ক্যাটেগরিঃ ফিচার পোস্ট আর্কাইভ, সেলুলয়েড

 

‘আমি এক অস্থির পৃথিবীতে আছি
এক মুহূর্তও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারি না।
যে অগণন যন্ত্রণায় পৃথিবী জর্জর
তার নিরসনে বাস্তব উপায় খোঁজো,
অস্থিরতা নয়, পৃথিবীকে ভালোবাসাই
জীবন্ত গ্রহের মুখবন্ধ।’
— (বুদ্ধদেব দাস গুপ্ত)

শব্দ দিয়ে ছবি আঁকা যেমন কবিতা, ছবি দিয়ে শব্দ তৈরি করে ফিল্ম। পাঠক যেন শব্দের বুনটে আঁকা দৃশ্যটিকে প্রায় ছুঁতে পারছে এমনভাবে শব্দ দিয়ে পাঠকের সামনে ঠিক ঠিক দৃশ্যকল্প উপস্থাপন করাই একজন কবির সার্থকতা ও যোগ্যতা। আর শুরুর দিকে সিনেমাতে ছবি পরম্পরার মধ্য দিয়েই কেবল দর্শকের সামনে এর বার্তা তুলে ধরা হতো। ‘ব্যটলশিপ পটেমকিন বা গোল্ডরাশ’— এমনই দুটি চলচিত্রের নাম। কিন্তু শুরুর অল্প কিছু দিনের মধ্যে এধরনের সিনেমার কথা পুরোপুরি ভুলে যেতে হয়। এসময় সংলাপসহ ধীরে ধীরে এর সঙ্গে যুক্ত হয় শিল্পর আরো চৌশট্টিটি কলা। শব্দের সঙ্গে যুক্ত হয় কাহিনী, সংবাদ, সংগীত, নৃত্যকলা, চিত্রকলা, সাহিত্য, নাটকের নাটকীয়তা, ক্যামেরার বিভিন্ন কারসাজি, রঙের খেলা, আলো-ছায়ার ব্যবহার ও এডিটিং-এর নানা কলাকৌশল, বিজ্ঞানের নানান জটিল আবিষ্কার। মোটকথা চৌষট্টি কলার সকল কলার সংমিশ্রণে তৈরী হয় সম্পূর্ণ নতুন ও অসম্ভব শক্তিশালী একটি ভাষা। তবে এই কথা বলতে শেখাটাই ছিল ফিল্মের উত্তরণের বড় একটি ধাপ। আগে যেখানে ছবি মাধ্যমে বক্তব্য তুলে ধরা হচ্ছিল সংলাপ যুক্ত হবার পর তা এতো বেশী গল্প বলাও শিখল যে সেখানে ছবি তার আগেকার নিজস্বতা অনেকটাই হারিয়ে ফেলল। দর্শকরা যেন ধরেই নিলেন সিনেমা বুঝি সাহিত্য পাঠের বিকল্প কোন মাধ্যম। ফলে কবিতা ও সাহিত্য পাঠে নিজস্ব দৃশ্যকল্প দাঁড় করাবার কল্পনা চর্চার সঙ্গে পাঠকের বিচ্ছেদ শুরু হলো। তবে এখানে একটি কথা বলে রাখা দরকার, সে সময় কেউ কল্পনা করেননি স্বল্প দৈর্ঘ্যের তথ্যচিত্রের সীমানা অতিক্রম করে চলচিত্র কখনো কাব্য উপন্যাস নাটক বা নৃত্যের সঙ্গে তুলনা করবার মতো স্বতন্ত্র একটি শিল্প হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে।

07_Boishakhi+Mela_Bioscope_Md+Pramanik_170417_0009

অন্যদিকে সত্যিকারের যোগ্য পরিচালকেরা তাদের গল্পকে ঠিক লিখিত-গল্পের কাঠামোতে ধরে রাখেননি। বরং দৃশ্যের সঙ্গে দৃশ্যের সমরূপ বা বিপরীত সম্পর্ক গড়ে তুলে তারা একে ছবির ভাষায় সাজিয়ে নেন। আর ছবির এই ভাষা খুঁজে নিতে কতটা দেরি হতে পারে আমাদের চলচ্চিত্রের ইতিহাসই এর প্রমাণ বহন করছে। বলা যেতে পারে ‘পথের পাঁচালী’র আগে উপমহাদেশে পুরোমাত্রায় চলচ্চিত্রের নিজস্ব কোন ভাষাই তৈরি হয়নি। এসময় এখানকার লোকেরা ফিল্মের মাধ্যমে কথা বহুল গল্প শুনবার একপ্রকার সাহিত্যরীতিতে অভ্যস্ত থাকায় তাদের কাছে এটিকে মনে হয়েছিল নিছক গ্রাম্য জীবনের কোন ডকুমেন্টরি। ‘অপরাজিত’-এ এই ধাক্কা ছিল খানিকটা বেশী। আগের সিনেমাটিতে তবু প্রকৃতিক সমারোহ, গ্রামীণ স্মৃতিকারতরা, শৈশবের সরলতার মতো বেশকিছু উপাদান ছিল, সেই তুলনায় সাধারণ দর্শকদের কাছে এটিকে অনেক শুকনো ঠেকে। ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’য় এসে লিখিত গল্পের বাইরে গিয়ে তুলে ধরা হয় এমন কিছু দৃশ্য যা থেকে সত্যজিত হয়ত এমন ঈঙ্গিত করেছেন যে প্রকৃতির ঐশ্বর্যের মাঝে বসবাস করেও মানুষের সঙ্গে এর যোগসূত্রের অভাব রয়েছে। যেমন : নিউক্লিয়ার পরীক্ষার কারণে পাখিরা আর ফিরে আসবে না জগদীশের এমন ভয় প্রকাশ করবার পরপরই, তাকে একটি পাখির ডাক শুনে পা টিপে টিপে এগিয়ে যেতে দেখা যায়। বা লাবণ্যের একা একা বেঞ্চিতে বসে হঠাৎ গেয়ে ওঠা কিংবা বায়নোকুলার হাতে জগদীশের পাখি খুঁজে বেড়ানো, ইত্যাদি।

