ক্যাটেগরিঃ প্রশাসনিক

 

শেখ হাসিনার বর্তমান ডিজিটাল সরকার আর বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলার সরকার- এই দুইয়ের মাঝে তফাৎ খোঁজার কোনো চেষ্টা কি করছেন আজকের দিনের মুজিব সেনারা বা আওয়ামী লীগ? বাহাত্তরের সংবিধান থেকে যেদিন অসাম্প্রদায়িকতা তুলে দিয়ে শেখ মুজিবের মৃত্যুর পর স্বাধীন বাংলার চেতনায় শুধু পেরেক মারা হয়নি, তখন থেকে সেই বিভ্রান্তি আর অপপ্রচারের ঢামাঢোলের রেশে হারিয়ে যেতে থাকে মুজিবের অর্থ ব্যবস্থাও। এমনকি বর্তমান আওমীলীগও যেন তার উল্টোপথেই চলছে? কীভাবে?

বাংলাদেশের মানুষ জাতীয়তাবোধ থেকে উদ্দীপ্ত হয়ে যতটা না লড়াই করেছে পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে, তার চেয়েও বেশি প্রভাবিত হয়েছে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর অসীম নিপীড়ন, এক চরম অর্থনৈতিক বঞ্চনা আর শোষণ দ্বারা। আর তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল স্বাধীন দেশের স্বপ্নে, যেখানে ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান হবে স্বল্প। যেখানে এদেশের গরিব-দুঃখী মানুষ অর্থনৈতিক মুক্তির দিশা খুঁজে পাবে। ১৯৭২ সালের ২৬ মার্চ প্রথম স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে বেতার ও টিভি ভাষণে ‘কেমন বাংলাদেশ চাই’ প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘আমার সরকার অভ্যন্তরীণ সমাজ বিপ্লবে বিশ্বাস করে। এটা কোনো অগণতান্ত্রিক কথা নয়। আমার সরকার ও পার্টি বৈজ্ঞানিক সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি প্রতিষ্ঠা করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। একটি নতুন ব্যবস্থার ভিত রচনার জন্য পুরাতন সমাজব্যবস্থা উপড়ে ফেলতে হবে। আমরা শোষণমুক্ত সমাজ গড়বো।”

লক্ষ্য করুন ১৯৭৩ সালে মুজিব সরকার প্রতি প্রচারিত পে স্কেল এর দিকে এবং অষ্টম পে স্কেলের দিকে (২০১৫ সাল)।

২০১৫ সালের পে স্কেল অনুযায়ী সর্বোচ্চ বেতন আর সর্বনিম্ন বেতনের রেঞ্জ ৮২০০-৭৮০০০। অষ্টম পে-স্কেলে ঘোষিত ২০টি গ্রেডের সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন গ্রেডে বেতনের অনুপাত দাঁড়িয়েছে ১:৯.৪৫, যা সপ্তম পে-স্কেলে ছিল ১:৯.৭৫। তবে অঘোষিত দুটি গ্রেডের একটির অর্থাৎ সিনিয়র সচিব ও সামরিক বহিনীর সমপদমর্যাদার কর্মকর্তাদের বেতন ৮২ হাজার টাকার (নির্ধারিত) সঙ্গে তুলনা করলে অনুপাত দাঁড়ায় ১:৯.৯৩ এবং অন্যটির অর্থাৎ মন্ত্রিপরিষদ সচিব, মুখ্য সচিব, সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনী প্রধানদের বেতন ৮৬ হাজার টাকার (নির্ধারিত) সঙ্গে তুলনায় অনুপাত দাঁড়ায় ১: ১০.৪২। কিন্তু ১৯৭২ সালের ২১ জুলাই বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় বেতন কমিশন গঠনের সময় বাংলাদেশ সরকারে চাকরিরত সাবেক পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং সাবেক পূর্ব পাকিস্তান সরকারের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পে-স্কেলের সংখ্যা ছিল ২২০৮টি। তৎকালীন রাজনৈতিক চিন্তাধারা অনুসরণে সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা গঠন লক্ষ্যের আওতায় কমিশন ২২০৮টি পে-স্কেলকে ১০টি জাতীয় গ্রেড ও বেতন স্কেলে সংকুচিত করার সুপারিশ করে। এতে সর্বোচ্চ (গ্রেড-১) এবং সর্বনিম্ন গ্রেডের (গ্রেড-১০) বেতন সুপারিশ করা হয় যথাক্রমে ২,০০০ (নির্ধারিত) এবং স্কেল ১৩০ থেকে ২৪০ টাকা। ২ হাজারের বেশি পে-স্কেলকে ১০টিতে রূপান্তর করতে গিয়ে সরকার এক বিরাট সমস্যার সম্মুখীন হয় এবং শেষ পর্যন্ত নিচের দিকের ৬টি স্কেল অর্থাৎ ৫ থেকে ১০ নং স্কেলগুলো বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত করা হয়। (সূত্র: website finance ministry and বণিকবার্তা, আব্দুল লতিফ মণ্ডল)।

