ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

00001
তসলিমা নাসরিন পচা একজন লেখক। যতসব পুরুষ বিদ্বেষী লেখা লিখে, বোকা বোকা মেয়ে-গুলানরে চালাক করে দিতাছে। যার কারণে, আজকে অনেক মেয়েই নিজ অধিকার সম্পর্কে সচেতন। যার কারণে মেয়েরা বুঝতে শিখেছে, কোন সিদ্ধান্ত সে নিবে, কোন সিদ্ধান্ত নিবে না। মেয়েগুলা বুঝতে শিখেছে, ‘জীবন যেহেতু আমার, সিদ্ধান্তটাও আমার’।

আহ হা তসলিমা নাসরিন! এটা আপনি কী করেছেন! এতে করে যে পুরুষগুলা (মূলত যারা পেশিশক্তি ব্যবহার করে নারীকে কোণঠাসা করে রাখার ইচ্ছা পোষণ করতেন) বড্ড বেকায়দায় পড়েছে! এর ফলে আগের মতো মেয়েগুলার লগে এরা লুতুপুতু প্রেম প্রেম, যাচ্ছে তাই আচরণ, যত্রতত্র তাদেরকে অবলা, অক্ষম, এরা পারবে না, দুর্বল, এদের দিয়া কিস্যু হবে না জাতীয় কথাগুলা উচ্চারণ করতে পারে না। ইস! আপনি বড্ড বেশি ক্ষতি করে দিয়েছেন পুরুষ-তন্ত্রের ধারক-বাহকদের। তাই তো তারা আপনাকে বলছেন, ‘তসলিমা নাসরিন নষ্টা, পথভ্রষ্ট’!

আমাদের সমাজে তসলিমা নাসরিনের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি ক্ষিপ্ত ধর্মান্ধ তথা বক ধার্মিকেরা। তবে ইদানীং তথা কথিত প্রগতিশীলরা প্রকাশ্যে না হলেও গোপনে গোপনে হয়ে উঠেছেন তসলিমা বিরোধী। বলতে শুরু করেছেন, ‘তসলিমা কোনো লেখকই না। তাঁর লেখা কোনো সাহিত্য কর্ম না। তাঁর বক্তব্য মূর্খ সুলভ। ধর্মকে আঘাত করে সে নিজের জনপ্রিয়তা বাড়ানো চেষ্টায় লিপ্ত। এটা জনপ্রিয়তা না, এটা কুপ্রিয়তা’। যার বড় প্রমাণ দিয়েছিলেন আমাদের সভ্য-সাচিরা মামলার আশ্রয় নিয়ে!

যেসব বক ধার্মিকেরা তসলিমা নাসরিনকে মূর্খ বলেন, তাঁর আলোচনাকে কটাক্ষ করে মন্তব্য করেন, তারা তো করবেনই! কেনো না, এরা তো বক ধার্মিক। ধর্ম ব্যবসা ছাড়া এদের যে আর কোনো পুঁজি নেই। তসলিমা তো সেই ব্যবসার মুলে হাত দিয়েছেন। বক ধার্মিকদের মুখোশ, লুঙ্গিতে টান দিয়েছেন তিনি।

তসলিমা বড্ড পাজি, কী দরকার ছিলো ধর্ম ব্যবসায়ীদের লুঙ্গিতে টান দেয়ার? কী দরকার ছিলো তাদের ব্যবসায় লাল বাতি জ্বালানো! কী দরকার ছিলো তসলিমার, আমাদের সভ্য-সাচিদের মুখোশে টান দেয়ার? আসলেই তসলিমা নাসরিন খুব বেশি বাড়াবাড়ি করেন। কেনো যে তিনি, বক ধার্মিক আর সভ্য-সাচিদের জি হুজুর, জি হুজুর করে যেতে পারলেন না! একটা বোকা লেখক সে। তাই তো তাঁকে দেশ ছাড়া হতে হয়েছে।