চলচ্চিত্রের সঙ্গে কথাবার্তা যুক্ত হবার কারণে সহিত্যের তুলনায় এর সুবিধা অনেক বেড়ে যায়। সাহিত্য যেহেতু পড়তে হয় তাই সাক্ষর লোক ছাড়া সাহিত্যের মুদ্রিত চেহারা সবার কাছে পৌঁছে না। অপর দিকে সাক্ষর-নিরক্ষর নির্বিশেষে চলচ্চিত্র সবার নাগাল পেতে সক্ষম। এর প্রভাবও অনেক বেশী বিস্তৃত। প্রভাব ও বিস্তারের দিক দিয়ে নিঃসন্দেহে চলচ্চিত্র অন্যসব শিল্পের থেকে এগিয়ে। কথা সাহিত্যের পাঠক ও চলচ্চিত্রের দর্শক এই দুয়ের মাঝে পার্থক্য হলো— সিনেমা দেখার সময় চিত্র-আখ্যানের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একজন দর্শক তার সকল সম্পর্ক, স্মৃতি ও দৃশ্য থেকে বিছিন্ন হয়ে হলের অন্ধকারে ছবিটির সীমাবদ্ধ একটি জগতে অবস্থান করেন। কিন্তু সাহিত্য পাঠকের চরিত্র পুরোপুরি আলাদা। নিজের অনেক ধরনের স্বাধীনতাকে আঁকড়ে থেকেই তিনি বই পড়েন। লেখার মধ্য দিয়ে লেখক কল্পনার যে জগত রচনা করেন প্রতিটি পাঠক আলাদাভাবে নিজের কল্পনা দিয়ে তা গড়ে নিতে পারেন। তাই কোন একটি উপন্যাসের পৃথিবী আর সেই উপন্যাসের কোন একজন পাঠকের পৃথিবী কখনই হুবহু এক নয়। বলা যেতে পারে সত্যজিৎ রায় ‘পথের পাঁচালী’ উপন্যাসে পাঠক হিসেবে তার যে পৃথিবী নিজের জন্য রচনা করেছিলেন, তারই একটি সেলুলয়েড মুদ্রণ তিনি উপন্যাসের পাঠক এবং অন্যান্য দর্শকদের জন্য রেখে গেছেন। তাই বলা যায়, চলচ্চিত্রে এসে তার একটা জগত সম্পূর্ণ স্থায়ী এবং অনড় হয়ে রইল দর্শকদের জন্য। অপরদিকে সাহিত্য পাঠকদের সেই জগতটি কখনই অনড় আর সুনির্দিষ্ট নয়, সেখানে নানা সময়ে নানান জগত গড়ে তুলবার সুযোগ থেকে যায়।

তাছাড়া উপন্যাস পড়বার সময় পাঠকের চারপাশে চেয়ে দেখবার সুযোগ রয়েছে। এখানে সে তার নিজস্ব জগত থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয় না, দিন হলে আলো ঝলোমল পরিবেশ তার হাতের কাছেই থাকে। এবং রাতের অন্ধকারেও সে তার পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যান না। এদিক দিয়ে চলচ্চিত্রের সঙ্গে দর্শকের সম্পর্ক অনেক নিবিড় ও ঘনিষ্ঠ। কারণ চলচ্চিত্র খানিকটা জোড় করে কোনকিছু চাপিয়ে দেবার মতো। ফলে ভাল চলচ্চিত্রর সময়-ঘনত্ব ও তীব্রতা অনেক বেশী, অন্যদিকে উপন্যাসের স্বাদ আস্বাদনে পাঠকের সেচ্ছাধীন কল্পনার সুযোগ লাভ করে থাকে। এপ্রসঙ্গে মার্গারেট কেনেডি তার ‘দ্য ম্যাকানাইজড মিউজ’ প্রবন্ধে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি মন্তব্য করেছেন : ‘Nobody had gone so far as to suggest that talking films might kill the circulating liberty.’

তারপরও আমাদেরকে একথা স্বীকার করে নিতে হবে যে, চলচ্চিত্র ও সাহিত্যের মাঝে সব সময়ই একটা অনুবাদ সম্পর্ক বিরাজ করবে। এই অনুবাদ এক ধরনের রূপান্তর। এই অনুবাদ যেমন শিল্পকে তাদের একে অপরের কাছ থেকে আলাদা করে তেমনি লেনদেনের মাধ্যমে পরস্পরকে সমৃদ্ধও করে। উপন্যাস বা গল্প থেকে যেমন নাটক হয় তেমনি নাটক থেকে উপন্যাস, আবার চলচ্চিত্রও হতে পারে। লোকে কেবল গল্প শুনে তৃপ্ত থাকতে চায় না, সে গল্পটি দেখতেও চায়। নাটক যেভাবে তাকে গল্প দেখায়, চলচ্চিত্রও তার সামনে আলাদাভাবে গল্পকে উপস্থাপন করে। লেখকের গল্পটি বর্জন ও যোগের মাধ্যমে চিত্রনাট্যের মধ্যদিয়ে অনূদিত হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত চিত্রনাট্য অনুসারে হুবহু ছবিটি তৈরি হয় না। শুটিং-এর বিভিন্ন পর্যায়ে অপ্রত্যাশিত অনেক ঘটনার কারণে চিত্রনাট্যের অনেক জায়গাতে পরিবর্তন আনতে হয়। এ প্রসঙ্গে আন্তোনিওনি বলেছেন : ‘I compose my scenes from behind the camera.’ তবে সবাই তার মতো এতটা না করলেও ক্যামেরা বদ্ধ চোখ চিত্রনাট্যকে বদলে দিতে পারে। আর শেষ বার এই পরিবর্তন সংগঠিত হয় কাঁচি-হাতে বসে থাকা সম্পাদকের টেবিলে।

