ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

আমরা বাঙ্গালি হয়ে অনেক কিছুই বাংলায় বলি না। যেমন, ‘ওহি’ আবরী শব্দ, এর বাংলা অর্থ ‘প্রেরণা’। ‘ওহিপ্রাপ্ত’ অর্থ ‘প্রেরণাপ্রাপ্ত’। আমরা নবী, রাসূল শব্দের সাথে পরচিত কিন্তু বাংলায় করলে সেটা যে ‘প্রেরণাপ্রাপ্ত’ বলা যায় এটা আমরা অনেকেই জানি না। আপনারা অনেকেই মধ্যপ্রাচ্যের নবী-রাসূলদের চেনেন অথচ এই বাংলার ‘প্রেরণাপ্রাপ্ত’দের চেনেন না। গোঁয়ো যোগী ভিখ পায় না। আজকে আপনাদের পরিচিত করে দেব দুইজন ‘প্রেরণাপ্রাপ্ত’ ব্যক্তিত্বের সাথে।

আনুমানিক ১৯২০ ইং সালে লেখক প্রেরণাপ্রাপ্ত মজিবুল হক ভূঞার জন্ম বৃহত্তর নোয়াখালীর মান্দারী গ্রামের জমিদার বংশে। তাদের বাড়ীটি খলীল ভূঞা বাড়ি নামে এখনও বহুল পরিচিত। বর্তমানে তা লক্ষ্মীপুর জিলার অধীন। আনুমানিক ১৯৩৮ সালের দিকে তিনি ঢাকা ইউনিভার্সিটির ইতিহাসে অনার্স বিভাগে অধ্যয়নরত অবস্থায় প্রেরণাপ্রাপ্ত আকসার উদ্দিন আহামদের সঙ্গে পরিচিত হন। তিনি একজন কামেল দরবেশ ছিলেন। শরিয়তী পাবন্দিসহ আধ্যাত্মিক তত্ত্ববাদী প্রেরণাপ্রাপ্ত আকসার উদ্দিন ধর্মীয় বিষয়ে এমন অলৌকিক কথা বলতেন যার সঙ্গে তদসমাজের কোনোই মিল ছিল না, আজও নেই। পক্ষান্তরে ইউনিভার্সিটি পর্যন্ত জীবনে তার এক ওয়াক্ত নামাজও কাজা হয়নি এবং জীবনে তিনি কখনও ক্লাসে প্রথম ছাড়া দ্বিতীয় হননি; আরবি তার অতিরিক্ত বিষয় ছিল; এমন মৌলবাদী মোল্লা মজিবুল হক প্রেরণাপ্রাপ্ত আকসার উদ্দিনের সঙ্গে ধর্মীয় যুক্তি-তর্কে এঁটে উঠতে না পেরে ঢাকা ইউনিভার্সিটির আরবি বিভাগের প্রফেসরদের নিয়ে তার বাসায় বহুবার বৈঠক করেন। প্রফেসরগণ তাঁর প্রশ্নের কোনো সদুত্তর দিতে পারতেন না, বরং তাঁর কাছে অবোধ শিশুর মতোই মনে হতো; অনর্গল তিনি কোরানের আয়াত তেলাওয়াত করে অর্থসহ বুঝিয়ে দিতেন অথচ তিনি ছিলেন গ্রাম্য নবম শ্রেণী পাস অথবা ফেল।

