ক্যাটেগরিঃ মতামত-বিশ্লেষণ

 

সাম্প্রদায়িকতা শব্দটি তখনো শুনিনি। অবশ্য যখন শুনেছি,তার বছর পাঁচেকের মধ্যেও যে এটা বোঝার মতো জ্ঞান হয়েছে তা বলতে পারি না। বুদ্ধি মাপতাম শারিরীক উচ্চতায়। আমি যে ওই সময় দুয়ারের উপরের ছিটকিনি ছুঁইতে পারতাম না। তার মানে আসলেই বুদ্ধি ছিলো নিচের ছিটকিনি বরাবর। তাই ওটাই লাগাতাম ওটাই খুলতাম। যদিও আধা সাম্প্রদায়িক পরিবারে জন্ম নিয়েছিলাম তবুও মুরুব্বীদের অপরাধটুকুন স্পর্শ করতে পারতাম না। অথচ অপরাধ বুঝার মতো দাগ মনের ভেতর ছিলো। প্রিয় শিক্ষক অমৃত লাল ঘোষের বাড়ি ছিলো আমাদের বাড়ির পেছনে। তার বাড়িতে কাজ করতো আমাদের বাড়ির মোক্তারের বৌ। ওই বাড়ি থেকে উপার্যন করে চাল কিনতে লজ্জা ছিলো না, কিন্তু শুধু হিন্দু বলে তাদের বৌ ঝিকে নিয়ে অশ্লীল মন্তব্য করতেও পেয়ারা বেগমের ঠোঁটে আটকাতো না। অমৃত স্যারের বৌ পুকুরে চাল ধু’তে আসলে ঘাটে বসে প্রস্রাব করতো আবার সে পানিতে চালও ধু’তো। গ্রামের হিন্দু জনগোষ্ঠীর নামে এ অপবাদ প্রচলিত ছিলো খুব করে। অবশ্য হিন্দুরা এর চেয়েও হীনভাবে মুসলমানদেরকে অপরিচ্ছন্ন হিসেবে গণ্য করতো। চারিদিকে এমন সাম্প্রদায়িক গন্ধ মৌ মৌ করতো। তবে হিন্দুরা প্রকাশ্যে ওসব করতে পারতো না। বড়জোর কেবল ওদের রান্নাঘরে মুসলমান প্রবেশ করতে গেলেই প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করতো। সাহস বলতে ওই একটুই ছিলো। বাকিটা মনে মনে।

আরো অনেক পরে ইতিহাসের বইপত্র পড়তে পড়তে বুঝলাম একসময় হিন্দুরাও ঠিক মুসলমানদের যায়গায় দখলে ছিলো। এখন কেবল হিন্দুর যায়গায় মুসলমান আর মুসলমানের যায়গায় হিন্দু। আমি যে সময়ের কথা বলছি অর্থাৎ নব্বই এর দশকের চেয়ে এখনকার গ্রামগুলো বিপুল অসাম্প্রদায়িক। এখন বরং অর্থায়িক হয়েছে। মুসলমান হিন্দুর অদলবদলের মাঝখানে কোন একটা সময় আমরা সাম্প্রদায়িকতার উর্দ্ধে ছিলাম। মননে অনেক উন্নত ছিলাম। এ অঞ্চল থেকে ব্রিটিশরা চলে যাবার পর বাংলাদেশ ভুখন্ডের মানুষজন ছিলো স্বাধীনতাগামী। হতাশাজনকভাবে স্বাধীনতার পর এ দৃশ্যের মৃত্যু ঘটে। মুক্তিযুদ্ধের সময় যে হিন্দু যুবক মুসলমান বন্ধুর সাথে একই থালায় ভাত খেয়েছিলো,স্বাধীনতার কিছুদিন পর সে হিন্দু আর মুসলমান বন্ধুর বাড়িতে খায়নি। এটার শতভাগ বিস্তৃতি না হলেও অধিকাংশের পরমধর্ম এরকমই ছিলো। যা গ্রামের উভয়ধর্মীয় মুরুব্বীদের কাছ থেকে শুনেছিলাম বুঝদার হবার পর।