প্রতিদিন দর্শক কত ছবিই তো দেখছেন। এর বেশীর ভাগই তারা প্রেক্ষাগৃহ থেকে বেরুবার পরপরই পুরোপুরি ভুলে যান। কিন্তু এদের যদি এমন দশটি ছবির তালিকা করতে বলা হয় যা তারা নির্জন কোন দ্বীপে নির্বাসনে যাবার সময় নিয়ে যেতে চান তাহলে এমন কতগুলো ছবির নাম তাদের কাছ থেকে পাওয়া যাবে যার আবেদন চিরস্থায়ী। অপর্ণা সেন-এর এই তালিকাতে প্রথমেই আছে ‘দ্য গোল্ড রাশ’ ছবিটি। এই ছবির নায়ক চার্লি চ্যাপলিন প্রায় সবার কাছেই পরিচিত। এই ছবির শুরুতে এক দল ছেলে মেয়েকে মুখে সাদা পাউডার মেখে মাইম শিল্পীদের মতো টেনিস খেলায় অংশ নিতে দখা যায়। যাদের হাতে কোন টেনিস ব্যাট নেই, নেই বলও। তবু কল্পিত গতি অনুসরণ করে অন্তিম মুহূর্তে অনিবার্যভাবে নায়ক টমাসকেও খেলায় অংশ নিতে হয়। এভাবেই কৌতুকের মাধ্যমে এতে রূঢ় বাস্তবতা ও লিরিসিজম ফুটিয়ে তোলা হয়। এর পরেই রয়েছে আকিরা কুরোসাওয়ার ‘রশোমন’। এই ছবির চারটি চরিত্রে পরস্পর বিরোধী অথচ সমানভাবে সত্য চারটি বিবরণ উপস্থাপনের মাধ্যমে পরিচালকে সত্যের প্রকৃতির প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে দেখা যায়। সামুরাই মাচিকো কিয়ো বনের পথে যাবার সময় দস্যু তাজোমারু তার সুন্দরী স্ত্রী মাসাকাকে কে ধর্ষণ করে। পরে বনের ভেতর নিহত সামুরাইকে আবিস্কার করেন এক কাঠুরে। সত্যিই কি মাসাকাকে ধর্ষণ করেছিল দস্যু না মেয়েটিরও তাতে সায় ছিল? কে খুন করল সামুরাইকে? দস্যু তাজোমারু না তার স্ত্রী? নাকি অপমানের জ্বালা সইতে না পেরে মাচিকো নিজেই স্ত্রীর ছুরিটি নিজের বুকে বিদ্ধ করেছে? দস্যু তাজোমারুকে বেঁধে আনা হয় বিচারকের সামনে। মাসাগোকে পালিয়ে আশ্রয় নিতে দেখা যায় এক মন্দিরে। কাঠুরে সেই অপরাধ দৃশ্যের সাক্ষী। চতুর্থ জন নিহত মাচিকো। তার বক্তব্য জানতে পরিচালক একজন মিডিয়ামকে বিচারালয়ে হাজির করেন। সমাজ সংসার বিচ্ছিন্ন নির্জন পাহাড়ি বনের আলো আঁধারিতে কোনটা ন্যায় আর কোনটা অন্যায় কে বলে দিবে। সব সত্যাসত্য পালাতক আলো ছায়ার মতই সেখানে অনিত্য। আর এভাবেই রশোমনের অসামান্য সম্পাদনা সম্মোহিত দর্শককে ভাব থেকে ভাবান্তরের মাঝে নিয়ে যায়। শেষ অবধি জানা যায় না কে সত্য বলল বা কে মিথ্যে। এতসব ছাপিয়ে এর মানবিকতাকেই পরিচালক গুরুত্বপূর্ণ করে তোলেন।

এক-একটি ছবির আবেদন এক-এক রকম। বিষয়বস্তুর ঐক্য থাকলেও ‘রশোমন’ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন স্বদের ছবি মিকেলাঞ্জেলো আন্তোনিওনির ‘ব্লো-আপ’। চিত্রকল্পের দিক দিয়ে উন্নত ‘প্যাসেঞ্জার’-এর মতো একই পরিচালকের মনোগ্রাহী আরো অনেক ছবি থাকার পরও গভীরভাবে নাড়া দেবার ক্ষমতার কারণে অপর্ণা সেনের নির্জন দ্বীপে যাবার এই তালিকাতে ‘ব্লো-আপ’ ছবিটিকে ঠাঁই পেতে দেখা যায়। এর দৃশ্যগত আবেদনের চেয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক আকর্ষণই এর মূল কারণ। পার্কে ছবি তুলতে গিয়ে একজন ফটোগ্রাফার অজ্ঞাতে একটা খুনের ছবি তুলে ফেলেন। ডার্করুমে সেই ছবি ব্লো-আপ করতে গিয়ে প্রথম ব্যপারটি লক্ষ্য করে সে। তারপর শুরু হয় অনুসন্ধিৎসা। ব্লো-আপ করতে করতে একপর্যায়ে ছবিটি ফুটকিময় হয়ে অর্থ হারিয়ে ফেলে। পরদিন মৃত দেহটিও পার্কে পাওয়া যায় না। হাতে ছবি থাকার পরও এভাবে সত্য হারিয়ে যায়।

এ ধরনের জীবন জিজ্ঞাসার প্রসঙ্গে ইঙ্গমার বার্গম্যান-এর নাম আসা খুবই স্বাভাবিক। তার ছবিতে রূপকের ব্যবহার ছাপিয়ে এধরনের জিজ্ঞাসার চেহারা আরো স্পষ্ট। তার সেরা সৃষ্টি ‘দ্য সেভেনথ্ সিল। এই ছবিতে ক্রুসেড ফেরত এক নাইটকে সাগরের ধারে বসে মৃত্যুর সঙ্গে দাবা খেলতে দেখা যায়। অপর দিকে প্লেগের ভয়ে ভুতগ্রস্থের মতো সবাই পালিয়ে বেড়াচ্ছে। ডাইনি সন্দেহে পুড়িয়ে মারা হচ্ছে অসহায় এক কিশোরীকে। তার পাশে কালো পোশাকের যাযক মুখ ফেরাতেই দেখা যায় সে-ই স্বয়ং মৃত্যু। প্লেগ এই মৃত্যুর প্রতীক। সেখানে নিজেদের ভালোবাসার আশ্রয়ে নিরাপদ কেবল জফ্, তার স্ত্রী মিয়া জফ্ ও তাদের শিশু পুত্র। ছবির অন্তিম দৃশ্যে ক্যরাভানে চেপে দূরে চলে যাবার সময় দিগন্ত রেখা বরাবর জফ্ কতগুলো ছায়ামুর্তি দেখতে পায়। ওখানে মৃত্যুর সঙ্গে হাত ধরাধরি করে তার আগেকার সঙ্গীরা সবাই নাচতে নাচতে অন্ধকারের দেশে হারিয়ে যাচ্ছে। জীবনের অর্থ অজ্ঞাত, মৃত্যু থেকে কারো মুক্তি নেই, পৃথিবীতে ভালোবাসা ও সারল্য আছে বলেই বেঁচে থাকা এতো সুন্দর—এসবই এই ছবির অন্তনিহিত বক্তব্য।

বার্গম্যান-এর অসামান্য নাট্যশৈলী দেখতে পাওয়া যায় তার একেবারে ভিন্ন স্বাদের ছবি ‘মাইলস অব এ সামার নাইট-এ। তিনি নিজে একে কমেডি বলে অবিহিত করলেও এটি আদৌ কমেডি না কাব্য তা নিয়ে ভাবার যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে। এর ফেনিল সুতোর মতো এগিয়ে চলা নির্ভার লঘুতার নাটকের গতি আট জন নারী পুরুষের প্রেম-অপ্রেমের জটিলতার গল্প ফুটে ওঠে। তবে ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে গেলে, এই ছবির আগেই নাম আসতে পারে জ্যঁ রেনোয়ার ‘দ্য রুলস অব দ্য গেম-এর। একদিনের ঘটনা প্রবাহের ওপর ভিত্তি করে নির্মিত এই ছবিতে ফুটে উঠেছে ফরাসী উচ্চবিত্তদের অবক্ষয়ের চেহারা।

