ক্যাটেগরিঃ প্রশাসনিক

 

03
বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠেছে ঢাকা শহর। কথাটা শুনতে খারাপ শোনা গেলেও, এটাই বর্তমান বাস্তবোচিত। ময়লা আবর্জনা! নাহ। ঢাকা বাস-অযোগ্য হয়ে উঠেছে যানজটের কারণে। আর এই যানজট সমস্যা বর্তামানে ঢাকাবাসীর কাছে অন্যতম প্রধান একটি সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। যা অনেকটা ‘গোদের ওপর বিষ ফোঁড়া’।

বর্তমান সময়ে ঢাকাতে যানজট কাক-ডাকা ভোর থেকে শুরু করে মধ্যরাত পর্যন্ত বিস্তার লাভ করেছে। আর এর ফলে ঢাকাবাসীকে বিশ পঁচিশ মিনিটের রাস্তা পেরুতে হলে দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা অথবা তারও বেশি সময় ব্যয় করতে হচ্ছে! যা রীতি মতো ভয়ানক একটা ব্যাপার। ফলে নাগরিক জীবনে ঘটছে ছন্দ-পতন।

যানজট নিরসনের জন্য ঢাকায় একের পর এক ফ্লাইওভার তৈরি হচ্ছে। কিন্তু, এতে করেও কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। বরং দিনদিন পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য কেবল মাত্র ফ্লাইওভারই নির্মাণই যথেষ্ট নয়।

পুরো ঢাকাকে যদি ফ্লাইওভার দিয়ে ঢেকে দেয়া হয়, তবুও বোধ করি, যানজট সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। এ সমস্যা সমাধানে চাই ভিন্ন চিন্তা-ভাবনা। প্রয়োজন যুগাপোযুগি পরিকল্পনা। ঢাকা শহরের বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবেলা করার জন্য দরকার এখান থেকে জনসংখ্যার চাপ কামানো। এর জন্য প্রয়োজন সরকারের কার্যকরী পদক্ষেপ।

ঢাকায় যেভাবে প্রতিদিন মানুষ আর গাড়ির চাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে, তা আগামী পাঁচ বছর পর কোন পর্যায় গিয়ে দাঁড়াবে! একবার ভাবতে পারেন? তখন শহরে গাড়ি থাকবে ঠিকই, কিন্তু সেই গাড়ি করে কী প্রয়োজনীয় গন্তব্যে যাওয়া-আসা করা সম্ভব হবে?

বর্তমান প্রেক্ষাপট বলছে ভিন্ন কথা। বর্তমান পরিস্থিতিই সাক্ষ্য দিচ্ছে, আগামীতে পায়ে হেঁটেই ঢাকাবাসীকে চলাচল করতে হবে। আর যদি তাই হয়, তাহলে এই যানজট সমস্যার সাথে পাল্লা দিয়ে সামগ্রিক জীবনের কাজ-কর্ম সময় মতো সম্পাদন করা কি সম্ভব? স্বাভাবিক জীবনের গতিপথ কি বাঁধাগ্রস্ত হবে না? সামগ্রিক জীবনের ছন্দ-পতন ঘটবে না?

আমরা অনেকেই মনে করি যানজট সমস্যার মুলে ফুটপাত দখল একটি প্রধান কারণ। তা না হয় মেনে নিলাম। কিন্তু ফুটপাত যদি দখলমুক্ত করা হয় তাহলে কি এই যানজট সমস্যা সমাধান সম্ভব? হয় তো সম্ভব কিছুটা। কিন্তু ঢাকা থেকে ফুটপাত একেবারেই দখলমুক্ত করা সম্ভব? কেনো না, মানুষের চাহিদার জন্যই ফুটপাত দখল হচ্ছে। আর এই চাহিদা যেহেতু মানুষের, সেহেতু ফুটপাত সকালে বেদখল হলে বিকেলে আবার দখল হবেই। ফলে যানজট নিরসনের জন্য শুধু ফুটপাতের পিছনে ছুটলেই হবে না।
02
তাহলে কি যানজট নিরসনের জন্য ঢাকা থেকে মানুষের চাপ কমাতেই হবে? হ্যাঁ। ঢাকা থেকে মানুষের চাপ কমাতে হবে। আর এখান থেকে মানুষের চাপ কমলে কমে যাবে গাড়ির চাপও। সেই সাথে ফুটপাত থেকেও কমবে দখলদারের সংখ্যা। এর ফলে রাজধানী থেকে যানজট নিরসন করা বা নিয়ন্ত্রণ করা হবে সহজতর। আর এসব করা সম্ভব হলে ঢাকাবাসি, সাধারণ মানুষ ফিরে পাবে স্বস্তির নি:শ্বাস।

ঢাকা থেকে মানুষের চাপ কমানো কী করে সম্ভব? অবশ্যই সম্ভব। এর জন্য প্রয়োজন কেবল সরকারের আন্তরিকতা এবং কার্যকরি পদক্ষেপ। সেই সাথে দরকার ব্যবসায়ীদের আন্তরিক সহযোগিতা। সরকার আর ব্যবসায়ীদের যৌথ উদ্যোগই একমাত্র পারবে ঢাকাকে যানজট-মুক্ত নগরী হিসেবে গড়ে তোলতে।

