ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

 

f2yhexrx
যে বিষয়টি নিয়ে লিখতে যাচ্ছি, সেটা আজ সারাদিন ধরেই মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। লিখব বলেও বেশ ক’বার মত ঘুরিয়েছি। তবে শেষতক বসলাম অফিস থেকে ফিরে। আসলে এটা নিজের তাড়নায় লিখতে বসা। আসলে আমার একটি লেখায় যে সমস্ত সমালোচনা হচ্ছে গত দু’দিন; এটি বলা চলে তারই একটা সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা।

গেলো দু’দিন আমার একটি লেখায় বিডিনিউজের ফেসবুকে রীতিমতো সমালোচনার ঝড় তুলেছেন একশ্রেণীর পাঠক। গালাগাল দিয়েছেন আমাকেসহ ব্লগ এডমিনকেও। যা আজ আমার দৃষ্টিতেও পড়েছে। লেখাটির পক্ষে (নগণ্য) বিপক্ষে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ শুনে, পড়ে আমি নিজেই বিস্মিত! কিছুটা শঙ্কিত-ও বটে। তবে আত্মতৃপ্তি এই যে, এখনো দিশাহারা হইনি।

বিডিব্লগে ‘ঘৃণা নয়, নায়লা নাঈমের সাহসিকতায় শুভ কামনা’ শিরোনামে একটি লেখা পোষ্ট দিয়েছিলাম। এটা আমার ভীষণ অন্যায়! এখানে আমি যা বলেছি, তা অনেকটা অন্ধের পথচলায় টর্চের আলো দেয়া। এটা নি:সন্দেহে বোকামি।

ওই লেখাটিতে বলেছিলাম, যৌনতাও একটি শিল্প হতে পারে। নান্দনিকতার মধ্যে যৌনতার ব্যবহার হোক। তাই বলে অশ্লীলতা নয়। যৌনতাকে তুলে ধরা হোক শিল্পরূপে। যৌনতাও যে একটি শিল্প তা বুঝিয়ে দেয়ার জন্য এই দেশে আরো আরো অনেক নায়লা নাঈমের জন্ম হোক। এ কথা বলায় আমার চৌদ্দগোষ্ঠি উদ্ধার করেছে একটা শ্রেণী!

আসলে যে শ্রেণীটা আমার চৌদ্দগোষ্ঠি উদ্ধার করেছেন গালাগাল দিয়ে, তা কি শালীনতা? বোধ করি; শালীনতা আর অশালীনতা বুঝবার ক্ষমতা তাদের নেই। সে ক্ষমতা নেই বলেই তারা আমার যুক্তি বুঝতে পারেনি। তবে তাদেরকে বুঝানোর দায় আমার নেই। কেন না, তারা বোধ-বুদ্ধিহীন, অন্ধজন। এদের পথচলায় টর্চের আলো দিলেই কি আর না দিলেই কি।
auejuyb2
যৌনতা আমাদের প্রতিটি জীবনেই অনস্বীকার্য। তবে যৌনতার ব্যবহার একেক জনের কাছে একেক রকম। কোনো কোনো ক্ষেত্রে নান্দনিক উপস্থাপনায় যৌনতায় যুক্ত হয় শিল্প-মাত্রা। আবার কোনো কোনো উপস্থাপন হয়ে উঠে চরম অশ্লীল। আমার সেই লেখাটির মূল বক্তব্য বা বিষয় বস্তু ছিলো ঠিক এমনই। কিন্তু যারা লেখাটিকে ভিন্ন চোখে দেখেছেন; যারা লেখাটিকে অশ্লীল বলেছেন, আসলে তারা লেখাটি ঠিকঠাক মতো পড়েননি বলেই আমার বিশ্বাস। আর পড়ে থাকলেও তা পড়ার জন্য পড়েছেন, বুঝার জন্য নয়।

এক্ষেত্রে একটি গানের মধ্যভাগের একটি লাইন তাদের জন্য উদাহরণ হতে পারে, ‘গানের ছন্দে মন আনন্দে, মাথা ঝুলাও তালে, বুঝলি না রে অন্ধ মানুষ, গায়কে কি বলে’।
6otnb1rg
আমাকে যদি কেউ প্রশ্ন করে, ‘তোমার চোখে পৃথিবীর সবচে’ সুন্দর কোন দৃশ্যটি’? আমার উত্তর হবে, ‘একজন মা যখন তাঁর সন্তানকে বুকের দুধ পান করান’। আমি বোধ করি; পৃথিবীতে এর চে’ অধিক সুন্দর দ্বিতীয়টি নেই।

এখানে একজন মা তাঁর সন্তানকে নিজ বক্ষ উন্মুক্ত করে দুধ পান করাচ্ছেন। এমন দৃশ্য তুলে ধরেছেন চিত্রকর। যা বহু ক্যালেন্ডার, বা অনেকের ঘরে ফ্রেমাকারে শোভা পাচ্ছে বা পেয়েছিলো। যদিও চিত্রকর্মটিতে একজন নারীর উন্মুক্ত স্তন ছিলো স্পষ্ট, তবুও চিত্রটি অশ্লীল নয়। কেনো না; এর উপস্থাপন ভঙ্গি নান্দনিক, মনোমুগ্ধকর।
1526916_449328541835171_130198782_n
সুনীল গঙ্গপোধ্যায়ের উপন্যাস অবলম্বনে অঞ্জন দত্তের ‘হঠাৎ নীরার জন্য’ কিংবা বিশ্ব বিখ্যাত ‘টাইটানিক’ অথবা কবি আল মাহমুদের জল বেশ্যা উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত ‘টান’ সিনেমাতে যৌনতার ব্যবহার ছিলো যথেষ্ট; কিন্তু এক মুহূর্তের জন্যও তা অশ্লীল মনে হয়নি। তার কারণ, এসব যৌনতার চিত্র-ধারণ বা উপস্থাপনের আঙ্গিকটা ছিলো পুরোপুরি নান্দনিক। যার জন্য যৌনতা পেয়েছিলো শিল্প-মাত্রা।

