ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

 

২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষনার বিষয়ে ১৯৭১ সালের অনেক আন্তর্জাতিক নিউজ-মিডিয়া, আমেরিকান বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টের নানা রিপোর্ট রয়েছে। যা রিপোর্ট করা হয়েছিল সেটা অবিকৃতভাবে দেয়া হলো এখানে ।

লিস্টের কয়েকটি নাম উল্লেখ করা হল রিপোর্টিং ডেইটসহ:

১. আমেরিকান ডিফেন্স ইনটেলিজেন্স এজেন্সী (২৬শে মার্চ, ১৯৭১)

২. আমেরিকান ডিপার্টমেন্ট অব স্টেইট টেলিগ্রাম (৩১শে মার্চ, ১৯৭১)

৩. আমেরিকান সিনেট রিপোর্ট (জুলাই ২৭, ১৯৭১)

৪. নিউ ইয়র্ক টাইমস (২৭শে মার্চ, ১৯৭১)

৫. ওয়াল স্ট্রীট জার্নাল (২৯শে মার্চ, ১৯৭১)

৬. টাইম, নিউজউইক (৫ই এপ্রিল, ১৯৭১)

৭. বাল্টিমোর সান (৪ই এপ্রিল, ১৯৭১)

৮. আমেরিকান ডিপার্টমেন্ট অব স্টেইট- রিসার্চ স্টাডি (ফেব্রুয়ারী ২,১৯৭২)

——————————————————————————————————————–

প্রথম আলোর এপ্রিল ১, ২০০৯
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা বিভাগের গোপন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন।

এপ্রিল ১, ২০০৯
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা বিভাগের গোপন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন। গোয়েন্দা প্রতিবেদনটি সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের মহাফেজখানা থেকে প্রকাশিত হয়। ফলে দেশের বাইরেও ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার দালিলিক প্রমাণ পাওয়া গেল।

গোয়েন্দা প্রতিবেদনে তারিখ ও সময় লেখা আছে, ২৬ মার্চ ১৯৭১, সময় ১৪টা ৩০। বিষয়: পাকিস্তানে গৃহযুদ্ধ। এতে বলা হয়েছে, ‘এই দিনে শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব পাকিস্তানকে একটি সার্বভৌম ও স্বাধীন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ হিসেবে ঘোষণা দিলে পাকিস্তান প্রবলভাবেই গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে।’

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ‘ঢাকা ও পূর্বাঞ্চলের অন্যান্য শহরে ভয়াবহ সংঘর্ষ হয়। বেসামরিক নাগরিক ও পুলিশসহ পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলসের ১০ হাজার সদস্য পশ্চিম পাকিস্তানের নিয়মিত প্রায় ২৩ হাজার সদস্যের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে নৌ ও বিমানে করে নিয়মিত সেনা এনে শক্তি বাড়ানো হয়। কঠোর সামরিক শাসন জারি করে ইসলামাবাদ যেকোনো উপায়ে দেশরক্ষার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে। অনেক লোকের প্রাণহানির আগ পর্যন্ত সম্ভবত এ পদক্ষেপ যৌক্তিক কারণে ব্যর্থ হবে।’

প্রতিবেদনটিতে প্রকাশক হিসেবে জন পাভেলস ও প্রস্তুতকারক হিসেবে জন বি হান্টের নাম লেখা আছে। আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক নূহ উল আলম লেনিন প্রতিবেদনটি এই প্রতিবেদকের কাছে দেন।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ঢাকা ত্যাগের আগে বাংলার মাটি রক্তে রাঙিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে যান। বঙ্গবন্ধু ইয়াহিয়ার ঢাকা ত্যাগের খবর পান উইং কমান্ডার এ কে খন্দকার ও লে. কর্নেল এ আর চৌধুরীর মাধ্যমে। পরিস্থিতি বুঝতে পেরে বঙ্গবন্ধু ইপিআরের ওয়্যারলেসের মাধ্যমে স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা পাঠিয়ে দেন। পরদিন ২৬ মার্চ এই ঘোষণা সব থানা ও ইপিআর ক্যাম্পগুলোতে পৌঁছে যায়। শাহজাদপুর থানার তৎকালীন ওসি আবদুল হামিদ ওই বার্তাটি পান।

