ক্যাটেগরিঃ নাগরিক মত-অমত

১. আমাদের হলের (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জসীম উদ্দীন হল) একটা গল্প আছে। একবার নাকি ঢাবির ছিটমহলের (নিউ মার্কেটের পেছনের যে কোনটা) কোন এক হলের এক নারী শিক্ষার্থীর রুমে পানি (বন্যায় কি-না) উঠেছিল। ওই সময় তিনি হলে ছিলেন না। খাটের নীচে ব্যাগ-সুটকেসে থাকা তার সব জামা কাপড় পানিতে নষ্ট হয়ে যায়। তার প্রেমিক বেচারা ছিল আমাদের হলের। তিনি গিয়ে বান্ধবীর রুমমেটদের সহায়তায় ময়লা পানিতে নষ্ট হওয়া সব জামাকাপড় নিয়ে আসেন। হলে এনে ধুয়ে শুকাতে দেন। এক সকালে হলের শিক্ষার্থীরা ঘুম থেকে জেগে দেখে, করিডোরজুড়ে মেয়েদের জামাকাপড়। এটা নাকি আলোড়ন তুলেছিল। হাসি ঠাট্টার পাত্র হয়ে গিয়েছিলেন সেই বড় ভাই।

২. একদিন হলের সামনে রিক্সা নিলাম। একটাই রিক্সা ছিল। ব্যাগ নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এক বন্ধুকে লিফট দিতে ডাকলাম। কোথায় যাচ্ছ? ‘ক্লাস করতে’। ব্যাগ? জামাকাপড় না? ‘হু’। তাহলে? ‘মুচকি হাসি’। কয়েকবার প্রশ্ন করেও সমাধান পাইনি। যাইহোক, তাকে রোকেয়া হলের সামনে নামিয়ে দিলাম। পরে আশ্চর্য হয়ে লক্ষ্য করেছি, মাঝে মাঝেই রোকেয়া হল থেকে ব্যাগ আনা নেওয়ায় তিনি ব্যস্ত থাকেন। কেন যেন কৌতুহল জাগল। খোঁজাখুজির পর তার এক রুমমেটের কাছে একটা গল্প শুনলাম, ‘তার প্রেমিকা থাকে রোকেয়া হলে। ময়লা জামা সেখানেই যায়। মেয়েটা ধুয়ে দেয়। ছেলেটা নিয়ে আসে।’

02_Aparajeyo+Bangla_0004

গল্পটা আমি বিশ্বাস করিনি। তবে একাধিক জন নিশ্চিত করার পর আমি বরং ভেবেছি, জসীম উদ্দীন হলের চেয়ে রোকেয়া হলের লন্ড্রির কোয়ালিটি ভাল। তাই জামাকাপড়গুলো সেখানকার লন্ড্রিতে যায়। ছাত্রী হলে জামাকাপড় পৌছে দেওয়া আরো অনেককে আবিষ্কার করার পর বিশ্বাস দুর্বল হয়ে আসে। কে জানে হয়ত সবগুলোই কাকতাল।

তবে একটা বিষয় কখনোই জানা হয়নি, এই মেয়েদের বন্ধু-বান্ধব, রুমমেট, ফ্লোরমেটরা তাদেরকে নিয়েও হাসাহাসি করেছে কি-না? যেভাবে আমার হলের সেই বড় ভাইয়ের ক্ষেত্রে হয়েছিল।

৩. ক্যাম্পাস জীবনে ডাকসু, আইবিএ, টিএসসি ক্যাফেতে দুপুরে খেতে গিয়ে দেখতাম, অনেক মেয়ে খাবার নিয়ে আসে। এরপর দুইজনে ভাগ করে খায়। এই দুইজনের অপরজন হচ্ছে একটা ছেলে। অনেক ক্ষেত্রে মেয়েটার বয়ফ্রেন্ড (নাও হতে পারে)। যাইহোক, আমি বেশ কিছুদিন বাসা থেকে খাবার আনা ছেলে খুঁজেছি। অনেক কষ্টে দুইজনকে পেয়েছিলাম। তারা প্রথম দ্বিতীয় বর্ষে মাঝে মধ্যে খাবার আনতো। তাদের দেখে আমার কাছে মনে হয়েছে, দুইজনই আত্মকেন্দ্রীক। দুইজনই সিঙ্গেল। গার্লফ্রেন্ডকে দামী রেস্টুরেন্টে নিয়ে খাইয়ে আনা প্রেমিকের সংখ্যা ভুরি ভুরি। তবে নিজের রান্না করা খাবার? এমন কাউকে আমি পাইনি।

