ক্যাটেগরিঃ স্বাস্থ্য

 

আমদের দেশের চিকিৎসাসেবা আজব ভাবে চলছে ।সরকারি হাসপাতাল এর কথা পরে বলি । আপনারা কি জানেন একটা ক্লিনিক কেমন করে চলে ? আমি খুব অল্পদিন এরকম কয়েকটা বেসরকারী হাসপাতাল এ কাজ করেছি । তার কিছু অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে চাই ।

আমাদের দেশের দক্ষিণ অঞ্চলের লোকজনের টাকা পয়সা তুলনামূলক ভাবে বেশি তাই ব্যবসাটাও সেই দিকেই বেশি হয় । ক্লিনিকের মালিকেরা হয় সাধারণত এলাকার প্রভাবশালী ব্যক্তিরা । বেশিরভাগ ক্লিনিকেই অনেকজন করে শেয়ারহোল্ডার থাকে । ক্লিনিকের সাথেই থাকে ডায়াগনস্টিক সেন্টার । প্রায় প্রতিটা ক্লিনিকের প্রচুর সংখ্যায় মার্কেটিং অফিসার (দালাল) ঠিক করা থাকে । নোয়াখালী , লক্ষ্মীপুর , কুমিল্লা এসব এলাকার আবার বেশিরভাগ মার্কেটিং অফিসার গ্রাম্য ডাক্তার । ফলে এদের জন্য কাজটা অনেক সহজ । নিজেরা রোগী নিয়ে হাসপাতালে চলে আসে (অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় এর ভুল চিকিৎসা এর জন্যই রোগীর অবস্থা খারাপ হয়ে গেছে ) । এসে প্রথমে ডিউটি ডাক্তার এর সাথে দেখা করে বলবে “ স্যার আমার রোগী , একটু ভাল ভাবে দেখেন , যা পরীক্ষা লাগে করান , যেই প্রফেসর লাগে তারে ডাকেন , রোগীর চিকিৎসার যেন কোন ত্রুটি না হয় ”(অবশ্যই রোগীর লোকের সামনে ) । রোগীর লকেরা তো তখন মনে করে লোকটা নিশ্চয় একটা ফেরেশতা ! হা হা হা । আসল বেপারটা হল দালালরা রোগীর যত বেশি পরীক্ষা হবে পরীক্ষার বিল ও তত বেশি হবে , দলাল ভাই পান এই টাকার ৫০% । এইবার শুরু হয় রোগীর লোকের মাথা খাবার কাজ । রোগীর লোককে বুঝানো হয় যেই প্রফেসর আপনার রোগী দেখছে সে কি চিকিৎসা করছে ? এই অসুখ সারতে এতদিন লাগে ? অন্য ডাক্তার দেখাবো , আমি এখনি ক্লিনিকের লোকের সাথে কথা বলছি । এভাবে যত ডাক্তার আছে মোটামুটি সবাইকে দেখাতে চায় , তাহলে রোগীর বিল বাড়তেই থাকে । রোগী ক্লিনিক থেকে যাবার সময় যা বিল পরিশোধ করে তার ৩০% পকেটে নিয়ে উনি রগীকে বাড়িতে পোঁছে দিয়ে আসে ।

এটা গেল দালাল বানিজ্য । আর ক্লিনিকের সাথে যে ডায়গ্নস্টিক সেন্টার থাকে সেসব যে কি পরিমাণ চার্জ নেওয়া হয় তা , হিসাবের বাইরে । একটা উদাহরন দেই , রক্তের গ্রুপ পরীক্ষা করার জন্য যে রিয়াজেন্ট লাগে সবচেয়ে ভালটার দাম প্রায় ৯০০ টাকা । একসেট রিয়াজেন্ট এর বোতল দিয়ে প্রায় ৫০০ লোকের রক্তের গ্রুপিং করা সম্ভব । আর ক্লিনিকে এই পরীক্ষার দাম প্রায় ১৫০-২০০ টাকা । বলতে গেলে খরচের ১০ থেকে ২০ গুন দাম রাখে । আর রিপোর্ট এর বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে কথা নাই বা বললাম ! অনেক ক্ষেতেই আমার বিশ্বাস পরীক্ষা ছাড়া নরমাল রিপোর্ট দিয়ে দেয় ।

হাসপাতালে যে ডিউটি ডাক্তার থাকে তাকে সাধারণত ২ বেলা রাউনড দিতে হয় , প্রতি বেলার জন্য রাখা হয় ২০০-৩০০ টাকা । মানে দিনে ৪০০-৬০০ টাকা । মনে করবেন না বেচারা ডিউটি ডাক্তার এই টাকা পায় , সে রোগী প্রতি দিনে ২০ টাকাও পায় কিনা স্নদেহ !

বেশির ভাগ ক্লিনিকেই নাই ডিপ্লোমা নার্স । যারা আছে তারা দেখে দেখে কাজ শেখা । তাই ভুল করে ঔষধ দেওয়ার ঘটনা প্রায়ই ঘটে ।

এভাবেও চিকিৎসা নিয়েও কিন্তু আমাদের দেশের কিছু লোক মনে করে সরকারি হাসপাতাল থেকে ক্লিনিকই ভালো ! সে যাই হোক , রোগীর বিল কিন্তু আসে অনেক বেশি । যেমন , সরকারি হাসপাতালে যদি একটা সিজার হয় তাহলে খরচ হবে প্রায় ১৫০০ টাকা (এখানে খরচ হয় অপারেশন এর ওষুধ , খালা মামা এর বকশিস , ) , এই অপারেশন যদি উত্তরাঞ্চলের ক্লিনিকে করান তাহলে খরচ হবে প্রায় ৭০০০-১০০০০ টাকা , দক্ষিণ অঞ্চলের ক্লিনিকে খরচ পরবে ২০০০০-২৫০০০ টাকা , আর ঢাকা এর স্কয়ার, এপোলো এর মত ক্লিনিক এ পড়বে ১০০০০০-১৫০০০০০ টাকা ।

এবার দেখা যাক টাকার বেশিরভাগ কার পকেটে যায় ? ক্লিনিকের ওয়ার্ড বয় বা খালা এর প্রতি শিফটে (৮ ঘণ্টা ) ৮০ টাকা , সিস্টার দের বেতন মাসে ৪০০০-৬০০০ টাকা , ডিউটি ডাক্তার এর বেতন প্রতি শিফটে ৩০০-৮০০ টাকা । ঢাকা এর বাইরের ক্লিনিক গুলোতে প্রফেস্ররা সাধারণত কলে রোগী দখেতে আসেন , তারা প্রতি কলে পান ৫০০ টাকা । সার্জারি এর ডাক্তার রা একেক অপারেশন এ একেক রকম টাকা নেন । যদি সিজারের কথা বলি তাহলে গাইনীর ডাক্তার রা উত্তরাঞ্চলে পান ১৫০০-২০০০ টাকা , দক্ষিণ অঞ্চলে পান ২৫০০-৩০০০ টাকা ঢাকায় কত তা জানি না ।

তাহলে বেশিরভাগ টাকাই যায় ব্যবসায়ীদের পকেটে । ব্যাবসায়ীরা সব জায়গায় লাভ খুজে , এক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম না । কিন্তু এরকম করে আর কতদিন? আমার মনে হয় এই ব্যবস্থা চলতেই থাকবে আরও অনেক দিন কারণ এদের বিরুদ্ধে বলার কেউ নাই।