এই তালিকাতে আসতে পারে ফ্রেদেরিকো ফেলিনির ‘অ্যামারকর্ড’ ছবিটি। এতে ফ্যাসিজমের হাস্যকর দিকটি অসাধারণ কৌতুকবোধের সঙ্গে তুলে ধরেছেন পরিচালক। কিসোলস্কির অসামান্য ছবি ‘এ শর্ট ফিল্ম এবাউট কিলিং ও এই তালিকা থেকে কিছুতেই বাদ পড়া উচিত নয়। এই ছবির দুই নায়কের একজন তরুণ আইনজীবী। স্বপ্ন আর আদর্শের ইমারতে সে আইনকে হাতিয়ার করে পৃথিবী থেকে চির তরে মুছে ফেলতে চান মৃত্যুদণ্ডের মতো বিভিষিকাময় বিধি। তার সব ব্যর্থতার পরও, মানবিকতার বিচারে ছবিটি সব দিক দিয়ে সফল।

যে চলচ্চিত্রকারের প্রভাব আমাদের জীবনে সবচেয়ে গভীর, কেবল ভূগোল বা ইতিহাসের বিচারেই নয়, হৃদয়ের দিক থেকেও যিনি আমাদের অনেক কাছের তার ছবি এই তালিকার জন্য বাছাই করতে গেলে নিঃসন্দেহে সমস্যার মোকাবেলা করতে হয়। তবে কৌতুক বোধ, উষ্ণতা, প্রাণপ্রাচুর্য ও কাব্যিকতার বিচারে তার ‘অপুর সংসার’ সামান্য হলেও তার অন্য সব ছবির থেকে এগিয়ে। যদিও ভবঘুরের জীবন কাহিনিই এই ছবির মূল কথা। এই ছবিতে অপুর জীবনের তিনটি অধ্যায় দেখতে পাওয়া যায়— প্রাক-অপর্ণা পর্ব; অপু-অপর্ণার দাম্পত্য জীবন; অপর্ণার মৃত্যুর পর অপুর নিঃসঙ্গতা ও বৈরাগ্য। প্রথম ভাগে অপু একা হলেও নিঃসঙ্গ নয়; দরিদ্র হলেও জীবন বিমুখ নয়; বেকার হলেও কেরানিগিরি করবার মানসিকতা নেই।

অপুকে একবার লিখতে দেখা যায় “মুক্তি চাই”। ‘অপরাজিত’-র অপুও মুক্তির স্বাদ পেয়েছিল মায়ের মৃত্যুতে। তবে এই দুই মুক্তিই গভীর অর্থবহ। বিশাল সমুদ্রের তীরে আর গহন অরণ্যের গভীরে রাবিন্দ্রিক চেহারার ভ্রম্যমান অপুকে আমরা দেখতে পাই। রবিন্দ্রনাথের মিস্টিক জীবনাদর্শে প্রভাবিত বিভুতিভুষণ এবং সত্যজিত তাদের কেন্দ্রীয় চরিত্রকে শান্তির খোঁজে প্রকৃতির এমনই উন্মুক্ত প্রান্তরে এনে দাঁড় করিয়েছেন। অপর্ণার সঙ্গে পরিচয় পর্ব অপুর জীবনের সহজ সুপ্রযুক্ত আদর্শ একটি দিন। এই একটি দিন থেকে দর্শক অপু চরিত্রের ইতিহাস জানতে পারে। ‘অপরাজিত’ ‘পরশ পাথর’ ও জলসা ঘর’ সিনেমার হবার পর অপুর জীবনালেখ্যর ধারাবাহিকতায় যে ছেদ পড়েছিল তা ‘অপুর সংসার’-এ পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করবার দরকার ছিল। তাই বুঝি এই সিনেমার অপুর বাস রেললাইনের ধারে। ট্রেনের হুইসেলে তার ঘুম ভাঙ্গে। ‘পথের পাঁচালী’ ও ‘অপরাজিত’-এর ট্রেনের থিম এখানে অক্ষুন্ন। ফুলসজ্জার রাতে সে অপর্ণাকে বলে— ‘দশ বছর বয়সে বাবা মারা গেলেন, সতেরোতে মা। একটি বোনও ছিল। দিদি।’ তখনই আমাদের ‘পথের পাঁচালী’র দূর্গা আর ‘অপরাজিত’র সর্বজায়ার মৃত্যুর কথা মনে পড়ে যায়। বিচ্ছেদ কত আসন্ন, ‘অপুর সংসার’ কত ক্ষণস্থায়ী তা বোঝাবার জন্যই বোধ হয় অপু-অপর্ণার দাম্পত্য জীবনকে এতো মধুর সঙ্গীতময় করে উপস্থাপন করা হয়েছে সিনেমার একান্ত নিজস্ব ভাষায়। এই ভাষার প্রয়োগ পুরো ছবির কাহিনি বিন্যাসকে আরো বাঙ্ময় করে চোখে দেখাকে অতিক্রম করে প্রতিটি দৃশ্যের চিত্ররূপকে চেতনার উদ্ভাসে পৌঁছে দেয়।

