ক্যাটেগরিঃ ভ্রমণ

হিমালয়ের নামটা শুনলেই মনের মধ্যে একটা হিমশীতল শান্তি অনুভূত হয়। হিমালয় কন্যা অনিন্দ্য রুপসী কালিম্পং এর রোমান্সে আচ্ছন্ন হয়েছিলাম অঞ্জন দত্তের কাঞ্চনজঙ্ঘা গান শুনে।

পাহাড়ের বিশালতা মনের শক্তি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে কর্মদক্ষতা বাড়ায়। নিজ, সমাজ ও দেশকে চেনায়। আমরা দেহ নিয়েই ব্যস্ত। কিন্তু সুস্থ সবল দেহ নিয়ে বাঁচতে হলে মনেরও খোরাক চাই।

ভূতত্ববিদরা বলেন, ছয় কোটি বছর আগে ভূগর্ভের প্রাকৃতিক আলোড়নের ফলে হিমালয় ক্রমশ মাথা উঁচু করে দাঁড়ায়। ফলে গঙ্গা উপত্যকার সঙ্গে পাঞ্জাব ও কাশ্মীর উপত্যকার সৃষ্টি হয়। হিমালয়ের দুই-তৃতীয়াংশ না কি এখনও ভূগর্ভে।

হিমালয় শুধু একটি পর্বতশৃঙ্গ নয়; হিমালয়ের শাখা-প্রশাখার আরম্ভ মায়ানমার থেকে চীন তিব্বত সীমানা এবং সেখান থেকে আসাম, পশ্চিমবঙ্গ, নেপাল হয়ে পাঞ্জাব, হিন্দুকুশ ও আফগানিস্তান হয়ে মধ্যপ্রাচ্যের প্রান্তে চলে গেছে।

সমগ্র হিমালয়ের দৈর্ঘ্য কম বেশি ৫০০০ মাইল। প্রস্থে ৫০০ মাইল। কোথাও কোথাও তারও বেশি।

 

কালিম্পং নিম্ন হিমালয়ে অবস্থিত পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের ডেলো ও দুরপিন পাহাড়ের সংযোগরক্ষাকারী শিরার উপর অবস্থিত এই শৈল শহর। এক সময় যে শহর ছিল ভারত-তিব্বত প্রধান বাণিজ্যদ্বার, রাজনৈতিক সমীকরণে তা আজ অবরুদ্ধ।

চীন তিব্বত আক্রমণ করলে বহু বৌদ্ধ সন্ন্যাসী কালিম্পং চলে আসে এবং সাথে করে নিয়ে আসে দুস্প্রাপ্য তিব্বতী বৌদ্ধপুঁথি যা জ্যাং ঢোক পালরি ফোডাং বৌদ্ধমঠে সংরক্ষিত আছে। ১৮৬৫ইং সালে ইংরেজ দখলের আগে কালিম্পং ছিল ভূটানের অংশ।

নয়নাভিরাম সৌন্দর্য্য, সহজ যোগাযোগ ও মনোরম জলবায়ুর কারণে পর্যটকদের আকর্ষণ করে কালিম্পং। ৮০’র দশক থেকে কালিম্পং ও দার্জিলিং পৃথক গোর্খা রাজ্য প্রতিষ্ঠার আন্দোলন করে আসছে এতদ্বাঞ্চলের পাহাড়ে বসবাসকারী গোর্খা জাতি। এ কারণে শান্ত পাহাড় মাঝে মাঝে অশান্ত হয়ে উঠে। আন্দোলনে হতাহতের সংখ্যা হতে থাকে দীর্ঘ থেকে দীর্ঘ।

এরপর কেন্দ্র, পশ্চিমবঙ্গ সরকার ও পাহাড়ি মোর্চার মধ্যে এক ত্রিপক্ষীয় চুক্তিতে দার্জিলিং ও কালিম্পং এর নতুন নাম হয় গোর্খাল্যান্ড টেরিটোরিয়াল এডমিনিটষ্ট্রেশন (জিটিএ)। জিটিএ নিয়ে একটা আলাদা আধা স্বায়ত্বশায়িত প্রশাসনিক ব্যক্তিবর্গ (বডি) তৈরি হয়। এই বডির প্রশাসনিক, কার্যনির্বাহী, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা আছে শুধু আইন করার ক্ষমতা নেই।

হিমালয় থেকে জন্ম হওয়া তিস্তা পাহাড়ের বুক চিরে পশ্চিমবঙ্গ ও সিকিমকে আলাদা করেছে। ৩০৯ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে এটি পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলা দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে।

দার্জিলিং থেকে একটু সকালেই যাত্রা কালিম্পং এর উদ্দেশ্যে। কালিম্পং যাওয়ার রাস্তাটি পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন। দুইপাশে পাহাড় সাথে বহমান নদী তিস্তা। সারি সারি পাইনসহ নানা বৃক্ষ, রাস্তার পাশে বানরের উপস্থিতি চোখে পড়ল। দূরের সুউচ্চ পাহাড়, পাহাড়ের গায়ে ভেসে বেড়ানো মেঘ, পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথে গাড়ির ছুটে চলা। পাহাড়ের গা ঘেঁষা বাড়িঘরগুলো দেখতে ছবির মত সুন্দর।

দার্জিলিং থেকে কালিম্পং এর দূরত্ব ৫৫ কিলোমিটার। তিস্তা নদীর উপর নির্মিত তিস্তা ব্রিজের এক পাড়ে দার্জিলিং অন্য পাড়ে কালিম্পং।