এবার আসেন, মেয়েটা কিভাবে সেই খাবার রান্না করে। মেয়েটা হয়তো হলেই থাকে। দীর্ঘ অপেক্ষা করে রান্না ঘরে সিরিয়াল পেয়ে হয়তো তাকে এই খাবার রান্না করতে হয়েছে অথবা রুমে লুকিয়ে রাখা এমন চুলায়, যেটা ধরা পড়লে তার সিট বাতিল যেতে পারে। আমি জানি, ছেলেদের হলে অন্য অনেক অবারিত স্বাধীনতার মত রুমে হিটার রাখা কোন বিষয়ই নয়। চাইলেই রাখা যায়। করা যায় রান্নাও। এরপরও রান্না করে মেয়েটাই। হলের খাবার খারাপ। তাই প্রেমিককে খাওয়াতে একটু কষ্ট তাকেই করতে হয়।

৪. অষ্টম ওয়েজ বোর্ড হওয়ার পর এক নারী ব্যাংকারকে তার বন্ধুরা ‘ট্রিট‘ দিতে বলে। বেতনের টাকা হাতে পাওয়ার পর সরকারি চাকুরির বাইরে থাকা সেই বন্ধুদের নিয়ে তিনি রেস্টুরেন্টে গিয়ে হৈ হুল্লোড় করে এক দুপুর কাটিয়ে দেন। বাসায় ফিরে বাকী টাকা ‘সংসারের জন্য’ ‘স্বামীর’ হাতে দেন। ‘গণিতে দক্ষ স্বামী’ বাকী টাকার হিসাব চায়। ফল ‘সংসারের টাকা বেহিসাবীর মত খরচের কারণে’ ‘দায়িত্ববান স্বামীর’ সঙ্গে কলহ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এই নারী শিক্ষার্থীর ‘স্বামী’ও এই বিশ্ববিদ্যালয়েরই। ক্যাম্পাসের রৌদ্র ছায়ায় তারা সেই সময় ৭ বছর কাটিয়েছিলেন, প্রেম করেছেন, পড়েছেন। দুইজনের বিশ্ববিদ্যালয় সার্কেল এক। আমি জানি না, এই আপুর সেই ‘বন্ধু’ কখন কিভাবে স্বামী হয়ে উঠেছে?

ভালোবাসার বিয়ের ক্ষেত্রে চোখের সামনে আমাদের শিক্ষিত-আধুনিক বহু নারীকে দেখেছি, তারা একটা বন্ধুকে প্রতিদিন-প্রতি পলকে ‘স্বামী’ বানায় বা স্বামী হতে সুযোগ দেয়। এরপর বিয়ে করে।

৫. বিবাহ উপযুক্ত ছেলেদের বিয়ে করতে বললে আশপাশের সবাই কী বলে জানেন? ‘আর কতদিন বুয়ার হাতে রান্না খাবা? জামা কাপড় ধোয়া নিয়ে টানাটানি আর কতদিন? এবার একটা বিয়ে কর।’

আমার দেখা সব পারিবারিক বিয়েতে দেখেছি, শ্বশুর বাড়িতে প্রথম সকালে নববধূকে সংসারের কাজে হাত দিতে হয়। পালিয়ে বিয়ে করা কয়েকজনকে জিজ্ঞেস করেছি, পরের সকালের নাস্তাটা কে বানায়? সব ক্ষেত্রেই উত্তর এসেছে ‘নারী’। প্রতিদিন ‘স্বামী’ হয়ে উঠা বন্ধুটার সঙ্গে জীবনকালব্যাপী সম্পর্কের প্রকৃত রূপ দেখতে জানতে হবে বিয়ের আগেই। আর নিজে থেকেতো সেই সুযোগ দেওয়াই যাবে না।

হ্যাঁ, আমি এখানে নারীকেই বেশি সক্রিয় হিসাবে দেখতে চাই। কারণ সক্রিয় হওয়ার প্রয়োজনটা তারই বেশি এবং সেটা নিজের প্রয়োজন। নিজ জীবনকে নিজের করে রাখতে। পুরুষরা এখানে সুবিধাভোগী শ্রেণীর। তিনি সুবিধা ছাড়তে চাইবেন-এমনটা ভাবা প্রায় সকল ক্ষেত্রেই ঠিক না।

বাসর রাতে বিড়াল মারার একটা গল্প আমাদের সমাজে প্রচলিত আছে। বিড়াল আসলে বাসর রাতে কমই মরে। বিড়াল নিজে মারাতো অনেক পরের বিষয়, কখন যে মরে, সেটা বুঝতে প্রায় সব মেয়েই ব্যর্থ হয়।