প্রেরণাপ্রাপ্ত মজিবুল হক বড় বড় ডিগ্রিধারী প্রফেসরদের প্রকাশ্যে এহেন পরাজয় দেখে তিনি বললেন, “আমি আর ইউনিভার্সিটিতে ফিরে যাব না, ইউনিভার্সিটির শিক্ষায় কোনো জ্ঞান নেই; আজ থেকে এই অশিক্ষিত লোকটিকেই আমার প্রফেসর ও গুরু হিসাবে গ্রহণ করলাম।” অতঃপর নিরলস ধর্মজ্ঞান সাধনায় কয়েক মাসের মধ্যেই তিনি দিব্যজ্ঞান প্রাপ্ত হন এবং সেই জ্ঞানে ঘরে বসেই আসন্ন পরীক্ষার সকল প্রশ্নপত্র তিনি দর্শন করেন।অনেক শিষ্য ভাই তাকে অনার্স ফাইনাল পরীক্ষায় অবতীর্ণ হতে বললে তিনি বলেন যে, “পরীক্ষার প্রশ্নপত্র দেখে ফেলেছি সুতরাং আমার পরীক্ষা দেয়া ঠিক হবে না।” এহেন সততার পরিচয় পেয়ে গুরু তার বড় মেয়ে নূরজাহান বেগমকে তার হাতে তুলে দেন। অতঃপর তার পৈত্রিক জমিদারি ত্যাগ করে শ্বশুর গুরুর পরিত্যক্ত বাড়ি বর্তমান পিরোজপুর জেলার নিলতী গ্রামে মানবেতর জীবন ধারণ করেন। প্রায় ২৪ ঘণ্টাই তিনি প্রকাশ্য/অপ্রকাশ্যে জিকিরে মশগুল থাকতেন। জীবনের শেষের দিকে তিনি পিরোজপুর উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। মৃত্যুর দিন পর্যন্ত তিনি সেখানেই কর্মরত ছিলেন । ১৯৬৯ সালের ১৬ জুন সোমবার ভোর রাতে তিনি দেহ ত্যাগ করেন। নিলতী গ্রামেই তার প্রায় নিশ্চিহ্ন মাজার অবস্থিত।

মৃত্যু সম্বন্ধীয় এবং তার জীবনের অলৌকিক ঘটনাবলি উল্লেখ করে পাঠকদের অন্ধ আকর্ষণ করা থেকে বিরত রইলাম। তার লেখাগুলিই যেন পাঠকদের আকর্ষণ করে। সম্ভবত ১৯৫০-১৯৬০ সালের মধ্যে বাণীগুলি লিখেছেন।লেখার মধ্যে কিছু সূরা ও আয়াতের বঙ্গানুবাদ (যার সঙ্গে প্রচলিত অনুবাদের কোনই মিল নেই) ও দেশ তথা বিশ্বের আমূল সংস্কারের ভবিষ্যৎ ইঙ্গিত আছে, যেমন : “আবর্তনের পরিবর্তন রচি/ ছিটকে ফেলে পূর্ত পরিতাপ/ সঙ্গে করি পূর্ব পাক।”

লেখাগুলি সবই পদ্যাকারে এবং ঐশী ভাবপূর্ণ। ব্যক্তিগতভাবে তিনি লেখক, কবি, সাহিত্যিক ছিলেন না । এটাই তার প্রথম ও শেষ লেখা। তিনি বলতেন, “কোনো মহান শক্তি আমাকে বলে অতঃপর আমি লিখি।” লিখতেন চলতে ফিরতে যে কোনো সময়। পকেটে সকল সময়ই কাগজ-কলম থাকত। এক এক সময় দু’লাইন থেকে ৮/১০ লাইন পর্যন্ত লিখে ফেলতেন।লেখাগুলি যে সাধারণ পেশাদারি লেখা নয় তা পড়লেই বোঝা যায়; ধর্ম সম্বন্ধে সূক্ষ্ম ও নিশ্চিত জ্ঞানী ছাড়া সাধারণ ও পেশাদারি ধর্ম শিক্ষায় শিক্ষিত যারা তাদের এটা নিয়ে হৈ-চৈ করা ঠিক হবে না। প্রায় ৪০ বৎসর পূর্বে তিনি দেহ ত্যাগ করেছেন; অতএব তার বিরুদ্ধে হৈ-চৈ করে অযথা সমাজে অশান্তি [গায়রীল ইসলাম] সৃষ্টি না করে বরং শান্তিপূর্ণভাবে বাণীগুলি গবেষণা করে জ্ঞান ও মানবকল্যাণের কিছু পেলে গ্রহণ করা যেতে পারে। যে কোনো অজুহাতে সমাজে অশান্তি সৃষ্টি কুফুরীতুল্য অপরাধ বটে! গ্রন্থটি মূল্যায়নের পূর্বে “ সংস্কার ও কোরান বনাম শরিয়ত” গ্রন্থদ্বয়ের যেকোন একটি একান্তই পড়া দরকার।