অনেকের কাছে অপ্রিয় হলেও ইতিহাস বলে, বিরাট কোন সাহিত্য কীর্তিকে সিনেমায় রূপায়িত করার পেছনে একটা সম্মান কাজ করে। বিশ্বের বেশীর ভাগ মানুষ হোমার, শেক্সপিয়র, ডিকেনস, গোর্কি, দস্তয়েভস্কি, টলস্টয়, ব্যালজাক, হুগো, মোপাসাঁসহ বিখ্যাত লেখকদের লেখা পড়তে অক্ষম। কিন্তু সিনেমার মাধ্যমে এঁরা সবাই সাধারণের কাছে পরিচিতি অর্জন করেছে। এখানেই সিনেমার অহংকার। একজন পরিচালকের চোখে সাহিত্যিকের সৃষ্টি বৈচিত্যময় চরিত্র, বিষয়বস্তু ও পরিবেশকে অভিনব বলে মনে হলে তা নিয়ে ছবি করতে ক্ষতি কী। ইতিহাসের পাতাতেও কিন্তু এধরনের কোন ক্ষতির কথা লিখা নেই। সফল ছবি সব সময় ছবি হিসেবেই সমাদৃত হয়ে এসেছে। ছোট একটি তালিকার দিকে তাকালেই তা বোঝা যাবে। ১৯৩৯-এ একাডেমি পুরস্কারের জন্য মনোনীত কেবল একটি ছাড়া সব ছবিই ছিল বিশ্বসাহিত্য থেকে তৈরি। ‘উদারিং হাইটস’, ‘দ্য উইজার্ড অব ওজ’, অব মাইস এন্ড ম্যান’, ‘গুডবাই মিস্টার চিফ, এবং ‘গন উইদ দ্য উইন্ড’। এর প্রতিটি ছবিতে লেখকের আড়ালে পরিচালক তার বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন। কেবল সংলাপেই নয় বরং আলো-ছায়ায় ছবি এঁকে, বহিদৃশ্যে, গৃহ-কোনে সবত্রই এই বক্তব্য দেখতে পাওয়া যায়। অতীত বর্তমান সব সময়ই লেখকরা চেয়েছেন তাদের লেখা নিয়ে সিনেমা হোক। কারণ তারা জানে লোকে পড়ে কম, কিন্তু বেশী বেশী সিনেমা দেখে। তাই বিগত শতাব্দীর মাঝের ইতিহাসের পাতা টুকু সাহিত্য আশ্রিত ছবিতে ভরে উঠতে দেখা যায় : ‘দ্য ওয়ে অব অল ফ্লেম’, ‘অল কোয়ায়েট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফন্ট’, এ্যরো স্মিথ’, ‌এ ফেয়ার ওয়েল টু আমস’, ‘ডেভিড কপারফিল্ড’, ‘দ্য ইনফরমার’, ‘এ মিডসামার নাইটস ড্রিম’, ‘দ্য গ্রেপস অব রথ’, ‘ফর হুম দ্য বেল টোলস’, ‘হ্যামলেট’, ‘গ্রেট একসপেকটেশানস’ ইত্যাদি।

তবে এসব ছবি করবার পেছনে প্রযোজকদের একটি উদ্দেশ্য ছিল। তারা দেখলেন তাদের দর্শকদের সবটাই শিক্ষত মধ্যবিত্ত। তারা পরিশিলিত সিনেমা দেখতে চান। মারামারি হানাহানি রক্তরক্তি তাদের পছন্দ নয়। যৌনতা তো নয়ই। তারা পরিবারের সবাইকে সঙ্গে নিয়ে দর্শক হিসেবে নির্জলা বিনোদন উপভোগ করতে চান। সে আনন্দ কেবল চিরায়ত সাহিত্যের পক্ষেই সরবরাহ করা সম্ভব। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের পর বিশ্ব জুড়েই এই বাস্তবতা বদলে যায়। এসময় গতানুগতিক সাহিত্য আশ্রয়ী সিনেমার বিরুদ্ধে ঝড় ওঠে। এসময় মোরাভিয়ার ‘গোস্ট এট নুন’ উপন্যাস থেকে কাহিনি ধার করে সফল ছবি ‘লে মেপরিস’ নির্মাণের পরও পরিচালক জাঁ-ল্যুক গাদার বলে বেড়ান— বই-এর পাতার পর পাতা ক্যামেরা চালিয়েই কেবল উপন্যাস থেকে ছবি করা সম্ভব। এমনকি এসময়কার ডিসিকা’র বিশ্ববিখ্যাত ছবি ‘বাইসাকেল থিবস’-এর কাহিনি নেয়া হয় লুজি ব্যাটোলিনির লেখা থেকে। এমনকি ফেলিনির বহু ছবিতে পর্যন্ত জেমস জয়েসের চরিত্রের আভাস পাওয়া যায়। সাহিত্য উৎসরিত হলেও এঁরা প্রচলিত পথ ত্যাগ করে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন। বক্তব্য লেখকের হলেও এসব সিনেমাতে ক্যামেরার সাহায্যে নতুন মাত্রা সংযোজিত হয়েছে চরিত্র বিন্যাসে।

বাংলাভাষায় সবাক ছবি ‘চণ্ডীদাস’ প্রথম সফল ছবি। বাংলা আর হিন্দিতে এই ছবি পুরো ভারতবর্ষকে মাতিয়ে রাখে। পরিচালক দেবকী বসু কবি চণ্ডীদাসের কিংবদন্তি-অনুসৃত জীবনী থেকে এই ছবি করেন। শরৎ সাহিত্য বাংলা ছবিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করে। কেবল তাই নয়, ক্রমশ তা বাংলা ছবিকে গ্রাসও করে। তার উপন্যাস যেমন বাঙালির অন্দরমহলে স্থির জায়গা করে নিয়েছিল, তেমনি তার গল্প থেকে তৈরি সিনেমাও মাসের পর মাস প্রেক্ষাগৃহগুলোকে দর্শকে টইটুম্বুর করে রাখত। এসব ছবির কাহিনিকার স্বয়ং শরৎচন্দ্র, সংলাপও তার। তাই পরিচালকের কোন বক্তব্য সেখানে ঠাঁই পেতে দেখা যায় না। এক কথায় এসব শরৎ সাহিত্যের পর্দায় অনুবাদ। এসময় শরৎ সাহিত্যের সাতপাকে বাঁধা বাংলা সিনেমাতে শরৎ অনুসরণে অসংখ্য গল্প আমদানি হতে দেখা যায়। ১৯৪৩-এ এসে পরিচালক বিমল রায় যাবতীয় শাসন-শোশনের মাঝে মধ্যবিত্তের ভূমিকা তুলে ধরে ‘উদয়ের পথে’ নির্মাণের মাধ্যমে বাংলা ছবিতে একটি নতুন মাত্রা যোগ করেন। ৪৫-এর আগে বিশ্বযুদ্ধ তার ভীষণ সংহার অব্যহত রাখলেও, চলচ্চিত্র বিশ্বে তখনও রোমান্টিসিজম বিরাজ করায়, বাংলাও তা থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি। এসময় কলকাতার পরিচালক বঙ্কিমকে টানলেও সুবিচার করতে পারেনি। আর রবীন্দ্রনাথ থেকে যান ধরা ছোঁয়ার বাইরে। কেবল এখানে সেখানে রবীন্দ্র সঙ্গীত ব্যবহারে তাকে প্রনাম জানানোর মতো একটা ভাব। তপন সিংহ-কে তাই ‘কাবুলিওয়ালা’ নির্মাণ করতে গিয়ে ভীষণ চাপের মুখোমুখি হতে হয়। অনেকেই নাক সিঁটকে বলতে শুরু করে দিল রবীন্দ্রনাথ ওতো সোজা নয়।

