ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

Somudrojol_1296711811_2-Alor_cover

“আলোর যাত্রা” মুক্তিযুদ্ধ ও তার পরবর্তী প্রেক্ষাপটে রচিত এক অনন্য উপন্যাস। উপন্যাসটিতে মুক্তিযুদ্ধ ছাড়াও তার পরবর্তী সময়ের বেশ কিছু দৃশ্যপট এর সমন্বয়ে এটি পরিপূর্ণতা লাভ করেছে। এর দৃশ্যায়নটা পাঠককে কখনো কখনো নিয়ে যাবে যুদ্ধের রণাঙ্গনে, আবার কখনোবা ভাসিয়ে দেবে কান্না ভেজা বাংলার বীরাঙ্গনাদের হাহাকারে। ২০১১ এর বইমেলাতে প্রকাশিত হয়েছিল এই উপন্যাসটি। দি রয়েল পাবলিশার্স থেকে প্রকাশিত এই উপন্যাসটির লেখিকা “রোকসানা লেইস” যিনি একাধারে কবি, গল্পাকার ও উপন্যাসিক। যারা একাধিক বই ইতিমধ্যে আলোড়িত করেছে পাঠককে। তিনি বেছে নিয়েছেন লেখক জীবন। দেশ, বিদেশের পত্র-পত্রিকা, ওয়েব প্রকাশনে সমান ভাবে পদচারণা। মূলত তার লেখনিই পাঠককে সচকিত করে তুলেছে বারংবার। তার লেখায় রয়েছে এক ধরনের মুগ্ধতা ও রয়েছে নিজস্ব ঢং, সেই সূত্র ধরেই তিনি লিখেছেন মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক উপন্যাস “আলোর যাত্রা”

উপন্যাসে রয়েছে ৫টি পর্ব বা অধ্যায় যদিও সব মিলিয়েই একটা কাহিনী। বলা যায় এটা লেখিকার নিজস্ব স্টাইল যদিও মূল কাহিনী হল মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তথাপি এর চরিত্রায়নে রয়েছে বেশকটি গল্পের আভাস আর এজন্যই লেখিকা ভিন্নতর স্বাদ দেবার জন্যই ছোট ছোট গল্পাকারে ফুটিয়ে তুলেছেন মূল কাহিনীটি। পরিশেষে পাঠকের পূর্নাঙ্গ পাঠেই মিলবে উপন্যাসের সমাপ্তি। উপন্যাসের উল্লেখ্য পর্ব গুলো হলো- বিপর্যস্ত অনুভব, কালরাত, একাকী একজন, অজানা দেশ ও আসা যাওয়া পথের ধারে। পর্ব ভিত্তিক হলেও একটা পর্বের সাথে অপরটির রয়েছে নিবিড় সম্পর্ক। সুচারুভাবে বর্ণিত হয়েছে প্রতিটি পর্ব এবং শেষ পর্যন্ত এই ৫টি পর্বে সমাপ্তি হয়েছে একই সাথে। লেখিকা উপন্যাসের শেষাংশ খুব সুন্দরভাবে উপস্থাপন করেছেন বলেই পাঠ করতে গিয়ে এর আকর্ষন ক্রমশই বেড়ে যায়। এই উপন্যাসের শুরুতেই সাবলীল বর্ণনার সাথে সাথে দেখতে পাই শব্দ প্রয়োগ ও বিষয়বস্তুর অভূতপূর্ব সমন্বয়। যে জন্য বিষয়বস্তু খুব সহজেই পাঠকের চোখে ধরা পড়বে। পাঠক বিভ্রান্তিতে যেন না পড়েন সেই জন্যই কাহিনীর বুনন সরল ভাবে উপস্থাপিত হয়েছে প্রতিটি পর্বে।

