ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

 

বুক রিভিউ না বলে বলছি কেন পড়বেন “ন হন্যতে।”

মৈত্রেয়ী দেবী যাকে সবসময় পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয় বিখ্যাত দার্শনিক সুরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্তের কন্যা, রবীন্দ্রনাথের ভাবশিষ্য আর স্নেহে লালিত (protégée), আবার তিনি পরিচিতও হন মির্চা ইলিয়াড (ইউক্লিড) নামের বিখ্যাত রোমানিয়ান দার্শনিক এর “লা নুই বেঙ্গলী” উপন্যাসের নায়িকা হিসেবে। The Bengali Nights নামে মির্চা ইলিয়াডের লেখা নিয়ে সিনেমাও হয়েছিল।

১৯৩০ সালে ঘটে যাওয়া একটি কাহিনি চল্লিশ বছর পর লেখিকার প্রাক্তন বিচ্ছেদের পুনর্জাগরণ “ন হন্যতে।” পুনর্জাগরণ বলা ভুল হবে, It never dies! লেখিকার আত্মজীবনীমূলক এই উপন্যাস মূলত প্রেমিক মির্চা এলিয়াডের লেখা Bengali Nights এর প্রতি উত্তর।

লেখিকা ঠিকই বলেছেন, জ্ঞানের আলো, বুদ্ধির আলো ইত্যাদি সব কিছুরই একটি সীমানা আছে। প্রেমের আলোর সীমানা নেই।

Na-hannyate

সুরেন্দ্রনাথের মতো জাত্যভিমানী অহংকারী পণ্ডিত বলে বসতো হয়তো, শুদ্র লেখক শুদ্র পাঠকের জন্যে কি লিখবে? আসলেই তাই। তবে জ্ঞানভারে ন্যুব্জ এসব পণ্ডিত পাঁঠাদের নিয়ে পড়ে কোনো একদিন আলোচনা করা হবে। এই বইটি নিয়ে এতো লেখা হয়েছে আমার লেখাটাই নতুন তথ্যের চেয়ে আমার যা মনে হয়েছে তাই লিখছি। তা ঐতিহাসিক ঘটনার বিচার বিবেচনার জন্যে নয়।

বইটিতে লেখিকার জীবনবোধ আর গভীরতায় যেকোন পাঠক মাত্রই পছন্দ করে বসবেন। প্রেম, পরিণয় নিয়ে গসিপ করার মতো সস্তা ভুড়ি ভুড়ি লেখার ভীড়ে, এই বইটি পড়ে আপনার নিঃসন্দেহে মনে হবে, এত বছর ধরে আপনি যে প্রেম ভালোবাসার সম্পর্কে আছেন, তার ভীত কতটুকু মজবুত? নাকি শরীর সর্বস্ব।

ষোল বছরের নায়িকার জীবনে অভাবিতের মতো আবির্ভূত হয় বাবার ছাত্র সম্পূর্ণ ভিনদেশী মির্চা। মির্চা ভারতীয় হওয়ার সাধনায় নিমগ্ন। ভারতীয় দর্শন শিক্ষায় ছাত্রত্ব নিয়েছে নায়িকার ক্ষমতাবান, জ্ঞানতাপস, সম্ভ্রান্ত পিতার। বিশাল নামডাক তাদের। ভবানীপুরের বিখ্যাত বাড়িতে রোজ আনাগোনো হয় তৎকালীন বিখ্যাত সব লেখক লেখিকা, সম্পাদকদের, এমনকি স্বয়ং রবীন্দ্রনাথও। রবীন্দ্রনাথকে মৈত্রেয়ী দেবী যেভাবে ভালোবাসতেন, সেই নিষ্কাম ভালোবাসায় তো মীরা বাঈয়ের কৃষ্ণের প্রতি। গীতগোভিন্দম -এর লাইনগুলো এই উপন্যাস না পড়লে আমিও মৈত্রেয়ী দেবীর মতো এতো কাছ থেকে অনুভব করতে পারতাম না। রাধা-কৃষ্ণ নিয়ে আমিও হয়তো “কৃষ্ণ করলে লীলা, আমরা করলে বীলা…”এরকম চটুল, আর গল্পসর্বস্ব চিন্তার কূপে ডুব দিয়ে ভীষণ ভালো থাকতাম, তবে মুক্তি মিলতো না। পেতান না ভালোবাসার শক্তির গভীর স্পর্শ।

মির্চা বলেছিল মৈত্রেয়ীকে, আমি তোমাকে না তোমার আত্মাকে ধরতে চাই। চল্লিশ বছর পরও যখন মৈত্রেয়ী দেবীর সেই শিহরণ জাগে অন্যের ঘরানী হয়ে, পুত্রপৌত্রে বর্ধিষ্ণু সামাজিক কৌঠরে তখন তিনি প্রশ্ন করেন নিজেকে, কি সেই অনুভব? যা সবকিছুর পরও বেঁচে থাকে? বিস্মৃতির অতলে যা হারিয়ে যায় না। “ন হন্যতে” মানে দেহের ভিতর, এর পুরোটা শ্লোকের অর্থ “তার মৃত্যু নেই, ক্ষয় নেই, অব্যয়।” তিনি সত্যিই বিরহানলে জ্বেলেছেন সব। সব কবিরাই কেন জানি বিরহ, বিরহ, বিরহের জয়গান করেছেন। মৈত্রেয়ী দেবীরও সেই প্রশ্ন। উত্তরও খুঁজে পেয়েছেন।

শুধু মাত্র জাতের মিল ছিলো না – নাহয় মির্চা খুব আপন করে নিয়েছিল পরিবারের সবাইকে। অথচ এত প্রতিভাবান পরিবারও সংস্কার ভাঙার সাহস করে নি, আত্মগরিমার জন্যে। তার পিতাকে দেখি সে মৃত্যুর আগেও ভালোবাসে আর মির্চা এতো দোষ দিয়েছে লেখায় তাও বই উৎসর্গ করেছে তার গুরুকে।

এই যে দীর্ঘ বিচ্ছেদ, তার প্রেক্ষাপট, শুধু ক্ষণিক দেখতে চাওয়াটাও এতো বছর পর কি পূরণ হয়েছে মির্চার? সব ছেড়ে নায়িকা, বৃদ্ধা কম্পিত শরীরে, শিকাগোতে পৌঁছায় মির্চার বই বিশিষ্ট কক্ষে। সমস্ত অভিমান, অভিযোগ ফেলে মৈত্রেয়ী দেবী চেয়েছিলো মির্চাকে দেখতে এক পলক। মির্চা তাকাবে না। কারণ সে তার স্বপ্নের ফ্যান্টাসীর মৈত্রেয়ীকে রেখে এসেছে ভারতে।

কিন্তু স্বপ্ন সত্যি হলেও জগতের ট্র্যাজেডি দেখ – মির্চার দুচোখ পাথর হয়ে গেছে! মৈত্রেয়ী দেবী কি করবেন?

রেটিং দিই না। এতো প্রশংসা করেছি লেখিকার জীবনবোধ আর প্রজ্ঞার জন্য। একটু উঁচুমানের লেখা যারা পছন্দ করেন, মৈত্রেয়ীদেবী নিরাশ করবেন না। আর রবীন্দ্রনাথের উপস্থিতি মৈত্রেয়ী দেবীকে দিয়েছে পরম সত্য প্রকাশের সাহস- যেনো প্রতিটি কবিতা, গানের চরণ অনুভবই দিয়েছে তাকে আরোও প্রগাঢ় অনুভব।