ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

 

জল ডুমুরের ঘুম

মে ঘ অ দি তি
ধরন: কাব্যগল্প
প্রচ্ছদ : রচিষ্ণু স্যানাল
প্রকাশনায়: সাম্প্রতিক প্রকাশনী
পাওয়া যাচ্ছে-একুশে বইমেলা-২০১২
মেলা পরবর্তী সময়ে পাওয়া যাবে-কাটাবনের কনকর্ড এম্পোরিয়ামের গদ্য পদ্য নামক দোকানে।
——————————————————————
মন ঘরের বিষণ্নতা তাড়াতে আমরা কেউ কেউ কখনো কখনো নিজেকে ভাঙতে বসি। কিংবা ফেলে আসা নির্জন রাত দুপুর গুলো অদৃশ্য সুতোয় বন্দি করতে কেউ কেউ অঙ্কন করি অসামান্য দৃশ্য কল্প কিংবা কাব্যকথা। ঠিক সেই রকম কিছু কথা, কিছু অনুভূতি আর কিছু অন্যরকম দৃশ্যপল্প নিয়েই রচিত হয়েছে মেঘ অদিতির কাব্যগল্প গ্রন্থ “জল ডুমুরের ঘুম”
কবিতা কবিতার মতই সুন্দর। অক্ষরবৃত্ত, মাত্রাবৃত্ত, ছন্দ বৃত্ত, অলংকরণ আরও বিভিন্ন রুপ নিয়েই কবির কলমের ডগায় যেমন করে ভর করে সে, তেমনি দৃশ্যকল্প, অনুভুতি আর উপমা দিয়ে নিয়ে গল্পাকারের হাতে রচিত হয় গল্প। কিন্তু এই দুই মিলে যখন রচিত হয় কম শব্দের পরিব্যাপ্তিতে অথচ ভাব প্রকাশে পূর্নাঙ্গ কিংবা দৃশ্যকল্পের ভাবার্থে পরিপূর্ণতায় পূর্ণ কিংবা কোন খন্ড চিত্রের সাজানো কথামালা সমৃদ্ধ একটি লেখা তখন সেটা হয় কাব্যগল্প। আর সেরকম কিছু অসাধারণ কিছু কাব্যগল্প নিয়েই সাম্প্রতিক প্রকাশনী থেকে এবারের মেলায় এসেছে মেঘ অদিতির প্রথম বই- জল ডুমুরের ঘুম। বইটিতে রয়েছে ৩৬টি কাব্য গল্প। প্রতিটিতেই ভিন্ন স্বাদ, ভিন্ন রস, কল্প ও স্বতন্ত্র ধারা সুস্পষ্ট লক্ষ্যনীয়।

কাব্যগল্প জিনিসটা অনেকটা সুদৃশ্য মনোরম লেকের মতো সেটা না নদী না পুকুর। যেখানে আছে শ্যাওলা থেকে নুড়ির বাস আছে। ক্ষুদ্র থেকে বৃহৎ প্রাণীর মিলনমেলা আছে। থেমে থাকা কিংবা দোল খাওয়া জলরাশি আছে। কাব্যগল্পে যেমন সংক্ষিপ্ত আত্মকথা বা সাময়িক দৃশ্যবলী থাকে তেমনি একটুকরো রোদের আচ কিংবা অতি প্রিয় শব্দটির বিভিন্ন ব্যবহারও থাকে। জলডুমুরের ঘুম বইটি পড়ার সময় কখনো কখনো মনে জাগতে পারে অনুভূতির আলোড়ণ। পাঠক দৃশ্য কল্পের সাথে মিশে গিয়ে নিজেই হয়ে যেতে পারে কাব্যগল্পের কোন চরিত্র।

লেখিকা মেঘ অদিতির এটি প্রথম প্রকাশিত বই হলেও লেখালেখির জগতে হস্ত স্বাক্ষর রেখেছেন অনেক আগেই। বাংলা ব্লগিং জগতে পরিচিত একটি নাম। সুনিপুণ দক্ষতায় ছোট্ট পরিসরে পাঠককে মন্ত্রমুগ্ধের মতো ধরে রাখার দুর্দান্ত মাদকতা তার লেখনিতে প্রকট মান। জল ডুমরের ঘুম বইটিতে যেসব কাব্যগল্প আছে তার মাঝে বনকুসুম ০ কম্পোজিশন ০ পরিবৃত্ত ০ কাল রাতে সাপে কেটেছিল ০ কাঙ্ক্ষা ০ সৃজন ০ বাতিঘর এক সবুজ ০ নির্বাসন ০ রেবতীকথন ০ শব্দকুহক ০ অনুবোধ ০ শিরোনামহীন সরলরেখা ০ শিঞ্জিনী ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

