ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

 

ছোট বেলায় মাদ্রাসায় পড়তাম। যারা কখনও মাদ্রাসায় পড়েনি, তারা কখনও মাদ্রাসাজীবনের সুখ-দুঃখ আর হাসি-কান্নার কথা বুঝতে পারবে না। আমাদের মাদ্রাসাটা ছিল অনেক বড়। চারিদিকে দেয়াল ঘেরা। আমরা ছোট ছিলাম বলে চৌদেয়ালের মাঝেই থাকতে হত সারাক্ষণ। মূল ফটক থেকে একপাও বেরুবার সুযোগ ছিলনা আমাদের।

বিকেলে মাদ্রাসার ছাদে দাড়িয়ে থাকতাম আর রাস্তায় মানুষের হাটা চলা দেখতাম। মাঝে মাঝে বাড়ির কথা মনে পরলে চোখ ঝাপসা হয়ে আসতো। মায়ের কথা মনে পরতো। কিসের অভাব যেন আমার কোমল হৃদয় ছুয়ে যেত। মাগরিবের পর ক্লাসে বসতাম। দুলে দুলে কোরআন পড়তাম। সোনারগাঁও এর একজন শিক্ষক ছিল। আমরা কারী সাহেব বলে ডাকতাম। খুব বদমেজাজী ছিল। তিনি যখন ডান হাতে বেত নিয়ে আর বাম হাত দিয়ে দাড়ি চুলকাতে চুলকাতে ক্লাসের মাঝখান দিয়ে হাটতো তখন আমাদের কোরআন পরার শব্দে দো-তলা দালানটি কেঁপে উঠতো। আরেকজন শিক্ষক ছিল শিবপুরের। আমরা ডাকতাম শিবপুরীহুজুর বলে। সে খুব মিশুক ছিল। আমাদের মাঝে মাঝে মজার মজার গল্প শোনাতো।

একবার হল কী,এক ছাত্রকে পড়া না হওয়ার কারনে আচ্ছা মত শাস্তি দিলেন কারী সাহেব। দু হাতে দুটো আর পিঠে দুটো বেত্রাঘাত। দু হাত লাল হয়ে গেল। পিঠ ফুলে গেল। তাই দেখে আমরাও ভয়ে কাপছিলাম। শিবপুরীহুজুর গিয়ে ফেরালেন। এদিকে সেই ছাত্র তো তার ছাত্রনেতা ভাইয়ের কাছে ফোন দিয়ে যতটুকু

মার না খেয়েছে তার চেয়ে ত্রিশগুন বেশী বানিয়ে বানিয়ে বলল। ছাত্রনেতা তো কলেজের প্রায় একশ ছাত্র নিয়ে মাদ্রাসায় হাজির। এই সব দেখে কারী সাহেবের মুখের সে কি করুন অবস্থা! বাঘের মুখে থাকা হরিনের মুখের মত। অবশেষে মাদ্রাসার প্রিন্সিপ্যাল সাহেব এর মিমাংসা করলেন। আজ কতদিন, কত বছর হয়ে গেল মাদ্রাসা ছেড়েছি।

সেই বন্দি শিবির থেকে মুক্তি পেয়েছি। কিন্তু নিজেকে তারপরেও কেন যেন খুব অসহায় মনে হয়। সেই কারী সাহেবের রাগান্বিত চকচকে চোখেও যে ভালবাসার কি জাদু ছিল তা আজ বুঝতে পারি। সেই শিবপুরীহুজুরের মজার মজার গল্পও তো আজ আর কেউ শোনায় না। আজও কেন এই মন ফিরে যেতে চায় সেই চৌদেয়ালের মাঝে? এটাই কি চিত্তবিলাপ?