বর্তমানে ঢাকায় থাকার যে কষ্ট তাতে বুঝা যায়, শখ করে কেউ আর এখানে থাকতে আসে না। বরং চাকরি, ভালো শিক্ষা, চিকিৎসা, জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ভালো সুযোগ, এ সব কারণেই ঢাকায় আসা। তারা যখন বুঝতে পারে এর সঙ্গে তুলনীয় সুযোগ-সুবিধা অন্য শহরে বা গ্রামে পাওয়া যাবে না, তখন মানুষগুলো হাজার বিড়ম্বনা, যন্ত্রণা সহ্য করে দাঁত কামড়ে পড়ে থাকে এখানে।

ঢাকা শহর বাঁচাতে হলে অবশ্যই এর জনসংখ্যা কমাতে হবে। তবে এখান থেকে জনসংখ্যা কমাতে কোনো আইন প্রণয়নের দরকার নেই। বরং বর্তমানে এ সরকার গ্রামগুলিকে অবহেলা করে শুধুমাত্র ঢাকা শহরে বেশি বেশি টাকা খরচ করে এখানকার ব্যবসায়ীদের স্বার্থরক্ষার যে নীতি গ্রহণ করেছে, তা থেকে সরে এলেই এই শহর থেকে লোকসংখ্যা আপনা আপনিই কমে যাবে।

অনেকে মনে করেন, শহরে গাড়ির সংখ্যা কমিয়ে বাস চালু করলেই হয় তো যানজট সমস্যার সমাধান হবে। তাদের জানা উচিত, শহরে গাড়ি একেবারে বন্ধ করে যদি ক্রমবর্ধমান মানুষের জন্য বাসের ব্যবস্থা করা হয়, তাহলে পরিণামে রাস্তায় বাসের জট আরো বৃদ্ধিই পাবে। এতে করে সমস্যা সমাধানের চেয়ে আরো প্রকট হবে।

তাই ঢাকা শহরের যানজট সমস্যার সমাধান করতে হলে এর জনসংখ্যা অবশ্যই কমাতে হবে। এর থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে এখান থেকে জনসংখ্যা কমানো ছাড়া বিকল্প আর কোনো পথ খোলা নেই। তবে এর জন্য দরকার একাধিক উপ-শহর নির্মাণ।

এক্ষেত্রে প্রথমদিকে ঢাকার আশপাশে তথা, মুন্সিগঞ্জ, শ্রীনগর, নবাবগঞ্জ, নরসিংদী, গজারিয়া, রূপগঞ্জ, সোনারগাঁও, মেঘনা সহ এর আশপাশের অঞ্চলগুলোকে উপ-শহর হিসেবে গড়ে তোলা যেতে পারে। কেনো না, এসমস্ত অঞ্চলগুলো থেকে ঢাকায় যাতায়াত খুবই সহজতর।

সেই সাথে নির্মিত উপ-শহরগুলোতে নাগরিক সুযোগ সুবিধার আধুনিক ব্যবস্থা যাতে থাকে, সেদিকটাও নিশ্চিত করতে হবে। অবশ্য এর জন্য সর্বপ্রথম প্রয়োজন, সুষ্ঠু-সুন্দর একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করা।

তবে উপ-শহর নির্মাণের পর বসে থাকলেই হবে না। উপ-শহর নির্মাণের পর সেখানে স্থানান্তর করতে হবে রাজধানী থেকে সকল কল-কারখানা, গার্মেন্টস বা এমন উৎপাদনশীল কোম্পানিগুলোকে। এখন কেউ কেউ প্রশ্ন করতে পারেন, তবে কি ঢাকা শহরকে আমি একেবারে ফাঁকা করে ফেলার কথা বলছি! প্রশ্ন তুলতে পারেন, তাহলে এ শহরের প্রয়োজনীয়তা কী?

না। আমি ঢাকাকে একেবারে ফাঁকা করার কথা বলছি না। আমি বলছি সুষ্ঠু-সুন্দর একটি পরিকল্পনার কথা। যার ফলে গ্রামগুলো শহর হবে। আর রাজধানী হবে আরো উন্নত। যেমন, ঢাকা শহরে বা শহর লাগোয়া যেসব স্থানে বড় বড় উৎপাদনশীল কোম্পানি বা কল-কারখানাগুলো উপ-শহরে স্থানান্তর হলেও, এগুলোর প্রধান কার্যালয় তথা দাপ্তরিক কাজ-কর্ম যেন রাজধানী থেকেই পরিচালিত হয়, এ ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে।

আর তা করা সম্ভব হলে এর সাথে সাথে নিজ থেকেই ঢাকা থেকে কমে যাবে বৃহত্তম একটি জনগোষ্ঠী। এতে করে ঢাকা যেমন হবে যানজট-মুক্ত নগরী। তেমনি হবে দুষণমুক্তও। সেই সাথে এই রাজধানী হবে একটি মডেল নগরি।