ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

 

কাজী নজরুল ইসলাম কে যারা ইসলামের এবং মুসলমানের কবি বইলা সহসাই রবীন্দ্রনাথ কে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করছেন, তারা আসলে কতটাই বা জানে কাজী নজরুলের সাহিত্য সৃষ্টি সম্পর্কে। সেই তো এক-“মসজিদের ও পাশে আমায় কবর দিও ভাই” গান দিয়ে মৌলভিরা ওয়াজ দিয়ে যাচ্ছে, যদিও তৎকালীন মোল্লা-মৌলভিরা তাকে নাস্তিক -কাফের এবং মুরতাদ হিসেবেই মূল্যায়ন করতো।

তার কিছু কবিতার লাইনে একটু চোখ রাখা যাক………।

ভূলোক দ্যুলোক গোলোক ভেদিয়া,
খোদার আসন ‘আরশ’ ছেদিয়া,
উঠিয়াছি চির বিস্ময় আমি বিশ্ব বিধাত্রীর! (বিদ্রোহী)

আমি রুষে উঠে’ যবে ছুটি মহাকাশ ছাপিয়া,
ভয়ে সপ্ত নরক হাবিয়া দোজখ নিভে নিভে যায় কাঁপিয়া! (বিদ্রোহী)

আমি বিদ্রোহী ভৃগু, ভগবান বুকে এঁকে দিই পদ-চিহ্ন;
আমি স্রষ্টা-সুদন; শোক-তাপ হানা খেয়ালী বিধির বক্ষ করিব ভিন্ন।
আমি বিদ্রোহী ভৃগু, ভগবান বুকে এঁকে দেবো পদ-চিহ্ন! (বিদ্রোহী)

আমি জাহান্নামের আগুনে বসিয়া হাসি পুষ্পের হাসি! (বিদ্রোহী)

আমি জানি জানি ঐ স্রষ্টার ফাঁকি, সৃষ্টির ঐ চাতুরী,
তাই বিধি ও নিয়মে লাথি মেরে, ঠুকি বিধাতার বুকে হাতুড়ি | (ধুমকেতু )

আমি জানি জানি ঐ ভুয়ো ঈশ্বর দিয়ে যা’ হয়নি হবে তা’ও!
তাই বিপ্লব হানি বিদ্রোহ করি, নেচে নেচে দিই গোঁফে তা’ও! (ধুমকেতু )

তোর নিযুত নরকে ফুঁ দিয়ে নিবাই, মৃত্যুর মুখে থুতু দি’!
আর যে যত রাগে রে তারে তত কাল্-আগুনের কাতুকুতু দি’! (ধুমকেতু )

আর স্রষ্টারে আমি চুষে খাই!
পেলে বাহান্ন-শও জাহান্নামেও আধা চুমুকে সে শুষে যাই! (ধুমকেতু )

এই ব্যাপারে নজরুলের জবাব ছিলো-

মৌ-লোভী যত মৌলভী আর ‘মোল-লারা’ ক’ন হাত নেড়ে,
‘দেব-দেবীর নাম মুখে আনে, সবে দাও পাজিটার জাত মেরে !’
ফতোয়া দিলাম কাফের কাজী ও,
যদিও শহীদ হইতে রাজী ও !
‘আম পারা’-পড়া হাম-বড়া মোরা এখনো বেড়াই ভাত মেরে !’
হিন্দুরা ভাবে, ‘পার্শী-শব্দে কবিতা লেখে, ও পা’ত-নেড়ে ! (আমার কৈফিয়ত)

নজরুল নিজেই বলেছেন– “আমি হিন্দু মুসলিমের মিলনে পরিপূর্ণ বিশ্বাসী । তাই তাদের কুসংস্কারে আঘাত হানার জন্যই আমি মুসলমানি শব্দ বা দেব দেবীর নাম ব্যবহার করেছি ।এতে আমার সৌন্দর্যহানী হয়েছে কিন্তু আমি জেনে শুনেই তা করেছি”

১৯২৯ খ্রিস্টাব্দের ১৫ ই ডিসেম্বর কলকাতার এলবার্ট মাঠে হিন্দু মুসলিম তরুন সমাজ নজরুলকে এক সংবর্ধনা দিয়েছিল।কবি সেখানে তার অবস্থান আরও স্পষ্ট করে বলেছেন- “কেউ বলেন আমার বানী যবন, কেউ বলেন কাফের ,কিন্তু আমি বলি আমি এই দুটোর একটিও নই ।আমি শুধু হিন্দু মুসলমানকে এক জায়গায় এনে হ্যান্ডশেক করাতে চেয়েছি ।”(নজরুল রচনাবলী ৮)

কবি প্রায় সাড়ে ছয়শ ইসলামী গান রচনা করেছিলেন যা পৃথিবীর ইতিহাসে একমাত্র ঘটনা। কিন্তু সারাজীবনই বিভিন্ন পক্ষ থেকে বিভিন্ন অভিযোগই সহ্য করে গেছেন, ক্লান্ত হয়ে পরেছেন এক সময়, তাই লিখেছেন……

বন্ধু গো, আর বলিতে পারি না, বড় বিষ-জ্বালা এই বুকে,
দেখিয়া শুনিয়া ক্ষেপিয়া গিয়াছি, তাই যাহা আসে কই মুখে,
রক্ত ঝরাতে পারি না তো একা,
তাই লিখে যাই এ রক্ত-লেখা,
বড় কথা বড় ভাব আসেনাক’ মাথায়, বন্ধু, বড় দুখে !
অমর কাব্য তোমরা লিখিও, বন্ধু, যাহারা আছ সুখে ! (আমার কৈফিয়ত)

আশ্রয় খুজে পেয়েছেন মহান রাব্বুল আলামিনের কাছে…

আল্লাহ আমার প্রভু, আমার নাহি নাহি ভয়
আমার নবী মোহাম্মদ, যাহার তারিফ জগৎময়।
আমার কিসের শঙ্কা,
কোরআন আমার ডঙ্কা,
ইসলাম আমার ধর্ম, মুসলিম আমার পরিচয়।

বোবা হয়ে যাবার আগে অনেক কষ্ট নিয়ে লিখেছিলেন……

তোমাদের পানে চাহিয়া বন্ধু, আর আমি জাগিব না,
কোলাহল করি’ সারা দিনমান কারো ধ্যান ভাঙিব না |
– নিশ্চল নিশ্চুপ
আপনার মনে পুড়িব একাকী গন্ধবিধূর ধূপ !- (বাতায়ন-পাশে গুবাক-তরুর সারি)

সুতরাং, নজরুল কোন বিশেষ সম্প্রদায়ের কবি নন, তিনি সমগ্র বিশ্বের শোষিত মানুষের পক্ষে সারা জীবন লড়ে গেছেন।

কবির ১১৬ তম জন্মবার্ষিকীতে তাঁর প্রতি রইলো তাই বিনম্র শ্রদ্ধা।

slide