ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

ইবনে তাইমিয়াতে পড়া অবস্থায় যেদিন প্রথম স্কুল মসজিদে ছাত্রশিবিরের বড় ভাইদের সাথে মিটিং হল, তার পরের দিন থেকে নিয়মিত তারা আমার সাথে যোগাযোগ রাখতেন। সম্ভবত, জামায়াত ইসলামের নিজস্ব প্রতিষ্ঠান ছিল ইসলামিক রিসার্চ ইনস্টিটিউট কেননা তার পর থেকে টানা ৭-৮ মাস আমি যতগুলো ইসলামিক বই পড়েছি তার অনেকগুলোই ছিল এই প্রতিষ্ঠানের। এছাড়া আরো কিছু লেখকের বই পড়েছিলাম যেমন, দাওয়াত ও জিহাদ-ড. আসাদুল্লাহ আল-গালিব, তাফসীরে সাঈদী-দেলোয়ার হোসেন সাঈদী, ইসলামী হকিকত-আবু আলা মওদুদী এবং মওদুদীর জীবনী সহ মওদুদীর লেখা কিছু বই।

এই পরিস্থিতি যে শুধু আমাকেই মোকাবেলা করতে হয়েছিল এমনটা না, ইবনে তাইমিয়ার প্রায় সব ছাত্রের একই মোকাবেলা করতে হয়। আর এই স্কুলে প্রতিটা হোস্টেলে যত জন ছাত্র ভর্তি হয় তার প্রত্যেকেই ছাত্র-শিবির করতে একটা সময় বাধ্য হয়। এবং এই সব হোস্টেল থেকে বের হওয়া যুবকরাই একটা সময় ছাত্র-শিবিরের খুব বড় নেতা হয়। এমন আমারও খুব কাছের বন্ধু ও পরিচিত আছে কয়েকজন।

আমি কুমিল্লার ঠাকুরপাড়ায় পরিবারের সাথে বাসায় থাকি। ঠাকুরপাড়ার একটা মসজিদ মেসে থাকে একজন ছেলে পরেরদিন আমার সাথে যোগাযোগ করে জানায়, তিনি ছাত্র-শিবিরের সাথী এবং তিনি এই সংগঠনের এই এলাকার দায়িত্বে আছেন। প্রতিটা বিকেলে আছরের নামাজের পর তিনি আমার সাথে ক্রমাগত সময় দিতেন, নিয়মিত সন্ধা বেলায় নাস্তা করাতেন কিন্তু ব্যাপারটাতে আমি খুব বিরক্ত হতাম কেননা আমি এই কারণে খেলতে পারতাম না। এই ভাবে চলতে থাকে ৬-৭ মাস। এমন সময় আমার বাসায় একদিন আমার ছোট বোনের মৃত্যুবার্ষিকীর ছোটখাট একটা দোয়া-অনুষ্ঠানে সেই সাথী সহ শিবিরের কয়েকজনকে আমি নিমন্ত্রন করেছিলাম, তারা যথারীতি বাসায় এসেছিল ।

অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পরে তারা আমার বাবার সাথে বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলে এবং ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে ছাত্র-শিবিরের নাম গোপন করে বলে, আপনার ছেলে আমাদের সাথে নামাজ-কালাম পড়ে এবং ইসলামিক চর্চা করে। এই প্রথম আমার মনে শিবির সর্ম্পকে খঁটকা লেগে গেল, তারা বাবার কাছে সংগঠনের নাম গোপন করল কেন, এই প্রশ্নে।

আমার বাবা ছিলেন চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের ছাত্র এবং তখন তিনি সেখানে বাংলায় মাস্টার্স করছিলেন। এর পাশাপাশি তিনি ছাত্র-ইউনিয়নের রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন এবং বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র-ইউনিয়নের সভাপতি ছিলেন। ঠিক সেই সময়ে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন চট্রগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র এবি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী।

শিবিরের বড় ভাইরা চলে যাবার পর বাবা আমাকে প্রশ্ন করলেন, এরা কারা? আমি সব খুলে বললাম, বাবা সেদিন সারা রাত জামাত-শিবিরের পুরো ইতিহাস বললেন এবং আমাকে তাদের সাথে মিশতে না করলেন, তাদের কাছ থেকে আনা সব বই ফেরত দিতে বললেন। পরের দিন বাবা সকালে অফিসে যাওয়ার আগে আমাকে নিয়ে ইবনে তাইমিয়া স্কুল এন্ড কলেজের অধ্যক্ষ হেলাল সাহেবের কাছে গেলেন যিনি এখনও দায়িত্বে আছেন। বাবা সেদিন এই সব ছেলেরা যেন আমার পিছু না নেয় সেই ব্যবস্থা করার জন্য প্রিন্সিপালকে বললেন। প্রিন্সিপাল ছাত্রাবস্থায় ছাত্র-শিবির করতেন এবং তিনি ভিক্টোরিয়া বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের ভিপি ছিলেন। তিনি বাবার সব কথা মেনে নিলেন।