যুদ্ধ একটা বাস্তব বিষয়। অনেক হারানোর বিনিময়ে সামান্য প্রাপ্তির বিষয়। সুন্দরভাবে ধারন করতে পারলে এটা অসামান্য হয়ে ওঠে। অথচ হতে গিয়েও তা হয়নি। মানুষ যুদ্ধ ভুলে গেছে,রক্ত ভুলে গেছে। বেশিরভাগ মানুষ লাল ভুলে সাদার পবিত্রতায় ডুব দিয়েছিলো। তারপর ঠিক ওখানটাতেই বসত নিয়েছে এবং সেটার উন্নয়নে মনোযোগ দিয়েছে। একটি জাতি কয়েকশ বছর ধরে শৃংখল ভাঙতে ভাঙতে পরিপক্ক হয়ে দুর্যোগের মতো আবারো শৃংখলবন্দী হওয়াটা মোটেও সাধারণ ঘটনা নয়। এর অবশ্যই ঐতিহাসিক গুরুত্ব আছে। সমাজ কারো এক ইশারায় সৃষ্টি হয় না। তেমনি সামাজিকতাও একই সময়ে একই লাইনে অনেকের ইশারায় সৃষ্টি হয়। সে সামাজিকতা এতো দ্রুত পাল্টাতে গেলে অনেক বড়ো ঝাকুনি লাগে। আর সে ঝাঁকুনি ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর অস্তিত্বের ঝাকুনি না হলে কোন নির্বিবাদী মানুষ নিজের সাথে প্রতারনা করতে পারে না। এটা হলো অনেকগুলো সম্ভাব্য যুক্তির একটি। আর এ যুক্তিটি আমার কাছে সবচে শক্তিশালী মনে হয়েছে। একটু ঝেড়ে কাশলে বিষয়টি অনেক সুন্দর ভাবে বেড়ে উঠবে।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং কৃত্রিম দুর্যোগের জড়াজড়ি অবস্থানের কারণে এ অঞ্চলের মানুষ বরাবরই কারো না কারোর কাছে আশ্রয় খোঁজার তাগাদা পায়। মানুষের অসহায়ত্ব মানুষকে অন্ধ বধির কালা করে রাখে। জীবন টিকিয়ে রাখার বাহাস ছাড়া অন্য কোন বাহাসে মন যোগাতে পারে না। বাংলাদেশের মতো রাষ্ট্রে জীবনযুদ্ধই যেন মূল জীবন,আর বাকিসব ঐচ্ছিক। এদেশের মানুষের জন্য ধর্ম একটি গুরুত্বপূর্ণ অন্ন। কোথাও কোথাও মানুষ ধর্মকে পরিধান করে। আর এখানের মানুষ ধর্মকে খেতে পছন্দ করে। একজন ঈশ্বরের প্রয়োজন আশ্রয়ে,অভিযোগে। প্রতিদিন কয়েকবার অদৃশ্য আশ্রয় এবং অভিযোগের দ্বারস্থ হতে হয় দারিদ্রপীড়িত মানুষগুলোকে।

দেশ স্বাধীন হবার আগ পর্যন্ত মানুষকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ,অভাব ইত্যাদির চেয়েও বেশি নির্যাতন করতো পরাধীন থাকার কষ্ট। মাটি খেয়ে বেঁচে থেকে হলেও দেশ স্বাধীন করতে হবে,এমনতর প্রতিজ্ঞায় ডুবেছিলো বেশিরভাগ মানুষ। তাদের প্রতিজ্ঞাই সবচেয়ে ধারালো অস্ত্র হিসেবে কাজ করেছে। এবং শেষে ফলও ধরেছিলো। কিন্তু সে ফল পাকার আগেই ঝরে পড়তে শুরু করেছিলো। এখনও ঠিক ওইভাবেই কাঁচা কাঁচা ফলগুলো ঝরে পড়ছে। অবশ্য এখনতো তেমন করে ফলও ধরে না।

