ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

 

00
প্রতিদিন লোকাল বাসে চড়ে আমাকে অফিস থেকে বাসা আর বাসা থেকে অফিসে আসা-যাওয়া করতে হয়। সেখান থেকে প্রতিদিন কিছু কিছু ঘটনা দেখে আমি নিজেও লজ্জিত হই। আর ভাবি, মেয়েগুলো সত্যি কি বোকা! আমার মনে প্রশ্ন জাগে, আমরা যারা ‘নারীবাদ’নিয়ে কথা বলি। আমরা যারা চাই ‘নারী’মেয়ে মানুষ নয় ‘মানুষ’ পরিচয়ে গর্বিত হউক। তাহলে কী আমাদের এই চাওয়াটা ভুল?

একজন নারী যদি একটি লোকাল বাসে উঠে। তাকে দেখে যদি একজন পুরুষ সিট ছেড়ে দিয়ে বসতে দেয়, সেটা কী তবে নারীকে সম্মান জানানো! নাকি সম্মান জানোর নামে অসম্মান করা? আবার পুরুষ যদি তার সিটটি নারী যাত্রী দেখেও ছেড়ে না দেয়। তাহলে সেটা কী অসভ্যতা?

পুরুষটি তার সিট থেকে উঠে দাঁড়িয়ে নারীকে বসতে দিলেন, সে কি সম্মান? না। আমি মনে করি একজন নারীর জন্য এটি চরম অপমানজনক। এতে করে সূক্ষ্মভাবে পুরুষটি বুঝিয়ে দিলেন, ‘নারী, তুমি অতিশয় দুর্বল প্রাণী। পুরুষ যা পারে তুমি তা পারো না। তুমি পুরুষের দয়াতেই বেঁচে থাকো। এটাই তোমার জন্য উপযুক্ত’! আবার একজন সুস্থ সবল নারীকে দেখে যদি কোনো পুরুষ তার সিটটি ছেড়ে না দেন, তাহলে সেটি কোনোক্রমেই অসভ্যতা নয়।

কখনো কখনো দেখি দেখি একজন নারী গাড়িতে উঠলেন, একটু পর সে পুরুষদের লক্ষ্য করে বলতে থাকেন, ‘আজব! মানবতা বলতে পুরুষগুলো মধ্যে কিছু নেই! আমরা মহিলা/মেয়েগুলো দাঁড়িয়ে আছি আর নির্লজ্জের মতো এরা বসে আছে! এদের কি মা-বোনও নেই’?

লোকাল বাসগুলোতে হরহামেশা এমন কথা শুনি। এ কথাগুলো সেকেলে ধ্যান ধারণার নারীরা বলছেন? না। এমন কথা শুধু সেকেলে ধ্যান-ধারণার নারীগুলো যে বলছেন, তা কিন্তু নয়। উচ্চ শিক্ষিত, রুচিশীল মেয়েগুলোও বলছেন! যাদের পোশাক-আসাক সাক্ষ্য দেয়, তারা আধুনিক। সত্যি আধুনিক?

যারা নিজেদেরকে অবলীলায় পুরুষের পায়ের কাছে সপে দিতে চায়! যারা পুরুষের সামনে নির্দ্বিধায় আত্ম-সমর্পণ করে! তারা কী করে আধুনিক! যারা সচেতন, সাধারণত তারাই তো আধুনিক। তাই নয়? তাহলে তাদেরকে কী আধুনিক বলা যায়? এরা কী আধুনিক? কিসে সম্মান আর কিসে অসম্মান? যাদের মধ্যে এ বোধটুকো নেই। তারা আর যাই হোক সচেতন নয়। তারা পোশাকে আসাকে যতোই আধুনিক হোক না কেনো, এরাই বোকা।

বোকা বলে আজও এরা প্রতিটি পদে পদে মার খাচ্ছে। হোঁচট খাচ্ছে। বড় বড় ডিগ্রী নিয়েও অন্যের ওপর নির্ভরশীল থাকছে। আর কড়াই-খুন্তির সংসার নিয়ে চার-দেয়ালে বন্দী থেকেও তৃপ্তির ঢেকুর তুলে বলছেন -আমি ভালো আছি! এখন কেউ প্রশ্ন করতে পারেন, ‘ভাই একজন নারীকে সিট ছেড়ে দেয়াটা অসম্মান কেনো! এটা তো মানবিকতা। পুরুষটি যদি নারীকে স্বেচ্ছায় সুযোগ দেয়, সেটা গ্রহণ করাটাই তো ভালো। তাই নয়’?

