ক্যাটেগরিঃ চারপাশে

 

‘‘চা’ যেভাবে আমাদের মাঝে এলো…’ পোষ্টটা ব্লগে দিয়া বেশ আনন্দেই আছিলাম। ‘ফিরি’ চায়ের অফার আইতাছিল বেশ। আমি তো মহা খুশি। ধইরাই লইছিলাম এই মাসটা শুইয়া, বইসা, কাইত চিৎ হইয়া চা খামু আর গেজামু। কিন্তুক বিনা মেঘে মাথায় এমনে ঠাডা পড়বো কল্পনাও করিনি। ঘটনা খুইলা কই।

আবু সুফিয়ান ভাই ছবির হাটে আইছে। তখন বেলা পিরায় ১২ টা বাজে। আমি ঘুম থেইক্কা উইঠা আড়মোড়া ভাংতাসি। ভাই ফোন দিয়া কইলো ছবির হাটে আইয়া পড়ো। চা খাইয়া যাও। আমি তো হিট। মাঞ্জা মাইরা বাইর হইলাম। যাক, এই ‘সক্কাল’ বেলায় ফিরি চা, দিনডা আরামেই যাইবো মনে হইতাছিল। খাইছি মামা পাইছি জোস ইসটাইলে একখান রিকসা লইয়া হাজির হইলাম ছবির হাটে। ভাইরে মধুর ভঙ্গিতে সালাম দিয়া কপট লজ্জার ভান কইরা চায়ের কাপে চুমুক দিতাসি- আহ, মওজাই মওজা। সুফিয়ান ভাই আস্তে কইরা কইলো, ‘সোহেল, বিশ তারিখে ছবির হাটে সাগর রুনি হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে ছবি প্রদর্শনীর সমস্ত দ্বায়িত্ব আপনার ওপর দিলাম। আপনি এটা করেন।‘

আর এট্টু হইলেই হাত থেইক্কা চায়ের কাপ ফালায়া দিসিলাম। আমি তো পুরাই টাসকি। পুরা দ্বায়িত্ব, তাও আমার উপ্রে। ক্যামনে এইডা সম্ভব। আমি ভাইরে বিভিন্নভাবে বুঝানোর টিরাই মাল্লাম- কইলাম, আমি ছুড মানুষ। এইডা আমারে দিয়া হইবো না। ভাই তার কথায় অনড়। আমারে উলটা কইলো,’পারুম না মানে, বয়স কত চলে হিসাব আছে? এই বয়সে আমরা দাবড়াইয়া বেড়াইছি’। ইত্যাদি ইত্যাদি।

মনে হইলো আমার বাড়া ভাতে ছাই পড়ছে। মিজাজ খ্রাপ কইরা চা ওয়ালারে কইলাম,’কি মিয়া, আমি কি ডায়াবেটিসের রোগী নাকি? এক্কেরে চিনির বালাই নাই চায়ে।’ অথচ এই চা ই আরাম কইরা খাইতাসিলাম। তাকায়া দেখি ভাই কর্মসূচির এক্কান লিস্ট বানায়া আমার দিকে বাড়ায়া দিসে। আমি লিস্ট পইড়া মনে মনে কইলাম- ইয়া খোদা, তুমি মাডিরে দুই ফাক কইরা দাও, আমি লাফ দিয়া গাছে উডি। সুফিয়ান ভাই তখন উদাস হইয়া দেখি আকাশের দিকে তাকায়া আছে।

হাতে আছে মাত্র একদিন এক রাইতের কিছু বেশি। কি করি, কি করি? পরথমে নওশের আলম রোমান ভাইরে কল দিলাম। রোমান ভাই কইলো সন্ধ্যায় ছবি মেইল কইরা দিব। আমি পড়লাম ফাপড়ে। সুফিয়ান ভাই আফিসে চইলা গেল, আর আমি চিন্তার উপ্রে পরপর কয়েকখান বিড়ি খাইয়া ফালাইলাম। পকেটে হাত দিয়া দেখি বিশ টেকা আছে।

সুফিয়ান ভাই বেশ কিছু টেকা দিয়া গেছে, কিন্তুক বাকিটা? ফুন দিলাম এইবার রোকন ভাইরে। ভাই আমার অমায়িক, পুরা ৫০০। আর কারে ধরা যায়, কারে ধরা যায়…? ফুন কল্লাম আদেল ভাইরে। ভাই ব্যস্ত, কইলো দুপুর ৩ টার সময় ‘সময় টিভিতে’ গিয়া একজনের কাছ থেইকা টেকা লইয়া আইতে।

এইদিকে টেনশনে আমার খাওয়া অফ। ঢুকলাম নীলক্ষেত, বাকুসা মার্কেট, নিউ মার্কেট আর গাউসুল আজমে। দড়ি কিনতে হইবো। কিন্তু কতটুকু দড়ি লাগবো জানিনা। আরেক কেচকি। আন্দাজের উপ্রে ৫০ গজ পাটের দড়ি কিন্না ফালাইলাম। এইবার কিনতে হইবো কালা কাপড়। গরমের জ্বালায় নিউ মার্কেটের এক্কান এসি আলা দুকানে ঢুইকা আরামে বইলাম। সেলসম্যান বিনীতভাবে কইলো, কি লাগবো ভাইয়া? আমি জিত্তা গেসি ভঙ্গিতে কইলাম, ব্যানারের কালা কাপড় দ্যান। সেলসম্যান পুলাডা আমার দিকে পুরা বিশ সেকেন্ড তাকায়া থাকলো। তারপর কইল, ভাই এইডা শাড়ির দুকান।

