ক্যাটেগরিঃ ফিচার পোস্ট আর্কাইভ, ব্লগালোচনা

প্রিন্ট কিংবা ইলেক্ট্রনিক্স মিডিয়ার সাথে ব্লগের বড় পার্থক্য হচ্ছে মত প্রকাশের স্বাধীনতা উপভোগ। এক্ষেত্রে ব্লগের সুবিধাজনক অবস্থানের কথা অন্য মিডিয়া কল্পনাও করতে পারে না। বাংলাদেশের ব্লগ সংস্কৃতি এখন গায়ে গতরে পুষ্ট হচ্ছে। ঘটে যাওয়া ঘটনাবলী কিংবা সামনে যা ঘটতে পারে- এসবের নখমাপা বিশ্লেষণ চলে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাংলা ব্লগ সাইটে। বিশেষত ২০১০ সালের পুরোটাই জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক বিষয়াদি নিয়ে ব্লগ জমিনে বেশ পলি জমেছে। বলা যায় উর্বর হয়েছে জমিনের বুক। একটি ঘটনা ঘটে যাবার পর প্রকাশভঙ্গি এবং পরবর্তী প্রতিক্রিয়ায় সংবাদপত্র কিংবা টেলিভিশনের সাথে ব্লগের সুনির্দিষ্ট পার্থক্য চিহ্নিত করা যাচ্ছে। যাকে নেতিবাচক বলার কোন কারণ নেই।

প্রথম কোন বাংলাদেশীর এভারেস্ট জয় থেকে শুরু করে, ড. ইউনুস, উইকিলিকস, মডেল অভিনেত্রী প্রভা কিংবা রূপগঞ্জে সেনা জনতা সংঘর্ষ- প্রতিটি বিষয়ে প্রচলিত গণমাধ্যমের চাইতে ব্লগকে দেখা গেছে অধিক সক্রিয়। এমনকি পেঁয়াজের দাম বাড়া নিয়ে মন্ত্রীর মন্তব্যের ছোট্ট একটি লাইন অথবা কোন হত্যাকান্ড নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের সিকি আধুলি ফাঁকফোকর- কিছুই বাদ যায় না ব্লগারদের পর্যবেক্ষণ থেকে।

মূসা ইব্রাহিম প্রথম বাংলাদেশী হিসেবে এভারেস্ট জয় করার পর ব্লগে বহুমাত্রিক যুদ্ধ, মডেল তারকা প্রভার ব্যক্তি জীবনে ঘটে যাওয়া অপ্রত্যাশিত বিস্ফোরণ, ডেনিশ ডকু নির্মাতা কর্তৃক ইউনুসের ক্ষুদ্রঋণের ফাঁদ ধরা এবং সর্বশেষ জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ এর তুড়ি বাজানো – বলা চলে বছর জুড়ে এ চার ব্যক্তি ব্লগে প্রকাশিত পোস্টসমূহের মোটা সোটা একটা অংশ দখল রেখেছেন। এবং এ আলোচনা কিংবা সমালোচনার ক্ষেত্রে ব্লগ বরাবরই স্বকীয় ধারায় ছিলো।

