ক্যাটেগরিঃ মানবাধিকার

নারীবাদ বা নারী মুক্তির বিরুদ্ধে অনেক কথা শোনা যায় আমাদের সমাজে। অনেকে আবার দাঁত-মুখ কিট-মিট করে, চোখ রাঙ্গিয়ে প্রশ্ন তুলে থাকেন —নারীবাদ আবার কী? আসলে নারীবাদ, নারীবাদ বলে যে নারী চিল্লা-ফালা করছে, তারা বেলেল্লাপনা করার জন্যই এমন করছে! ছিঃ ছিঃ! এরা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। —এ দৃষ্টিভঙ্গি আজকের নয়; বহুকাল ধরেই এই সমাজে, আমাদের মাঝে বিদ্যমান।

ধর্মান্ধতা, কুসংস্কার-মনাদের ধারণা, নারী তো কেবল ভোগের সামগ্রী! আর যা কিছু ভোগ্যপণ্য, তা তো নষ্ট হয়। সে ক্ষেত্রে নারীও নষ্ট হয়, যেমন —ডিম নষ্ট হয়, নারকেল নষ্ট হয়, দুধ নষ্ট হয়। ধর্মান্ধ আর কুসংস্কারাচ্ছন্নদের কাছে নারী তো কেবল দুধ, নারকেল, ডিমের মতোই! যেমন হেফাজত নেতা বলেছিলেন —‘নারী তেঁতুলের মতো’!

তাদের মতো ধর্মান্ধ, মৌলবাদী ধ্যান-ধারণায় বিশ্বাসীদের কাছে নারী আর যাই হোক, ‘মানুষ’ নয়! ইংরেজি অভিধানের ‘ম্যান আর ওমেন’ শব্দ দু’টিও বলে ‘মানুষ’ কে! এখান থেকেই হয় তো নারী-পুরুষের বৈষম্যের শুরু। ‘মানুষ’ শব্দটি নারীর জন্য নয়। এটি একমাত্র পুরুষের জন্য প্রযোজ্য। নারীদের কী ‘মানুষ’ হতে আছে? ‘মানুষ’ তো কেবলই পুরুষরা! তাই হয় তো এই সমাজও ভাবতে শেখায়, নারী কেবলই নারী, ‘মানুষ’ নয়!

আহ নারী, তুমি মানুষ হতে চাও কেনো! নারী তুমি নারীই থাকো, মানুষ হতে চেয়ো না। তাহলে তুমি নষ্ট হবে। ধর্ষিত হবে। দোররা বাড়ি অবধারিত তোমার জন্য। তুমি পাপিষ্ঠ হবে। কুলটা বলবে তোমাকে সমাজ। তুমি তো অবলা, পুরুষের জন্য শস্যক্ষেত্র, পুরুষের অর্ধাঙ্গিনী, ভোগ্যপণ্য —তোমার কী দরকার স্বাধীনতা চাওয়ার?

নারী, তুমি বরং ঘর সামলাও। বাচ্চা-কাচ্চা সামলাও। স্বামী-সন্তান সংসার সামলাও। তোমার বাইরে বের হওয়ার কী আছে! তুমি পর্দা করো। স্বামীর মঙ্গলের জন্য তুমি শাখা-সিঁদুর, বালা পড়, পূজা-অর্চনা কর। তুমি নামাজ পড়, রোজা রাখো, ব্রত করো স্বামীর কল্যাণে। স্বামীর জন্য না খেয়ে উপোষ বসে থাকো। স্বামী ফিরলে তবেই অন্ন গ্রহণ করো। এই তো তোমার কাজ! —এমন ধ্যান-ধারণার চর্চা বহুকাল ধরেই আমরা করে আসছি। এসবই আমরা পেয়েছি উত্তরাধিকার সূত্রে।