তারপর কয়েকদিন আমার সাথে শিবিরের ভাইদের কোনো যোগাযোগ নেই। সপ্তাহ খানেক পরে শিক্ষা বোর্ড মসজিদে দেখা হয় তাদের দুই জনের সাথে। তারা আমাকে নানা ভাবে বুঝাতে চেষ্টা করলেন, ইসলামী আন্দোলনে যোগ দেয়ার সময় বাবা-মা কে জানাতে নেই এবং তারাও যে এখানে আসার সময় বাবা-মায়ের তীব্র বাধার সন্মুখীন হয়েছিলেন। কিন্তু আমি তাদের কোন কথাই আর শুনলাম না। তারা এরপর থেকে আমার পিছু নেয়া ছেড়ে দিয়েছে। এরপর থেকেই এইসব ব্যাপারে শুধু দর্শকের ভূমিকা আমি পালন করতাম। নিজের চোখে বন্ধুদেরকে দেখেছি শিবিরের ক্যাডারে পরিণত হতে, প্রচন্ড মারামারি করতে, আহত হতে, স্যারদের সাথে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে যোগ দিতে।

উচ্চ মাধ্যমিকে অধ্যয়নের সময়ে একবার প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া কুমিল্লা টাউন হলে এসেছিলেন, বিরাট সমাবেশ হয়েছিল। আমার বন্ধুদের কেউ কেউ সেই কর্মসূচির স্বেচ্ছাসেবক ছিল এবং কেউ কেউ বাস ভর্তি করে এলাকা থেকে লোক এনেছে।

এই স্কুল ফলাফলের দিক থেকে একসময় কুমিল্লা বোর্ডে পঞ্চম ছিল কিন্তু যখনই বিএনপি-জামাত জোট ক্ষমতায় আসে, এই প্রতিষ্ঠানের অধঃপতন শুরু হয়। শিক্ষকরা আর ক্লাস নিতে চান না, রাজনীতিতেই বেশী সক্রিয় থাকেন। ক্লাস নিলেও ক্লাসে ব্যাপক হারে রাজনীতির কথা শুরু করেন। এই স্কুলটি তখন থেকেই হয়ে পরে বৃহত্তর কুমিল্লার জামাত-শিবিরের মূল ঘাটি এবং আজ পর্যন্ত একই পরিস্থিতি বিদ্যমান। কলেজ শাখার ৩ তালায় অনুষ্ঠিত হয় প্রতি শুক্রবার শিবেরের কর্মী প্রশিক্ষণ।

কিছুদিন আগে ঐ স্কুলের প্রাক্তন সব সহপাঠীরা একত্রিত হয়েছিলাম একটি বন্ধু সংঘ করার জন্য। কিন্তু তাদের অনেকেই যখন বলল, এই অনুষ্ঠান ঐ স্কুলের শিক্ষকদের দ্বারা উদ্ধোধন করার কথা তখনই তীব্রভাবে প্রতিবাদ করে আমি সেখান থেকে সরে গিয়েছিলাম এবং আজ অবধি সেই সংঘটি আর হয়নি।

আমার ছাত্রজীবন এমন একটি স্কুলে কেটেছিল যার কথা আমি কারো কাছে কখনোই স্বীকার করিনা।

আমার পরিচিত এক ছোট ভাই ফখরুল, যার বাড়ী চাঁদপুর পড়ে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় গণিতে। পরিবারের আর্থিক অনটনের কারণে সে ইপিজেডের কাছে এই স্কুলের একটা হোস্টেলে আবাসিক শিক্ষকের চাকুরী নেয় এবং ধীরে ধীরে তাকে শিবির করতে বাধ্য হতে হয়। সে প্রথম অবস্থায় আমার কাছে এসে এসব কথা বলে দুঃখ করত আর আশ্রয় চাইত। আমার পক্ষে যেহেতু আশ্রয় দেয়া সম্ভব না তাই তাকে থাকতে হয় ওখানেই। সে এখন শিবিরের সাথী। কিছুদিন আগে রোহিঙ্গাদের পক্ষে একটা জঙ্গি মিছিল বের করে জেলার জামায়াত ও শিবিরের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক সহ ৭ জন এখন জেলখানায়। মিছিলে থাকা বাকী জনদেরকেও খুজছে পুলিশ। সেই ফখরুল এখন পুলিশের ভয়ে তটস্ত।

রাষ্ট্র তার নাগরিকদেরকে এই সব নষ্টদের কালো থাবা থেকে কখনোই সুরক্ষা দিতে পারেনি। জার্মানী, ইতালীতে যেখানে হিটলার ও মুসোলিনির দলকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, সেখানে জামায়াত বাংলাদেশে প্রকাশ্যে রাজনীতি করে এমপি হয় মন্ত্রী হয়!

সে দায় খানিকটা হলেও আমাদের…

(সমাপ্ত)