বিপর্যস্ত অনুভব উপন্যাসের প্রথম পর্ব। ২৫ শে মার্চের রাতে ঘটে যাওয়া নারকীয় ধ্বংস যজ্ঞের এক ভয়াল চিত্র। গ্রাম্য গৃহবধূ কুলসুম আর তার স্বামী অন্য সবার মতো সেই রাতে ঘুমিয়ে ছিল পরম নির্ভরতায় কে জানতো তাদের এই সুখ হয়ে যাবে নরক যন্ত্রনা। পাকহানাদারদের হামলায় কুলসুম তার স্বামী ও পরিবারকে হারায়। ধর্ষিত হয় নরপিশাচদের হাতে। তাকে ফেলে দিয়ে যায় এক অন্ধ গর্তে। লেখিকার মুন্সিয়ানায় ফুটে উঠেছে সেই সব চিত্রগুলো তিনি ভেতরের জমে থাকা সমস্ত কথামালা দিয়ে বর্ণনা করেছেন নিম্নে তারই কিছুটা দেয়া হলোঃ

“কালঘুম থেকে জেগে উঠে দেখল সব ফাঁকা, চারপাশ শূন্য। আবীর রাঙা আকাশ, নীচু হয়ে যেন গিলে খেতে আসছে। হাত-পা শরীর অবশ, নড়নের শক্তি নাই। চক্ষু দুটি খোলা শুধু আকাশের পানে। চোখ ছাড়া যেন সব মরে গেছে। ধীরে ধীরে কয়েকটা লম্ব শ্বাস নেয় ভেতরটা যেন নড়ে উঠে একটুখানি। হাতটা তুলে আস্তে আস্তে। অনেক কষ্ট হয়। ফর্সা সুডৌল বাহু কালসিটে রক্তজমাট, কাদালেপা চিত্র আঁকা। দু’হাতের আঙ্গুলে আঙ্গুলে জড়িয়ে মাথার উপর হাত দুটো তুলে আড়মোড়া ভাঙতে চায়, চেষ্টা করে। অনেকক্ষণ সময় লাগে, একসময় সমর্থ হয় আড়মোড়া ভাঙান, নড়ে উঠে ভেতর থেকে শরীর ব্যথায়। যন্ত্রণায় কঁকিয়ে উঠে। কোমরের নীচ থেকে যেন নিঃস্বার হয়ে গেছে। আরো ধীরে আরো সময় নিয়ে উঠে বসে একসময়। মাটির ভিতর গেঁথে যাওয়া অর্ধেক শরীর টেনে। লোহুর ধারায় ভিজে গেছে মাটি। রক্ত জমে তামার মতন কালো হয়ে গেছে জমিন। ফর্সা পা দুটোর অবস্থা হাতের চেয়েও খারাপ। আকাশের রঙিন আলো কালো মেঘে ঢেকে যেতে থাকে”

উপন্যাসের এই পর্বে দেখতে পাই ধর্ষিতা কুলসুমের সাথে পরিচয় হয় কয়েকজন তরুন মুক্তিযোদ্ধার যারা দেশের তরে নিজেদের জীবন বিসর্জন দিতে এসেছে। নয়মাস যুদ্ধের বিভিন্ন অপারেশন আর গল্পগাথা নিয়ে কাহিনী এগিয়ে যায়। উপন্যাসের কোথাও কোথাও পাঠক থমকে যেতে পারেন বিশেষ করে নব প্রজন্মরা যারা মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ততটা জানে না। কালরাত অধ্যায়টি মুলত যুদ্ধের বিভিন্ন চিত্র নিয়ে লেখা হয়েছে। দেশকে ভালবেসে যুদ্ধে নামে হারুন। এক এক করে হারায় প্রাণপ্রিয় বন্ধুদেরকে অবশেষে খুজে পায় আরেক যুদ্ধাহত নারী সামিয়াকে। উপন্যাসে হারুন আর সামিয়া দুজনেই স্বজন হারানো ব্যথিত মানুষ। যারা নিজেদের সব হারিয়ে মনকে মুঠো বন্দি করে যুদ্ধের নানান অভিজ্ঞতাকে সঙ্গি করে পুরো উপন্যাস জুড়েই পদচারনা করে। কালরাত অধ্যায়টির বেশ কিছু অংশ পাঠককে নিয়ে যায় যুদ্ধের সময়কার সেই বিভীষিকাময় মুহূর্তে আর এভাবেই চোখের সামনে ভেসে উঠে কিছু লাইন:

বড় আপার বড় মেয়ে পারুল আপার বিয়ে ছিল ছাব্বিশে মার্চ। সে উপলক্ষে চাচার বাসায় জড়ো হয়েছিল ওরা অনেক আত্নীয়-স্বজন। একটার পর একটা অনুষ্ঠান, পান-চিনি, গায়ে হলুদ, গানবাজনা, মেহেদী মাখা, রঙ খেলায় অনেক দিন পর সেই ছোটবেলার আনন্দ ফিরে পেয়েছিল সামিয়া। দেশের পরিস্থিতির কারণে বিশ্ববিদ্যালয়-স্কুল-কলেজ সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্র বন্ধ। তাই পড়ালেখায় ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা ছিল না। বাচ্চারা যেন গ্রীষ্ম, রোজা, পূজার মতন আলাদা এক ছুটি পেয়ে গেছে। সবাই মনের আনন্দে মেতেছিল বিয়ের ফুর্তিতে। অভিভাবকরাও ছিলেন হাসিখুশি মেজাজে। বংশের প্রথম মেয়ের বিয়ে। আয়োজন ছিল বিশাল। শান্তিবাগে চাচার মস্ত বাড়ি। এখানেই বিয়ে হবে……….
আরেকটা অংশে দেখতে পাই সেই বিয়ে বাড়িতেই হঠাৎ গোলাগুলির শব্দ, আকাশভরা আগুনের ফুলকি। কিছু বুঝে উঠার আগেই ট্রাক ভর্তি মিলিটারি এসে হানা দেয় তারপর একে একে হত্যা করে সবাইকে শুধু অন্ধকারে বেচে যায় সামিয়া আর তার ছোট ভাই বাবুয়া। একসময় সেই বাবুয়াকেও হারিয়ে ফেলে সে। শহরে গ্রামে দৌড়াতে দৌড়াতে এক সময় মুক্তিযোদ্ধাদের দলে ভিড়ে সামিয়া এভাবেই লেখিকা সচতুর ভাবে কাহিনী বিন্যাস করেছেন।

একাকী একজন পর্বটি অন্যরকম একটি অধ্যায় যেখানে বাদশা মিয়ার কুড়িয়ে পাওয়া সন্তান সাজিদ মেহরা নিজের পরিচয় খুজে বেড়ায়। বাদশা মিয়ার কুড়িয়ে পাওয়া ছেলে সাজিদ। যার জন্ম পরিচয় জানবার আগেই মৃত্যু ঘটে। সাজিদের জীবনের অনেকটা কাল কাটে এভাবেই। তারপর এক সাহেব তাকে নিয়ে আসে ঢাকা সেখানেই শুরু হয় তার নতুন জীবন কিন্তু মাতৃ পিতৃ হীন হবার এক অসহ্য যন্তনা তাকে তাড়া করে ফেরে তাই সে মনে মনে খুজে ফেরে তার আসল পরিচয় কি? কে সে? এখানে আমরা খানিকটা রোমান্সের গন্ধও পাই। আবেদিন সাহেবের সাহায্যে সাজিদ মেহরা একসময় নামী শিল্পী হয়ে উঠেন। আমরা দেখতে পাই আবেদিন সাহেবের মেয়ে লিমা সাজিদ মেহরার প্রেমে পড়ে গেলেও অনাথ সাজিদ মেহেরা তাকে এড়িয়ে যায়।