তিস্তা ব্রিজ সংলগ্ন অ্যাডভেঞ্চার ইভেন্ট রিভার রাফটিং ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে।

কালিম্পংকে মনে হবে মন্দিরের শহর। এর পর্যটন স্পটগুলো দুই পাহাড় মুখি ডেলো ও দুরপিন, যার অবস্থান দুই দিকে। ডেলো হিলের দিকে পাহাড় বেয়ে আমাদের গাড়ি উঠতে লাগলো।

হনুমান মন্দির, বৌদ্ধ মন্দির। দুই মন্দির থেকে ডেলো হিলের চুড়ায়। কালিম্পং এর সবচেয়ে উঁচু এই চুড়ায় আছে সাজানো উদ্যান। বাগানের একপাশ দিয়ে উঠে গেছে বাধানো রাস্তা। সবুজ ঘাসে ঢাকা মাঠ, বসার চত্তর। চুড়ার এক পাশে পাইন গাছের জঙ্গল। পাহাড়ের চুড়ায় আছে সরকারি টুরিষ্ট লজ। নিচের ভ্যালিতে তাকালেই সরু ফিতের মত বয়ে যাওয়া তিস্তা।

কালিম্পং ট্যুরের সবচেয়ে আকর্ষনীয় দিক হলো ডেলো হিলের অ্যাডভেঞ্চার জার্নি প্যারাগ্লাইডিং। মানালি ও পুখারাতে প্যারাগ্লাইডিং হয়। কয়েক দিনের বৃষ্টি পর আবহাওয়া ভালো থাকায় এ সুযোগ হাতছাড়া করলাম না।

বৃষ্টি পরবর্তী পাহাড়ের সবুজ গাছপালা ও ঝকঝকে আবহাওয়ায় সব কিছু সুন্দর লাগছিল। ডেলো পাহাড় থেকে কালিম্পং শহরের কয়েক কিলোমিটার ব্যাসার্ধ জায়গা নিয়ে প্যারাসুটে পাখির চোখে কালিম্পং, সিকিমের রাজধানী গ্যাংটক দেখা সত্যিই অসাধারণ এক অভিজ্ঞতা।

ডেলো পাহাড়ের মত দুরপিন পাহাড়ও পর্যটক বিশেষভাবে আকর্ষণ করে। পাথুরে খাড়া আঁকাবাঁকা রাস্তা উঠে গেছে দুরপিনের চুড়ায়। এ পথে রয়েছে ভারত সেনাবাহিনীর ২৭ হিমালয়ান রেজিমেন্ট। রবীন্দ্রনাথের স্মৃতি বিজড়িত গৌরিপুর হাউজ (চিত্রভানু) আর পাইন ভিউ নার্সারি।

দুরপিনের অবজারভেটরি পয়েন্ট থেকে পাহাড় ও সমতলের ৩৬০ ডিগ্রীতে অসাধারণ ভিউ পাওয়া যায়। মনাস্ট্রির প্রবেশ করে মাখনের প্রদীপ, বিশাল বৌদ্ধমূর্তি, ঘূর্ণায়মান কাঠের চরকি, গেরুয়া বসন পরা ক্ষুদে বৌদ্ধ শিক্ষার্থী, তিনতলা আবাসিক ভবন। সাথে একটি বিশাল মাঠ। দুরপিন দারা মনাস্ট্রিতে ঘুরে মন ভালো হয়ে যাবে।

কালিম্পংএর অর্থনীতিতে ফুলের বিশেষ অবদান তাই নার্সারিও প্রচুর। তবে ব্যক্তিগত উদ্যোগে গড়ে তোলা পাইন ভিউ নার্সারি একটু ভিন্ন রকম। প্রায় অর্ধ শতাব্দী আগে শ্রী মোহন সমশের প্রধান নামক এক ক্যাকটাসপ্রেমী এই ক্যাকটাসের বাগানটি গড়ে তোলেন। তার এই বাগানে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ক্যাকটাসের সংগ্রহ রয়েছে। এই সংগ্রহশালা দেখে অভিভূত না হয়ে উপায় নেই কারো।

পাহাড়ের কোল ঘেঁষে গড়া গৌরিপুর হাউজ যা স্থানীয়ভাবে চিত্রভানু নামে পরিচিত। মংপুর যাওয়া-আসার সময় প্রায়ই রবীন্দ্রনাথ এখানে অবকাশ যাপন করতেন।

১৩৪৫ সালের ২৫শে বৈশাখ  ৮০তম জন্মদিনে নিজের লেখা জন্মদিন কবিতাটি তিনি টেলিফোনে আবৃত্তি করেছিলেন, যা সরাসরি সম্প্রচার করে অল ইন্ডিয়া রেডিও’র  ‘আকাশবাণী কলকাতা’৷

কিন্তু বাড়িটি দেখে খুবই মন খারাপ হয়ে গেল। কবির এই স্মৃতিচিহ্নটি আন্দোলনকারীদের দ্বারা আজ ধ্বংস।

ফেরার পথে তিস্তা ব্রিজ, কালিঘাটের তিস্তা ড্যাম ও করোনেশন ব্রিজ দেখতে দেখতে সমতলের শিলিগুড়ির দিকে এগুচ্ছি আর ভাবছি – সমতলের অধিকাংশ নদী সমুহের উৎসভূমি হিমালয় পর্বতমালা। হিমালয় জীবের প্রাণধারক। গুরুগম্ভীর হিমালয়ের এক নিজস্ব ভাষা আছে। যারা হিমালয়কে অন্তর দিকে ভালোবেসেছে, তারা সে ভাষা অন্তরে বসিয়ে কান পেতে শুনতে পায়।