এ ধরনের পরিস্থিতিতে বাংলা ছবি তাই ধীরে অগ্রসর হয়। বাইরে পরিচ্ছন্ন একটা ভাব থাকলেও ভেতরে ভেতরে চলছিল সেই শরৎ সাহিত্যেরই অনুকরণ। পরিস্থিতি অনেকটাই একঘেয়ে হয়ে আসলে, এ সময় সত্যজিৎ রায় স্বদর্পে হাজির হলেন তার ‘পথের পাঁচালী’ নিয়ে। এর কাহিনি বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শেষ্ঠ সম্পদ। বিভূতিভূষণের সাহিত্যের আলো দিয়ে বাংলা সিনেমাকে চির দিনের জন্য আলোকিত করে গেলেন সত্যজিৎ রায়।

এ পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র ছাড়াও বিভূতিভূষণ, তারাশঙ্কর, বনফুল, প্রেমেন্দ্রমিত্রসহ আরো অনেক দিকপাল সাহিত্যিকদের কাজ নিয়ে অঢেল ছবি হয়েছে। এই বিবেচনায় এক কথায় বলতে গেলে বাংলা সিনেমা ভীষণভাবে সাহিত্য নির্ভর। কিন্তু এই সব সাহিত্যিকদের মূল বক্তব্য থেকে আমাদের বর্তমান চলচ্চিত্র জগত পুরোপুরি সরে এসেছে। বর্তমানে তা একেবারেই জীবনবোধ বিচ্ছিন্ন। এখনকার সবই খুব ভাসা ভাসা। চলমান সময়ের বিজ্ঞান যেখানে কল্পলোক ও বাস্তবকে এক বিন্দুতে মেলাতে ব্যস্ত, ঠিক সেই সময় আমাদের চলচ্চিত্র কেবলই শারীরিক অভিব্যক্তি দ্বারা আক্রান্ত। বোধের কোন ক্রমোন্নতি সেখানে নেই। সবই এখন সমাজ ও শেকড়ের সাথে সম্পর্কহীন। মূল্যবোধহীন সাম্প্রদায়িকতার ধ্বজাধারীরাই এখন সজাগ। বিপন্ন দেশজ সংস্কৃতি ঐতিহ্য বিশ্বায়নের ঢলের কাছে অসহায় ও আক্রান্ত। পশ্চিমা ভোগবাদী সংস্কৃতির দাপট উপড়ে ফেলতে চাইছে আমাদের ঐতিহ্যের শেকড়। শিল্প মাধ্যম বলে সিনেমাও এই অবক্ষয়ের বাইরে নয়। বাংলা মূলধারার সিনেমা এখন চূড়ান্ত অসুস্থ। ‘মানুষ কেন বেইমান’, ‘বাবা কেন চাকর’,সহ কাটপিস সমৃদ্ধ ছবিগুলো এখন শহর-গ্রাম দাপিয়ে বেড়াচ্ছে।

তারপরও এই মানবিক বিপর্যয় না মানার মতো কিছু মানুষও রয়েছে। যারা চিরকালই নতুন এক পৃথিবীর স্বপ্ন দেখতে অভ্যস্ত। সমাজের প্রতি দায়বদ্ধ সচেতন, পরিশিলীত মননের অধিকারি সৃষ্টিশীল মানুষেরাই এই দলের। যারা সব সময়ই শেকড়ের প্রতি টান অনুভব করে থাকেন। ব্যবসায়িক লাভালাভের কথা তুলে রেখে এমন অনেকেই মানবিক বোধের পরিচর্যায় এগিয়ে এসেছেন সুস্থ ধারা চলচ্চিত্র নির্মাণে। আর এদের সংখ্য একেবারেই কম নয়। কবি বুদ্ধদেব দাসগুপ্ত এমনই এক নির্মাতা। তার ‘কালপুরুষ’, ‘নিম অন্নপূর্ণা’ গৃহযুদ্ধ’, ‘ফেরা’, ‘চরাচর’, ‘উত্তরা’ ‘মন্দ মেয়ের উপ্যাখ্যান’, স্বপ্নের দিন’ ‘তাহাদের কথা’ ইত্যাদি প্রায় সব ছবিই সাহিত্য নির্ভর। এই সব ছবিতে দ্বেস, হানাহানি, ধর্মের আফিম থেকে মানুষকে মুক্ত করে সুন্দর এক পৃথিবীর স্বপ্ন দেখিয়েছেন। এছাড়াও তার অনেক ছবিতেই স্থান পেয়েছে লোক সংস্কৃতি।

সম্প্রতি অনেক তরুণ নির্মাতা মৌলিক কিছু করবার চেষ্টা করছেন। তবে তাদের এই প্রচেষ্টাও প্রশ্নবিদ্ধ। তাদের গল্পগুলো কতটা গ্রহনযোগ্যতা পাচ্ছে তা নিয়ে প্রশ্ন করবার যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে। একথা মানতেই হবে, বর্তমানে নির্মাণে যথেষ্ট বৈচিত্র্য এসেছে। পরিবর্তন এসেছে গল্প বলার ঢং-এ। কিন্তু তাদের গল্পটি কি সাধারণ দর্শকের বোধগম্য? এমন অভিযোগ অহরহই শুনতে পাওয়া যাচ্ছে। বাছাই কিছু মানুষের গল্প বলতে গিয়ে সব শ্রেনীর দর্শকদের উপযোগি কোন গল্প আসছে না এমন অভিযোগ অনেকের। শুধু আমাদের দেশেই নয়। আন্তর্জাতিক ময়দানে একটি ছবির লড়ার মূল উপাদান হলো এর মৌলিকত্ব। গল্পকে বলা হয়ে থাকে সিনেমার হৃৎপিণ্ড। যে সিনেমার কাহিনির মৌলিকতা আর নতুনত্ব যত বেশী, দর্শকের কাছে সেটি তত বেশী আকর্ষণীয় হতে বাধ্য। বিশ্বায়নের এমন একটি সময়ে এসেও যেসব সিনেমা দেশে বিদেশে সমাদৃত হচ্ছে, তাঁর মূলে রয়েছে সিনেমার অভিনব কাহিনি বা গল্প। এখন যেমন ভালো গল্পের অভাব দেখতে পাওয়া যাচ্ছে, তেমনি চিত্রনাট্য ও সংলাপসমৃদ্ধ কাহিনিরও অভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এমনকি আগেকার সেই শরৎ সাহিত্য অনুকেরণের মতো, বর্তমানে সিনেমা নির্মাণে মৌলিক কাহিনি বাছাইয়ের চেয়ে বরং নকল ছবির গল্প নিয়ে ছবি বানাবার প্রবণতা আগের চেয়ে বহুগুণে বেড়েছে। এর ফলাফল হিসেবে, ছবি দেখতে গিয়ে প্রচণ্ড হতাশ হচ্ছেন আগ্রহী দর্শক।
একটা সময় ছিল যখন সিনেমার কাহিনি নির্বাচনের পেছনে অনেক সময় আর শ্রম দেয়া হতো। ভিন্ন-ধাঁচের গল্পের জন্য পঠন-পাঠন অনুসন্ধানসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের মাঝে একাধিক মিটিং হতো। সবার পরামর্শ শুনে তারপর গল্প বাছাই হতো। এখন খুব সহজ পদ্ধতিতে বিদেশী বা প্রতিবেশি দেশের বক্স অফিস কাঁপানো কোন ছবির গল্প উল্টেপাল্টে বা একাধিক ছবির কাহিনি জোড়াতালি দিয়ে আনাড়ি হাতে অদক্ষভাবে কাহিনি উৎপাদন করা হচ্ছে। আর ইন্টারনেটের কারণে সাধারণ দর্শকদের কাছে তা গোপনও থাকছে না। কিন্তু তারপরও এধরনের নকলবাজি থেকে বেরিয়ে আসার স্পষ্ট কোন উদ্যোগ বা প্রচেষ্টা সাধারণ দর্শকদের গোচরে আসছে না।