শুধু এই সিনেমাগুলো কেন! এমন আরো বহু সংখ্যক সিনেমা রয়েছে; যেখানে যৌনতা এসেছে গল্প প্রাসঙ্গিক। কোথাও কোথাও যৌনতার উপস্থাপন ছিলো সচেতনতামূলক, শিক্ষণীয়। যার রূপ, রস, গন্ধ, সবই ছিলো নন্দন তত্বে ভরা; এক কথায়—নান্দনিক। তাহলে কী যৌনতাকে শিল্প বলা যায় না? যৌনতা কি শিল্প হতে পারে না?

যৌনতাও শিল্প হতে পারে। যৌনতাকেও দেয়া যায় শৈল্পিক রূপ; কেবলমাত্র ব্যবহার শৈলীর মাধ্যমে। যার উপস্থাপন ও আঙ্গিক হবে নান্দনিক। উপস্থাপন ক্ষেত্র হবে যথার্থ। যা সুকুমার শিল্প হয়ে হৃদয় ছুঁয়ে যাবে। তাহলে যৌনতাকে আর অশ্লীল মনে হবে না।

তবে এ সমস্ত যৌনতার চিত্রগুলি আবার অশ্লীল মনে হবে—দৃষ্টিভঙ্গি বা বোধ-বুদ্ধির কারণে। তাই সবার আগে প্রয়োজন আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। আর তা না হলে আমরা নান্দনিক উপস্থাপনকে অশ্লীল দাবী করে রে রে করে উঠবো। আবার অশ্লীলতাকে নান্দনিকতা ভেবে উল্লাসে ফেটে পড়ব!

যেমন ‘ট্যাঙ্কি ছেঁদা’, ‘ওই ছেরি তোর কপাল ভালা’, এবং ‘যৌবন আমার লাল টমাটো’র মতো অনেক গান আমাদের চারপাশে বেজেছে উচ্চস্বরে, এখনো কোথাও কোথাও বাজতে শুনি। এসব গানের সাথে আমরা উল্লাস করতেও দেখেছি ক্ষেত্র বিশেষ—যা কিনা চরম অশ্লীলতা।

আবার ‘আগুনের পরশমণি’, ‘দুই দুয়ারি’, ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’, কিংবা ‘চার সতিনের ঘর’, এবং ‘মেঘলা আকাশ’র মতো নান্দনিক সিনেমা আমরা টিকেট কেটে দেখি না! কিন্তু ‘ফায়ার’, ‘খাইছি তোরে’, ‘খবর আছে’ এবং ‘তছনছ’ সিনেমা দেখি নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে দ্বিগুণ টাকায় টিকেট কেটে! এখানে কি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি প্রশ্নবিদ্ধ হয় না?

আমরা, বিশেষ করে এক শ্রেণীর পুরুষেরা সবসময় নিজেদের ‘দুধে ধোয়া তুলসী পাতা’ জাহির করি। প্রকাশ্যে যৌনতার প্রশ্ন এলে অনেক পুরুষই ভাব ধরি, ‘ভাঁজা মাছটা উল্টে খেতে পারি না’! নারীকে স্বল্প বসনে দেখলে রে রে করে উঠি, জাত গেলো, জাত গেলো বলে হৈ চৈ করি। আবার সুযোগে হিংস্র নেকড়ে হয়ে উঠি। আবির্ভূত হই ধর্ষক রূপে! খুবলে খুবলে খাই হিজাব পড়া নারী দেহ-ও!

আমরা এমন একটা শ্রেণী যে, প্রেমিকাকে উন্মুক্ত পিঠ, স্ক্রিন টাইট স্লিপ লেস জামা, টি-শার্ট, জিন্স প্যান্ট পড়া দেখতে পছন্দ করি; কিন্তু স্ত্রীকে নয়! আবার আমরা অনেকেই ঘরে বউ রেখে গোপন প্রেমিকা রাখি; কিন্তু ঘরের বউ খোলা মনে কারো সাথে কথা বললেই তাকে কুলটা উপাধি দিই! আসলে আমরা সবাই—সাধু সাধু সাধু…!

‘আমাদের অঞ্চলে সৌন্দর্য্য অশ্লীল, অসৌন্দর্য্য শ্লীল। রূপসীর একটু নগ্ন বাহু দেখে ওরা হৈ চৈ করে, কিন্তু পথে পথে ভিখিরিনীর উলঙ্গ দেহ দেখে ওরা একটুও বিচলিত হয় না’। বহু আগে এই উক্তিটি করেছিলেন ড. হুমায়ূন আজাদ স্যার। যা বর্তমানেও প্রযোজ্য।

তবে আক্ষেপের বিষয় হলো, স্যার যখন ওই উক্তিটি করেন, তখন বাংলাদেশ এতোটা আধুনিক ছিলো না। ইন্টারনেটের ব্যবহার ছিলো না যত্রতত্র। টিভি ছিলো। ছিলো না ডিশ এন্টেনার ছড়াছড়ি। এখন যুগ পাল্টিয়েছে। আমরা হাতের মুঠোয় বিশ্বটাকে নিয়ে ঘুরছি। আধুনিক হচ্ছে দেশ, বেশ। কিন্তু আমাদের ধ্যান-ধারণা এখনো সেকেলে! এখনো পরিবর্তন হয়নি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি। আমাদের মনটাকে কী শৈল্পিকভাবে গড়ে তুলতে পারি না আমরা? বলতে কি পারি না—জয় হোক মানবতার?