ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

01
ছাত্রলীগের এক কর্মীকে ‘মারধরের’ অভিযোগে ঢাকার তিতুমীর কলেজের সামনের রাস্তায় তাণ্ডব চালিয়েছে সংগঠনটির কর্মীরা। এই ঘটনায় সোমবার (6জুলাই) বেলা আড়াইটার দিকে সরকার-সমর্থক ছাত্র সংগঠনের কর্মীদের ভাংচুরের শিকার হয়েছে বিভিন্ন ধরনের অন্তত ৩০টি গাড়ি। সূত্র: বিডি নিউজ।

মুল ঘটনা, কলেজ শাখার ছাত্রলীগ-কর্মী সানি নামের এক শিক্ষার্থীকে মারধর করেছে রব্বী নামের একজন। আর এই রাব্বী ঢাকা মহানগর শ্রমিক লীগের সভাপতি দেলোয়ার হোসেনের সমর্থক। আর এমনটি স্বীকার করেছেন খোদ তিতুমীর কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি কাজী মিরাজুল ইসলাম ডলার।

আর ঘটনার পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ঢাকা মহানগর পুলিশের গুলশান বিভাগের উপ কমিশনার মুশতাক আহমেদ খান জানিয়েছেন, ‘পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে। কী কারণে এ ঘটনা ঘটেছে, তা আমরা জানার চেষ্টা করছি’!

পুলিশের উপ-কমিশনারের এমন বক্তব্যে সাধারণ মানুষ ব্যথিত এবং মর্মাহত হবেন এটাই স্বাভাবিক। এমন একটি ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর তার কী এমন বক্তব্য আমাদের কাম্য ছিলো? নাকি সরকার সমর্থিতরা ওই ঘটনাটি ঘটিয়েছে বলেই তার সুর নমনীয়?

অথচ ঘটনা সম্পর্কে জানা যায়, সরকার সমর্থিতদের নিজস্ব কোন্দলের কারণে সৃষ্টি হয়েছে ওই ঘটনা। আর এতে তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে ক্ষতি করেছেন সাধারণ মানুষের গাড়ি! তাহলে যারা এদের তাণ্ডবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেন, সেই ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দিবে কে? নাকি সাধারণ মানুষ সরকার সমর্থিত আর বিরোধীদের দ্বারা এমন করেই ক্ষতিগ্রস্ত হতেই থাকবে? এ প্রশ্নের উত্তর আমাদের রাজনৈতিকরা দিবেন কী?

আমরা জানি এই দেশে পুলিশ বিশেষ করে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সাধারণ জনগণের চিন্তা ভাবনা করার চেয়ে বেশি চিন্তা করেন সরকারি দলের। এটা এদেশের রীতিনীতি, যা জন্মলগ্ন থেকেই প্রতীয়মান। কিন্তু বর্তমান সময়ে পুলিশ বাহিনীগুলো কেমন যেন পোশাক পরিহিত রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীর মতো আচরণ করছেন! যা কখনোই সাধারণ মানুষের কাম্য ছিলো না।

স্বাধীনতা পরবর্তী সব সময়ই সরকারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। শুধু বাংলাদেশ কেনো, ব্রিটিশ আমল থেকেই পুলিশ বা আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ছিলো জনগণ অথবা বিরোধী মতকে দমন করার মুল হাতিয়ার, যা এখনো বিদ্যমান আমাদের দেশে। পুলিশ সব সময়ই বিরোধী দলের ওপর দমন-পীড়ন চালিয়েছে, মূলত সরকারকে খুশি করতে। এটা সকল সময় আমরা দেখেছি।

তবে এত কিছুর পরও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর প্রধানদের কখনও রাজনৈতিক বক্তব্য দিতে শোনা যায়নি।নীরবে কাজ করলেও মুখ খুলে কিছু বলেননি তাঁরা। তবে এখন শুধু কাজ নয়, রাজনীতিবিদদের মতো বক্তব্যও দিচ্ছেন তাঁরা। যা কখনোই একটি স্বাধীন দেশের জন্য মঙ্গলজনক নয়।

সাম্প্রতিক সময় তথা বর্তমান সরকার সময়ে পুলিশ বা ব়্যাব প্রধান যে ভাষায় কথা বলছেন, সোটা প্রজাতন্ত্রের কোনো কর্মচারীর ভাষা হতে পারে বলে মনে হয় না। আমাদের জেনে রাখা উচিৎ যে, রাজনীতি আর প্রশাসন এক হয়ে গেলে দেশের সামনে ভয়াবহ খারাপ উদাহরণ হয়ে যাবে। কিছুদিন পরে দেখা যাবে সচিবরাও রাজনীতির ভাষায় কথা বলছেন। তাতে আমলাতন্ত্র বলে কিছু থাকবে? এতে করে সাধারণ মানুষের পক্ষে ন্যায়বিচার পাওয়ার পথ রুদ্ধ হয়ে যাবে।