দেশে প্রতি বছর অসংখ্য গল্প উপন্যাস প্রকাশিত হচ্ছে। সেই সঙ্গে আমাদের হাতে রয়েছে সমৃদ্ধ সাহিত্য ভাণ্ডার। তার কতটি সিনেমা পর্যন্ত এসে ঠেকছে এই প্রশ্নের উত্তর আমার জানা নেই। কিন্তু উল্লেখযোগ্য হারে যে হচ্ছে না তা বর্তমান চলচ্চিত্রর কাহিনি দৈন্যতা থেকেই আঁচ করা যায়। এপ্রসঙ্গে দেশের জনপ্রিয় চলচ্চিত্র নির্মাতা কাজী হায়াৎ বলেন, ‘একটা সময় চলচ্চিত্র পাড়ায় সাহিত্যিকদের বেশ আনোগোনা ছিল। এটাই তো স্বাভাবিক। শিল্প-সাহিত্য তো সব একসঙ্গেই থাকবে। সিনেমাও একটি শিল্প। সেই সব সাহিত্যিকেরা এখন হারিয়ে গেছেন। বতৃমানে যারা সাহিত্য রচনা করছেন তারা চলচ্চিত্রের জন্য গল্প লিখছেন না। দেশে সাহিত্যিকের কোন অভাব না থাকলেও সিনেমার জন্য গল্প লেখার মানুষ প্রায় নেই বললেই চলে। আমাদের চারপাশে অনেক শিক্ষিত লোক আছেন। যারা চাইলেই চলচ্চিত্রের জন্য ভালো গল্প লিখতে পারেন। ভালো চলচ্চিত্রের জন্য মৌলিক গল্পের যেমন প্রয়োজন, তেমনি ভালো চিন্তা-চেতনার লেখকেরও প্রয়োজন রয়েছে।’

তবে বাস্তবতা অনুধাবন করতে চাইলে, এর বিপরিত দিক থেকে আসা বক্তব্যও আমাদের জানা প্রয়োজন। এপ্রসঙ্গে গুণী চিত্রনাট্যকার ও গল্পকার মাসুম রেজা বলেন, ‘গল্পের জন্য খুব বেশী বাজেট রাখা হয় না। এখনকার সিনেমার ক্ষেত্রে এটাই বাস্তবতা এবং সত্যি। সবাই যেখানে বলছে একটা গল্পই সিনেমার প্রাণ, সেখানে আমাদের দেশে গল্প লেখকদের সঠিক সম্মানী নেই, সম্মান তো নয়ই। ভালো গল্পের জন্য ভালো পরিবেশ দরকার। কাজের পরিবেশটা একজন শিল্পীর জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তা-না হলে স্ক্রিপ্ট রাইটারের জন্য কাজ করা মানসিকভাবে অনেক চাপের হয়ে দাঁড়ায়। আগে আমাদের অনেক ভালো ভালো স্ক্রিপ্ট রাইটার ছিলেন। তারা অনেক ভালো ভালো গল্প হাজির করেছেন। কিন্তু এদের অনেকেই আবার ক্ষোভ আর অভিমানে এই প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে চলে গেছেন। একটি ভালো গল্প হলে মানুষ সিনেমাটি দেখবেই। সিনেমার ক্ষেত্রে গল্পকে প্রাধান্য দিলে সিনেমা ভালো হবে। আমাদের দর্শক এখন বাণিজ্যিক সিনেমার পাশাপাশি ভিন্নতা চায়। গল্প লিখতে গেলে সেটাও মাথায় রাখতে হবে।’