ইয়া মাবেদে এলাহি, আমি চাইয়া দেখি আমার পাশের ললনা কাস্টমাররা আমার দিকে তাকায়া আছে। যিন আমি মঙ্গল গ্রহ থেইক্কা এইমাত্র ল্যান্ড করছি এই দুকানে। লাফ দিয়া উইঠা পিরাই দৌড়াইয়া বারাইলাম বাইরে, আহা কি সে সূর্যের উত্তাপ।

এমন সময় দেহি পকেটের ফুন বাজতাসে। আমার তখন দেখার টাইম নাই। ফুন ধইরাই কইলাম,’হ্যালো, আসসালামুয়ালাইকুম। কে বলছেন?’

‘কি বলতাসি মানে? আমার সাথে মজা করতাসো? আমারে এতই সস্তা মনে হয়?’ আমার গার্ল ফিরেন্ড ঝাড়ি দিয়া ফুন কাইটা দিল। আমি তখনই বেশ কয়েকবার টিরাই মাল্লাম, বাট ফুন অফ। সবই কপাল।
যাকগা, পরে বাকুশা মার্কেট থেইক্কা কিন্না ফালাইলাম কালা কাপড় আর কিলিপ। দৌড় দিলাম সময় টিভিতে। পৌছায়া কল দিলাম আদেল ভাইয়ের ‘সোর্সরে’। হেই কইলো খাড়ান, আমি এট্টু ব্যস্ত আছি। চল্লিশ মিনিট পরে আইতাসি। ওইদিকে ব্লগার আরিফ হোসেন সাঈদ ক্যাম্পাসে আইয়া ওয়েট কত্তাসে সিলেক্টেড পোষ্ট আর কমেন্টের বান্ডিল নিয়া। বেচারারে দেখা পর্যন্ত দিতে পাল্লাম না। এক ছুড ভাইয়ের কাছে ডকুমেন্টগুলান দিয়া আরিফ বিদায় নিল। আমি সময় থেইক্কা ৫০০ টেকা লইয়া ফেরত আসলাম ক্যাম্পাসে।

মেইল চেক কইরা দেখি সুফিয়ান ভাই আমারে নওশের ভাইয়ের পাঠানো ফটো এবং ৮ এপ্রিলের ফটোগুলান মেইল করছে। ওইগুলা নিয়া আইলাম স্টুডিওতে। তখন সন্ধ্যা, কইলাম- ভাই আর্জেন্ট ১৫ কপি পুষ্টার সাইজ ছবি প্রিন্ট দিমু। দোকানদার আমারে উদাস গলায় কইলো, পরশুদিন আইসা লইয়া যাইয়েন। আমার তখন মাথায় বাশ, কয় কি? আমি কইলাম ভাই- আজকের মধ্যেই লাগবো। অবশেষে মুলামুলি কইরাও যখন কাম হইলো না, তখন কইলাম- ভাই এইগুলান সাগর-রুনির ফটো। কালকা আমরা একখান প্রতিবাদ কত্তাসি। না হইলেই না।

এইবার দোকানদার উলটা আমারে ফাপড়। তা মিয়া আগে কইবেন না? আটটায় দোকান বন্ধ হইয়া যায়। কিন্তু আমি রয়েল তেহারির দোকানে আপনার ছবিগুলা দিয়া যামু। আপনে রাইতে নিয়া যাইয়েন। আমি তখন বিষ্মিত। ধন্যবাদ জাতীয় কিছু কইতে ইচ্ছা করলো না। বাইর হইয়া আইলাম।

ইতিমধ্যে শুধু আইরিন আপুরে ফুনে একটু আভাস দিয়া রাখলাম। কিন্তু তখনো আমি সিওর না, কনফিডেন্স পাইতাসিলাম না। ফুন দিলাম ব্লগার মাহাবুবরে। আমারে সে যে সাহস দিল, তাতে জেদ চাইপা গেল। কইরাই ছাড়ুম। পারলে ঠেকা।

ছবির হাটে গেলাম। প্লেসটা বুকিং দেওয়া নিয়া পড়লাম ফাপড়ে। খালি নাই কালকা, কোন একটা অনুষ্ঠান নাকি আছে। পরে বিপদ থেকে উদ্ধার করলেন চারুকলার প্রাত্তন ছাত্র, বর্তমানে ডেইলী সানের সংবাদকর্মী নিলয় ভাই। তিনি আমাকে আশ্বাস দিলেন, সাহস দিলেন। সুফিয়ান ভাই রাত সাড়ে এগারোটার দিকে ফোন দিয়ে কাজ কর্মের খর নিলেন গম্ভীর কন্ঠে। ফোন ছাড়ার আগে বললেন,’সোহেল, আমি আপনার পরে এতো প্রেশায় দিয়েছি বলে আমার পরে রাগ করেন নি তো। আমি সত্যি মনঃকষ্টে আছি যে আপনার সাথে পর্যাপ্ত সাহায্য করতে পারলাম না।’