এ ছাড়া স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র যা ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল গৃহীত হয়, তাতে বলা আছে, ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার অর্জনের আইনানুগ অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ ঢাকায় যথাযথভাবে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন, বাংলাদেশের অখণ্ডতা ও মর্যাদা রক্ষার জন্য বাংলাদেশের জনগণের প্রতি আহ্বান জানান, এবং ………’

ঘোষণাপত্রে বলা আছে, ‘এতদ্বারা আমরা আরও সিদ্ধান্ত ঘোষণা করিতেছি যে, শাসনতন্ত্র প্রণীত না হওয়া পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রপ্রধান এবং সৈয়দ নজরুল ইসলাম উপরাষ্ট্রপ্রধান পদে অধিষ্ঠিত থাকিবেন, এবং …’

——————————————————————————————————
২৫শে মার্চ মাঝরাতে ইয়াহিয়া খান তার রক্তলোলুপ সাঁজোয়া বাহিনীকে বাংলাদেশের নিরস্থ মানুষের ওপর লেলিয়ে দিয়ে যে নরহত্যাযজ্ঞের শুরু করেন তা প্রতিরোধ করবার আহ্বান জানিয়ে আমাদের প্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।

১১ই এপ্রিল ১৯৭১ বাংলাদেশবাসীর উদ্দেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী জনাব তাজউদ্দীন আহমদের বেতার ভাষণ।
———————————————————————————————————————–

৩ মার্চ, ১৯৭১: পল্টনের জনসভায় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের ঘোষনা
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের সর্বাধিনায়ক :
স্বাধীন সার্বভৌম বাঙলাদেশের জাতীয় সংগীত হিসেবে ‘আমার সোনার বাঙলা আমি তোমায় ভালবাসি……’ গানটি ব্যবহৃত হবে।
————————————————————————————————————————

শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ ঢাকায় যথাযথভাবে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন,

যেহেতু উল্লিখিত বিশ্বাসঘাতকতামূলক কাজের জন্য উদ্ভূত পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমান জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার অর্জনের আইনানুগ অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ ঢাকায় যথাযথভাবে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন, এবং বাংলাদেশের অখণ্ডতা ও মর্যাদা রক্ষার জন্য বাংলাদেশের জনগণের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানান; এবং
বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র
মুজিবনগর, বাংলাদেশ
তারিখ: ১০ এপ্রিল ১৯৭১
http://www.bangladesh-71.info/portal/index.php?option=com_content&view=article&id=48:2009-12-30-09-23-07&catid=1:latest-news&Itemid=50
———————————————————————————————————————————–
জনাব স্পীকার : এই হাউসের সামনে যে প্রস্তাব ছিল তা সংশোধনের পরে যে আকারের হয়েছে, আমি তা পড়ে শোনাচ্ছি। সংশোধিত প্রস্তাব হচ্ছে :
“বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে ও আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ঐতিহাসিক স্বাধীনতা সংগ্রামে বাংলাদেশের যে বিপ্লবী জনতা, কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, যুবক, বুদ্ধিজীবী, বীরাঙ্গনা, প্রতিরক্ষা বিভাগের বাঙ্গালীরা, সাবেক ই. পি. আর পুলিশ, আনসার, মুজাহিদ ও রাজনৈতিক নেতা ও কর্মী ও বীর মুক্তিযোদ্ধারা নিজেদের রক্ত দিয়ে আমাদের স্বাধীনতা অর্জন করেছেন। আজকের দিনে বাংলাদেশর জনগণের ভোটে যথাযথভাবে নির্বাচিত বাংলাদেশ গণপরিষদের সশ্রদ্ধচিত্তে তাঁদের স্মরণ করছে।

১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার যে ঘোষণা করেছিলেন এবং যে ঘোষণা মুজিব নগর থেকে ১৯৭১ সালের ১০ই এপ্রিল স্বীকৃত ও সমর্থিত হয়েছিল এই সঙ্গে এই গণপরিষদ তাতে একাত্মতা প্রকাশ করছে।