স্বাধীনতার বেড়ে ওঠার সীমানা ছিলো যোদ্ধাদের শরীর এবং মন। এ দুইটার মাঝেই গুলি চলেছে,বেয়নেটের খোঁচা চলেছে,ধর্ষন হয়েছে আবার চাষাবাদও হয়েছে। সবকিছু মিলিয়ে মানুষের মাঝেই ছুটে চলেছিলো ঘোড়া,মুছড়িয়ে পড়েছিলো আহত গাধা। কতো জমিন উল্টো হয়ে দেখিয়েছিলো হা হয়ে থাকা কলিজার পেট। এসবের যাই ঘটেছে,সবই শরীর আর মনে ভেতরে। অথচ দেশের মানুষের কাছে এটা কিন্তু আসল সত্য ছিলো না। বেশিরভাগ মানুষই মনে করতো এটা হচ্ছে সত্যের পরের ঘটনা। আসল সত্য হচ্ছে স্রষ্টা আমাদের পরীক্ষা নিয়েছিলেন এবং স্রষ্টাই আমাদেরকে স্বাধীনতা দিয়েছেন। এতোদিন ধরে যে যোদ্ধার কাছে সবচেয়ে শক্তিশালী ছিলো একটিমাত্র বুলেট,সবচেয়ে প্রেরণার ছিলো স্বাধীনবাংলা বেতার কেন্দ্রের গর্জে ওঠার গান। আজ আবার তার কাছে শক্তিশালী হয়ে গেছে একজন অদৃশ্য স্রষ্টা। এটা আসলে এরকমই। মানুষ জানে না সে কতোটা প্রাকৃতিক। মানুষ বুঝে না পরিস্থিতি অনুযায়ী সে কতোটা পাল্টে যেতে পারে। একটি ভুল সত্য মানুষকে এধরনের অসততার দিকে নিয়ে যায়। তার স্রষ্টা আর স্থির থাকে না। কখনো বুলেট,কখনো কাস্তে,কখনো মা,কখনো সে নিজেই স্রষ্টা হয়ে ওঠে। এভাবে করে একটা দুর্বাঘাসও বাদ পড়ে না। যে কিনা ধরেই নিয়েছে স্রষ্টার অধীনে থাকাটাই হলো চরম সত্য,সে সবসময় ওই সত্যকেই ধারণ করতে চাইবে। কিন্তু সত্যের সত্যতা যাচাইয়ের ইচ্ছা ছিলো না বলেই তার সত্য ধারণ করাতে সততা ছিলো না। কিন্তু বরাবরই ধারণ করার বিষয়টি সত্য।