হুম মানবতা। কিন্তু গাড়িতে একজন পুরুষ দেখে কি একইভাবে আপনি সিট ছেড়ে দেন? নাকি আপনার এই সিট ছেড়ে দেয়ার মানবতাটা শুধু নারীর জন্য? এ ক্ষেত্রে নিশ্চয় আপনার উত্তর হবে -নারী? তাহলে আপনার কাছে আমার প্রশ্ন, পুরুষের জন্য এমন মানবতা নেই কেনো? মানবতাবোধ শুধু নারী কেন্দ্রিক কেনো? সেক্ষেত্রে অবশ্যই আপনি বলবেন, ‘তারা (নারী) পুরুষ অপেক্ষায় দুর্বল। তারা পুরুষের মতো দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। তাই’। তবে কি এটি নারীকে অসম্মান করা হলো না? সুস্থ-সবল একজন নারীকে দুর্বল মনে করাটাই তো পুরুষের বিকৃত মানুষিকতার পরিচয়। তাই নয়? একজন সুস্থ-সবল নারীকে দুর্বল ভাবাটাই তো নারীর জন্য অসম্মান, অপমানের। তাই নয়?

কারো মনে প্রশ্ন জাগতে পারে গাড়িতে তবে আমার আচরণ কেমন হয়? আমি কী করি? একজন নারী দাঁড়িয়ে আছে আর তা দেখে আমি কী বসে থাকি? হুম বসে থাকি। ক্ষেত্র বিশেষ আবার সিট ছেড়েও দিই। আর সেটা কেবল নারী কেন্দ্রিক নয়। নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য। তবে সিট ছেড়ে দেয়াটা কদাচিৎ।

প্রতিদিন অনেক ঘটনা প্রত্যক্ষ করছি। দেখছি। ভাবছি। মেয়েগুলোর আচরণে হতবাক হচ্ছি, আবার পুরুষগুলোর কর্মকাণ্ডে লজ্জিতও হচ্ছি। তবে কিছু নারী আছেন যারা সত্যিকার অর্থে পুরুষ অপেক্ষায় নিজেদেরকে দুর্বল ভাবতেই পছন্দ করেন। আবার অনেক পুরুষ আছেন যারা নারীদেরকে শুধু নারীই মনে করছেন। মনে করছেন নারী কেবল দুর্বল প্রাণী। এরা পারবে না। এরা আমাদের দয়া, অনুগ্রহেই টিকে আছে। যা সত্যিকার অর্থেই আমাকে লজ্জিত করে।

কিন্তু নারী সত্যি কী দুর্বল? নাহ। নারী দুর্বল নয়। এরা পুরুষের চেয়ে অনেক বেশি শক্ত-সমর্থ। বিদ্যায়-বুদ্ধিতে এরা পুরুষের চেয়েও এগিয়ে। ধৈর্যের বিচারেও তারা পুরুষের চেয়ে এগিয়ে। চিন্তা-চেতনা বা মানবিক গুণাবলির দিক দিয়েও তারা পুরুষের চেয়ে কম নয়।

বাংলাদেশে আজকে অনেক নারীই প্রাইভেট কার, মোটর বাইক চালাচ্ছে। শুধু চালাচ্ছেই না, বেশ দক্ষতারও পরিচয় দিচ্ছে। কিন্তু আমরা কি কখনো শুনেছি –তারা সড়ক দুর্ঘটনা ঘটাচ্ছে? নারী অফিস করছে, বাচ্চা-কাচ্চা-সংসার সামলাচ্ছে। একজন পুরুষের ক্ষেত্রে সম্ভব? একজন নারী আর একজন পুরুষকে যদি পানিতে ডুবিয়ে দেন, সেক্ষেত্রে নারীটির আগে দম আটকে মারা যাবে পুরুষটি। তাহলে নারীকে কেনো এতো দুর্বল ভাবা?

বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, কর্মস্থলে একজন পুরুষ-কর্মীর চেয়ে অধিক যত্নশীল একজন নারীকর্মী। তারা কাজও করছেন মনোযোগ সহকারে। সেদিক থেকে পুরুষ-কর্মীরা অনেক পিছিয়ে, তবে ফাঁকিবাজিতে একজন নারীকর্মীর চেয়ে একজন পুরুষ-কর্মী অনেক এগিয়ে। আবার দুর্নীতি, ঘুষসহ নানা কেলেঙ্কারিতেও নারীদের চেয়ে পুরুষরা এগিয়ে।

আজকের নারীরা দুর্বল নয়। আজকে নারীরা রাষ্ট্র চালাচ্ছে। রাজনীতি করছে। সমাজ ব্যবস্থা পরিবর্তনের জন্য লড়াই করছে। নারীরা আজ বিমান চালাচ্ছে। রেল চালাচ্ছে। আবার অত্যন্ত দক্ষতার সাথে তারা সংসার-সন্তানও সামলাচ্ছে।

এতো কিছুর পরও আমরা তাদের দুর্বল ভাবি! দুর্বল করে রেখেছি। তারা পারে কিংবা পারবে -আমরা স্বীকার করতে চাই না। আমরা চাই তাদেরকে দুর্বল অখ্যায়িত করে ঘরের চার-দেয়ালে আটকে রাখতে। আমরা চাই তারা কড়াই-খুন্তির সংসার নিয়ে খুশি থাকুক। বড় বড় ডিগ্রি নিয়েও তারা আমাদের যৌনদাসী হয়ে থাকুক। তারপরও তারা হাসিমুখে তৃপ্তির ঢেকুর তুলে বলুক -আমি ভালো আছি!