ক্যাটেগরিঃ চারপাশে

ব্লগে এটি আমার ২য় লেখা্। আশা করি পাঠকরা আমার লেখা মনোযোগ দিয়ে পড়বেন এবং সচেতন নাগরিক হিসাবে বুঝার চেষ্টা করবেন।

আমাদের দেশে যৌনপেশা স্বীকৃত পেশা । বর্তমানে বাংলাদেশে ১৪টি নিবন্ধিত যৌনপল্লী রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে দৌলতিয়ার যৌনপল্লী, টাংগাইলের কান্দাপাড়ার যৌনপল্লী, পটুয়াখালির যৌনপল্লী এবং আরো অনেক। এরমধ্যে সবচেয়ে বড় হচ্ছে দৌলতিয়ার যৌনপল্লী। বর্তমানে এখানে প্রায় ১৫০০ যৌনকর্মী রয়েছে। এরপর টাংগাইলে রয়েছে প্রায় ৮০০ এর মত।সারা দেশে প্রায় ১ লক্ষ যেৌনকর্মী রয়েছে যেৌনপল্লী ও ভাসমান মিলিয়ে। এর মধ্যে ২০০৪ সালের এক হিসাব অনুযায়ী প্রায় ২৪০০০ শিশু যেৌনকর্মী রয়েছে যাদের বয়স ১২-১৮ বছরের মধ্যে। আমার লেখাটি আমি কয়েকটি অংশে ভাগ করব । প্রথম অংশে কেন যেৌন পেশায় আামাদের দেশের মেয়েরা নিয়োজিত হয়। ২য় অংশে আমাদের সমাজে তাদের অবস্থান কি। এবং শেষ অংশে বাস্তবে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি সামজিক ও রাজনৈতিক ভাবে কেমন হওয়া উচিত যেৌনকর্মীদের উপর।

ছোটবেলায় যখন ক্লাশ ৬/৭ পড়তাম তখন আমি যেৌনকর্মীদের অনেক ভয় পেতাম, সত্যি বলতে তাদের আমি ঘৃণা করতাম বলা চলে । আামার এই ধ্যান-ধারণার পরিবর্তন হতে শুরু করে যখন আমি কলেজে পড়ি। য়খন পরিবার, সমাজ, দেশ নিয়ে বুঝতে শিখি। যখন অনেক অনেক গল্প, উপন্যাস পড়া শুরু করি তখন থেকে । যখন বুঝতে পারি আমরা সবাই মানুষ। মানুষের কোন জাত হতে পারে না, হতে পারে না কোন শ্রেণী। আমদের সবার এই পৃথিবীতে সমান অধিকার আছে মানুষ হিসাবে ।এরপর আমার শুরু হল খোজা যে কেন একটা মেয়ে এই পেশা বেছে নেয়। এর জন্য আমি অনেক ভিডিও ডকুমেন্টারি দেখি এবং ইন্টারনেটে তথ্য খোজা শুরু করি। তখন আমি দেখি আমরা বেশিরভাগ মানুষ তাদের কে বাংলায় নটি বলে গালমন্দ করি আরো অনেক অকথ্য ভাষায় বকাবকি করি। কিন্তু আমরা কখনো বুঝার চেষ্টা করি না যে কেন একটা মেয়ে এই পেশা বেছে নেয়। আপনাদের কি মনে হয় কোন মেয়ে কি শখের বশে এই পেশা বেছে নেয় নাকি পেটের দায়ে বলুন তো? আপনাদের কাছেই প্রশ্ন। অনেক সময় আমরাও মেয়েদের এইপথে যেতে বাধ্য করি। আজকাল যেৌনপল্লীগুলোতে অনেক মেয়েকে দালালেরা পাচার করে দেয় দেশের নান প্রান্ত থেকে নিয়ে এসে। আমি মনে করি মেয়েদের এই পেশা কোন উপায়ন্তর না দেখে বেছে নেয়্, কারণ বেচে তো থাকেত হবে আর বেচে থাকেতে হলে খাবার খেতে হবে । চাইলেই তো মরে যাওয়া যায না। আর আত্নহত্যা সবাই করতে পারে না।

