ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

toslima
এক.
সত্য লেখার কারণে আপন দেশ ছেড়ে চলে যেতে হয়েছিলো তসলিমা নাসরিনকে। মৌলবাদী গোষ্ঠীর জন্য নিজের দেশে ফিরতে পারছেন না তিনি। এ নিয়ে প্রচণ্ড আক্ষেপ ছিলো আমার। ভেবেছিলাম আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে তাকে ফিরিয়ে আনবেন, —তাঁর নিরাপত্তা ব্যবস্থা করবে। কিন্তু ৯৬-২০০১ আওয়ামী লীগ সরকার হতাশ করলেন। আবারো ২০০৮ সালে ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ। এবারও একই অবস্থা! প্রগতিশীল, মুক্তমনা বুদ্ধিজীবীরা কেনো সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করেন না—তসলিমা নাসরিনকে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে? কেনো তাঁরা তসলিমা পক্ষ হয়ে সরকারের কাছে দাবী করেন না? এ নিয়েও আক্ষেপের কমতি ছিলো না।

মগজের কোষে কোষে হাজারো প্রশ্ন মিছিলের ন্যায় একজোট,—‘সরকার চাইলে কী তসলিমা নাসরিনকে দেশে ফিরিয়ে এনে তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেন না’? নিশ্চয় পারেন। কিন্তু সরকারের সেই আন্তরিকতা নেই। — তাঁদের আন্তরিকতা নিয়ে আমরা সন্দিহান! বোধ করি, সরকার নিজেও চায় না,—তসলিমা ফিরে আসুক! তাই হয় তো সরকার পক্ষ থেকে তাঁকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হয়না। আর করা হবে বলেও মনে হয় না। তবে এবার আমরাও আর চাই না তসলিমা নাসরিন ফিরে আসুক। তাঁর এই দেশে ফেরার দরকার নেই।

দুই.
সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনী খুনের পর যে দেশের প্রধানমন্ত্রী বলতে পারেন,—‘কারো বেডরুম পাহারা দেয়া সম্ভব নয়’। আবার জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে এই দেশের প্রধানমন্ত্রীই বলেন,—‘ওসমান পরিবারে আওয়ামী লীগের জন্ম হয়েছে’ তাই এদের দেখাশোনার দায়িত্ব আমাকেই নিতে হবে’! তবে কী এই দেশ খুনি, সন্ত্রাসীদের জন্য! ইতোপূর্বে প্রধানমন্ত্রীর করা ওই মন্তব্য তেমন ইংগিত কি বহন করে না?

আর যদি তা না-ই হবে, তাহলে সাগর-রুনী খুন প্রসঙ্গে একরকম মন্তব্য আর গডফাদারের তকমা লাগানো সেই ওসমান পরিবার সম্পর্কে ভিন্ন মন্তব্য কেনো হবে? অথচ এই ওসমান পরিবারের বিরুদ্ধে অভিযোগের অন্ত নেই। যেমন, ২০১০ সালের ১৭ই আগস্ট জেলা প্রশাসকের সম্মেলনে জেলা আইনশৃঙ্খলা মিটিংয়ে ডিসিসহ একাধিক এমপির সামনেই সে-সময়কার এমপি সারাহ বেগম কবরীকে দেখে নেয়ার হুমকি দিয়েছিলো এমপি নাসিম ওসমান (বর্তমানে মৃত)।

২০১১ সালের ১৮ই জুন জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে বাস-ভাড়া নিয়ে আঞ্চলিক পরিবহন কমিটির সভায় ডিসি-এসপি’র সামনেই এমপি কবরীকে শামীম ওসমান লাঞ্ছিত করেন। একই সময় মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি আনোয়ার হোসেনের মুখে সজোরে ঘুষিও মারেন শামীম ওসমান!