স্বাধীনতা সনদের মাধ্যমে যে গণপরিষদ গঠিত হয়েছিল আজ সে সনদের সঙ্গেও এ পরিষদ একাত্মতা ঘোষণা করছে।
এক্ষণে এই পরিষদ বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের আশা-আকাক্সক্ষার সেই সব মূর্ত আদর্শ, যথা, জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা, যা শহীদান ও বীরদের স্বাধীনতা সংগ্রামে আত্মত্যাগে উদ্বুদ্ধ করেছিল, তার ভিত্তিতে দেশের জন্য একটি উপযুক্ত সংবিধান প্রণয়নের দায়িত্ব গ্রহণ করছে।”

বাংলাদেশ গণপরিষদ [১০ এপ্রিল, ১৯৭২]
————————————————————————————————–
Sheikh Mujibur Rahman’s action of starting his non-co-operation movement is an act of treason. He and his party have defied the lawful authority for over three weeks. They have insulted Pakistan’s flag and defiled the photograph of the Father of the Nation. They have tried to run a parallel Government. They have created turmoil, terror and insecurity.
TEXT OF YAHYA’S BROADCAST on March 26, 1971

শেখ মুজিব রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ-সংগঠিত করেছেন এবং নেতৃত্ব দিয়েছেন…। রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা এবং সেনাবাহিনীর অনুগত্য বিনষ্টের অভিযোগ আনা হয়েছে তার বিরুদ্ধে।
ইয়াহিয়া খান
নভেম্বর ১৯৭১

http://www.prothom-alo.com/detail/date/2010-06-23/news/51661
—————————————————————————-
ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী নয়াদিলি্লতে এক অনুষ্ঠানে বলেন, শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের নেতা। বাংলাদেশ প্রশ্নে রাজনৈতিক মীমাংসার জন্য অন্য কোনো পক্ষের সঙ্গে নয়, তাঁর সঙ্গেই আলোচনা করা উচিত। শ্রীমতী গান্ধী এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগপ্রধান শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে আলোচনা করার জন্য পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খানের প্রতি আহ্বান জানান।
একাত্তরের এই দিনে ২৩ জুন
লিংক
————————————————————————————————————
২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষনার বিষয়ে ১৯৭১ সালের আন্তর্জাতিক নিউজ-মিডিয়া
LEADER OF REBELS IN EAST PAKISTAN REPORTED SEIZED; Sheik Mijib Arrested After a Broadcast Proclaiming Region’s Independence DACCA CURFEW EASED Troops Said to Be Gaining in Fighting in Cities -Heavy Losses Seen

The Pakistan radio announced today that Sheik Mujibur Rahman, the nationalist leader of East Pakistan, had been arrested only hours after he had proclaimed his region independent and after open rebellion was reported in several cities in the East.
New York Times – Mar 27, 1971

লিংক

“The rebel leader Sheikh Mujib arrested.” The paper also added—“The radio Pakistan has declared that, Sheikh Mujib was arrested from his residence, within one hour after he declared the independence of Bangladesh.” (The Evening News, March 26, 1971: Headline news)

“The independence war has begun in East Pakistan. Pakistani soldiers started to crush Bangalee’s independence movement under the leadership of Sheikh Mujib. President Yahya Khan declared Sheikh Mujib the traitor of Pakistan. The declaration of the independent Bangladesh, in the name of Sheikh Mujib, came from a radio station named: “Voice of Bangladesh”. The radio also has issues an order to all Bangalees to follow orders only from the Sheikh Mujib, the leader of the independence.” (The Guardian- March 27, 1971)

“The leader of independence Sheikh Mujib has declared independence of Bangladesh and severe battle is in progress in the eastern part of Pakistan. President Yahya Khan has banned Awami League political party, declared Sheikh Mujib as the traitor of Pakistan and vowed to punish Sheikh Mujib for his crime. ” (The Times of London, March 27, 1971)
——————————————————————————————–

টিক্কা খানের বয়ান,

“I knew very well that a leader of his stature would never go away leaving behind his countrymen. I would have made a thorough search in every house and road in Dhaka to find out Sheikh Mujib. I had no intention to arrest leaders like Tajuddin and others. That is why they could leave Dhaka so easily.”