এর ফলে আমাদের সমাজে প্রকাশ্যে কিংবা গোপনে, ঘরে কিংবা বাইরে প্রতি মূহুর্তেই কোনো না কোনো নারী নির্যাতিত হচ্ছে, নিগৃহীত হচ্ছে। কোনো না কোনো পুরুষ দ্বার নারী হচ্ছে নিষ্পেষিত। পুরুষতান্ত্রিক সমাজের যে ধারা, যে নিয়ম, তা কখনোই নারীর পক্ষ অবলম্বন করে না। ধর্ম-কর্ম যাই বলি না কেনো —কোথাও নারী মুক্ত নয়।

তাই বহুকাল থেকেই নারীকে তার স্বাধীনতা, অধিকারের দাবী নিয়ে আন্দোলন করতে হচ্ছে। নারীর প্রতি পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গি বারবারই প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। কেনো পুরুষকে বারবার এমন প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়? নারীকে কেনো বলতে হয়, পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর প্রয়োজন?

নারী মানুষের অধিকার চায়। নারী তার প্রাপ্যটুকু চায়। একজন মানুষের অধিকার যা, নারী তাই চায়। মানুষ হিসেবে নারী অধিকারের নামই হচ্ছে নারীবাদ। পরিবার, কর্মক্ষেত্র ও সমাজে নারীর হীন-মর্যাদা বিষয়ে সচেতনতা অর্জন এবং এ অবস্থা পরিবর্তনে নারী ও পুরুষের সক্রিয় উদ্যোগের অপর নামই নারীবাদ। এটি একটি সামাজিক আন্দোলন —যা নারীর গৎবাঁধা ভূমিকা, লিঙ্গ বৈষম্য ও সমান অধিকার প্রতিষ্ঠার পক্ষে।

নারী মুক্তি বা নারী অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে শুধু নারী নয়, লিঙ্গ সমতা নিশ্চিত করতে হলে নারী ও পুরুষ উভয়কেই ভূমিকা রাখতে হবে। সেজন্য পুরুষকেও এগিয়ে আসতে হবে। কিন্তু বাস্তবতা কি? —পুরুষ কি নারীর সহায়ক শক্তি হতে পারছে?

এগিয়ে চলার ক্ষেত্রে পুরুষ দ্বারাই সর্ব প্রথম বাধাগ্রস্ত হতে হয় নারীকে। —হচ্ছে না? তবে আশার কথা হচ্ছে, নারীকে সহায়তার ক্ষেত্রে পুরোপুরিভাবে পুরুষ এগিয়ে না এলেও বলা যায়, পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে শুরু করেছে। নতুন দিনের সূচনা হচ্ছে।

নারী মুক্তির অন্তরায় ধর্মান্ধতা আর কুসংস্কারই দায়ী। এ জাল কেটে বের হয়ে আসতে হবে। এর থেকে উত্তরণের জন্য আমাদেরকে পথ খুঁজে বের করতে হবে। এক্ষেত্রে আবশ্যক, নারীবাদ প্রতিষ্ঠার পূর্বে মানবতা-বোধের চর্চা শুরু করা। তা হলেই সম্ভব নারীমুক্তি, প্রতিষ্ঠা পাবে নারীবাদ।

তবে নারী মুক্তি পরিপূর্ণতা পাবে প্রগতিশীল, মুক্তচিন্তা, মানবতা বোধের চর্চায় যখন আমরা পুরোপুরি অভ্যস্ত হবো। আর তা হলেই সমাজ থেকে দূর করা সম্ভব লিঙ্গ বৈষম্য। নারী-পুরুষ সমানে সমান হয়ে, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সমাজ বিনির্মাণের অংশীদার হতে পারবে। এতে করে রোধ করা সম্ভব নারীর প্রতি পুরুষের সহিংস আচরণ, পেশী শক্তির ব্যবহার। রোধ করা সম্ভব যৌন-নিপীড়ন, ধর্ষণের মতো ন্যক্কারজনক ঘটনা। জয় হোক মানবতার।