ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে তৃতীয় একটা ভাষা শিখতে হয়। বাধ্য হয়েই তাই অনেকে ফ্রেঞ্চ বাছাই করে। কারণ তুলনামূলকভাবে চাইনিজ-জাপানিজের চেয়ে ফ্রেঞ্চ শেখা সহজ। কিন্তু আমি বাধ্য হয়ে না, ফ্রেঞ্চ শিখেছিলাম ফরাসি ভাষার প্রতি গভীর মমত্ববোধ আর ভালোবাসা থেকে। ফরাসি আভিজাত্যে মোহাবিষ্ট হয়ে।

আমাদের সময়ে নবম শ্রেণির পাঠ্যে ‘পারি’ নামক একটি প্রবন্ধ অন্তর্ভুক্ত ছিল। অন্নদাশংকর রায় তার সেই ভ্রমণ কাহিনীতে প্যারিসকে বর্ণনা করেছেন- ‘অর্ধেক মানবী তুমি, অর্ধেক কল্পনা’ বলে। আমি অন্নদাশংকরের সেই কল্পনার রানীকে খুঁজে পাই সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘ছবির দেশে কবিতার দেশে’ নামক ভ্রমণ কাহিনীতে। সেই ভ্রমণ কাহিনীর প্রচ্ছন্ন প্রেক্ষাপটে সুনীলের চিরায়ত প্রেমের আখ্যানও খুব মর্মস্পর্শী।

 

 

 

কলকাতা থেকে পল এঙ্গেলের আমন্ত্রণে আমেরিকায় যান তিনি। এই বইটির প্রেক্ষাপট আমেরিকা থেকে ফ্রান্স অবধি। কত শত কবির কবি হয়ে ওঠার গল্প, কত দার্শনিকের ব্যাখ্যা সবকিছু খুব যত্ন নিয়ে তুলে ধরেছেন তিনি। মূলত মার্গারিটা নামক এক নারীর টানেই তরুণ কবি সুনীলের ফ্রান্স যাত্রা। যদিও বইয়ে তার বিভিন্নভাবে পাঁচবার ফ্রান্স যাওয়ার উল্লেখ আছে। প্রতিবার নতুন ভাবে ফ্রান্সকে আবিষ্কার করেন সুনীল। তিনি সুনিপুণ ভাষায় করেছেন ছবির বর্ণনা, কবিতার বিশ্লেষণ আর অনুবাদ।

সুনীলের আরো কয়েকটা লেখায় এই প্রেমিকার কথা এসেছিল। ইউরোপিয়ান মূল্যবোধ নিয়ে যে স্থূল ধারণা আমরা পোষণ করি, সুনীলের নায়িকা মার্গারিটা এসব ধারণার মূলোৎপাটন করে।

সমকালীন ব্যান্ড মেঘদল তাদের ‘মেঘদল’ নামটি নেন ফরাসি কবি শার্ল বোদলেয়ারের একটি কবিতা থেকে। আর সেই বিখ্যাত ফরাসি কবি, ফরাসি শিল্প আর আর্ট মুভমেন্টকে যে একটা ভ্রমণ কাহিনীতে স্থান দেওয়া যায়, আমি নিশ্চিত সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মত কবি-ঔপন্যাসিক না হলে তা কেউ পারত না। এই বইয়ের প্রতিটি চ্যাপ্টার শুরু হয়েছে একেকটা ফরাসি কবিতার অনুবাদ দিয়ে। আর শেষমেশ কি হয় তা নিয়ে টানটান উত্তেজনা কাজ করবে।

তাই সুনীলের লেখা নিয়ে কিছুই বলতে হয় না। সুনীলের ভক্ত মাত্রই তা জানেন। ফরাসি শিল্প, সাহিত্য, রসনা, রমণী কোনটাই বাদ যায়নি। আছে মুজতবা আলীর মতো তৎকালীন ফরাসি পারঙ্গম স্বদেশীয় পণ্ডিতদের সজীব বিচরণ। বইটি দশে দশ। সবারই পড়া উচিত।