ক্যাটেগরিঃ নাগরিক আলাপ

 

আমরা যারা পদ্মার ওপারের বৃহত্তর ফরিদপুরের মানুষ তারা জন্ম লগ্ন থেকেই পদ্মা নদীর উপরে একটি সেতুর স্বপ্ন লালন করে আসছি। কারন নদী পারাপারের সময় আমাদের অনেক আত্মীয় পরিজনকে এই সর্বনাশা পদ্মা গিলে খেয়েছে। বর্ষা কালে ঢাকা থেকে বাড়ি যাওয়ার কালে যখন লঞ্চ বা ফেরিতে উঠি এবং প্রচণ্ড ঢেউ শুরু হয় তখন মনে হয় এই বুঝি সাঙ্গ হল জীবনের সব লেনদেন। ভাবি এইবার আল্লাহ বাঁচালে আর কোণ দিন পদ্মা নদী পার হবনা। কিন্তু নাড়ীর টান কেউ তো অস্বীকার করতে পারেনা। জীবন বাজি রেখে আবার সেই আত্মাহুতি দেওয়ার প্রচেষ্টা। আশায় বুক বাঁধি পদ্মার উপর সেতু হলে আমাদের আর দুঃখ থাকবেনা। আমাদের নেত্রীও আমাদের স্বপ্ন দেখাতে থাকে যে ক্ষমতায় গেলে তারা পদ্মার উপর সেতু করে দিবে। স্বপ্নে বিভোর আমরা পদ্মা নদীর ওপারের মানুষেরা বাছ বিচার না করে বিপুল ভোটে বিজয়ী করে ক্ষমতার মসনদে বসাই আওয়ামী লীগকে।

ক্ষমতায় এসেই তারা আমাদের আশার বানী শোনায় যে এই সরকারের আমলেই পদ্মা সেতু নির্মাণের কাজ শেষ হবে এবং সেতুর উপর দিয়ে গাড়ি চলবে। সেতুর কাল্পনিক ছবিও আমাদের দেখানো হয়। আমরা অপরূপ মমতায় সেই স্বপ্নের সেতুর ছবি আমাদের ঘরের দেওয়ালে ঝুলিয়ে রাখি। মাস গড়িয়ে বছর যায়। বছরের পর বছর। এভাবে তিন বছরেরও অধিক কাল। অবশেষে স্বপ্ন ভঙ্গ। কারন বিশ্ব ব্যাংক ঋণ চুক্তি বাতিল করেছে। কেন বাতিল করল? কারন আমাদের সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে সেতু নির্মাণের শুরুতেই দুর্নীতি হয়েছে। তাদের কাছে তার প্রমান ও আছে। সেই প্রমান তারা সরকারের কাছে সরবরাহ ও করেছে। বিশ্ব ব্যাংক চেয়েছে এই দুর্নীতির ব্যাপারে সরকারের সুস্পষ্ট পদক্ষেপ। কিন্তু আমাদের সরকার নির্বিকার। সেতু হোক আর না হোক দুর্নীতিবাজ মন্ত্রী ও নেতাদের কে রক্ষা করতেই হবে। কারন সরকার জানে আমাদের মতো বোকা বাঙ্গালীদেরকে কিছু একটা বলে বুঝান যাবে। কিন্তু দলকে তো আর ডোবানো যায় না। সরকার হয়ত ভাবছে সরকারের মেয়াদের শেষ সময়ে নির্বাচনের আগে আবার মুনশিগঞ্জের পয়েন্টে সামান্য কয়েক টাকার ইট বালু দিয়ে একটা কিছু করে আনুষ্ঠানিক পদ্মা সেতুর ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করলেই হবে। যেমনি করেছিল ২০০১ সালে ক্ষমতা ছাড়ার আগ মুহূর্তে। কোণ পরিকল্পনা নেই, বাজেট নেই, অর্থ নেই অথচ প্রধান মন্ত্রী পদ্মা সেতুর ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করলেন। জাতির সাথে কত বড় বেইমানি! সহজ সরল জনগনের দুর্বল জায়গায় কতবড় আঘাত!

এতো বড় প্রতারনা করেও ক্ষমতায় আসতে পারল না আওয়ামীলীগ। আমরা ধৈর্য ধরে রইলাম। ভাবলাম আমাদের দল ক্ষমতায় আসলে পদ্মা সেতু হবেই। কিন্তু এবার যখন দেখলাম আবার সেই প্রতারনা, সেই ভাঁওতাবাজি, সেই দুর্নীতি। বিশ্ব ব্যাংক ঋণ চুক্তি বাতিল করার পরেও যোগাযোগ মন্ত্রী বলছেন সঠিক সময়ে পদ্মা সেতুর কাজ শুরু হবে। আমরা জানি সবই ভাঁওতা। ঢাল নাই তলোয়ার নাই নিধিরাম সর্দার। যেখানে সরকার জনগনের মৌলিক চাহিদা মেটাতে আজ হিমসিম খাচ্ছে সেখানে পদ্মা সেতুর মতো এতো বড় একটা প্রকল্প নিজস্ব অর্থায়নে করার চিন্তা একটা অলিক কল্পনা ছাড়া আর কিছুই না। আওয়ামীলীগ সরকারের এবার ভাগ্য খারাপ। জনগন এখন আর ২০০০ সালের মতো অত বোকা নেই। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির কল্যাণে মানুষ এখন অনেক সচেতন। আমদের স্বপ্ন ভাঙার সব দায় এই সরকারের। এবার যদি আর সেতুর ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করার মতো মানুষের চোখে ধুলা দেওয়ার মতো ভাঁওতাবাজি করে তাহলে আওয়ামীলীগ তার দাত ভাঙ্গা জবাব পেয়ে যাবে। মানুষের মোহো ভেঙে গেছে। স্বপ্ন দুঃস্বপ্নে পরিনত হয়েছে। স্বপ্ন ভাঙার ভয়ে মানুষ আর নতুন করে স্বপ্ন দেখতে ভয় পাচ্ছে। এবার আর স্বপ্ন নয় বাস্তব মুখি পদক্ষেপ। কারন বিবেকবান মানুষ একই সাপের গর্তে বারবার দংশিত হয়না।