ক্যাটেগরিঃ ভ্রমণ

অনেকদিন থেকে আমার একটা পাহাড় কেনার শখ। কিন্তু পাহাড় কে বিক্রি করে তা জানি না। যদি তার দেখা পেতাম, দামের জন্য আটকাতো না। আমার নিজস্ব একটা নদী আছে, সেটা দিয়ে দিতাম পাহাড়টার বদলে। সুনীল বাবুর মত আমারও একটা শখ আছে পাহাড় দেখার। তাই হেঁটে হেটে সুনীল বাবুর সুনীল আকাশে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে বেরিয়ে পড়লাম।

কাঞ্চনজঙ্গা স্থানীয় শব্দ “কাং চেং জেং গা” থেকে এসেছে, যার অর্থ তেনজিং নোরগে তাঁর বই  ম্যান অফ এভারেস্ট (Man of Everest)-এ লিখেছেন “তুষারের পাঁচ ধনদৌলত”। পাঁচটি পর্বতচূড়ার কারণে একে “তুষারের পাঁচটি ঐশ্বৰ্য” বলা হয়। ঈশ্বরের পাঁচ ভান্ডারের প্রতিনিধিত্ব করে, স্বর্ণ, রূপা, রত্ন, শস্য, এবং পবিত্র পুস্তক। তাই সিক্কিম এবং দার্জিলিংয়ের স্থানীয় লোকেরা একে পবিত্র মনে করে পূজা করে।

 

কাঞ্চনজঙ্গা হিমালয় পর্বতমালার পর্বতশৃঙ্গ। মাউন্ট এভারেস্ট ও কে২ এর পরে এটি পৃথিবীর তৃতীয় উচ্চতম পর্বতশৃঙ্গ যার উচ্চতা ৮,৫৮৬ মিটার (২৮,১৬৯ ফুট)। এটি ভারতের সিকিম রাজ্যের সঙ্গে নেপালের পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্তে অবস্থিত। এর পশ্চিমে তামূর নদী, উত্তরে লহনাক চু নদী এবং জংসং লা শৃঙ্গ, এবং পূর্বদিকে তিস্তা নদী অবস্থিত।

সান্দাকফু এখন পরিচিত ট্রাকিং রুট। সান্দাকফু থেকে হেটে যখন পৃথিবীর সর্বোচ্চ পাঁচটি চুড়ার চারটিই দেখতে পারবেন এবং বিশেষ করে কাঞ্চনজঙ্গার সু-উচ্চ পর্বতশৃঙ্গের উপর সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের ম্যাজিক্যাল আলোর বিকিরণ দেখে মনে হবে স্বর্গ দূরে নয় এখানে।

বর্ডার থেকে শিলিগুড়ি হয়ে দার্জিলিং যেতে যেতে রাত। রাতের দার্জিলিং এক অপূর্ব সৌন্দর্যে সাজে। সুউচ্চ পাহাড়ের ভাজে ভাজে মানব বসতির নিয়ন আলোয় পাহাড় সাজে এক আলো আধারির মায়াবি অপ্সরায়। রাস্তার পাশের টি শপে গাড়ি থামিয়ে চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে স্মৃতির ফ্রেমে বন্দি করতে পারেন সুখময় স্মৃতি।

সকালে দার্জিলিং থেকে সুখিয়াপুখরি হয়ে যাত্রা করলাম মানেভঞ্জন এর উদ্দেশ্যে। দুই পাহাড়ের মাঝে ৬,৯৯০ ফুট উচচ্চতায় পাহাড়ের ঢালে বসতবাড়ি আর নানা দোকান নিয়ে এক জমজমাট বাজার মানেভঞ্জন। যার অর্ধেকটা নেপাল অর্ধেকটা ভারত।
মানেভঞ্জন, সিঙ্গলিলা জাতীয় উদ্যানের প্রবেশপথ। দুইটার মধ্যে সিঙ্গালিলা পার্কের প্রবেশ ফি ও কর্তৃপক্ষের রেজিষ্টারে তথ্য দিয়ে ল্যান্ড রোভারে খাড়াই পর্বতে যাত্রা করলাম সান্দাকফুর উদ্দেশ্যে। সময় লাগবে তিন থেকে সাড়ে তিন ঘন্টা। হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হল মুশলধারে। পাহাড়ি পাথুরে খাড়া রাস্তা আর বৃষ্টিতে এডভেঞ্চারের মাত্রা বেড়ে দ্বিগুন। প্যাঁচানো পাহাড়ি পথ ধরে গাড়ি উপরে উঠছে। পিছনে বসায় নিচের দিকে তাকাতেই ভয়ে গলা শুকিয়ে যাওয়ার অবস্থা।

সিঙ্গালিলা পর্বত চুড়ায় জন্মানো বিষাক্ত গাছের নাম থেকে এর নাম হয়েছে সান্দাকফু। সান্দাকফু শৃঙ্গটি ৩৬৩৬ মিটার (১১৯৪১ ফুট উঁচু)। দার্জিলিঙের সিঙ্গালিলা জাতীয় উদ্যানের ধারে পশ্চিমবঙ্গ-নেপাল সীমান্তের এই শৃঙ্গ সিঙ্গালিলা পাহাড়ের সবচেয়ে উঁচু বিন্দু।