স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রের নেতৃত্বের স্তরে বহুজনেই এ সত্য স্বীকার করেননি। এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের অস্তিত্ব অস্বীকার করে ওনারা প্রগতিশীলতাকে ঈশ্বরের আসনে বসিয়েছিলেন। কোটি কোটি মুসলমানকে সাথে না নিয়ে মানচিত্র রং করতে বেরিয়ে পড়েছিলেন। ভারতের মাটিতে দাঁড়িয়ে মুজিব বাহিনীর অফিসার দম্ভভরে হুংকার ছুঁড়েছিলেন -না,বাংলাদেশ মুসলিম রাষ্ট্র নয়। বাংলাদেশ সেক্যুলার রাষ্ট্র। এর আগেই একজন ভারতীয় অফিসার শিখিয়েছিলেন স্বাধীনতাকে কিভাবে দেশের সব মানুষের জন্য করে নিতে হয়। তিনি বলেছিলেন ‘পাকিস্তান এতোদিন পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম রাষ্ট্র হিসেবে অহংকার করতো। এখন আর তাদের সেই অহংকার নেই। এ অহংকার বাংলাদেশের, বাংলাদেশ এখন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম রাষ্ট্র’। এইতো সুন্দর ছিলো,এইতো সত্য ছিলো। সত্য অপ্রিয় হলেও সত্য। এ হচ্ছে সত্যের নিজস্ব শক্তি। আর তখন দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম রাষ্ট্রের শক্তিও বাংলাদেশের জন্য সত্য ছিলো এবং সে সত্যই আমাদের সবচে বড়ো শক্তি ছিলো। অথচ অতি উৎসাহী অদূরদর্শী কিছু প্রগতিশীল নেতা এতোবড় সত্যকে অস্বীকার করে বাংলাদেশকে করেছে শক্তিহীন। যেখানে বাংলাদেশের প্রত্যেকটি মানুষ ছিলো একেকজন কার্যকর স্রষ্টা,যারা একটি রাষ্ট্র সৃষ্টি করার ক্ষমতা রাখে;সেখানে কিছু নেতার অসামান্য ভুলের কারণে স্বাধীনতা ধারণ করার আগেই ধর্মীয় পরাধীনতার আতংকে ভুগতে শুরু করে বেশিরভাগ মানুষ। শেখ মুজিব তখন পাকিস্তানে বন্দী। অস্থায়ী সরকার তখন ভারতে। আর দেশের মাটিতে চলছিলো ঈশ্বর নিধন কর্মসূচী। রেডিও টেলিভিশন থেকে সেলামালকি, বিসমিল্লাহ, আল্লাহ হাফেজ এর মতো লোকাচারকে চটকোনা দিয়ে বের করা হয়েছে। দেশের কোথাও কোথাও বিজয় সমাবেশের পাশের মসজিদে আযান বন্ধ রাখা হয়েছিলো। অথচ বেআক্কেলের মতো মনে রাখেনি, দেশের বেশিরভাগ মানুষ চেয়েছিলো এ দেশ থেকে পাকিস্তানের দৈত্য দানবরা চলে যাক, তাই চলে গেছে। এখনতো দেশের বেশিরভাগ মানুষই চাচ্ছে না যে এ দেশ থেকে ধর্ম চলে যাক,তবে কি আর ধর্ম যেতে পারবে? ধার্মিকদেরকে দেখা যেতো,স্পর্শ করা যেতো,তাদের মুখে আল্লাহ ভগবান শোনা যেতো,এ জ্বলজ্যান্ত মোটা সত্যকে কিভাবে,কোন যুক্তিতে অস্বীকার করেছিলো তখনকার নেতৃবৃন্দ! প্রগতিশীলতাকে কখনো চাপিয়ে দেয়া যায় না। কারণ চাপিয়ে না দেয়ার নামই প্রগতিশীলতা। অথচ এখনো দেশের বেশিরভাগ প্রগতিশীল দাবিদাররা ঈশ্বর চর্চার বাইরে যেতে পারেননি। প্রগতিশীলতা নামক ঈশ্বরকে এখনো জোর করে খাওয়ানোর চেষ্টা চলছে। যা কেবল সত্যের শক্তির কারণেই সফল হবে না।

মুসলিম বাঙালি সংস্কৃতিকে স্বীকার করে নিলে এ দেশে এখন বাঙালি সংস্কৃতি সুপ্রতিষ্ঠিত থাকতো। কারণ মুসলিম সংস্কৃতি বলে কিছু নেই। যা আছে তা ধর্মকর্ম। যেমন ঈদ, রমজান, শবে কদর, মহররম ইত্যাদি। একাত্তরে মুসলিম বাঙালি সংস্কৃতি নামের কিছু নির্মাণ করা গেলে চল্লিশ বছর পর এখন তা বাঙালি সংস্কৃতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতো। অলিখিতভাবে ঠিকই দূর্গাপূজাকে প্রচুর মুসলমান উৎসব হিসেবে মেনে নিয়েছে। আমি দেখেছি লক্ষীপূজার সময় অমৃত স্যারদের বাড়ি থেকে আমাদের বাড়িতে সন্দেশ আসতো। আমাদের দু’ঈদ এবং অন্যান্য ধর্মীয় উৎসবে অমৃত স্যারদের বাড়িতে হাঁস, পোলাওর চাল, মশলাপাতি পাঠাতাম। আমরা উৎসবের লেনদেন করতাম। এভাবে আমাদের পুরো গ্রামে, জেলায়, বিভাগে, পুরো বাংলাদেশে। সংকীর্ণমনা জাতির বিবেকরা তখন চুপি চুপি ধর্মীয় উৎসব ধারণ করলেও স্বীকৃতি দিতে লজ্জা পেয়েছেন। উনাদের এ ধরনের লজ্জার জন্য আমরাও লজ্জিত।