এই সমাজে একটা শ্রেণী থাকে তথাকথিত ঈশ্বরের মতো, লোকচক্ষুর আড়ালে। এরা প্রচণ্ড স্বার্থ-বাদী। এদের স্বার্থে কেউ ব্যাঘাত ঘটালে তার বারোটা বাজিয়ে ছাড়েন। এই শ্রেণীটা প্রকাশ্যে অনেক ভদ্র, নম্র। পক্ষান্তরে হিংস্র, পিশাচ। এই শ্রেণীটার বিরুদ্ধে কেউ কখনো সত্য উচ্চারণ করলে এরা সুকৌশলে বৃহত্তম একটি গোষ্ঠীকে অর্থ আর বুদ্ধি দিয়ে উস্কে দেয়। এক্ষেত্রে তাদের প্রথম পছন্দ মৌলবাদী গোষ্ঠী। কেনো না, এই গোষ্ঠীটা নিতান্তই মূর্খ, বর্বর। এরা কান আছে কিনা যাচাই না করে চিলের পিছনে ছুটে, এটাই এদের বৈশিষ্ট্য। যেমন, তসলিমা কি বলেছেন, তা যাচাই বাছাই না করেই তাঁর মুণ্ড চাই, মুণ্ড চাই বলে শ্লোগান ধরেছিলেন।
00002
যেমন ২০০৩ সালে একই ধরণের শ্লোগান ধরেছিলো মনিকাকে নিয়ে। মনিকা আলি লন্ডন প্রবাসী বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত লেখক। তিনি তাঁর উপন্যাস ‘ব্রিক লেন’ লিখে বাংলাদেশি, বিশেষ করে সিলেটিদের মাধ্যমে চরম বিতর্কিত হয়েছিলেন। তার বিরুদ্ধে উত্তেজিত হয়ে উঠেছিলো সিলেটিরা। তাঁকে যেন বাংলাদেশে আসতে দেয়া না হয়, সেজন্য সভা সমাবেশও করা হয়। এমন কি সে যদি সিলেটে আসার চেষ্টা করে, তাহলে এয়ারপোর্টেই তাঁকে মেরে ফেলা হবে বলেও হুশিয়ারি উচ্চারণ করেছিলেন উগ্রপন্থী কিছু অন্ধ জনগোষ্ঠী। তাঁর অপরাধ, —তিনি তাঁর উপন্যাস ‘ব্রিক লেন’ এ বাংলাদেশকে ছোট করেছেন (এটা উত্তেজিতদের অভিযোগ)!

এ প্রসঙ্গে একটি হাস্যকর ঘটনা হচ্ছে, —মনিকা ‘ব্রিক লেন’ লিখেছিলেন ইংরেজি ভাষায়, যার বাংলা অনুবাদ নেই। কিন্তু এক সমাবেশে সিলেটের একটি ইউনিয়নের জৈনক চেয়ারম্যান মণিকার বিরুদ্ধে বক্তব্য দিচ্ছিলেন, —‘মনিকা বাংলাদেশকে ছোট করে লিখেছেন। তিনি বাংলাদেশকে বিতর্কিত করেছেন। তাকে বাংলাদেশে আসতে দেয়া হবে না। সে এখানে আসার চেষ্টা করলে তাকে এয়ারপোর্ট থেকে ফেরত পাঠানো হবে। সে বাঙালি নামের কলঙ্ক’। এমন আরো অনেক কিছু বলেছিলেন তিনি।

কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, —সেই চেয়ারম্যান বইটি পড়েননি। আসলে পড়েননি তা নয়, তার পক্ষে মনিকা আলির ‘ব্রিক লেন’ পড়া সম্ভব নয়। কেনো না, চেয়ারম্যান মহদোয় ছিলেন এক্কেবারেই অক্ষরজ্ঞাণহীণ। তবুও তিনি মনিকা বিরোধী! সাংবাদিকরা বিষয়টি বুঝতে পেরে তার কাছে জানতে চাইলেন, —তিনি বইটি পড়েছিলেন কিনা? তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, —‘নাহ, শুনেছি তিনি (মনিকা) বাংলাদেশকে ছোট করে বই লিখছেন’!

