ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

ঘটনাটি গত ১৬ ফেব্রুয়ারি শুরু। স্থান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শামসুন্নাহার হল। কয়েকদিন ধরেই স্বাস্থ্য ভালো যাচ্ছিল না সেই হলের এক শিক্ষার্থীর। সেই বিকালে তার অবস্থার অবনতি ঘটে। এক পর্যায়ে রুমমেট বন্ধুরা বিষয়টি সংশ্লিষ্ট হাউজ টিউটরকে (দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষক) জানায়। যথারীতি রাজনৈতিক নেতাদের মতো হাউজ টিউটর সঠিক চিকিৎসার আশ্বাস দিলেন। কিন্ত বাস্তবে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করলেন না। সন্ধ্যার পর পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটলে তার বন্ধুরা তাকে নিয়ে হাসপাতালে যেতে উদ্যোগী হয়। তখন এক হাউজ টিউটর বলেন, ‌‌’আমাদেরকে জানানোর পর আর তোমরা তাকে নিয়ে যেতে পারবে না। হাসপাতালে নিলে আমাদেরকে না জানিয়েই নিতে হতো। এটাই এখানকার নিয়ম।

তিনি আরো বলেন, ‘তোমরা মেয়ে মানুষ, তোমাদেরকে এভাবে ছাড়তে পারিনা।’ এক পর্যায়ে শিক্ষার্থীরা তাদের বন্ধুকে শিক্ষকদের তত্ত্বাবধানে হাসপাতালে নেয়ার দাবি করেন কিন্তু তাদের দাবি অগ্রাহ্য হয়।

পরে সেই নারী শিক্ষার্থীর বিভাগের কিছু বড় ভাই এবং বন্ধু এসে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে চাইলে বিবেকের কেন্দ্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট শিক্ষকগণ বিবেকতাড়িত হয়ে নেতিবাচক উত্তর দিলেন। এদিকে ক্রমেই রোগীর অবস্থার অবনতি ঘটতে থাকে। হলের বাইরে এসে দাড়িয়ে আছে অ্যাম্বুলেন্স। কিন্তু বিবেকের (!) তাড়নায় শিক্ষকরা তাকে যেতে দিতে পারছেন না

ছোট বেলায় একটি কথা শুনেছিলাম, ‌‌‌‌’প্রয়োজনে জান যাবে, কিন্তু সমাজবিধি ভাঙতে মানা।’ কথাটি শুনে গ্রাম্য সেই সালিশদারের বিরুদ্ধে রগ ভীষণভাবে চটে গিয়েছিলাম। ছোট বেলায় সেদিন ছোট্ট হৃদয়টা কেঁপে কেঁপে প্রতিবাদ করে উঠেছিল। কিন্তু এখানে বিবেক সেভাবে পারেনি, কারণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা নিশ্চই সেই গ্রাম্য মোড়লদের মতো নয়। তাই গ্রাম্য মোড়লদের বিরুদ্ধে রগ চটে উঠলেও এখানে বিবেক সেই সাহস করেনি।

ঘটনার এক পর্যায়ে বাইকে চড়ে সেই নারী শিক্ষার্থীর (নিবন্ধিত অভিভাবক) ভাই আসলেন। তখন আড়মোড়া ভেঙে অসুস্থ্য শিক্ষার্থীকে হাসপাতালে নিতে অনুমতি দিলেন কর্তৃপক্ষ। তবে শর্ত জুড়ে দিলেন, ‌’ভাইকে রোগীর সাথে অ্যাম্বুলেন্সে উঠতে হবে। বন্ধু বা অন্য কেউ উঠলে হল থেকে নেয়া যাবে না।’
“তাহলে বাইক কি করা হবে?” এমন প্রশ্নের জবাবে এক শিক্ষক বললেন, ‘সেটা আমরা জানি না। আমরা নিয়মের কথা বলছি।’

আমি এখনো বিশ্বাস করি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দেশের বিবেক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যায়ল সঠিক সব কাজই করে থাকে। এমনকি সেই সঠিক কাজ করতে গিয়ে প্রাণ গেলে যাবে। তাতে কি নিয়মের সাথে আপোষ করতে হবে নাকি? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কথনো আপোষ করতে জানে না।

কাহিনীর শেষ প্যারাটি হচ্ছে এরকম যে, শেষ পর্যন্ত সেই শিক্ষার্থীকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলেন তার স্বজনরা। এক পর্যায়ে পরীক্ষা নিরীক্ষার পর জানা গেলো, সেই নারী শিক্ষার্থীর টনসিলের অপারেশন করতে হবে এবং পরিস্থিতি খুবই খারাপ।

ধন্য! ধন্য! ধন্য! আসুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জয়গান গাই। এমন কঠিন পরিস্থিতিতে নিয়মের জন্য ত্যাগ স্বীকার করতে পারা কেবল বিবেকের কেন্দ্রভূমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই সম্ভব!

————————————————————————
ফিচার ছবিঃ রাজু ভাস্কর্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়