বইটির এগারোতম কাব্যগল্প- বাতিঘর এক সবুজ; যেখানে শুরুতেই মোহময় কাব্য ভাব ফুটে উঠেছে। এর দৃশ্যপট দুটো আলোকবিন্দু নিয়ে। লেখিকা গদ্যের ধারায় সৃষ্টি করলেও কাব্য ভাব এতে অক্ষুন্ন হয়নি দৃশ্যপটটি এগিয়ে গেছে সেরকম ভাবেই। ফেলে আসা কথার সাথে নতুন ইচ্ছেরা আহবান জানায় সবুজ ফুটকিকে, হঠাৎ করে হারিয়ে যাওয়া চির চেনা মানুষগুলোর বিদায় ভাবনায় ভারাক্রান্ত করে হওয়া মন, ঠিক বুঝতে পারে হারিয়ে যাওয়া পার্থিব বস্তুটি হয়তো পরম আনন্দে আছে। কাব্যগল্পটির কিছু অংশ এখানে তুলে দেয়া হলো-

“ হ্যাঁ, বলছিলাম আমার সেই সবুজ আলোর ফুটকির কথা। আমি সযত্নে রেখেছি রাধাকৃষ্ণের মূর্তিটার পাশে। রোজ জল-বাতাসা দিই, তারপর সন্ধ্যেবেলা আবার ঘরে তুলে রাখি। এই আলোক বিন্দুটি যাকে আমি সবুজ ফুটকি বলছি সে একসময় সত্যিই নাজুক ছিল ভারি। ওকে যত্ন না করলে কবেই মরে যেতো। আমি জানতাম এই বিন্দুটিকে সাথে সাথে রাখতে হবে। জানি, ওকে সাথে করে আমি পৌঁছে যেতে পারি আমাদের ছায়াপথে। আমি জেনে গেছি এইসব বিন্দুগুলোকে আগলে রাখতে জানলে কেউ যেমন হারে না, তেমন হারায়ও না। নিজের অবস্থানটি চিনে নিয়ে সে নিজের মত করে বেঁচে থাকতে শিখে যায়!

আমি জানি তুমি কেমন আছো! তুমি এখন চেনা গন্ডির সীমানা ছুঁয়ে, আটপৌরে হয়ে, চাঁদ দেখে দেখে বাঁচো।”

(বাতিঘর এক সবুজ)

ছোট্ট পরিধিতে যে এমনটা সম্ভব তা কেউ কেউ দেখে হতবাক হয়ে যেতে পারেন। বাক্য নির্মানে কিংবা বাক্য বুননে উনি যে দক্ষতা দেখিয়েছেন তাতে পাঠক কোন কোন কাব্যগল্পে নিজেকে অংকন করে নেবে অনায়াসে। তেমনি একটি কাব্যগল্প “দংশন” যেখানে দেখতে পাই দত্তবাড়ির আঙ্গিানায় সমস্ত চোখমাঠে ঘুড়ে বেড়ায় মন। সুপারি গাছ, কিংবা পুকুরের ঢেউয়ের নাচন, ছাদের বুনোলতা, হলুদ প্রজাপ্রতি সবখানেই লেখিকা দৃশ্য অংকন করেছেন আর দেখিয়েছেন উপমার ব্যবহার

“দত্তবাড়ির পুকুরের ধারে দাঁড়িয়ে থাকা খান কতক সুপারি গাছের মাথা ছুঁয়ে উড়ে যাওয়া পরদেশী কালো মেঘের গায়ে বালুচরী নকশা। জলের দিকে হেলে পড়া শিশু নারকেল গাছ আর দূরে মেহগনির ঘন সবুজ রঙ। রোদ্দুর নেই বলে আদুরে হাওয়ায় গাছগুলো ঢলে পড়ছে এ ওর গায়ে। পুকুরের জলেও তিরতিরে ঢেউয়ের নাচন। একটা চুপচাপ সাদা বাড়ির সবুজরঙা জানালা আর দরজা বেয়ে উঠে যাওয়া বুনোলতা ছাদ ছুঁয়েছে। ছাদভর্তি ঘাস দোল খাচ্ছে বাতাসে। ভাদ্র মাসের নেমে আসা দুপুরে কলাগাছের ভেলায় পুকুরে ঘুরে বেড়ানো কিশোরের মুখে মৃদু হাসি। একটা দু’টো করে হলুদ প্রজাপতি সে হাসিকে ছুঁয়ে আনন্দে ডানা মেলেছে। অসহ্য সুন্দর এ দৃশ্য আমাকে পূর্বজন্ম ফিরিয়ে দেয়। ধ্যানস্থ হই, দেখি সাদা বাড়ির জানলায় এক অপরূপাকে”
(দংশন)