তবে নিজের মত বাঁচার ইচ্ছা সব মেয়েরই আছে। প্রেমিককে ভাবেন সেই ইচ্ছাপূরণের সঙ্গী। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে প্রেমিকের হল থেকে আসা কাপড় ধুয়ে দেওয়া মেয়েটারও সে রকম ইচ্ছা হয়ত আছে। তিনিও হয়তো ভাবেন, তিনি এখন এ সব করছেন, যা তার সঙ্গী এক সময় পুষিয়ে দিবেন।

কেবল তিনি ভুলে যান, পরিবারও একটি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। এখানেই সবচেয়ে ভয়াবহ রাজনীতি হয়ে যেতে পারে, যায়।

ফলে এক সময় নিজের মত বাঁচার ইচ্ছা প্রকাশ করেই নারীকে পড়তে হয় নতুন ধরণের বিড়ম্বনায়। শুনতে হয়, ‘এ কেমন মেয়ে, তুমিতো মোটেই সংসারী না’। তখন উপদেশ আসে, ‘মানিয়ে নাও, নয়ত অশান্তি চলতেই থাকবে’। অধিকাংশ ক্ষেত্রে মেয়েটি মানিয়ে নিয়ে ‘শান্তিতে’ বাস করে……. কেউ কেউ বিদ্রোহ করে সংসার ভাঙে……..

পুনশ্চ- ‘সম্পর্ক’ নিয়ে আমাদের সমাজে কথা কমই হয়। যে লেখাটি দেখে এত কথা মনে হল, সেটি প্রিয় লেখক সীনা আক্তারের। তার লেখা কয়েকটি কলামই কেবল আমি পড়েছি… লেখেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে

সম্পর্ক, বিয়ে; অতঃপর…
http://opinion.bdnews24.com/bangla/archives/38134

পুনশ্চ-২
‘সম্পর্ক’র একটা বড় দুর্বলতাটা রয়েছে। এই যে এত কথা বললাম, ব্যক্তি জীবনে এর প্রভাব খুব বেশি না। কারো ক্ষেত্রেই না। ব্যক্তি জীবন গঠিত হয়, প্রাকটিসের মধ্য দিয়ে। লেখালেখি-চিন্তা যাই হোক, প্রাকটিসটা শুরু থেকেই ভাল না হলে সব জলে যায়। এ কারণেই আমরা অনেক সত্যিকারের ‘নারীবাদী’ পুরুষকেও ‘নারী নিপীড়ক’ হিসাবে দেখি।

‘মানব সম্পর্কে’র এই অভিনব দিকটার কারণেই আমরা একই ব্যক্তিকে বহু ধরণের আচরণ করতে দেখি। দুনিয়ার সবার কাছে সবচেয়ে খারাপ মানুষটা তাই তার নারী সঙ্গীর কাছে সত্যি সত্যি ‘বর’ হতে পারে। জীবনে ব্যর্থ ব্যক্তি হিসাবে সমাজের কাছে চিহ্নিত অনেক ছেলেও তার সঙ্গীর কাছে ‘সেরা’ হতে পারে। আমাদের সমাজে অহরহ দেখি, একই ব্যক্তি ঘরে নিজের মায়ের একান্ত সেবক, স্ত্রীর নিপীড়ক, কন্যার নিপীড়নে প্রতিবাদী। মায়ের কথায় স্ত্রীকে পেটায়। স্ত্রীর কথায় মাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠায়। কন্যার জন্য ‘সমতায় বিশ্বাসী ছেলে’ খোঁজা মা-বাবাই আবার ছেলের জন্য ‘সংসারী মেয়ে’ খোঁজে।

সব ছেলের মাঝেই থাকে পিতৃতান্ত্রিক পুরুষ স্বত্ত্বা, থাকে মানুষেরও একটি মন। রোমান্টিক সম্পর্কে এই দুটোর লড়াই চলে। নারী চেতনে-অবচেতনে কোন একটা পক্ষ নেয়। যা নির্ধারণ করে দেয় তাদের সম্পর্কের বহু কিছু…….

‘সম্পর্ক কার সাথে’ এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ ‘কিভাবে হয়েছে’। এটা সম্পর্কের সবচেয়ে শক্তিশালী দিকও। সম্পর্কের এই অভিনব দিকটা না থাকলে নারীদের জন্য সমান অধিকারের পৃথিবী গড়তে সব মানুষকে ‘ভাল’ হয়ে যেতে হত। সর্ব মাপকাঠিতেই। নারীর জন্যও বিশ্ব গড়তে সেটার আবশ্যকতা নাই। বাকী সম্পর্কে যে যেমন আছে, তেমন থেকেই নারীর জন্য সুন্দর একটা পৃথিবী গড়তে পারে। এরপর হয়ত আপনাতেই বাকী সব বিষয়েও পৃথিবীটা সুন্দর হয়ে যাবে।