মানে তখন অনুপাত কত হয় হিসেব করুন? তাছাড়া এখনকার মতো ২০টি ধাপ থাকার মানে, একজন অপেক্ষাকৃত নিচে স্তরে জয়েন করলে তার উপরে যেতে অনেক সময় লাগবে। আর নিচার স্তরে যারা আছে তাদের পদোন্নতির সুযোগ থাকে না বললেই চলে।

সেটা মাঝখানের যেকোন ধাপ থেকে অন্য পরবর্তী ধাপে যাওয়ার জন্যও প্রযোজ্য। আর তাতে করে দেখা গেল, এই সরকার বঙ্গবন্ধুর অর্থনৈতিক ব্যবস্থা থেকে দূরে সরে গিয়ে কার্যত ধনী-গরীব বৈষম্য আরোও বাড়িয়ে দিচ্ছে। তাহলে এতো বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন হেন তেন বলে এত ব্যবধান তৈরি করা মানে কি? সরকার পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় সরে যাওয়ার সাথে সাথে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের মূল স্পিরিট থেকে সরে যাচ্ছে সে বিষয়ে খেয়াল রাখেন কি? এই বেতন কাঠামো বেতন বৈষম্য দূর করে সরকারের উচিত ছিল সেটি ১:৫ এর কাছাকাছি এনে মাঝখানে ২০ টি ধাপ সংকুচিত করে বঙ্গবন্ধুর আমলে প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়া। কিন্তু সে আশা এখন গুড়ে বালি!

এবার নিচের উপাত্তগুলো দেখি:

ড. কাজী খলীকুজ্জমান বলেন, সবচেয়ে ধনী যে ৫ শতাংশ তাদের আয়ের অংশ জাতীয় আয়ের ২৫-২৬ শতাংশ আর অতি দরিদ্র যে ৫ শতাংশ, তাদের আয়ের অংশ ১ শতাংশের কম। তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশে এখন ২৪-২৫ শতাংশ দারিদ্র্য। অতি দারিদ্র্য রয়েছেন ১২ শতাংশের মধ্যে। (সূত্র: কালের কণ্ঠ (২১ জানুয়ারি, ২০১৫)।

দেশের মোট আয়ের ২৮ শতাংশই রয়েছে ৫ শতাংশ ধনাঢ্য পরিবারের হাতে। আর সবচেয়ে গরিব ৫ শতাংশ পরিবারের আয় মাত্র দশমিক ২৩ শতাংশ। অর্থাৎ দেশের মোট আয় ১০০ টাকা হলে তার ২৮ টাকা আয় যাচ্ছে ধনাঢ্য ৫ শতাংশ পরিবারে। আর মাত্র ২৩ পয়সা আয় যাচ্ছে সবচেয়ে দরিদ্র ৫ শতাংশ পরিবারে। (সূত্র : দৈনিক সমকাল, ১৮ অক্টোবর, ২০১৭)।

এরমানে দাঁড়াচ্ছে বাংলাদেশের সামগ্রিক জিডিপি বাড়তে থাকায় দারিদ্র্যের হার কমছে, কিন্তু ধনী ও গরিবের বৈষম্য বাড়ছে। মাত্র দু’বছরের ব্যবধানে ধনীদের কাছে সম্পদ চলে যাওয়া বৃদ্ধি পেয়েছে ৩-৪ শতাংশ! এর ফলে একটা নির্দিষ্ট গোষ্ঠী অনেক বিত্তশালী হচ্ছে যারা পরবর্তী রাজনীতি, অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করবে। তাহলে কোথায় যাচ্ছে বঙ্গবন্ধুর গণমানুষের বাংলাদেশ? জনগণের সরকার গঠিত হবে নাকি, অভিজাতদের হাতে কুক্ষিগত রাষ্ট্র? অথচ ছয় দফা আন্দোলনের মূল প্রেরণা ছিল এই বৈষম্য প্রশমন করা।

এ থেকে বোঝা যায়, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার সাথে সাথে স্বাধীন বাংলার অর্থ ব্যবস্থাও সাম্রাজ্যবাদীদের কাছে পদদলিত হয়। শেখ হাসিনার সরকারও কি পথ হারিয়েছে?

‎(সংক্ষেপিত)