ক্যাটেগরিঃ জানা-অজানা

1.

পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে হাজারো ভাষাভাষী জাতিগোষ্ঠী যারা আমাদের এই বসুন্ধরাকে করেছে বৈচিত্রময়। তেমনি উত্তর ভারতের জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যের লাদাখের লে শহর থেকে প্রায় ২৩০ কিলোমিটার দূরে ১৫,০০০ ফুট উচ্চতায় বিখ্যাত সো-মোরিরি হ্রদ। পূর্বে তিব্বত, পশ্চিমে জাঁসকার উপত্যকা- মাঝে রূপসু উপত্যকায় বিখ্যাত সো-মোরিরি। সো-মোরিরি হ্রদের ধারে ছবির মত সুন্দর কোরজোক গ্রাম, আর এই গ্রামে বাস করে যাযাবর তিব্বতী চাংপারা।

লাদাখ অঞ্চলটি হিমালয়ের একেবারে উল্টো দিকে। তাই মৌসুমী মেঘ হিমালয় বিভাজিকায় ধাক্কা খেয়ে বৃষ্টিপাত নামে দক্ষিণ অংশে আর উত্তর অংশ থেকে যায় বৃষ্টিহীন। শীতকালে এখানের তাপমাত্রা মাইনাস ৪০ ডিঃসেঃ পর্যন্ত নেমে আসে। রুক্ষ পাহাড়ের ধুধু প্রান্তরের কারণে অনেকে একে বলে চাঁদের পাহাড় আবার অনেকে বলে সরোবরের দেশ। তবে এখানে যে শুধু রুক্ষ পাহাড় তা নয়, পাহাড়ী খরস্রোতা নদী, সবুজ ভ্যালী ও বিখ্যাত হ্রদও রয়েছে।

2.

তিব্বতী ভাষায় চাংপা শব্দের অর্থ – “উত্তরের অধিবাসী”। চাংপা জাতিগোষ্ঠীর আদি বাসস্থান তিব্বতের উত্তর পশ্চিম দিকে অবস্থিত চাংতাং নামক উচ্চ মালভূমি অঞ্চলে। চাংপা পশ্চিম তিব্বত ও জম্মু এবং কাশ্মীর রাজ্যের জাঁসকার অঞ্চলে বসবাসকারী এক আধা যাযাবর তিব্বতী জাতি। হিমালয়া ও কারাকোরাম পর্বতমালার মধ্যবর্তী অঞ্চলে এদের বসবাস।

চাংপা যাযাবর মেয়ে সো-মোরিরি রূপকথার গল্পের ছোট্ট নায়িকা। তার ছিল পোষা আদরের এক গাধা। এ পাহাড় থেকে সে পাহাড়, বরফ ঢাকা মাঠ, নদী-ঝরনা পেরিয়ে যেতে যেতে কখন খেলার ছলে বরফ ঝড়ের কবলে পড়ে পাক খেতে খেতে সো-মোরিরি আর তার অবলা বন্ধু দিশা হারায়। তারপর কেটে যায় বহুবছর– কেউ ওদের আজও খোঁজ পায়নি। ওদের বিশ্বাস, এই নীল অতলে, হিমেল সরোবরের নিচে আজও শীতঘুমে আছে ওরা। সেই থেকে এর নাম হয় সো-মোরিরি।

3.somoriri Lek

চাংপাদের কিছু দল নির্দিষ্ট অঞ্চলে স্থায়ীভাবে বসবাস করে। আবার আরেকটি দল যাযাবর জীবন যাপন করে। এদের মধ্যে যারা যাযাবর জীবন যাপন করে, তাদের ফালপা বলা হয়। আর যারা যাযাবর জীবন ছেড়ে একস্থানে স্থায়ীভাবে বসবাস করে তারা ফাংপা নামে পরিচিত।

ঐতিহাসিক কাল থেকে চাংপা জাতি গোষ্ঠীর পশুপালকেরা লাদাখ থেকে তিব্বতের দিকে পশুচারনের জন্য যেত। কিন্তু চীন তিব্বত অধীগ্রহনের পর সেই পথ বন্ধ হয়ে যায়। ভারতের জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যের লাদাখ অঞ্চলের চাংপা জাতিগোষ্ঠীর মানুষের প্রধান পেশা পশুপালন। এরা দেখতে সুন্দর হয় তবে রুক্ষ প্রকৃতির সঙ্গে বেঁচে থাকার যুদ্ধে অল্প বয়সেই বয়সের ছাপ পড়ে যায়।

4.

চাংপাদের মূল জীবিকা পশুপালন। তার মধ্যে অন্যতম ছাগল, ভেড়া, ইয়ার্ক ও ঘোড়া। পশমিনা ছাগলের লোম থেকে তৈরী করা হয় দামী পশমিনা শাল। পাহাড়ের ১৫ হাজার ফিট উপরে এক ধরনের সবুজ ঘাস জম্মায় যা এই পশমিনা ছাগলের জন্য অত্যন্ত উপকারী। তাই চাংপারা এই ঘাসের জন্য বছরে ৫-৬ বার জায়গা পরিবর্তন করে থাকে। এই পশমিনা ছাগলের পশম নিকটস্থ পাইকারদের কাছে বিক্রির মধ্যেই চাংপাদের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ।

চাংপারা দুধের মধ্যে লবন, বাটার মিশিয়ে চা তৈরী করে। এছাড়াও বার্লির গুড়া থেকে সু-স্বাদু ছাতু তৈরী করে আহার করে। এদের খাবারের তালিকাতে দুধ এবং মাংস প্রিয়। চাংপারা ভাত-মাছ খেয়ে থাকে কালে-ভাদ্রে।

5. Nubra

পশমিনা ছাগলের পশম দিয়ে তৈরীকৃত তাবুতে এদেরকে বসবাস করতে দেখা যায়। চাংপারা অপদেবতার হাত থেকে রক্ষা পেতে প্রতিটি তাবুর মাঝখানে একগোছা পশমিনা ছাগলের পশম ঝুলিয়ে রাখে। অচেনা মানুষ ও রাতের তুষার চিতার হাত থেকে রক্ষা পেতে কুকুর পুষে থাকে। কুকুরের গলায় কাটাযুক্ত চওড়া বেল্ট পরিয়ে দেওয়া হয় যাতে তুষার চিতা কুকুরকে গলায় কামড় বসাতে না পারে।

যাযাবর সকল পরিবারের প্রধানদের মধ্য থেকে গব্বা (হেডম্যান) ৩ বছরের জন্য নিযুক্ত করা হয়। গব্বা বা হেডম্যানের কাজ চারণভূমি বরাদ্দের সমন্বয় করা, বিরোধ নিস্পত্তিতে তার কর্তৃত্ব প্রয়োগ করা। সরলতা, সততা, সামাজিক অবস্থা, খ্যাতি ও মধ্যস্থতা করার ক্ষমতার ব্যক্তিগত গুনাবলীকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হয়।

6.

চাংপারা যাযাবর ও অযাযাবর দুইভাগে বিভক্ত হলেও বিয়ে-শাদীতে বাধ সাধে না। তিব্বতী ভাষা হতে উদ্ভুত চাংস্কাত ভাষায় কথা বলে। ধর্মীয় দিকে থেকেও এরা তিব্বতী বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী। ২০০১ সালে চাংপাদের ভারতের সংবিধানে উপজাতির মর্যাদা দেয়া হয়।