বিঃ দ্রঃ প্রায় অস্পষ্ট মূল পাণ্ডুলিপি থেকে খুব কষ্ট করে লেখাগুলি উদ্ধার করা হয়েছে বিধায় কোথাও কিঞ্চিৎ মাত্র শাব্দিক বানান ভুল ভ্রান্তি থাকতে পারে, সাধু ও চলিত ভাষার মিশ্রণ আছেই। তবে মূল বিষয় এমনকি বাক্যেও ভুল নেই। কারণ তাঁর ২য় সন্তান অতঃপর ভক্ত হিসাবে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত লেখার সাথে পরিচিত ছিলাম।

বিনীত

প্রকাশক
সূত্র: পৃষ্ঠা ২-৩, প্রেরণাবাণী [Revelation]
লেখক: প্রেরণাপ্রাপ্ত মুজিবুল হক
Published by : M. Jamilul Bashar (মজবাসার)

আসুন আমরা এই মহান ‘প্রেরণাপ্রাপ্ত’-র একটি প্রেরণাবাণী বা ওহি বা revelation দেখি:

প্রেরণাবাণী ॥ ৯০
আমি ব্রহ্মা আমি শিব
আমি হরি আমি কৃষ্ণ
ইন্দ্র অগাস্ত বিষ্ণু আমি
আমি শোক-সন্তাপ পরিত্যক্ত।
অহিংস বুদ্ধ অশোক
সর্বাঙ্গ সুন্দর সুঠাম আমি
আল আমিন আহম্‌দ শুদ্ধ।
তোমাদের সাথে মিলেমিশে
নাই মোর কোনো কর্ম
যেহেতু তাঁরই পাতে
আমি বিক্রীত ধর্ম।
তোমরা মোরে কী দেখাও ভয়?
ও-ভয় কম্পিত নয়
মম এ বিক্রীত হৃদয় ।
কলঙ্কিনী রায় লো
কালি গঙ্গা পদ্মা গো
সতী সাধ্বী শ্রীমতী
সীতা সাবিত্রী অহল্যা ভাই গো।
ওগো ভগবান! তুমি মোরে
কেন কর না দান
নিত্য নূতন নৈবিদ্যমান।
ত্রিলোচন ত্রিলোকায়ত্ব মহাদেব আমি
আমি মহামহিম আ-মহাপরিব্যপ্ত
মম পদে সবে লীন অহরাত্র।
[ব্রহ্মা = ইব্রাহীম; শিব = শোয়েব; হরি = হারুন; কৃষ্ণ = মুছা;
ইন্দ্র = ছোলায়মান; অগাস্ত = ইলিয়াছ; অশোক = يسع
বিষ্ণু = যিশু; বুদ্ধ = যুলকেপলে; সাবিত্রী = মরিয়ম; অহেল্যা = মুছার মাতা;
মহাদেব = আদম; মনু = নুহ্‌ ।]

সূত্র: পৃষ্ঠা-৪৫, প্রেরণাবাণী [Revelation]
লেখক: প্রেরণাপ্রাপ্ত মুজিবুল হক

Published by : M. Jamilul Bashar (মজবাসার)


[উল্লেখ করা নিস্প্রয়োজন, এই প্রবন্ধে উল্লেখিত দুইজন প্রেরণাপ্রাপ্তের একজন জনাব মজবাসারের পিতা অন্যজন নানা। কী নির্মম সত্য একজন নবীপুত্র এবং নবীর-নাতিকে আমরা চিনতেই পারি নাই। কেন, বাংলার নবী বলে কি তাদের কদর করা যাবে না!!!]