ক্যাটেগরিঃ ভ্রমণ

কৈশরের গল্পে শোনা কাশ্মির আমার কাছে আপেলের দেশ হয়ে ছিল। বড় হয়ে জানলাম মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীর এর নাম দিয়েছে ভূ-স্বর্গ। সেই স্বপ্নের কাশ্মির দেখতে অবশেষে শ্রীনগরে।

শীতে শুভ্র বরফে আচ্ছাদিত হয় উপত্যকা। ফলের মৌসুমে আপেলের বাগানে ব্যস্ত হয়ে পড়ে কৃষক। বসন্তে জাফরানসহ নানান ফুলে ঝলমল করে উপত্যকা।

ভাবতেই অবাক লাগছে মধ্য হিমালয়ের পীরপাঞ্জাল পর্বতমালার মাটি পায়ের নিচে। মাথার উপর কাশ্মিরের আকাশ। ঝিলাম নদী, ডাললেক, চিনার, দেবদারু, মুগল গার্ডেন, হযরতবাল মসজিদ, কাশ্মির বিশ্ববিদ্যালয়, জাফরান, স্বর্গীয় ফল আপেলের শহরে বুকভরে নিঃশ্বাস নিচ্ছি। স্বপ্নের কাশ্মির এখন আমার কাছে বাস্তব।

কাশ্মিরের সুইজারল্যান্ড খ্যাত পেহেলগাম যাওয়ার পথে পড়বে দক্ষিন কাশ্মিরের পুলওয়ামা জেলা। পুলওয়ামা জেলার পাম্পোরে কাশ্মিরের সবচেয়ে বেশি জাফরান জন্মায়। পাম্পোরের দূরত্ব ঝিলাম নদীর শহর শ্রীনগর থেকে মাত্র ১১ কিলোমিটার। যাওয়ার পথে এঁকেবেঁকে চলা ঝিলাম কোথাও কোথাও আপনার সঙ্গী হবে।

জম্মুর অর্থনীতি শিল্পসম্পৃদ্ধ হলেও কাশ্মির ভ্যালির অর্থনীতি মূলত কৃষি নির্ভর। এর রপ্তানীর থেকে আমদানি বেশি। অর্থনীতির ভাষায় যাকে বলে ভোক্তা অর্থনীতি। জাফরান, আপেল ও হস্তশিল্পই এখানকার অর্থনীতির চালিকা শক্তি আর সঙ্গে পর্যটন শিল্প।

বাদশা জয়নুল আবেদীন দক্ষিন কাশ্মিরসহ বিভিন্ন অঞ্চলে পাহাড়ি ঝরনা থেকে নালা তৈরি করে কৃষির উন্নয়ন সাধন করেন। দক্ষিণ কাশ্মির মূলত কৃষি নির্ভর। প্রায় সকল কাশ্মিরীদের বাড়ির সামনে ছোট-বড় সবজি বা ফুলের কোনো না কোনো বাগান আছে। এ অঞ্চলের জেলা পুলওয়ামায় সবচেয়ে বেশি জাফরান ও অনন্তনাগ জেলায় সবচেয়ে বেশি আপেল জন্মায়।

নাজিরের পাশের আসনে বসে স্বভাবসূলভ বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলতে বলতে চলে এলাম পুলওয়ামা জেলার পাম্পোরের লেথাপোরায়। হাইওয়ের পাশে লাইন ধরে সকল মসলার দোকান। নূর মোহাম্মদ বক্স নামের প্রসিদ্ধ এক ড্রাইফুডের দোকানের সামনে আমাদের গাড়ি দাঁড়ালো।

ড্রাইভার নাজির পাশের দোকান থেকে কাহওয়া ফরমায়েশ করল। দারুন জিনিস কাশ্মিরী কাহওয়া চা। জাফরান, কাঠবাদাম, মধু, এলাচ, দারুচিনি ইত্যাদি মেশানো খুবই সতেজ করা পানীয়।

