ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

চারদলীয় জোটের সর্বাধিনায়ক বেগম খালেদা জিয়া রোডমার্চ কর্মসূচীতে সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুল এলাকায় অনুষ্ঠিত এক পথসভায় বলেছেন “আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধ করেনি। আওয়ামী লীগ কেবল এপার ওপার (বাংলাদেশ ভারত) করেছেন। জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে এ দেশের মানুষ যুদ্ধ করেছে।“ ইদানিং আমার যে কোন কথা একটু বেশি শুনার অভ্যাস লক্ষ্য করলাম। আশ্চর্যজনকভাবে পত্রিকায় উনার এ কথাগুলো দ্বিতীয়বার পড়তে গিয়ে ঘোরের তোড়ে দেখলাম “গোলাম আজমের পরামর্শে জিয়াউর রহমান স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতৃত্ব দিয়েছেন। শেখ মুজিবতো সুযোগ বুঝে ধরা দিয়ে পাকিস্তান গিয়ে সুখে শান্তিতে বসবাস করেছেন। গোলাম আজম পত্র পত্রিকায় পাকিস্তানের পক্ষে বিবৃতি দিলেও গোপনে কিন্তু এ দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য কাজ করেছেন। স্বাধীনতার পর বাকশালী সরকার এ ইতিহাস মুছে ফেলেছে!”

কোন কিছু অতিরঞ্জিত শোনা ভালো নয়। এতে করে তথ্য বিভ্রান্তি ঘটে। প্রপাগান্ডা হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু ২০০১ সালে সেই কৈশোর পেরোনো বয়সে রাজাকারের গাড়িতে জাতীয় পাতাকা দেখার মাঝে কোন ঘোর ছিলো না। তবুও ভেবেছিলাম বেগম জিয়া হয়তো সবচেয়ে ঘৃণিত কাজটি করে ফেলেছেন। এরপর আর ঘৃণা কুড়ানোর মতো কিইবা করতে পারেন। ক’দিন ধরে বেগম জিয়ার মুখে প্রকাশ্যে গ্রেফতারকৃত যুদ্ধাপরাধীদের মুক্তির দাবি শুনে এখন মনে হচ্ছে ১০ বছর আগে যা ভেবেছি, তা ভুল ছিলো। এরপর ভীষণ আশংকায় ছিলাম, কখন কী শুনে ফেলতে হয়। সর্বশেষ আজ উনি শুনালেন, আমরা শুনলাম। এসব কথা আমাদের সাথে দুর্ধর্ষ মশকরা ছাড়া আর কিছুই না। আমাদের দু:খ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে ভেংচি কেটে ঠিকই তা ছেদ করে বুকের ভেতরটা ভেদ হয়ে খিল খিল করে হেসে উঠে মশকরার তীর। নিজেকে খুব অসহায় মনে হয়।

ক’দিন আগে জাতিকে বুঝালেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এখন আর মুসলমান নন। উনি হিন্দু হয়ে গেছেন। তার মানে উনাকে ভোট দেয়া যাবে না! এই যে এসব উদ্ভট কথা উনি বলছেন, কেন বলছেন? ক্ষমতায় যাওয়ার জন্যতো? কি হাস্যকর বিষয়! বিএনপি চাইলে খুব হেসেখেলে ক্ষমতায় যেতে পারে। সরকার শেয়ার বাজার নিয়ে লগ্নিকারীদের সাথে নির্মম তামাশা করলো, কমিশনখোর মন্ত্রীর হাতে পুরো দেশের সড়ক রেল বিভাগ ধর্ষিত হলো, তিস্তা চুক্তি ব্যর্থতা, পদ্মাসেতু ব্যর্থতা, বিদ্যুতের মতো গুরুত্বপূর্ণ শক্তিকে বেসরকারি খাতে দিয়ে দিলো, আরো কতো কতো অবিবেচক সিদ্ধান্ত, আরো কতো জনবিরোধী কাজকর্ম পড়ে আছে। অথচ একের পর এক মিথ্যাচার করে ক্ষমতায় যেতে চাচ্ছেন বেগম জিয়া।