মূসা ইব্রাহিম
২৩ মে ২০১০ এভারেস্ট জয়ের বৈশ্বিক কৃতিত্বে নাম লেখায় বাংলাদেশ। ৩০ বছর বয়সী তরুন তুর্কী মূসা ইব্রাহিম নেপালী সময় ভোরের পরে এভারেস্টের চূড়ায় উড়িয়ে দেন লাল সবুজের পতাকা। একই সাথে ১৬ কোটি মানুষকে করে নিলেন ইতিহাসের অংশ। এ খবর টেলিভিশন চ্যানেল সমূহ এবং পরদিন প্রথম সারির দৈনিক পত্রিকাসমূহে বিশেষ গুরুত্বপ্রাপ্ত হয়ে সারাদেশের মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। টেলিভিশন এবং সংবাদপত্রের কাজ যেখানে শেষ, ব্লগের ব্যস্ততা সেখানে শুরু। সংবাদ মাধ্যমে বিশ্বজয়ী নায়কের ভূমিকায় থাকা মূসা ইব্রাহিমকে খুব সহজে ব্লগাররা নায়ক মেনে নেননি। বিশেষ করে সামহোয়ারইনব্লগ এবং সচলায়তনে চলতে থাকে নেভারেস্ট-এভারেস্ট যুদ্ধ। একপক্ষ পুরো ঘটনাকে বানোয়াট আখ্যায়িত করে, আরেকপক্ষ এ ধরনের দাবিকে হাস্যকর বলে উড়িয়ে দেয়। মাঝামাঝি একটা পক্ষ “আলু পোড়া” খেতে ব্যস্ত ছিলো। শেষ পর্যন্ত মাসব্যাপী এ ব্লগীয় যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটে বানোয়াট দাবি করা পক্ষ থেকে মূসা ইব্রাহিমের এভারেস্ট জয়ের ঘটনাটিকে স্বীকৃতি প্রদানের মাধ্যমে। তবে পুরো বিষয়টি যে খুব সহজে ঘটেছে, তা কিন্তু না। এমনকি তা যে অভ্যস্ত কাদা উৎসবের মাধ্যমে হয়েছে তাও নয়। বরং ব্লগারদের সম্মিলিত চেষ্টায় সর্বোচ্চ আলোচনা সমালোচনার পরই সংশয় মুক্ত হয় প্রথম বাংলাদেশীর সর্বোচ্চ পর্বত শৃঙ্গ আরোহণের ঘটনা। মূসা ইব্রাহিমের প্রকাশিত গুটিকয়েক স্থির চিত্র, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য ইত্যাদি প্রমাণসমূহকে যেতে হয়েছে প্রযুক্তি জিজ্ঞাসাবাদে। স্থিরচিত্র বিশ্লেষণী প্রযুক্তির দ্বারস্থ হয়ে এবং প্রকাশিত সংবাদসমূহের চুলচেরা বিশ্লেষণ শেষে ১৬ কোটি মানুষের আনন্দের জয় হয়। এভাবে করে তরুন ব্লগাররা প্রমাণ করেছে খুব সহজে কোন ঘটনা এখন আর আম জনতাকে গেলানো সম্ভব না। ঘটনার ওজন অনুযায়ী স্বচ্ছতা প্রদর্শন করেই কৃতিত্বকে নিজের করে নিতে হবে। নইলে তা দেশের জনগনের সামষ্টিক হবে না, বরং কৃতিত্ব দাবিকারীর নিজস্ব সম্পদ হয়েই থাকবে।

প্রভা
গত তিনচার বছর ধরে বাংলাদেশে টেলিভিশন চ্যানেলের সংখ্যা বৃদ্ধির পর শোবিজে এক ধরনের বিপ্লব ঘটে । আগমন ঘটে প্রচুর নতুন মুখের। যারা তুমুল প্রতিযোগিতার মুখে থেকে নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠিত করে যাচ্ছেন। প্রভা হচ্ছেন তাদেরই একজন। কিন্তু যখনই তার মুখটি দর্শকদের কাছে খুব দ্রুত চেনা হয়ে যাচ্ছে, ঠিক তখনই তীব্র ধাক্কার মতো ঘটনা ঘটে গেলো ব্যক্তি জীবনে। দীর্ঘদিনের প্রেমিক, বিয়ের জন্য চুক্তিবদ্ধ ব্যবসায়ী রাজিবকে বিয়ে না করে বিয়ে করলেন আরেক শীর্ষ মডেল অপূর্বকে। মেনে নিতে পারেননি সাবেক প্রেমিক রাজিব। ইন্টারনেটের সুবিধা নিয়ে প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে পূর্বে ধারণকৃত দৈহিক ঘনিষ্ঠতার ভিডিও প্রকাশ করলেন অনলাইন মাধ্যমে। মূহুর্তের মধ্যে ছড়িয়ে যায় ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের মাঝে। মনিটরের সামনে বাংলা ব্লগারদের কী-বোর্ডে তখন প্রভা বিষয়ক বালু উড়া শুরু করলো। ভিডিও প্রকাশ করে রাজিবকে পড়তে হয় তীব্র সমালোচনার মুখে। ব্যক্তিগত মূহুর্তের ভিডিও প্রকাশ করে রাজিব তথাকথিত পুরুষতান্ত্রিকতার চর্চা করেছেন এবং নিচু মানসিকতার পরিচয় দিয়েছেন – বেশিরভাগ ব্লগারই এ ধরনের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে। একই সাথে ভিডিও প্রকাশের পর প্রভার স্বামী অপূর্ব’র ভূমিকা নিয়েও চলেছে আলোচনা। যে দিকগুলো নিয়ে সংবাদ মাধ্যমে চুলচেরা বিশ্লেষণ প্রায় অসম্ভব।