Then Tikka Khan said more in a very firm voice, “in case we failed to arrest Sheik Mujib on that very night, my force would have inflicted a mortal blow at each home in Dhaka and elsewhere in Bangladesh. We probably would have killed crores of Bangalees in revenge on that night alone.” (Interview by Musa Sadik, which took place in 1976 when Gen. Tikka Khan was the then Governor of Punjab, Published in the ‘News From Bangladesh’ on march 28, 2000)

ড: খুরশেদ আলম চৌধুরি, ৯ এপ্রিল ২০০৭, http://www.bangladesh-web.comলিংক

—————————————————————————————————-
পাকিস্তানি জেল থেকে মুক্ত হয়ে ঢাকায় ফেরার পর প্রথম যে বিদেশি সাংবাদিকের সঙ্গে বঙ্গবন্ধু খোলামেলা সাক্ষাত্কার দেন, তিনি হলেন নিউইয়র্ক টাইমস-এর দিল্লি ব্যুরোর প্রধান সিডনি শ্যানবার্গ। ১৮ জানুয়ারি ১৯৭২ টাইমস-এর প্রথম পাতায় বেশ গুরুত্বের সঙ্গে সে সাক্ষাত্কার ছাপা হয়। আমি টাইমস-এর সে প্রতিবেদন থেকে হুবহু উদ্ধৃতি দিচ্ছি:

‘তাঁর (অর্থাত্ বঙ্গবন্ধুর) সামনে কফি, টেবিলে ছিল ধূমপানের পাইপ ও তামাক। তিনি বললেন, তিনি জানতে পেরেছিলেন যে পাকিস্তানি সামরিক কর্তৃপক্ষ পরিকল্পনা করছিল তাঁকে হত্যা করে সব দোষ বাঙালির (চরমপন্থীদের) ওপর চাপাতে। তাদের পরিকল্পনা ছিল আমার গাড়ি লক্ষ্য করে গ্রেনেড ছুড়ে মারা, তারপর বলা বাঙালি চরমপন্থীরা এ কাজ করেছে। আর সে জন্যই (পাকিস্তানের) সামরিক বাহিনীকে আমার দেশের মানুষের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পথে নামতে হয়েছে। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, নিজ গৃহেই থাকব, নিজের ঘরেই ওরা আমাকে হত্যা করুক। তাহলে সারা পৃথিবী জানবে ওরা (অর্থাত্ পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী) আমাকে হত্যা করেছে। তারপর আমার রক্তে পরিশুদ্ধ হবে আমার মানুষ ও দেশ।’

বঙ্গবন্ধু যেভাবে ধরা পড়লেন, ব্রিগেডিয়ার (অব.) জহির আলম খানের গ্রন্থ দ্য ওয়ে ইট ওয়াজ-এর ভিত্তিতে তার একটি বিবরণ গোলাম মুরশিদ দিয়েছেন। সম্প্রতি ওয়েবভিত্তিক ফোরাম ‘পাকিস্তান ডিফেন্স’-এর সঙ্গে এক দীর্ঘ সাক্ষাত্কারে জহির খান সে গ্রেপ্তারের যে বিবরণ নতুন করে দিয়েছেন, এর সঙ্গে গ্রন্থভুক্ত বিবরণের কিঞ্চিত্ ফারাক রয়েছে। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাত্কারের ভিত্তিতে শ্যানবার্গ যে বিবরণ দিয়েছেন, তা এই দুই বর্ণনা থেকেই আলাদা। তাতে নানা নতুন তথ্য রয়েছে, যা অন্য কোথাও নেই। শ্যানবার্গ লিখেছেন, ২৫ মার্চ সামরিক অভিযান আসন্ন জেনে বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ পুত্র কামাল ও তাঁর স্ত্রী এবং তাঁর দুই মেয়ে হাসিনা ও রেহানাকে আত্মগোপনের নির্দেশ দেন। কিন্তু তাঁর স্ত্রী কনিষ্ঠ পুত্র রাসেলকে নিয়ে ধানমন্ডির বাড়ি ছেড়ে যেতে অস্বীকার করেন। তাঁদের দ্বিতীয় সন্তান শেখ জামালও যে সে বাড়িতে তাঁর নিজের ঘরে ঘুমিয়ে ছিলেন, সে কথা তাঁরা কেউই জানতেন না। রাত ১০টা নাগাদ শেখ মুজিব জেনে যান যে পাকিস্তানি সেনারা নাগরিক কেন্দ্রসমূহ আক্রমণের লক্ষ্যে অবস্থান গ্রহণ করেছে। কয়েক মিনিট পরই সেনারা তাঁর বাড়ি ঘিরে ফেলে এবং (বাড়ি লক্ষ্য করে) মর্টারের গোলা ছুড়ে মারে। এমন এক আক্রমণের কথা ভেবে তিনি আগেভাগেই কিছু প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিলেন। সাড়ে ১০টা নাগাদ তিনি চট্টগ্রামে এক গোপন ঠিকানায় যোগাযোগ করে দেশের মানুষের জন্য একটি বার্তা রেকর্ড করেন। পরে এই বার্তাটিই একটি গোপন বেতার সম্প্রচারযন্ত্রের মাধ্যমে প্রচার করা হয়। সে বার্তার মোদ্দাকথা ছিল, তাদের নেতার কী হয়েছে সে কথা চিন্তা না করে যেভাবে সম্ভব তারা যেন প্রতিরোধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। তিনি সাড়ে সাত কোটি বাঙালির মুক্তির কথাও সে বার্তায় ঘোষণা করেন। শেখ মুজিব জানালেন, বার্তাটি প্রেরণের পর তিনি বিডিআর ও তাঁর দলের সদস্যরা, যারা তাঁর পাহারায় নিযুক্ত ছিল, তাদের সরে যেতে নির্দেশ দেন।