আজকে (6জুলাই) তিতুমীর কলেজের ছাত্রলীগ দ্বারা সংঘটিত ঘটনায়ই তার ইংগিত বহন করছে। যার কারণে ছাত্রলীগ তাণ্ডবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েও ন্যায় বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সাধারণ মানুষ। আর প্রকাশ্যে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে সাধারণ মানুষের ক্ষতিসাধন করেও নির্বিঘ্নে রয়েছে সরকার সমর্থিতরা! আর পুলিশ কথা বলছে ভিন্ন সুরে। যা স্পষ্ট পুলিশের উপ-কমিশনারের বক্তব্যে।

আমরা দেখেছি দেশের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী রাজনীতিবিদদের দ্বারা অনেক আগে থেকেই নিয়ন্ত্রিত। রাজনৈতিক নেতাদের ইচ্ছা-অনিচ্ছায় পরিচালিত হয় প্রশাসন। ফলে পুলিশ-ব়্যাব কার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে বা নেবে না, তাও ঠিক করেন সরকার পক্ষের রাজনৈতিকরা। আর তাই কী পুলিশের উপ-কমিশনার সেই চিন্তা মাথায় রেখেই কি অমন নমনীয় সুরে বক্তব্য দিয়েছেন?

অথচ পেশাদারী অবস্থান থেকে তিনি (উপ-কমিশনার) যদি দায়িত্বশীল বক্তব্য দিতেন তাহলে হয় তো তাঁর বক্তব্য হতে পারতো, ‘পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে। আমরা আমাদের ফোর্সকে নির্দেশ দিয়েছি, চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে ঘটনার সাথে জড়িতদের আটক করা হবে। যারা এ ঘটনা ঘটিয়েছে তারা ছাত্রলীগ হোক বা ছাত্রদল হোক, আইনের চোখে এরা অপরাধী। এদের কোনো ছাড় দেয়া হবে না’। এমন বক্তব্য কী আমাদের কাম্য ছিলো না? আর তিনি যে বক্তব্য দিয়েছেন তাতে কি নমনীয়তা ফুটে উঠেনি?

এদিকে আজকে তিতুমীর কলেজের ছাত্রলীগ যা ঘটিয়েছে তাতে সাধারণ মানুষই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তারা (ছাত্রলীগ) কোনো সরকারি যানবাহন ভাঙেনি। তারা যে সমস্ত গাড়ি ভেঙ্গেছে তা নিতান্তই সাধারণ মানুষের। আর পুলিশ প্রশাসনের বক্তব্য শুনে হাস্যকর এবং সার্কাসের মতো বলেই মনে হলো।

আমাদের পুলিশের দায়িত্বশীলরা যদি এমন বক্তব্য হরহামেশাই দিতে থাকেন তাহলে সরকার পক্ষীয় সংগঠনগুলো পানের থেকে চুন খসার মতো ঘটনা ঘটলেই এমন তাণ্ডব চালাবে। পুলিশের আচরণ এবং ছাত্রলীগের কর্মকাণ্ডে কী এমনটিই মনে হচ্ছে না?

অথচ পুলিশের একটি চমৎকার শ্লোগান আছে। আর তা হলো, ‘জনতাই পুলিশ, পুলিশই জনতা’। আসলে কী তাই? বাংলাদেশের পুলিশ আর সাধারণ জনগণের মধ্যে বর্তমানে দূরত্ব যোজন যোজন। অথচ এমনটি হওয়া কথা ছিলো না।

তবে আজকে পুলিশ বাহিনী যে অবস্থায়, এর জন্য আমাদের দেশের প্রতিটি সরকারই দায়ী। আমাদের দেশের সব ক’টি সরকারই পুলিশকে জনগণের বন্ধু হওয়ার থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছেন নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য। পুলিশকে করে দিয়েছেন জনগণের প্রতিপক্ষ। যা একটি স্বাধীন দেশের জন্য মঙ্গলজনক নয়। আমরা চাই রাজনৈতিক হাতিয়া হিসেবে যেন আমাদের সরকার পুলিশ বাহিনীকে ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকেন। আর যদি তা সম্ভব না হয়, তবে এদেশে আইনের শাসন কখনোই প্রতিষ্ঠা হবে না। জয় বাংলা। জয় হোক মানবতার।