আমাদের সমাজে এমন অক্ষরজ্ঞাণহীণ মানুষের অভাব নেই। আবার অক্ষর জ্ঞানযুক্ত মানুষও আছেন, যারা কেবল শোনার উপরই বিশ্বাস করেন। এই সংখ্যার লোক আমাদের সমাজে নেহাত কমন নয়। এ জাতীয় মানুষদেরকে অন্ধ বলা যায়। এরা যুক্তিতে বিশ্বাসী না। মূলত এরাই মৌলবাদ গোষ্ঠী। এরাই প্রত্যক্ষ আর পরোক্ষভাবে মৌলবাদীদের আশ্রয়, পশ্রয়দাতা। এরাই মৌলবাদকে উস্কে দেয়।

‘মৌলবাদ’ বর্তমানে পৃথিবীর সবচেয়ে ব্যাপক ব্যবহৃত শব্দ। মৌলবাদ শব্দটি বর্তামানে প্রচণ্ড রকম নিন্দার্থক এবং ভীতিকর শব্দগুলোর অন্যতম একটি শব্দ। মৌলবাদ শব্দটির অবস্থান এখন মীর জাফর, রাজাকার শব্দের মতোই ঘৃণিত। মৌলবাদ মানেই প্রতিক্রিয়াশীলতা, রক্ষণশীলতা, কূপমণ্ডুকতা, আদর্শিক উগ্রতা, চরমপন্থি, প্রগতি ও আধুনিকতার বিরোধী। এরা আবার কল্লা কাটায়ও সিদ্ধহস্ত।

আজকের প্রেক্ষাপটে বলতে পারি, যা কিছু আধুনিক, প্রগতিশীল বিকাশের বিরোধী তা-ই মৌলবাদ এবং যারা এই প্রগতি-বিরোধী তন্ত্র, মন্ত্রে বিশ্বাসী মূলত তারাই মৌলবাদী। যেমন, খ্রিস্টান মৌলবাদ, হিন্দু মৌলবাদ, ইসলামি মৌলবাদসহ নানা ধর্মাবলম্বী মৌলবাদ। অথচ মৌলবাদ শব্দটি উচ্চারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষিপ্ত, হিংস্র হয়ে উঠে ইসলামি মৌলবাদীরা! যার কারণে এই গোষ্ঠীটি বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে বেশি আতঙ্কের, সর্বাধিক আলোচিত। যাদের আচার-আচরণ বিশ্বব্যাপী নিন্দিত, ঘৃণিত। এই গোষ্ঠীটা কল্লা বা মুণ্ড কাটতে বেশ পারদর্শী। এরা যুক্তি বুঝে না, মানুষ বুঝে না—এরা কেবল ধর্ম বুঝে।

এই মৌলবাদ শ্রেণীটা সবচেয়ে বেশি ক্ষিপ্ত মানবতাবাদ, নারীবাদ বা মুক্তবাক বিশ্বাসীদের প্রতি। তবে বাংলাদেশে এই শ্রেণীটা সবচেয়ে বেশি ক্ষিপ্ত নারীবাদী, মানবতার পক্ষে আপোষহীন শক্তি তসলিমা নাসরিনের উপর। এদের যুক্তি হলো, —তসলিমা নাসরিন ইসলাম ধর্ম, আল্লা আর মোহাম্মদ নিয়ে কটূক্তি করে লিখেছেন। কিন্তু এদের মধ্যে দশভাগ মানুষ তসলিমা নাসরিনের লেখা পড়েছেন কিনা, তা সন্দেহজনক। তবুও এরা তসলিমা বিরোধী। তবুও এরা তসলিমার মুণ্ড চায়। তাদের মতে, তসলিমা ইসলাম নিয়ে যাচ্ছে তাই বলেছে। তসলিমা নাস্তিক মুরতাদ।
0003
প্রশ্ন হচ্ছে, তসলিমা যাই লিখেছে বা যাই বলেছে, তা কী কেবল একটি ধর্ম কেন্দ্রিক? তিনি কী হিন্দু বা অন্য ধর্ম নিয়ে সমালোচনা করেননি? তাহলে শুধু শুধু কেনো ইসলামি মৌলবাদরা তার উপর ক্ষিপ্ত বেশি? আসলে তসলিমার মন্তব্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে ইসলামি মৌলবাদ বা ইসলাম ধর্ম ব্যবসায়ীরা, এটাই এখন স্পষ্ট। তাই এই শ্রেণীটা ক্ষিপ্ত। যার প্রমাণ মাসিক মদিনা বা ইনকিলাব গোষ্ঠী।