জাফরান বিশ্বের সর্বাপেক্ষা মূল্যবান মসলার একটি। এটি গ্রিসে প্রথম চাষ করা হয়েছিল। স্পেনের ‘লা মাঞ্চা’ অঞ্চলের জাফরানের সুবাস সবচেয়ে ভাল এবং পৃথিবীর সরবরাহকৃত জাফরানের ৭০ ভাগ উৎপাদিত হয় স্পেনে। এছাড়াও তুরস্ক, পাকিস্তান, ইরান, ইতালিসহ ইউরোপ ও এশিয়ার প্রায় ২০টি দেশে জাফরান চাষ হয়।

জাফরান ফুল দেখতে যেমন আকর্ষনীয় তেমনি সুগন্ধ এর। প্রাকৃতিক কারণে জাফরান ফল তৈরি করতে পারে না। ফলে বংশ বিস্তারের জন্য মানুষের সাহায্য প্রয়োজন হয়। বীজ না হওয়ার কারণ হচ্ছে এই উদ্ভিদের দেহে কোন মিয়োসিস কোষ বিভাজন হয় না। পুং রেণু আর স্ত্রী রেণু তৈরি হয় মিয়োসিস কোষ বিভাজন থেকে। পুং রেণু ও স্ত্রী রেণুর মিলনেই বীজ তৈরি হয়। যেহেতু এর দেহে মিয়োসিস বিভাজন হয় না সেহেতু পুং রেণু ও স্ত্রী রেণুও তৈরি হয় না বিধায় বীজও হয় না।

তাহলে প্রশ্ন থাকে বীজ ছাড়া উদ্ভিদ জন্ম নেয় কীভাবে? চার বছর পর পর জাফরান উদ্ভিদের মূলে ক্রোম বা টিউব সৃষ্টি হয়। অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা খুব সাবধানে এটি সংগ্রহ করে রোপন করে। দেখতে অনেকটা পেঁয়াজের মত। রোপনের প্রথম বছর সাধারণত গাছে ফুল আসে না। একটি জাফরান গাছ পর পর তিন থেকে চার বছর ফুল দিয়ে থাকে।

জাফরান ফুলে লাল বর্ণের তিনটি গর্ভদণ্ড থাকে। এই গর্ভদণ্ড সংগ্রহ করে শুকিয়ে জাফরান প্রস্তুত করা হয়। এক গ্রাম জাফরান পেতে প্রায় ১৫০টা ফুটন্ত ফুলের প্রয়োজন হয়। প্রতি কেজি জাফরানের মূল্য প্রায় তিন থেকে চার লাখ টাকা।

প্রায় সব ধরনের মাটিতেই জাফরান চাষ করা যায় তবে বেলে-দোঁআশ মাটি এ ফসলের জন্য বেশি উপযোগী। এঁটেল মাটিতে বিশ শতাংশ বালু ও চল্লিশ শতাংশ জৈব সার মিশিয়ে চাষের উপযোগী করা যায়।

জনশ্রুতি আছে মিশরের রাণী ক্লিওপেট্রা তার স্নানের জলে সুগন্ধি ছড়াতে জাফরান ব্যবহার করত। আলেকজান্ডার যুদ্ধক্ষেত্রে তার শরীরের ক্ষত পরিস্কার করতে ব্যবহার করত জাফরান মেশানো পানি। আমাদের দেশে জাফরান ব্যবহার করা হয় জরদা, পায়েশ এবং বিরিয়ানিতে।

জাফরান গ্যাস্ট্রিক, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদপিণ্ডের সমস্যা দূর করে এবং খাদ্য হজমে সহায়তা করে থাকে। পরিমাণমত জাফরান নিয়মিত খেলে ফুসফুসের বিভিন্ন রোগ দূর হয়ে যায়। অনিদ্রা দূর করে জাফরান। যে কোনো ধরণের ব্যাথা নিরাময়ে জাফরান অত্যন্ত কার্যকরী। স্মৃতিশক্তি ও চিন্তাশক্তি বৃদ্ধিতেও এটি বেশ সহায়ক। এছাড়াও আরো অনেক রোগের উপকার করে।