এই কাব্য গল্পে যেমন আমরা দেখতে পাই উপমার ব্যবহার তেমনি প্রত্যক্ষ করি অপরূপ রচনা শৈলী “নিঃ শব্দ দহন” লেখাটিতে। একটা গহীন আকুতি কেমন করে যেন মনের গহীনে দাগ কেটে যায়। বিষাদকৌটা, প্রাণভোমরা আর নীলাভ জোস্নারাতের মতো অজস্র শব্দরা খেলা করে যায় এই লেখায়। হয়তো ভেসে উঠে অদৃশ্য কোন মনোদেয়াল।

“কালশিটে পড়া রাতের কাছে ঘুমিয়ে পড়ার আগে যে স্তিমিত আলো, সে আলোয় দুচোখের দিকে অপলক থেমে থাকা মন বলে : প্রশ্ন কোরো না কোনো আজ, সে সময় আর নেই। তোমার কাছ থেকে এই নিলাম বিষাদকৌটো, আমার প্রাণভোমরা রেখে যাবো এতে। পরিত্যক্ত জীবন থেকে তোমাকে দিলাম কিছু স্বপ্ন পালক, মোহময়ী স্মৃতি আর নীলাভ জ্যোৎস্নারাত। প্রগাঢ় অন্ধকারের কোনো এক রাতে আবার যদি ফিরি তবে ভালোবেসে লন্ডভন্ড করে তোমার শরীর খুঁড়ে তুলে নেবো সব জ্যোৎস্না।
মুখ তুলে একবার চোখে রাখো চোখ। শেষবার… ছুঁয়ে বলো ভালোবাসি, বড় ভালোবাসি…”

(নিঃশব্দ দহন)

আরো একটি লেখায় দেখতে পাই, যেখানে আকুলতা কিংবা ইচ্ছের ও অপ্রাপ্তির জমে থাকা নথি খুলে বসলে শব্দরা যেমন করে ভেতর থেকে বেড়িয়ে আসতে চায় ঠিক তেমনি অনেক শব্দ বেড়িয়ে এসে জায়গা করে নিয়েছে “শূন্যের ভেতরে ঢেউ কাব্যগল্পটিতে”

“জানলা দিয়ে তাকিয়ে আছি। নারকেলগাছের গা গলে ঢুকে পড়ছে রোদ্দুর। উঠোনে দু’টো শালিকের দীর্ঘ বাক্য বিনিময়ে বিঘ্ন ঘটিয়ে কার্নিশে বসে ডেকে যাচ্ছে চড়াই। রোদ আরও চওড়া হয়ে এবার উঠোনে এসে পড়েছে। ভ্রু কুঁচকে, চোখ কুঁচকে তবু রোদ্দুরের দিকে তাকিয়ে আমি। প্রায়ান্ধকার জানালার এপাশে দাঁড়িয়ে মুখ ভেঙ্গে চুরে যায়, আমি ভাঙ্গতে শুরু করি ভিতর থেকে। মনে হয় মানুষ হয়ে জন্মালাম কেন! পাখি হতে পারতাম, ঘাস হতে পারতাম অথবা প্রজাপতি, শালিক, চড়াই বা রোদ্দুর যে কোনো কিছুই তো হতে পারতাম! মানুষ না হয়ে এসবের যে কোনো কিছু হয়ে জন্মালে আমার অনুভূতি থাকতো কি!!”
(শূন্যের ভেতরে ঢেউ )

আগেই বলেছি জল ডুমুরের গান বইটি পড়লেই বুঝা যায় লেখিকার লেখা কতখানি আন্তরিক, কতখানি স্নিগ্ধ! প্রতিটি কাব্যগল্পেই কোন না কোন নতুনত্বের পরশ তিনি বিছিয়ে দিয়েছেন। বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ভিন্ন ভিন্ন কল্পদৃশ্যের খেলা রেখেছেন কাব্যগল্পগুলোতে। লেখনির কোথাও দৈন্যতা নেই যেন সব শব্দসম্পদে ভরপুর এক সবুজাভ বৃক্ষ। শূন্য মনঘরে প্রাপ্তিযোগ নেহায়েত কম হবেনা আর এই শব্দ প্রাপ্তিগুলো কিংবা শব্দালোরন বিষয়টি সুস্পষ্ট হবে বনকুসুম লেখাটি পড়লে তারই কিছুটা তুলে ধরলাম-