রাত ১১টা। শহরে সেনা হামলা শুরু হয়। খুব দ্রুত তা তীব্র আকার ধারণ করে। মধ্যরাত ও রাত একটার মধ্যে শেখ মুজিবের বাড়ি লক্ষ্য করে সেনারা গোলা ছুড়তে আরম্ভ করে। মুজিব তাঁর স্ত্রী ও কনিষ্ঠ পুত্রকে ঠেলে দোতলার পোশাক বদলের ঘরে পাঠিয়ে দেন। এই সময় তাদের মাথার ওপর দিয়ে শোঁ শোঁ করে গোলা উড়ে যেতে থাকে, তাঁরা সবাই মাটিতে বসে পড়েন। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই পাকিস্তানি সেনারা তাঁর বাসায় ঢুকে পড়ে। একজন দ্বাররক্ষী তাদের ঢুকতে দিতে অস্বীকার করলে তাঁকে তারা হত্যা করে। মুজিব পোশাকঘরের দরজা খুলে বাইরে এসে সেনাদের মুখোমুখি হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘গুলি থামাও, গুলি থামাও, গোলাগুলি কেন করছ? আমাকে যদি গুলি করতে চাও তো করো গুলি। আমি তোমাদের সামনে আছি। কিন্তু আমার দেশের মানুষের ওপর, আমার ছেলেমেয়েদের ওপর গুলি ছুড়ছ কেন?’
আরেক পশলা গোলাগুলির পর একজন মেজর তাঁর সেনাসদস্যদের থামার নির্দেশ দেন। তিনি শেখ মুজিবকে জানান, তাঁকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। (অতঃপর) মুজিবের অনুরোধে তাঁকে বিদায় নেওয়ার জন্য কয়েক মুহূর্ত সময় দেওয়া হয়। পরিবারের প্রতিটি সদস্যকে তিনি চুম্বন করে বলেন, ‘শোনো, ওরা আমাকে মেরে ফেলতে পারে। তোমাদের সঙ্গে আমার হয়তো আর দেখা হবে না। কিন্তু (মনে রেখো), আমার দেশের মানুষ মুক্ত হবে, আমার আত্মা তা দেখে শান্তি পাবে।’

এরপর তাঁকে গাড়িতে করে নিয়ে যাওয়া হয় জাতীয় সংসদ ভবনে। সেখানে ‘আমাকে একটি চেয়ার দেওয়া হয় বসতে’। ‘তারপর তারা আমাকে চা খেতে দেয়,’ পরিহাসের গলায় বললেন মুজিব। ‘আমি বললাম, বাহ্, কী চমত্কার! আমার জীবনের এই তো সবচেয়ে সেরা সময়।’

[লিংক]