ক্যাটেগরিঃ আন্তর্জাতিক

 

রোহিঙ্গা পরিচিতি:

পৃথিবীর মাটিতে একমাত্র রাষ্ট্রবিহীন এবং নির্যাতিত একটি জনগোষ্ঠীর নাম রোহিঙ্গা, – জাতিসংঘ। মায়ানমারের হিসেব মতে: আট লক্ষের কাছাকাছি রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠির বসবাদ আরাকানে ।

আরাকানের প্রাচীন নাম রূহ্ম জনপদ, খৃষ্টপূর্ব ১৫০০ বছর পূর্বে অষ্ট্রিক জাতির একটি ক্ষুদ্র অংশ রোহিঙ্গা “কুরুখ” নৃগোষ্ঠীর ১ম বসতি স্থাপনের স্বাক্ষ্য পাওয়া যায়, পর্যায়ক্রমে বাঙালি (হিন্দু এবং ধর্মান্তরিত মুসলিম), তুর্কি, আরবি, মোগল, পাঠান ও পার্সিয়ান বঙ্গোসাগরের তীর ঘেঁষে বসতি শুরু করেন, এই সকল জাতিগোষ্ঠির শংকরজাত জনগোষ্ঠি হচ্ছে বর্তমানের এই রোহিঙ্গা।

৭ম-৮ম শতাব্দীতে আরাকান রাজ্যে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠির গোড়াপত্তন ধরা হয়, মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম বনিক এবং ধর্মযাজকদের সাথে ততকালীন আরাকানবাসীদের সংমিশ্লণে শংকর “রোহিঙ্গা জাতি”র উদ্ভোব হয়েছে বলে ঐতিহাসকভাবে প্রমানিত। রোহিঙ্গারা পশ্চিম মায়ানমারের রাখাইন রাজ্যের নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী হলেও ধর্মিয় বিশ্বাসে রোহিঙ্গাদের এক তৃতিয়াংশ মুসলিম ।

১৪৩০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় আরাকান রাজ্য, সেখানে মুসলিম শাসন ২০০ বছরেরও অধিককাল স্থায়ী হয়। ১৬৩১ থেকে ১৬৩৫ সাল পর্যন্ত আরাকানে মারাত্মক দুর্ভিক্ষ হয়। এরপর মুসলিম শাসনের অবসান ঘটে। ব্রিটিশ শাসন কালের কয়েকশত বছর পূর্বেই আরাকানে রোহিঙ্গা জাতির উদ্ভোব হয়েছিল, এটি ঐতিহাসিভাবে প্রতিষ্ঠিত সত্য ।

জেনে নেই কোন সালে কতজন রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছিল –

➢ ১৯৩৭ সালে প্রায় ৩০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়, ফেরত যাওয়ার সংখ্যা অজানা।
➢ ১৯৪২ সালে প্রায় ২২ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়, ফেরত যাওয়ার সংখ্যা অজানা।
➢ ১৯৭৮ সালে প্রায় ২.৫ লক্ষ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়, ফেরত যাওয়ার সংখ্যা অজানা।
➢ ১৯৯১ সালে প্রায় ০২ লক্ষ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়, ফেরত যাওয়ার সংখ্যা অজানা।
➢ ২০১২ সালে প্রায় ২০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়, ফেরত যাওয়ার সংখ্যা অজানা।
➢ ২০১৬ সালে প্রায় ৮৫ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়, ফেরত যাওয়ার সংখ্যা অজানা।
➢ ২০১৭ সালে মোট ৫ লক্ষ (প্রায়) রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়, ফেরত যাওয়ার সংখ্যা অজানা।

’রোহাঙ্গাদের “ধর্মিয় রাষ্ট্র কায়েমের আকাঙ্খা’
১৯৪৭ সালে “মুজাহিদ পার্টি” গঠন করে স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে আন্দোলন সংগ্রাম করতে থাকে, তার ইসলামি রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে আরাকান’কে স্বাধীন করার ঘোষণাও দেয়। ১৯৬২ এর পূর্বপর্যন্ত তাদের মুজাহিদ পার্টি যথেষ্ট সক্রীয় ছিল, যা কালক্রমে দূর্বল হতে থাকে। এরপরও, বর্তমানে বার্মার মুজাহিদরা আরাকানের দূর্গম এলাকায় এখনও সক্রিয় আছে বলে প্রমান পাওয়া যায়।

মায়ানমারের দৃষ্টিতে রোহিঙ্গা
মায়ানমার সরকার কয়েকশত বছরেও রোহিঙ্গাদের রাষ্ট্রিয় স্বীকৃত দেন নাই এবং তাদের আইন অনুযায়ী মায়ানমারের ভূমি ও সম্পত্তি মালিক হতে পারবেন না বিদেশী কোন নাগরিক, বার্মার দাবী রোহিঙ্গারা এদেশের নাগরিক নয়, এরা ভারতীয়, বাংলাদেশী অন্য অন্যেকোন রাষ্ট্রের নাগরিক, এরা জোর্পূর্বক শত শত বছর এ রাজ্যে বসবাস করে আসছে । রোহিঙ্গারা মিয়ানমার সরকারের দৃষ্টিতে অবৈধ অভিবাসী তথা, বিদেশি। তাই, রোহিঙ্গারা কোন ভূমি বা, স্থায়ী সম্পত্তির মালিক হতে পারে না। মিয়ানমার সরকার তাদের আইনসিদ্ধভাবে রোহিঙ্গাদের ভূমি যেকোন সময় দখল করে নিতে পারে।