আকাশ মস্ত নীল। যেন খুব করে কেউ রঙ গুলে আকাশকে স্নান করিয়েছে। তাতে হালকা পলকা পাল তুলে ভাসছে হাসিমুখে সাদা সাদা মেঘ। কচি সবুজ রঙে জুড়ে আছে পুরো প্রান্তর, খুব দূরে গিয়ে ছুঁতে চেয়েছে সে দিগন্তরেখা। চুপ করে বসে রঙগুলো দেখি। তোমাকে বলেছিলাম এখানে এলেই মন ভালো হয়ে যায়! তোমার চোখও সেকথাই বলছে। বিকেলের পড়ন্ত রোদের লালচে আভা তোমার চুলে এসে বসেছে চুপ করে। বুকে মাদল বেজে ওঠে। ভিমপলশ্রীর কোমল নিখাদ বাতাসে ভেসে বেড়ায়। শাড়ির আঁচলে রাধা-কৃষ্ণ চিত্রবুনোট। কপালে ছোটো কালো টিপ।”
(বনকুসুম)

বইয়ে অন্যরকম ধাঁচের একটি লেখা কাব্যগল্প কম্পোজিশন। শব্দরা এখানে শুধু খেলাই করেনি দেখিয়েছে তার রুপ সমুদ্রও। দৃশ্যকল্প এখানে তিরতির করে ঘুড়ে বেড়িয়েছে সমস্ত লেখাময় আর তাই লেখনিতে উঠে এসেছে-

“ নিরন্ন শরীরে বয়ে এনেছি সহস্র ব্রতচিহ্ন, কালজ্ঞ। যুদ্ধ ও ধ্বংস থেকে বাঁচিয়ে আনা আমার কান্নাগুলো কেবল তোমার সান্নিধ্যে রেখে যেতে চাই। দিন ফুরিয়ে গেলেই বজ্রনিনাদে আমার পিছু ফেরার পালা। বিটোভেনের বদলে আমার কান্নাগুলো বাজিও, আর কিছু চাই না।
একজীবন ধরে বয়ে বেড়ানো কান্নাগুলো বিটোভেনের চেয়ে কম দামি কিছু কম্পোজিশন নয়।”

(কম্পোজিশন)

এরকম আরো ছোটখাটো উপাখ্যান কাব্যগল্পে পরিনত হয়ে উঠেছে। সেরকম আরেকটি লেখা “কাল রাতে সাপে কেটেছিলো” যেখানে খুজে পাই সেই রবী বাবুর কাদম্বিনীর ছায়া চিত্র। দৃশ্যকল্প একসময় বিদ্রোহী হয়ে উঠে ভালোবাসা আর ঘৃণা খুব বিদগ্ধ ভাবে ধরা দিয়ে যায় এই লেখায়। কাব্য গল্পের প্রায় সবগুলো লেখাতেই বিভিন্ন শ্রেনীর পাঠকের ভালোলাগা বিরাজমান। গ্রন্থের জল ডমুরের ঘুম কাব্যগল্পটির মতো আমরাও জানাতে চাই –“আমাদের রাতগুলো বহুবর্ণা আলোর নীচে ঘুরপাক খায়। বৃত্তে বৃত্তে বাড়ে উপনিবেশ ছায়া। আমাদের খিদে মরে যায়, তৃষ্ণা হয় না অথচ শরীর অতিকায় হয়ে ওঠে। শহরের রাস্তাগুলো যখন যে যার মত নিরাপত্তা খোঁজে তখন আমাদের ঘোর কাটে। আমরা জেনে যাই এক অন্ধজীবনের কথা। আমরা জানি তীরন্দাজের বোধের মরণ হয়ে গেছে। তবু ঝরে পড়ার আগমুহূর্তে আমাদের গায়ে এসে পড়া রোদের মুখ মায়া মাখা, গাছের চিরল পাতার গায়ে থাকে সম্ভ্রমমাখা দুরন্ত সবুজ আদর আর আমাদের কাছে এসে দাঁড়ায় মৃত্যুদূত।
আমরা ধ্রুবতারার সাথে পূর্বজন্মে ফিরে যেতে চাই।”

কাব্যগল্প গুলো যেন মোহময়তার হাট বিছিয়ে দিয়েছে, যেন মন্ত্রমুগ্ধের মতো চোখ রেখেই চলতে ইচ্ছে করে পাতার পর পাতা। পরিশেষে জল ডুমুরের ঘুম বইটির সফলতা কামনা করি। বইটি পাঠকের হৃদয় ছুয়ে যাবে বলেই আমার দৃঢ় বিশ্বাস।

……………………………………….০………………………………………