আমি একটা ডকুমেন্টারি দেখেছিলাম দৌলতিয়া আমাদের দেশে যৌনপেশা স্বীকৃত পেশা । বর্তমানে বাংলাদেশে ১৪টি নিবন্ধিতনপল্লীর সেখানে এক কর্মী বলছে, ‘’ আমার আর ভাল লাগে না বেচে থাকতে । আল্লাহ কেন আমকে মরণ দেয় না। পেটের জন্য না পাড়ি ছাড়তে না পারি স্বামী সংসার করতে। আমি একটি ভিডিও লিংক যুক্ত করছি এই লেখার সাথে। অনুগ্রহ করে দেখে নেবেন। সাথে সাথে আমরা মানে সমাজ দেশ সরকার এর জন্য দায়ী। আমরা দায়ী কারণ আমরা তাদের কখনোই ভাল চোখে দেখি না। সমাজ তাদের কখনোই মানুষ হিসাবে স্বীকৃতি দেয় না। আগে তো তারা মারা গেলে কোন কবর পর্যন্ত দেওয়া হত না। আমি শুনেছিলাম কোন জায়গায় তাদের নাকি তারা মারা গেলে নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হত আবার কোন জায়গায় তাদের মাথা উপরে রেখে দাড়িয়ে কবর দেওয়া হত। ভাবুন এটা হতে পারে কখনো। একবার টেলিভিশনে দেখেছিলাম এক মাওলানা বলছে যে যেৌনপেশা ইসলামে স্বীকৃত নয় তাই তাদের নাকি কোন জানাযা বা কবর হয় না। কিন্তু আমাদের ইসলাম ধর্মে কেউ মারা গেলে তাকে কবর দেওয়া আমাদের সবার দায়িত্ব। সে যত বড় পাপী হক না কেন। সে পাপী হলে আল্লাহ তাকে শাস্তি দিবে কিন্তু কবর না দিলে আমরা পাপীর ভাগিদার হব। এখন এর কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে। এখন তাদের জানাযা, কবর দেওয়া হয়।

আসলে কোন নারী শখের বসে এই পেশায় আসে না।এর জন্য আমদের সমাজ ব্যবস্থা আমাদের সরকার দায়ী। প্রতিটি নারী যারা এই পেশায় জড়িত তারা কেউ এই পেশায় থাকেতে চায় না। এই পেশায় আরো একটি লক্ষণীয় বিষয় হল চেইন। অর্থাৎ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায় কোন যেৌনকর্মীর সন্তান যদি মেয়ে হয় বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তাদের বয়স যখন ১০ এর উপর হয় তখন তারাই তার মায়ের এই পেশা গ্রহণ করে। আর ছেলে সন্তানগুলো কিন্তু বেশি দূর পড়াশোন করতে পারে না। কারণ হচ্ছে আমাদের সমাজ এই সন্তাদের কখনো স্বীকৃতি দেয় না। আমার নিজের চোখে দেখা যে কোন যেৌনকর্মীর সন্তনরা সাধারণ বিদ্যালয়ে যেতে পারে না কারণ আমরা তাদের যেতে দেই না। আমরা তাদের চাই না যে আমাদের সাথে তারা পড়াশেনা করুক । বর্তমানে কিছু NGO বিদ্যালয়ে তারা পড়াশোনা করে। কিন্তু বেশি দূর তারা করতে পারে না। পরবর্তীতে মেয়েগুলো মায়ের পেশা কে বেছে নেয় কারণ বেচে তো থাকতে হবে। আর ছেলে শিশুগুলো শিশুশ্রমে লেগে যায়। সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে আমরা হোক প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে কিন্তু আমরা মানে আমাদের সমাজ, আমাদের সরকার দায়ী।