৯০ভাগ মানুষের সংস্কৃতিকে স্বীকার করে না নিয়ে সে সংস্কৃতিতে সংস্কার আনবো কিভাবে? অস্তিত্বহীন কোন কিছুকে ঘঁষামাঝা করার ইচ্ছা চরম মাত্রার বেওকুপি। আর এ বেওকুপির কারণে মসজিদ মন্দিরে শান্তিতে থাকা ধর্ম এখন অশান্ত হয়ে উঠেছে। ধর্ম এখন ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে শুরু করে চোরের গায়ে মাখা সরিষার তেলেও পাওয়া যায়। ধর্ম যে খুব আদুরে জিনিস এবং ধর্মে পরিচিতদের একমাত্র পরিচয়, তা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে নাস্তিক ভাবাপন্ন মানুষরা। নইলে ধর্ম নিয়ে এতো টানা হেঁচড়া কেন? কেনইবা স্বাধীনতার পরপরই আযান, সালাম, আল্লাহ হাফেজ নিয়ে নেতাদের মাঝে এতো চুলকানি ছিলো? বাঙালি জাতির কাছে স্বাধীনতা যেমন সার্বজনিন ছিলো, তেমন একটি সার্বজনীন সংস্কৃতি দিতে পারেননি। পারেননি সংস্কৃতি বান্ধব কর্ম দিতে। বরং তাদেরকে ব্যস্ত করে দিয়েছিলেন ধর্ম মেরামতে। এখন পর্যন্ত ওরা ধর্ম মেরামত করে যাচ্ছে। বাঙালি শব্দটিতে মুসলমানরা পরিচয় খুঁজতেছে না। কেন খুঁজতেছে না? কারণ যারা যুদ্ধের পর মানুষের ভেতর ধর্মভয় ঢুকিয়েছিলো, তাদের কাছেও একটা ধর্ম ছিলো। বাঙালি ধর্ম। এবং সেটাকে ইসলাম ধর্মের প্রতিপক্ষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে উনারা সক্ষম হয়েছিলেন। তার সুফল এখন আমরা দিচ্ছি।

একাত্তরের পর এ দেশের মানুষ যদি বাঙালি মুসলমান দিয়ে শুরু করতে পারতো, তবে এখন বাঙালি এবং মুসলমান হিসেবে উন্নত হবার চিন্তা করতাম। যেটা অনেক বৈচিত্রময় হতো এবং পরিবর্তনের অনেক সুযোগ সৃষ্টি হতো। অথচ কেউ মুসলমান এবং বাঙালি হিসেবে শুরু করে অধিকাংশ মুসলমান ইসলামের ভেতরে গেছে, আর অধিকাংশ বাঙালি বাঙালিত্বের ভেতরে গেছে। উভয় পক্ষের মধ্যেই অনেকে পরিবর্তিত হয়েছেন, অনেকে পথভ্রষ্ট হয়েছেন। সব মিলিয়ে মৌলিক যা আছেন, তাদের মধ্যে মুসলমানরা এখনো অধিক সংখ্যার। অপরদিকে বাঙালিরা চারদিকে সরে গিয়ে এখন কেবল বাঙালি শব্দটাই আছে। ১৬ কোটি মানুষের দেশে ৯০ ভাগ মুসলমান এদিক সেদিক সরলেও মোটাদাগের মাঝেই মুসলমান পরিচয় এবং যত্ন আছে।