এই বইয়ে অজানা দেশ পর্বের জয় এনথন ক্রিসটেফার এর চমকপদ কাহিনীটা অনেককেই নাড়া দেবে নরওয়ে থেকে বাংলাদেশে আসে তার জন্মদাত্রী মাকে দেখতে যে মা’কিনা লোক লজ্জার ভয়ে জন্মের পরপরই তাকে তুলে দিয়েছিল বিদেশিনীর হাতে কিন্তু সে যে বাঙালী সেই বোধটা ধীরে ধীরে তার মাঝে প্রকাশ হয়ে উঠে তাই সে খুজতে আসে তার শ্যামাঙ্গী মাকে কিন্তু এখানে তার তো পরিচিত কেউ নেই, এই প্রথম সে এসেছে বাংলাদেশে। কিভাবে এই জনসমুদ্রে তার মাকে খুজে পাবে সেই প্রশ্ন নিয়েই লেখিকা গল্পে আকর্ষন রেখে রেখে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। এই অধ্যায়ে লন্ডন ফেরত টগবগে এক তরুনীরও দেখা পাওয়া যায় যে কিনা লন্ডনে বড় হয়েও এই দেশের জন্য কিছু করতে চায়? তার এই আশা পূরন করতে কে এগিয়ে আসবে সেই আয়োজন চলে কাহিনীর ফাঁকে ফাঁকে।
উপন্যাসের আরেকটি অবাক পর্ব হলো “আসা যাওয়া পথের ধারে” এই পর্বটিতে এক বিদেশীর বাংলার প্রতি সহানুভূতির চিত্রটি খুব সুন্দর ভাবে ফুটে উঠেছে। কানাডা বসবাসরত বাংলাদেশী কন্যা জিনিয়ার প্রেমে পড়ে যায় সে। মুক্তিযুদ্ধে ধর্ষিতা জিনিয়া স্বামী আর পরিজনদের হাতে অপমানিত হয়ে নিজের জীবনের সাথে যুদ্ধ করে নিজেই নিজের জীবনকে সাজিয়ে নেয়। উপন্যাস পড়তে পড়তে টের পাই আমরা হারিয়েছি যাদের তাদের হয়তো পাব না কিন্তু যারা আমাদের সাথে রয়ে গেল তাদের জন্য আমরা কি করতে পেরেছি? কতটুকু করতে পেরেছি এই কথাটি যেন লেখিকা পাঠকের চোখে আঙ্গুল তুলে দেখিয়ে দিতে পেরেছেন। উপন্যাসের পরিশেষে কুলসুম বিবি খুজে পায় তার ছেলেকে। মনের গাঙে বিষন্নতার ঢেউ তাড়ানো সাজিদ মেহেরা হয়ে যায় হারিয়ে যাওয়া সেই বাবুয়া আর সামিয়া খুজে পায় তার ভাইকে। এভাবেই তাতাই এর স্বপ্ন পূরনে এগিয়ে আসে সবাই। উপন্যাসের মূল চরিত্র বেশ কয়েকটি হারুন সামিয়া দম্পত্তি, কুলসুম-জয় মা-সন্তান তাছাড়া নভেরা ইউসুফ তাতাই, সাজিদ মেহেরা বাবুয়া এই চরিত্র গুলোও উপন্যাসকে সমৃদ্ধ করেছে।

যুদ্ধের অনেক কাহিনী এখনও রয়ে গেছে আমাদের অজানা। লেখিকা তেমনি কয়েকটা কাহিনীর নিয়ে রচনা করেছেন এই মুক্তযুদ্ধ ভিত্তিক উপন্যাস আলোর যাত্রা। নব প্রজন্মের জন্য একটি অনন্য উপন্যাস হতে পারে এটি এতে সুন্দর ভাবে উপস্থাপিত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের কথা, দেশের কথা, হারানো স্বজনদের কথা, রাজাকারদের কথা, হায়েনাদের কথা।

ধন্যবাদ লেখিকা রোকসানা লেইসকে এরকম একটি বই উপহার দেবার জন্য। ভবিষ্যতে উনার কলম থেকে আরো সমৃদ্ধশালী কথাসহিত্য বেড়িয়ে আসবে বলে কামনা করি। আশা করি পাঠকদের ভালো লাগবে এই উপন্যাসটি। পরিশেষে এর সফলতা কামনা করি।