অনেকেই বিরোধীদলীয় নেত্রীকে অদূরদর্শী বলে থাকেন। আমি তা বলতে নারাজ। অদূরদর্শী কেউ অন্তত একটি দেশের প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন না। তাও একবার নয়, দু’বার নয়, তিন তিন বার তিনি প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। সুতরাং তাকে অদূরদর্শী বলতেই পারি না। তাহলে কেন এতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুকে পাশ কাটিয়ে মিথ্যাচারের বিরতিহীন সার্ভিস চালিয়ে যেতে হচ্ছে? রাজনীতি নামক ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে গন্তব্যে (ক্ষমতায়) যাওয়ার পথে এতো রঙ্গলীলা কেন করছেন? অনেক ভেবে চিন্তে বুঝলাম বিরোধী দলীয় নেত্রী ঘোড়ায় উল্টো হয়ে বসেছেন। তিনি দূরদর্শী, তা আগেই বলেছি। ঘোড়ায় উল্টো হয়ে বসে অনেক দূর পেছন পর্যন্ত দেখতে পারেন। অন্তত স্বামীর শাসনকাল পর্যন্ততো অবশ্যই দেখেন। তিনি স্পষ্ট দেখতে পান তার স্বামী ধর্মকে ব্যবহার করে স্বৈর শাসক হয়েও মহানায়ক হতে পেরেছেন, বঙ্গবন্ধুর মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে প্রায় মুছে ফেলতে পেরেছিলেন। তিনি দেখেছেন ধর্মকে ব্যবহার করে মুক্তিযুদ্ধের সময় হাজারো অনাচারের চাবুক চালিয়েও রাজাকার আলবদরা এদেশের রাজনীতিতে পুন:প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এরশাদের মতো লোকও ধর্মকে ব্যবহার করে নয় বছর দেশ শাসন করেছিলেন, হয়েছিলেন পল্লীবন্ধু। এসব দেখে তিনি উজ্জীবীত হচ্ছেন। তাইতো প্রধানমন্ত্রীর ধর্ম নিয়ে হঠকারী মন্তব্য করেন, দাঁড়ি টুপি পরা কতগুলো বদমাশের পক্ষে কথা বলেন। চিরচেনা সে প্রতারণার পথ ধরে বীর বিক্রমে ক্ষমতার দিকে যাচ্ছেন।

দেশনেত্রী, প্লীজ আপনি সামনে ফিরে বসুন। কারণ ঘোড় সওয়ার উল্টো হয়ে বসলেও ঘোড়া কিন্তু উল্টো দিকে দৌড়ায় না। ঘোড়া সামনের দিকেই দৌড়াবে। আর সামনের দিকে আছি আমরা নতুন প্রজন্ম। ক’দিন আগে আপনার দলের মহাসচিব তরুন প্রজন্মকে নিয়ে একটি অনলাইন মাধ্যমে লেখার প্রয়াস পেয়েছেন। উনার লেখা পড়ে মনে হয়েছে এ দেশের নতুন প্রজন্ম এখনো মাথায় সরিষার তেল দিয়ে একপাশে সিঁথি কেটে সকাল বিকাল রাত গুনে দিন পার করে। এতো বোকা বোকা লোকগুলো একটি রাজনৈতিক দলের মহাসচিব হয় কিভাবে, সেটাই এক বিস্ময়! দেশনেত্রী, আপনাকে ঘোড়ায় সামনে ফিরে বসতেই হবে। খাল কাটা কর্মসূচী আর ইসলামের দোহাই দিয়ে ভোট সংগ্রহের দিন শেষ। একজন বিরোধী দলীয় নেত্রী হিসেবে আপনি কতটা সফল, তার উপর নির্ভর করবে ক্ষমতায় যাওয়া। আমরা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি আপনার ব্যর্থতা। উল্টো হয়ে বসে বসে দূরদর্শী সৃষ্টি দিয়ে পেছনের দূরে তাকিয়ে থাকলে আপনি বারংবার ব্যর্থ হবেন।

এ দুখীনি মানচিত্রকে ধর্ষণ করা থেকে বিরত থাকুন, ইতিহাস বিকৃত করা থেকে সরে আসুন, ধর্ম ধর্ম খেলা বন্ধ করুন, যুদ্ধাপরাধীদেরকে আঁচলের ছায়া থেকে ধাক্কা দিয়ে বের করে দেন। বিশ্বাস করুন এ দেশে আপনারা জাতীয়তাবাদের যে সংজ্ঞা দাঁড় করিয়েছেন, আমরা তা অস্বীকার করি। জাতির জন্মশত্রুদের সাথে নিয়ে যিনি ক্ষমতার স্বাদ নেন, তার মুখে জাতীয়তাবাদের কথা মানায় না। আমাদের দেশের জন্মসংক্রান্ত কোন বিরোধে আমরা আর জড়াতে চাই না। জাতির জন্মশত্রুদের নিশ্চিহ্ন করার কাজে যদি সহায়তা না করেন, তবে ইতিহাস অনুসন্ধানী নতুন প্রজন্ম আপনাকে ছুঁড়ে ফেলে দেবে।

আমরা অনেকদূর এগিয়ে গেছি। তরুণ প্রজন্ম চায় এমন একটি ইশতেহার দেখে ভোট দিতে, যে ইশতেহারে লেখা থাকবে একটি জাতির উন্নয়নের রোডম্যাপ। ইতিহাস বিকৃতির, প্রতিপক্ষকে ডান্ডাবেড়ি পরানোর, জন্মশত্রুদের নিয়ে সরকার গঠনের অঙ্গীকার সম্বলিত ইশতেহার দেখে ভোট দিতে চায় না।