এই গোষ্ঠীটার প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা মান্নানকে নিয়ে লেখার কারণেই তসলিমার বিরুদ্ধে বেশি সোচ্চার হয় একটা শ্রেণী। যে শ্রেণীটা মৌলবাদ গোষ্ঠী। যারা ইনিয়ে বিনিয়ে, ধর্মটাকে ঢাল করে সাধারণ মানুষকেও ক্ষেপীয়ে তুলেছেন। যা অন্ধর মতো বিশ্বাস করে ক্ষিপ্ত আর হিংস্র হয়ে উঠেছে অন্ধ-ধার্মিকেরা। অথচ যুক্তির বাইরে তসলিমা একটি কথা লিখেছেন, এমন প্রমাণ কেউ দেখাতে পারবে বলে মনে হয় না।

তসলিমা নাসরিন এ যাবত-কাল যা লিখেছেন তা নি:সন্দেহে সমাজের, মানুষের কথা লিখেছেন, অধিকার আদায়ের জন্য সোচ্চার হতে আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। সমাজের অসঙ্গতিগুলো তুলে ধরেছেন তিনি। কিন্তু এসব যুক্তি তীক্ষ্ণ সূচের মতোই বিঁধেছে ধর্মান্ধ, সুবিধাবাদীদের গায়ে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, যুক্তি মেনে নিতে এতো ভয় কেনো পায় মৌলবাদীরা? কেনো তারা মেনে নিতে চায় না, যা যুক্তিসংগত তাই সত্য?

কথায় আছে, সত্য কথা সূচের মতো তীক্ষ্মভাবে গায়ে বিঁধে। সত্য তাই সহসায় সহ্য করতে পারে না এরা। যার কারণে তসলিমার উপর ক্ষিপ্ত মৌলবাদ গোষ্ঠী। এই গোষ্ঠীটা সত্য কোনকালেই সহ্য করতে পারে না। এই গোষ্ঠীর অধিকাংশ-জনই জানে না তসলিমা কি লিখেছেন! তবুও এরা তসলিমার মুণ্ড চাই বলে শ্লোগান ধরছে। আসলে এদেরকে একটা শ্রেণী অর্থ আর বুদ্ধি দিয়েই মাঠে সক্রিয় করে রেখেছে। আর এই শ্রেণীটা তথাকথিত ঈশ্বরের মতোই লোকচক্ষুর আড়ালে থাকেন। এরা ধর্ম ব্যবসায়ী। এরা চরমভাবে স্বার্থ-বাদী একটা গোষ্ঠী বা শ্রেণী।

(বি: দ্র: প্রথম আলো ব্লগের মতো বিডি ব্লগটিও আমার কাছে অতি প্রিয় হয়ে উঠলো কেমন জানি, বুঝতে পারি নি। তাই যা লিখি, এখানে শেয়ার করার লোভটা সামলাতে পারিনা। ফলে এই লেখাটি ‘ইস্টিশন’ ব্লগে দেয়ার পরও এখানে দিলাম আবার। বাধাধরা কোনো নিয়ম আছে কিনা জানি না। এডমিনের আপত্তি থাকলে বোধ করি এটি প্রকাশ হবে না। আপত্তি না থাকলে আশা রাখি প্রকাশ হবে।)