তো, কি আর করা। অকর্মা ধর্মসন্তানরা এখন যতো ধর্মের ভেতরে যাচ্ছে,ততো বর্বর হচ্ছে। তাদের পুরো ক্যারিয়ার,মান সম্মান এখন ধর্ম কেন্দ্রিক। কে কতো বেশি ধর্মের বিধি নিষেধ মানবেন, তার প্রতিযোগিতা চলছে। কারণ এর উপর নির্ভর করছে সামাজিক জৌলুস। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের দেশে মুসলমানরা যখন ১৪০০ বছর আগের ধর্মের কাছে শুয়ে আছে,তখন দিন যতো সামনে যাচ্ছে মুসলমানরা ততোই অদ্ভুত হচ্ছে। কোট টাই পরা একজন মুসলমান ফতোয়ার শিকার হেনার মৃত্যুতে আপসোস করে। কিন্তু ধর্মকে টিকিয়ে রাখার জন্য তিনিও দু’চার পয়সা দান খয়রাত করবেন। কারণ ধর্ম টিকলেই উনার পরিচয় টিকবে, নইলে উনি পরিচয়গতভাবে জারজ হয়ে যাবেন। ব্যস! হেনার মৃত্যুর সংবাদ আর পড়ার দরকার নাই। হিন্দু মূর্তিপূজারী ইন্ডিয়ানরা সীমান্তে কোন বাড়াবাড়ি করতেছে কিনা,সে সংবাদটাই একটু সময় নিয়ে পড়া দরকার। কারণ সব মিলিয়ে হিন্দু ধর্মের চেয়ে ইসলাম ধর্ম উৎকৃষ্ট- এটার প্রমান নেয়া বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ। তাই একজন মুসলমান হয়ে ধর্মান্দ মৌলবাদীদের ঠেকানোর চেয়ে ফিলিস্তিনের মানুষের জন্য নফল এবাদত করাকে শ্রেয় মনে করে। ফতোয়ার স্বীকার একটি কিশোরীর চেয়ে ফিলিস্তিনের মানুষরা অনেক গুরুত্বের দাবি রাখে। কারণ মৌলবাদীরাওতো মুসলমান। যদিও এতো বছরের নফল এবাদতের পরও ফিলিস্তিনের মুসলমানদের নিরাপদ করা যাচ্ছে না কেবল ধর্মের গন্ডির না পেরুনোর কারণে। ইহুদীরা মুসলমানদের উপর আক্রমন করতেছে। ওদের বন্ধু হিসেবে আছে খ্রিস্টানরা। সুতরাং মুসলমানরাই মুসলমানদের রক্ষা করতে হবে। কিন্তু আরবলীগ, ওআইসির সে ক্ষমতা নেই। অথচ যদি এমন হতো যে ইহুদীরা ফিলিস্তিনের ‘মানুষদের’ প্রতি আক্রমন করছে, তবে এ মানুষদেরকে রক্ষা করার জন্য প্রচুর মানুষ পাওয়া যেতো।

হিসাব যখন মুক্তিযুদ্ধ এবং এ দেশের জন্ম নিয়ে, স্বাধীনতার চল্লিশ বছর পর এখন আমরা কি করবো? আরে মশাই, অবস্থা এখনো রাষ্ট্রের বিপক্ষে যায়নি। তবে জনগনের বিপক্ষে ঠিকই গেছে। দেশের মুসলমান এবং বাঙালি কেউই ভালো নেই। মূল ধারার রাজনীতিতে কারোরই কোন প্রতিনিধি নেই। মুসলমান এবং বাঙালিরা খেত খামারে, বস্ত্রকলে, গাড়ির চিপায়, প্রবাসে জীবনকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে। রাজনীতি এখন শকুনের কাছে। বাণিজ্য এখন রাক্ষসের কাছে। সংস্কৃতি এখন শয়তানের কাছে। ধর্ম এখন বজ্জাতের কাছে। পৃথিবী থেকে সাম্রাজ্যবাদ উচ্ছেদ হয়নি। ঔপনিবেশিকতা নির্মূল হয়নি। শকুন, রাক্ষস, শয়তান আর বজ্জাতরা তৈলমর্দন করে যাচ্ছে সাম্রাজ্যবাদীদের কাছে। রাষ্ট্রের সুন্দর চেহারা এখন বৈদেশিক চামচামির উপর নির্ভর করছে। কারণ আমাদের সংস্কৃতিকে আমরা আপন করে নিতে পারিনি। ধর্ম আর বাঙালিয়ানার সংঘাতের কারণে মানচিত্রের রেখাগুলো মুখস্ত করতে পারিনি। গোষ্ঠীভুক্ত পছন্দ অপছন্দের উর্দ্ধে মানচিত্রবন্দী মানুষের স্বার্থ। এ সত্য স্বীকার করতে হবেই। ধর্মের ভেতর আত্মপরিচয় খোঁজা মানুষগুলোকে সাথে নিয়েই মানচিত্র ভ্রমন করতে হবে। যারা এতোদিন পবিত্র হরফ ভ্রমনে ব্যস্ত ছিলো। আবার ধর্ম চলে যাবে মসজিদে মন্দিরে। মসজিদ হবে মুসলমানের, মন্দির হবে হিন্দুর। আর বাংলাদেশ হবে বাঙালি মানুষদের, যারা মানচিত্রের পরিচয়ে বিস্তৃত সবুজ পাড়ি দেবে আর ধর্মীয় পরিচয়ে উপাসনালয়ে যাবে।