ড. মুহম্মদ ইউনূস

ডেনিশ প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা টম হেইনমান নির্মিত ‘ক্ষুদ্র ঋণের ফাঁদে’ নামে প্রামাণ্যচিত্রের ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ার হয় নরওয়ের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে। যেখানে অভিযোগ করা হয় ড. ইউনূস নরওয়ে, সুইডেন, নেদারল্যান্ডস ও জার্মানির দেওয়া অর্থ থেকে ১০ কোটি ডলারেরও বেশি গ্রামীণ ব্যাংক থেকে গ্রামীণ কল্যাণ নামে নিজের অন্য এক প্রতিষ্ঠানে সরিয়ে নেন। ফলে বড় ধরনের অস্বচ্ছতার অভিযোগ সৃষ্টি হয় ইউনূসের গ্রামীণ ব্যাংকের বিরুদ্ধে। নোবেলজয়ী এ ক্ষুদ্রঋণ বিশেষজ্ঞ বলেছিলেন বাংলাদেশ থেকে দারিদ্র্যকে যাদুঘরে পাঠানোর কথা, বলেছিলেন সামাজিক ব্যবসার কথা। যা শূলে চড়তে শুরু করে বাংলা ব্লগ সমূহে। ব্লগে উঠে আসতে থাকে ঋণগ্রস্থদের কেস স্টাডি, আসতে থাকে ক্ষতি প্রত্যক্ষদর্শীদের সাবলীল লেখাসমূহ। কিন্তু ব্লগেতো আর সবকিছু সমানতালে চলে না। এত অভিযোগের পরেও ড. ইউনূসের মেধাকে রাষ্ট্রীয় সম্পদের বাইরে নিতেও রাজি নয় ব্লগাররা। অনেকেই বলেছেন প্রাতিষ্ঠানিক জটিলতার কথা। বলা হয় লেনদেনের চুক্তি কিংবা শর্তের মারপ্যাঁচের কথা। কিন্তু তবুও প্রথম নোবেলজয়ী বাংলাদেশীকে প্রশ্নবিদ্ধ দেখে ব্লগাররা চেপে রাখা অস্বস্তি প্রকাশ করেছেন হতাশার অসন্তোষে। যা প্রকাশিত হয়েছে নানা বৈচিত্রে। যুক্তির বিপরীতে যুক্তি, প্রমাণের বিপক্ষে প্রমাণ- এভাবেই স্রোতের মতো তথ্য আসে, আসে ব্লগারদের মতামত। গতবছর ব্লগে ব্যক্তি আলোচনার ইউনূসের উপস্থিতি উল্লেখ করার মতো।

জুলিয়ান অ্যসাঞ্জ
বলা হচ্ছে গতবছরের সবচেয়ে জনপ্রিয় শব্দের নাম উইকিলিকস। এর কর্ণধার জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জকে বলা হচ্ছে ভার্চুয়াল রবিনহুড। যিনি ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকা সাম্রাজ্যবাদীদের “অতি গোপনীয়” দলিলকে বাদামের ঠোংগার মতো বিলিয়ে যাচ্ছেন। বাংলাদেশের পত্র পত্রিকায় এ ভার্চুয়াল রবিনহুডকে নিয়ে সংবাদপত্রের নিজস্ব ভাষায় মানপত্র রচিত হয়েছে। কিন্তু আলোচিত এ ব্যক্তিকে নিয়ে গভীর থেকে গভীরতর ফিচারিং চলে বাংলা ব্লগ সমূহে। উইকিলিকস এর কর্মপন্থা, জুলিয়ানের আদর্শ, সাহস ইত্যাদির পোস্টমর্টেমের প্রতিযোগিতা চলছে এখনো। কিন্তু জুলিয়ান কি সমালোচনার ঊর্দ্ধে? ব্লগারদের চোখ হয়তো দু’টি নয়। ইন্দ্রিয়ও প্রচলিত সংখ্যার নয়। তাইতো ১৭ ডিসেম্বর বিখ্যাত গার্ডিয়ান পত্রিকায় সুইডিশ রমনীদের সাথে জুলিয়ানের গোপন তথ্য প্রকাশের পর তার ক্ষেপে যাওয়ার দিকে নাক বরাবর আংগুল ধরেছেন ব্লগাররা। বলেছেন স্ববিরোধিতার কথা। এবং অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন নি:শর্তভাবে জুলিয়ানের প্রকাশিত নথিসমূহ মেনে নেয়া ঠিক হচ্ছে কিনা। তবুও তার বক্তব্যে উঠে আসা অগোপনীয়তার পক্ষাবলম্বন কিংবা মানবাধিকার লংঘনের অভিযোগে অভিযুক্ত মার্কিনী এবং তাদের মিত্রদের বিপক্ষে অবস্থানের কারণে বছরের শেষের দিকে এসে ব্লগে সিংহভাগ কন্টেন্টই জুলিয়ানকে বানিয়েছে ভার্চুয়াল রবিনহুড।