বর্তমান সময়ের অধিকাংশ সিনেমার গল্প যার হাতে রচিত হচ্ছে, তিনি হলেন আব্দুল্লাহ জহির বাবু। এপ্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমাদের ইন্ডাস্ট্রিতে যে মোটেও মৌলিক গল্প হচ্ছে না, কথাটা কিন্তু ভুল। পাল্টা অভিযোগ কিন্তু আমরাও করতে পারি। দর্শকরা এখন মৌলিক গল্প নিতে চায় না। কারণ মৌলিক গল্পে রসকস কম। যেমন জাজ মাল্টিমিডিয়ার সঙ্গে, ‘দবির সাহেবের সংসার’ নামে একটি মৌলিক ছবির গল্প লিখেছিলাম। আমার জানামতে তাদের অন্যতম লস প্রজেক্ট হয়েছিল ছবিটি। এর গল্পে কিন্তু হিট হবার মতো যথেষ্ট এলিমেন্ট ছিল। কিন্তু দর্শক গ্রহণ করেনি। সে বছরই অন্য আর একটি সিনেমা হিট হয়, যার নাম, ‘হিটম্যান’। এই সিনেমাটি শতভাগ নকল। এখন প্রযোজক আপনাকে কী বলবে, একটি ফ্লপ ছবির গল্প লিখে দিন? প্রযোজক বলবে যে নকল ছবি যদি সুপারহিট হয়, ব্যবসা করে তাহলে আপনি আমাকে বরং নকল ছবিই দিন। সিনেমা যেহেতু একটা লগ্নিশিল্প, টাকা তাকে ফিরিয়ে আনতেই হবে। ইন্ডিয়ার কথাই ভাবুন, তাদের কাছে এখন এটি এমন এক স্টেজে গিয়ে ঠেকেছে যে, গল্পটিকে আগেই পরীক্ষিত হতে হচ্ছে। অন্য কোনো ভাষায় সফল হলে তবেই সেই গল্প নিয়ে ছবি তৈরি করছেন তারা।’
এবিষয়ে কথা বলতে গিয়ে, গত বছরের সবচেয়ে ব্যবসাসফল সিনেমার নির্মাতা অমিতাভ রেজা বলেন, ‘একজন নির্মাতা হিসেবে আমার একটা স্বপ্ন আছে, তা হলো সিনেমা নির্মাণ করা। সেখানে অবশ্যই আমি যা-তা কোনো গল্প নির্বাচন করব না। আমি মৌলিক অদেখা, না শোনা একটি গল্প চাই ও চেয়েছি— সবসময়। কিন্তু সেই গল্পে আমার নিজস্বতা , আমাদের সমাজ , বাস্তবতা থাকতে হবে। আবার সেই গল্পে কোনো জটিলতা ঢুকিয়ে মাথার উপর থেকে নিয়ে যেতে চাইনি। কিন্তু রহস্যে ফেলতে চেয়েছি। সিনেমা হলে বসে দর্শক গল্পটি নিজের মধ্যে ধারণ করবেন, নানা প্রশ্ন করবেন, নিজের মধ্যে উত্তর খোঁজার চেষ্টা করবেন। কারণ দর্শক যদি অদেখা একটি গল্প না পান, তাহলে তিনি বসে থাকবেন না— সিনেমাটি দেখার জন্য। তাই একটি ভালো গল্প নির্বাচনের দিকে আমি বেশী মনোযোগী ছিলাম। আর আমাদের প্রত্যেকেরই উচিত সিনেমায় নিজেদের গল্প বলা, যা একেবারে মৌলিক। আমাদের গল্পের অভাব নেই। আমাদের আছে সমৃদ্ধ সাহিত্য। শুধু পছন্দ করে একটু ঘষে মেজে উপস্থাপন করলেই চমৎকার কাজ হবে। ভালো সিনেমার পূর্ব শর্তই হচ্ছে একটি গোছানো চমৎকার গল্প, যা দর্শক আগে দেখেনি। এই দুর্বলতা অবশ্য এখনকার তরুণ নির্মাতারা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছেন। ইতিমধ্যে অনেক তরুণ ভালো কিছু ছবি নির্মাণ করে জানান দিয়েছেন— তারা আসছে। এভাবেই একদিন আমাদের সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি নিজের পায়ে দাঁড়াবে।’

তবে যে যাই বলুক না কেন, সবার প্রথমে চলচ্চিত্র নির্মাতাদের বুঝতে হবে দর্শক কী বোঝেন, তারা কী চায়, কী-সে তারা সবচেয়ে সন্তুষ্ট বা তৃপ্ত। বাস্তবে দর্শক চান নিটোল প্লট সম্বলিত কাহিনি— তা রোমান্টিকই হোক বা কমেডি কিংবা ট্র্যাজিডি, হোক তা সমসাময়িক বা পৌরানিক অথবা ঐতিহাসিক কিংবা লোকগাথা। দর্শক চায় গতিময় একটি কাহিনি। অনেক সময় কোন হাল্কা গল্পকেও ছুটতে হয় উদ্দাম বেগে, আর একই সঙ্গে ছুটে চলে মানুষ, ঘোড়া, মোটরগাড়ী, প্লেন ইত্যাদি সবকিছু। এদের সঙ্গে ক্যামেরাও যদি ছোটে, তবেই দর্শকের মনও এই ছুটার সঙ্গে একাত্ব হয়ে ছুটে চলতে পারে। এই ক্যামেরার গতির সঙ্গে আবার এডিটিং এর শট-পরিবর্তনযুক্ত গতি যুক্ত হয়ে পুরো গতিটাই আরো দশগুন বেড়ে যেতে পারে। এই গতিময় কাহিনিতে যদি থাকে নাটকীয়তা, ঘাত-প্রতিঘাত, সুদর্শন নায়ক-নায়িকা, মনোরম বহির্দৃশ্যাবলি ও ছিমছাম সুদৃশ্য পরিবেশ, শ্রুতিমধুর গান, দৃষ্টিনন্দন নৃত্য এবং অন্যান্য রসের একটা উপভোগ্য সমন্বয় তাহলেই কেবল দর্শকের মন ভরতে পারে। এসবই পেয়ে থাকে স্বার্থক কাহিনি-চিত্রের তকমা। এসব ছবিই পারে নাটকের সাথে সিনেমার পার্থক্য গড়তে। কোন সিনেমাতে উপরের উপাদান সমূহ অনুপস্থিত থাকলে তাকে দর্শক লম্বা নাটক ছাড়া আ কী বলতে পারে?

অবাধ সংবাদ মাধ্যমের কল্যাণে বেশ কয়েকবছর ধরে আমরা আমাদের চলচ্চিত্র জগত সম্পর্কে হতাশ জনক অনেক কথাই জানতে পেরেছি। তার মাঝে সবচেয়ে হতাশ জনক হলো সিনেমা বা নাটকের সেটের পাশে কিছুদিন ঘুরঘুর করা লোকেদের নির্মাতা বনে যাবার গল্প। কোন রকম প্রাতিষ্ঠানিক বা হাতেকলমের শিক্ষা ছাড়া হঠাৎ-ই একদিন এদের কেউ কেউ কোন না কোন নাটক, সিনেমা নির্মাণের কাজে হাত দিয়ে বসেছে। এটা কী-করে সম্ভব এমন প্রশ্নের জবাবে এদের অনেককেই নাকি দাঁত কেলিয়ে বলতে শোনাগেছে, ‘একখান মালদার পার্টি পাইছি ভাই। তাই একটু রিস্ক নিয়ে ফেললাম’। এর ধরনের ঘটনা থেকেই বুঝতে পারা যায়, এধরনের অদক্ষ অশিক্ষিত লোকের কারণে দিন দিন আমাদের সিনেমার মান কতটা তলানিতে গিয়ে ঠেকছে। কেনো প্রযোজকে একের পর এক মূলধন হারাতে হচ্ছে। কেনো প্রকৃত মেধাবী আর চৌকশ নির্মাতাদের সুস্থভাবে কাজ করবার পথটি ক্রমশ রুদ্ধ হয়ে যাচ্ছে!

তথ্যসূত্র :
১. When Indian Films Swayed in India: Art in Chitrabikshan English Annual, 1975
২. Indian Directors on Ray— Answers to Questionnaire: Chitravas, Satyajit spl. No.
৩. শতবর্ষে চলচ্চিত্র (প্রথম খণ্ড)/ নির্মাল্য আচার্য ও দিব্যেন্দু পালিত সম্পাদিত
৪. চিত্রনাট্য সংগ্রহ— বুদ্ধদেব দাসগুপ্ত
৫. বিষয় : চলচ্চিত্র— সত্যজিৎ রায়
৬. http://www.guruchandali.com
৭. https://www.banglainsider.com