বরাবরের মতো এবারো কিছুই বলতে পারলাম না।এতো ভালবাসা, কৃতজ্ঞতা আমার মত হতভাগা কই রাখবো? চোখে জ্বালা কত্তে লাগলো।

যাক, পরে একফাকে দুঃসাহস কইরা দিলাম পোষ্ট “প্রিয় ব্লগার, আসছেন তো ছবির হাটে?” রাইতে ছবি সংগ্রহ কল্লাম। দুইডা খাইয়া টিএসসিতে বইতেই আইরিন আপুর ফোন। ভরসা বাড়তে লাগলো। কাজ কাম গুছায়া লইতাসি, রাইতে ১ টার দিকে ফোন দিলেন জাগো বাহে জাগো। দশ বারো মিনিট ধইরা পরামর্শ, সাহস আর উৎসাহ পাইলাম। বিনিময়ে চাইলাম পূর্ণ সহায়তা। সহজেই পেলাম।

রাত তিনটার পরে কাজ সাম আপ কইরা গোসল দিলাম। সকালে অ্যালার্ম দিয়া শুইলাম। এট্টু পর দেখি ‘উনি’ ফুন দিসেন। কিছুই কইলেন না, শুধু প্রশ্ন করলেন সারাদিন কি কি করলাম। আমি মিনমিন করে বললাম। বান্ধবী আমারে তেমন কিছু কইলো না, ঠান্ডা স্বরে কইলো ঘুমাও। সকালে উঠতে হবে না? ঘুমাও, যাও। আমি বোকার মতন কিছুক্ষন চিন্তা কত্তে কত্তে ঘুমায়া পড়লাম।

সকালে ঘুম ভাঙ্গলো ব্লগার মাহবুবের ফোনে। তাড়াতাড়ি সব গোছায়া ছবির হাটে গিয়া দেখি সুফিয়ান ভাই সহ ওরা আমার জন্য অপেক্ষা কত্তাসে। অনুশোচনা হলো। ঝটপট কাজে নেমে পড়লাম। নওশের ভাই সহ একে একে সবাই এলো, হাসি আনন্দের মধ্যে দাঁড়িয়ে গেল সুন্দর একটা সেট।

আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখি অদ্ভুত নীল। দর্শনার্থীদের জন্য রাখা কাগজে প্রথম মন্তব্য করলেন একজন বৃদ্ধ। পেশা খুব সম্ভবত দিন-মজুর। তার ভাঙ্গা ভাঙ্গা হাতের দূর্বল হাতে তিনি লিখেছেন তার ক্ষোভের কথা। দূর থেকে আমি তাকিয়ে দেখছি। খেয়াল করনি কখন যেন পাশে এসে দাড়িয়েছেন সুফিয়ান ভাই। কিছু বললেন না, কাধে হাত রেখে আমার মত তিনিও তাকিয়ে রইলেন। আমার মোবাইল ফোনে এসএমএস এর শব্দে ঘোর ভাংলো।

বান্ধবী ম্যাসেজ় দিসে, “এই যে মশাই, আপনি যা করছেন তার জন্য আপনার ভবিষ্যত একশোটা অপরাধ অগ্রীম মাফ! এখন প্লিজ ফোন দিওনা, আমি অফিসে ব্যস্ত। অনেকগুলো মুমু… ”
আমি বুকের বামপাশে হাত দিলাম। হৃদয়ের স্পন্দন নিলাম আঙ্গুলে। ভাবলাম, জীবন বোধহয় সত্যিই অন্নেক সুন্দর। আমার সামনে তখন সাগর ভাই, রুনি আপার ছবি। ছবিতে রুনি আপার কোলে ছোট্ট মেঘ, মেঘের মুখে দুষ্টু মিষ্টি হাসি। ওদের ছবি যেন হঠাৎ জীবন্ত হয়ে উঠলো। একরাশ ঘৃণা ছুড়ে দিয়ে গেল আমাদের এই ঘুনে ধরা ‘চোর-পুলিশ’ খেলার রাজনীতিকে।

ততক্ষনে আকাশেও মেঘ জমেছে। আজ ‘মেঘ’ ফেটে জল ঝরার সম্ভবনা আছে। সিদ্ধান্ত নিলাম, বৃষ্টি হলে ভিজবো। কারন, আজ ওদের নির্মম হত্যাকান্ডের ৭০ তম দিনে, ওদের ছবির সামনে দাঁড়িয়ে,পাচ বছর বয়সী মেঘের কথা চিন্তা করে দু ফোটা ‘অক্ষম’ চোখের জল একমাত্র বৃষ্টিতেই লুকোনো সম্ভব। খুনিদের ধরতে ১৬ কোটি মানুষের দু ফোটা করে হলেও বত্রিশ কোটি অশ্রুফোটাও কি যথেষ্ট নয়, মাননীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী মহোদয়???