সান্দাকফু ট্রেকিং বা ভ্রমনের সবচেয়ে উপযুক্ত সময় মার্চ-এপ্রিল। এসময় চারিদিকে ফুলে ফুলে ছেয়ে যায় প্রকৃতি। অন্য সময় হল সেপ্টেম্বর – নভেম্বর। এখানকার আবহাওয়া বিবির মুডের মত ক্ষনে ক্ষনে পরিবর্তিত হয়। সান্দাকফু ট্রেকিং এর স্বর্গ রাজ্য হওয়ার অন্যতম কারণ পশ্চিমবঙ্গ – নেপাল সীমান্তে এই শৃ্ঙ্গ থেকে মাউন্ট জানু (কুম্ভকর্ণ), কাঞ্চনজঙ্ঘা ১, ২, ৩, কাব্রু নর্থ, কাব্রু সাউথ, রাথং, কোকতাং, ফ্রে, মাউন্ট এভারেস্ট, মাকালু, লোৎসে এবং ভুটানের চোমলহরি সুন্দরভাবে দেখা যায়।

ধোত্রে, টংলু হয়ে টুমলিং এসে চা বিরতি তুমুল বৃষ্টি হচ্ছে সঙ্গে মেঘ। গাড়ি থামিয়ে কফি খেয়ে সবাই একটু গরম হয়ে নিলো। সিঙ্গালিলা পার্ক থেকে সান্দাকফুর রাস্তা নেপাল সীমানা বরাবর। গৌরিবাস, কালাপোখরি, বিকেভঞ্জন হয়ে সান্দাকফু পৌছলাম। সূর্য্য অস্ত যাওয়ার অন্তিম মুহূর্তগুলো ক্যামেরা বন্দি করতে সকলে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। সন্ধ্যা হওয়ার সাথে সাথে ঠাণ্ডার দাপটে ঠিকে থাকা দায়। নেপালি হোম লজে রাত্রি যাপন।

 

পরের দিন সকালে আমাদের ট্রেকিং শুরু হল ফালুটের উদ্দেশ্যে। সান্দাকফু – ফালুট ট্রাকিংএ ফালুটের কাছে কিছু আপহিল হলেও সবচেয়ে চমৎকার অংশ এটি। এ পথে পানি ও খাবার পাওয়া যায় না মোলেতে গিয়ে চা-নুডুল পাওয়া যেতে পারে। তাও আবার অনিশ্চিত। তাই কিছু শুকনো খাবার ও পানি সঙ্গে নিয়ে যাওয়াই ভালো।

এপ্রিল-মে এ সময়টায় সান্দাকফু – ফালুট ট্রাকিং এ চারিদিকে ফুটে আছে লাল রডোডেনড্রন সঙ্গে বুনো কসমস সহ নাম না জানা পাহাড়ি ফুল। এখানকার অধিবাসীরা ফুল পছন্দ করে। তাই তাদের বাড়ির আঙ্গিনায় সুসজ্জিত ফুলের সারি চোখে পড়ল। বনের কোথাও এত নির্জন যে দলছুট হয়ে পিছিয়ে পড়লে গা ছিমছিম করে উঠে। মাঝে খাড়া পাহাড় বেয়ে উঠে দুচার মিনিট জিরিয়ে আবার হাটা শুরু। প্রচুর ঠান্ডা, সঙ্গে মেঘ, তার সঙ্গে যুক্ত হল গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি।

গাইড বলল সামনে সাবারগ্রাম। সাবারগ্রামে জল খাবারের ব্যবস্থা আছে। সেখান থেকে ফালুট আরো ৬ কিলোমিটার। বৃষ্টি কাদায় বিপর্যয় এবং ফালুটে হোটেল না পেয়ে সাবারগ্রাম থেকে নেমে মোলেতে গিয়ে আজকের মত ট্রাকিং শেষ করে মোলেতে রাত্রি যাপন।

 

 

পরের দিন ট্রেকিং শুরু শ্রীখোলার উদ্দেশ্যে। পিঁপড়ার সারির মত দলবেধে পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে হাটছি। মেঘের ঘনত্বের কারণে অল্প একটু সামনে কেউ কাউকে দেখছিনা। লুকোচুরিতে মনে হবে – মেঘ এখানে ওড়না ওড়িয়ে দিগঙ্গনার নৃত্য করছে। বনের মধ্য দিয়ে হাটছি আর ঘোর লাগা চোখের ওপর তখন উপছে পড়া আগুন। যেদিকে তাকাই সেদিকে দেখি রডোডেনড্রন গুচ্ছ। মনে পড়ল – রবি ঠাকুর তার শেষের কবিতা উপন্যাসে রডোড্রেনড্রন নিয়ে লিখেছিলেন –

হঠাৎ কখন সন্ধ্যা বেলায়,
নামহারা ফুল গন্ধএলায়
প্রভাত বেলায় হেলা ভরে করে
অরুন মেঘরে তুচ্ছ
উদ্ধত যত শাখার শিখরে
রডোডেনড্রান গুচ্ছ।

বৃষ্টি ভেজা মাটির গন্ধ, মোরগের ডাক, গলায় ইয়কের ঘন্টার আওয়াজ, পতপত করে উড়া প্রেয়ার ফ্লাগ। বনের মধ্য দিয়ে, পাহাড়ি ঝরা পার হয়ে এ পাহাড় থেকে সে পাহাড়, কারো বা বাড়ির আঙ্গিনা দিয়ে আমরা এগিয়ে চলছি। কেউ কেউ সুন্দর লোকেশন দেখে ছবি তুলতে গিয়ে দলছুট। পথে কফি শপের দেখা মিলল। কফি শপ থেকে কফি পান করে আবার হাঁটা শুরু। অবশেষে উঁচু দূর পাহাড় থেকে দেখা মিললো নিচে শ্রীখোলা নদী ও ব্রিজের।

এই খাড়া পাহাড় থেকে নামতে বেশ সময় লেগে গেল। সবাই থেকে গেল শ্রীখোলায়। শুধু আমি একা ছুটলাম নতুন গন্তব্যের উদ্দেশ্যে।