২০১২ সালে নারায়ণগঞ্জ রেলস্টেশনে রেলওয়ের মূল্যবান জমিতে নাসিম ওসমানের ছত্রছায়ায় অবৈধ মার্কেট নির্মাণকাজ শুরু হয়। দোকান বরাদ্দ দেয়ার নামে নাসিম ওসমান ও কয়েকজন কোটি কোটি টাকা অগ্রিম সেলামি হাতিয়ে নেন।

২০১৩ সালের ১৭ই এপ্রিল জেলা আইনশৃঙ্খলা মিটিং থেকে বেরিয়ে নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাব সভাপতি ও সংবাদ সংস্থা বাসস’র ডেপুটি চীফ কবি হালিম আজাদকে নাসিম ওসমান কর্তৃক হুমকি।

চাঞ্চল্যকর আশিক, ভুলু, চঞ্চল ও মিঠু হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে আজমেরী ওসমানের ওপর। এছাড়াও সবচেয়ে আলোচিত মেধাবী শিক্ষার্থী তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী হত্যাকাণ্ডের অভিযোগও রয়েছে এই ওসমান পরিবারের ওপর।

শুধু তাই নয়। এমন আরো অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে এই ওসমান পরিবারের ওপর। যা নারায়ণগঞ্জের টোকাই শ্রেণী থেকে শুরু করে এলিট শ্রেণী পর্যন্ত জানেন সেসব কথা। অথচ প্রধানমন্ত্রী তাদের দায়িত্ব নিতে চান!

তিন.
প্রধানমন্ত্রী ওসমান পরিবারের মতো এমন একটি পরিবারের দায়িত্ব নেয়ার কথা জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে যখন বলতে পারেন (!) তখন বোধ করি, —এই দেশ তসলিমা নাসরিনের জন্য নয়। এই দেশ মুক্তমনা ব্লগার রাজীব হায়দার, অভিজিৎ রয়, অনন্ত দাসের জন্য নয়। এ দেশ মুক্তমনা, ধর্ম নিরপেক্ষ-বাদীদের জন্য নয়।

তাই সান্ত্বনা তসলিমা নাসরিন দূরে আছেন, ভালো আছেন। অন্তত জীবন নিয়ে বেঁচে আছেন। দেশে এলেই তো মৌলবাদী গোষ্ঠী ঝাঁপিয়ে পরবে তাঁর মুণ্ড নেয়ার জন্য। ধর্মান্ধ দলের চাপাতি কেড়ে নিতে চাইবে তাঁর প্রিয় জীবনটাকে। কেড়ে নিবে তাঁর শানিত কলম! দূরে থেকে অন্তত তিনি লিখে তো যেতে পারছেন। এটাই বোধ করি তাঁর অসংখ্য পাঠকের আত্মতৃপ্তি, সান্ত্বনা, অন্তত আমাদের প্রিয় লেখক তসলিমা নাসরিন বেঁচে তো আছেন। এই প্রাপ্য-টুকোই বা কম কিসের!

এই দেশ। দেশের সরকার। দেশের মানুষ আপনাকে নিরাপত্তা দিতে পারবে না। আসলে দিতে পারবে, দিতে চায় না। এটাই এখন স্পষ্ট। তাই, কী দরকার দেশে ফেরার? দূরে আছেন সেই ভালো, দূরেই থাকুন। আপনি দূরেই থাকুন আমাদের প্রিয় মানুষ, প্রিয় ব্যক্তিত্ব হয়ে। আপনার ক্ষুরধার লেখনীর মাধ্যমে খুলে দিন আরো কিছু নোংরা মানুষের মুখোশ। তুলে ধরুন তাদের মন্দ, কুরুচি সব আস্ফালন।

সেই ভালো, দূরেই থাকুন তসলিমা নাসরিন। আপনি আরো আরো লিখুন। প্রতিটি মোড়ে, অলিতে-গলিতে, মানবকুলে সৃষ্টি করুন জাগরণ। জাগিয়ে তোলার অমিয় সুধা পান করান আমাদের ঝিমিয়ে পরা বিবেক, বোধ-বুদ্ধিকে। —আমাদের সব কিছু যে আজ নষ্টদের দখলে চলে গেছে!

হুমায়ূন আজাদ স্যর আগেই জানতেন,—‘সব কিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে’। তা তিনি লিখেও গিয়েছিলেন তাঁর কবিতায়। কিন্তু কবে যাবে সব নষ্টদের দখলে? তা হয় তো তাঁর জানা ছিলো না। হয় তো তিনি এখন থাকলে আবারো লিখতেন,—‘সব কিছু নষ্টদের দখলে চলেই গেছে’।