জাতিসংঘের তথ্যমতে বর্তমান বিশ্বের নির্যাতিত ও রাষ্ট্রবিহীন জনগোষ্ঠীর নাম “রোহিঙ্গা”, এই উক্তিটি মিয়ানমার সরকার গত ২০০ বছরেও মানতে রাজি হয় নাই ।

রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতনের দীর্ঘ ইতিহাস এবং বাংলাদেশ তাদের শেষ আশ্রয়স্থল

এটি সম্প্রতিক দৃশ্য ০৮/০৮/২০১৭

➢ ১৯৩৭ সালে বার্মার স্বায়ত্তশাসন লাভের পর সা¤প্রদায়িক দাঙ্গা ব্যাপক রূপ নেয় এবং অন্তত ৩০ লাখ রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠির জীবন দিতে হয়।

➢ ১৯৪২ সালের ২৮শে মার্চ (দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ) ২০,০০০ রোহিঙ্গা হত্যা করা হয়, তার অধিকাংশ ছিল মুসলিম। রোহিঙ্গারা যুদ্ধের সময় জাপানী শক্তির বিরোধিতা করেছিল, ব্রিটিশ শক্তির পক্ষে দাঁড়িয়েছিল রোহিঙ্গাদের সংগঠনগুলি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় প্রাণভয়ে ২২,০০০ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছিল, সে সময় উদ্ভাস্ত রোহিঙ্গাদের সাথে চট্রগ্রামে দাঙ্গাও হয়েছিল বলে ইতিহাস স্বাক্ষ্যদেয় (বর্তমানে তাদের তথ্য বাংলাদেশ সকারের কাছে আছে কিনা আমার জানা নেই)।

➢ ১৯৭৮ মুজাহিদ বাহিনী নিধনে ততকালীন সামরিক সরকার “কিং ড্রাগন অপারেশন” এর নামে রোহিঙ্গা নিধনের নামে হত্যজঙ্গ চালায়। প্রায় ভয়ে হাজার হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে চলে আসতে বাধ্য হয়। এ সময় তিন মাসে আড়াই লাখ রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু নাফ নদী পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় গ্রহণ করেন।

➢ ১৯৯১ সালে। সেই সময় ২ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা জীবন বাঁচাতে বাংলাদেশে পালিয়ে চলে আসে।
➢ ২০১২ সালে ১ লাখ ২৫ হাজার রোহিঙ্গা মুসলমান আশ্রয়হীন হয়ে পড়েন। অনেকেই বাংলাদেশে চলে আসে।
➢ ২০১৬ সালে ৮৪ হাজার আশ্রয়প্রার্থী রোহিঙ্গা বাংলাদেশে ঢুকে পড়ে।
➢ সর্বশেষ তথ্যমতে অত্যাচারের মাত্রা সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছে বর্তমানে প্রায় ৫ লাখ রোহিঙ্গা মিয়ানমার থেকে প্রাণভয়ে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে, বাংলাদেশ সরকার তাদের নিরাপত্তায় যথেষ্ট সহানুভূতি দিখিয়েছেন।

বাংলাদেশের করণীয়

❀ মিয়ানমারের ভেতরে একটি ‘নিরাপত্তা অঞ্চল’ করা হোক।
❀ বাংলাদেশে ঢুকে পড়ার রোহিঙ্গাদের একটি ডাটাবেইস এর মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করণ।
❀ আশ্রয় প্রার্থী রোহিঙ্গাদের সাথে “জঙ্গিবিরোধী” কর্মসূচী গ্রহণ করে, তাদেরকে ধর্মিয় জঙ্গিবাদ থেকে নিষ্কৃয় করা
❀ ঐতিহাসিকভাবে এটা প্রমাণিত রোহিঙ্গা ঐ অঞ্চলের নাগরিক, তাদের পক্ষে আন্তজার্তিক আইনে বিচার চাওয়া।

বিজ্ঞজন করণীয় বিষয়টি আরো বিস্তারিত আলোচনা করতে পারবেন, আমি দু/চারটি লাইন তুলে ধরলাম মাত্র।

রোহিঙ্গাদের নিপীড়ণের বিরুদ্ধ্যে প্রতিবাদ করার অর্থ এই নয় যে, রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়াকে সমর্থন করছি। শত শত বছর ধরে একটি নির্দিষ্ট ভূখন্ডে বসবাস করলেও তাদের নাগরিকত্ব নেই। এত অত্যাচার-নির্যাতন নিপীড়ন সহ্য করেও বর্তমানে প্রায় ৮ লাখ রোহিঙ্গা মিয়ানমারে বসবাস করেছেন আসছিল। মানুষ হিসেবে মানবিক মূল্যবোধ যাগ্রত হবে এটিই নিয়ম, রোহিঙ্গাদের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া জরুরি। বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়া রোহিঙ্গা ইস্যুর বিন্দুমাত্র সমাধানের পথ নয়। আমাদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে রোহিঙ্গাদের উপর মায়ানমারের করা এই অত্যাচারের প্রতিবাদ করা উচিত।

পাদটীকা: লেখা এবং মূল্যায়ন আমার ব্যক্তিগত, ইহাতে ব্লগ ডট বিডিনিউজ২৪ ডটকম কর্তৃপক্ষের নিজস্ব কোন দায় থাকিবে না।

slide