এখন আসি আমাদের সবার কেমন দৃষ্টিভঙ্গি কেমন হওয়া উচিত। আমি আমার কথা বলব আমার দৃষ্টিভঙ্গি কেমন এদের প্রতি। আমার দৃষ্টি অনুযায়ী পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ আমারে কাছে সমান। মানুষের বর্তমানে যে শ্রেণীবিন্যাস তা হচ্ছে টাকার জন্য । আমি সব মানুষকে সমান দৃষ্টিতে দেখি কারণ জন্ম মৃত্যু কোনটাই আমাদের হাতে না। আজকে আমাকে বলা হয় মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান কারণ আমার বাবার মাসে ২০০০০ টাকা আয় আছে আমার পরিবার তিনবেলা ভালমত খাবার পায়। এই আমি যদি ঢাকা শহরের কোন বাবার ঘরে জন্মগ্রহণ করতাম যার মাসে ২০০০০০ টাকা আয়; যার গাড়ি, বাড়ি সব আছে তাহলে আমাকে বলা হত উচ্চবিত্ত। আর সবশেষে যদি রাস্তার কোন দিনমুজুরের ঘরে জন্মগ্রহণ করতাম যেখানে আমার বাবার আয় থাকত মাসে ২০০০-৪০০০ টাকা, যেখানে আমি ২ বেলা খাবার জন্য প্রতিনিয়ত উন্মুখ হয়ে খাকতে হত, তখন আমি হতাম নিম্নবিত্ত। আমার কথা হচ্ছে আমি আমার জন্ম নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনা। আজকে আমি মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান কারণ আল্লাহ আমাকে এইঘরে জন্ম দিয়েছে । আল্লাহ যদি আমাকে ঐশ্বরিয়া রায়ের ঘরে জন্মদিত হয়ে যেতাম উচ্চবিত্ত। আর দিনমজুরের ঘরে জন্ম নিলে নিম্নবিত্ত। যেখানে আমি আমার জন্ম নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না তাহলে কেন আমি মানুষ হেসাবে আরেক মানুষ কে তার জাত দিয়ে বিচার করব। আজকে আমার জন্ম যদি ঐ যেৌনপল্লীতে হত তাহলে আমাকেও ওদের বর্তমান যা ভবিষৎ তা মেনে নিতে হত। সুতরাং আমার কাছে পৃথিবীর সকল মানুষ সমান। এখন যারা যেৌনকর্মী আছে আসুন আমরা এদরকে এদের পেশা দিয়ে বিচার না করে মানুষ হিসাবে বিচার করি এবং এদেরকে আর এদের সন্তানদের আমরা সামাজিক স্বীকৃতি দেই। তাহলে আজকে যে শিশু এই পল্লীতে জন্মগ্রহণ করবে দুইদিন পর সে আমাদের সাথে আমাদের স্কুলগুলোতে পড়াশোনা করতে পারলে আমদের মতই ডাক্তার, প্রকেৌশলী হতে পারবে। আর এতে তাদের যে চেইন ছিল মায়ের পেশা গ্রহণ তা কমে আস্তে আস্তে একদিন শূন্যের কোঠায় আসবে । এর জন্য দরকার আমাদের সচেতনতা। আমি মনে করি সরকারের দায়িত্বের পাশাপাশি আমেদর সামাজিক ভাবে অনেক দায়িত্ব রয়েছে এদের প্রতি। আমিার মনে হয় আমাদের দায়িত্ব বেশি কারণ আমরা সামাজিকভাবে যদি এদের স্বীকৃতি দিতে পারি এদরকে যদি মানুষ হিসাবে গণ্য করি এদর সন্তানদের যদি নিজেদের বন্ধু মনে করতে পারি তাহলেই পরিবর্তন আসবে। এবং আমার বিশ্বাস একদিন না একদিন এই পেশা আমাদের সমাজ ধেকে পুরো উঠে যাবে। আসুন আমরা আমাদের সামাজিক দায়িত্ব এড়িয়ে না চলে বাস্তবতাকে মেনে এদের সাথে একসাথে মিলেমিশে একটা সুন্দর সমাজ গড়ে তুলি। আমি জানি না আমি কতটুকু লিখতে পেরেছি এ্খানে। আপনাদের আরো বেশি করে জানার জন্য আমি youtube এর কিছু লিংক যুক্ত করছি । আপানার ভিডিওগুলো সময় করে দেখে নিলে এদর জীবনযাপন কতটা কষ্টের এবং তারা আসলে কেন আসে, তারা থাকতে চায় কিনা এই পেশায় তা বুঝতে পারবেন। নিচে কিছু লিংক দেওয়া হল। আর পাঠকদের প্রতি অনুরোধ আপনারা কমেন্ট করতে ভুলবেন না। আপনাদের কাছ থেকে আমি অনেক বেশি কমেন্ট আশা করছি। কারো যদি কোন প্রশ্ন থাকে আমাকে করতে পারেন আমি উত্তর দিব কিন্তু সবার আগে অনুরোধ আপনারা বুঝতে চেষ্টা করবনে এবং তা পজিটিভ ভাবে। আগে থেকেই যদি নেগেটিভ হয়ে থাকেন তাহলে হবে না । সবশেষে আসুন আমরা সাবই মিলে একটি সুন্দর, দুর্নীতি মুক্ত, অসাম্প্রদায়িক সুখী বাংলাদেশ গড়ে তুলি।
আমি একটি লিংক যুক্ত করছি । বাকী লিংকগুলো আামার ইউটিউব চ্যানেলে পেয়ে যাবেন।