ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

 

শহীদ বুদ্ধিজীবী ও মুক্তিযোদ্ধার সন্তানরা যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য গঠিত ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিতে প্রস্তুত রয়েছে। ১৯৭১ সালে পাকহানাদার বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসররা তাদের পিতাদের ধরে নিয়ে যাওয়ার ঘটনায় তারা প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন। খবর বাসস

মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধীদের ব্যাপারে গঠিত ট্রাইব্যুনালে সাক্ষী দেয়ার ইচ্ছাপোষণ করে তারা বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দ্রুত সম্পন্ন করতে তারা সব ধরনের সহযোগিতা করতে প্রস্তুত রয়েছেন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে গঠিত ট্রাইব্যুনালকে সরকারের একটি ইতিবাচক উদ্যোগ উল্লেখ করে তারা এ বিচারের বিপক্ষে যারা অবস্থান নিয়েছে তাদের ব্যাপারে সতর্ক থাকার এবং তাদের সকল প্রকার অপপ্রচারের ব্যাপারে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান। ড. জ্যোতির্ময় গুহের কন্যা ড. মেঘনা গুহ ঠাকুরতা বলেন, আদালত থেকে যদি তার পিতার হত্যাকান্ডের ব্যাপারে বক্তব্য চাওয়া হয় তাহলে তিনি তা দিতে প্রস্তুত রয়েছে। তিনি বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ব্যাপারে রাষ্ট্র উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। কর্তৃপক্ষ যদি চায় তাহলে আমি আমার বক্তব্য দিতে বাধ্য। দৈনিক ইত্তেফাকের সাবেক বার্তা সম্পাদক শহীদ বুদ্ধিজীবী সিরাজুদ্দীন হোসেনের সন্তান প্রজন্ম-৭১ এর সভাপতি সাংবাদিক শাহীন রেজা নুর বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের দুষ্কর্মের প্রতি যারা সমর্থন ব্যক্ত করেন তারাও যুদ্ধাপরাধীদের মতো এক ধরনের অপরাধী। এদের ব্যাপারে দেশবাসীকে সজাগ থাকার জন্য তিনি আহবান জানান। তিনি বলেন, আমি যুদ্ধাপরাধের জন্য গঠিত ট্রাইব্যুনালে সাক্ষীর হতে প্রস্তুত হয়েছি। কারণ আমার সামনে থেকে সেইদিন আমার পিতাকে বাসা থেকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেই দিনের ঘটনা আজো আমার চোখে ভাসছে। শাহীন রেজা নুর বলেন, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যার প্রায় ৩৭ বছর পর ৭১-এ মানবতা বিরোধী অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের বিচারের লক্ষ্যে ট্রাইব্যুনাল গঠিত হওয়ায় শহীদের সন্তান হিসেবে আমরা অত্যন্ত খুশী। তিনি বলেন, বিচার শুরু হলেও বিচারের গতি নিয়ে আমরা অত্যন্ত বিচলিত। এ ধরনের অপরাধের বিচার আরো দ্রুত হওয়া উচিত। এতবড় অপরাধের বিচার করার ক্ষেত্রে সংস্লিষ্টদের আরো অধিক মনোযোগী ও নির্ভীক হতে হবে। বিচারকে গতিশীল করতে প্রসিকিউশন টিমে আরো জাদরেল লোক নিয়োগ দিতে তিনি আহবান জানান। তিনি বলেন, এই ট্রাইব্যুনালকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে ইতোমধ্যে জামাত-বিএনপি ও তাদের অনুসারীরা শত শত কোটি টাকা নিয়ে নেমেছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ঠেকাতে তারা আমেরিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে লবিষ্ট নিয়োগ করে এই ট্রাইব্যুনাল সম্পর্কে অপপ্রচার চালাচ্ছে। শাহীন রেজা নুর বলেন, এই ট্রাইব্যুনালকে নিয়ে মওদুদ ও খন্দকার মাহবুব উদ্দিনসহ তাদের অনুসারীরা নানা ধরনের কথা বলছেন। সংকীর্ন দলীয় ও মতলবী স্বার্থে তারা যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচানোর অপপ্রয়াসে লিপ্ত, যা ওই অপরাধীদের দুষ্কর্মের প্রতি তাদের সমর্থনই ব্যক্ত করে। সুতরাং এরাও যুদ্ধাপরাধীদের মতো এক ধরনের অপরাধী। এদের ব্যাপারে দেশবাসীকে তিনি সজাগ থাকার আহবান জানান। তিনি বলেন, ইতোমধ্যে কেউ কেউ তাদের অপপ্রচারে বিভ্রান্ত হয়ে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করার ক্ষেত্রে মানবাধিকার যাতে লঙ্ঘিত না হয় এ ব্যাপারে সতর্কও করছেন। এ ব্যাপারে ভিকটিম পরিবারের কথা হচ্ছে, ৭১-এ আমাদের স্বজনদের যখন হত্যা করা হয় তখন মানবাধিকার কোথায় ছিল। অথবা ইরাক যুদ্ধে গুয়ান্তানামো বে কারাগারে বন্ধী নির্যাতনের সময় তাদের মানবাধিকার কোথায় ছিল। তিনি বলেন, এই বিচার যদি দ্রুততম সময়ের মধ্যে সম্পন্ন না হয় তাহলে জামায়াত ও তাদের অনুসারীরা বিচারকে নসাৎ করতে আরো তৎপর হবে। ইতোমধ্যে সরকারের সামনে আরো অনেক ইস্যু চলে আসতে পারে এবং এতে বিচার প্রক্রিয়ায় বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা রয়েছে।

৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ বুদ্ধিজীবী লেঃ কর্নেল আব্দুল কাদিরের সন্তান সাংবাদিক নাদিম কাদির বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার আমাদের প্রাণের দাবি। আমার মা মরহুমা হাসনা হেনা কাদির সারা জীবন কোন রাজনীতি করেননি। কিন্তু যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ব্যাপারে সবসময় সোচ্চার ছিলেন। একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি গঠনে উদ্যোক্তাদের প্রথম ৫ জনের একজন ছিলেন আমার মা।
তিনি বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকে আমরা স্বাগত জানাই। একজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ও সাংবাদিক হিসেবে এই বিচারকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছি। এ বিষয়ে অভিজ্ঞ বেশ কয়েকজন বিদেশী বিশেষজ্ঞের সাক্ষাৎকারও গ্রহণ করেছি। তাদের প্রত্যেকে ট্রাইব্যুনাল ও বিচার প্রক্রিয়ার উচ্চসিত প্রশংসা করেন। যারা এই বিচার নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন তারাও এ বিষয়টি জানেন। কিন্তু এ ব্যাপারে তাদের অন্য কোন স্বার্থ থাকতে পারে।

এদেশীয় যুদ্ধাপরাধী আল-বদরদের বিচারের পাশাপাশি পাকিস্তানী যুদ্ধাপরাধীদেরও বিচার দাবি করে তিনি বলেন, পাকিস্তান বা বাংলাদেশ যে সরকারই করুক, এ দেশীয় রাজাকারদের বিচারের পাশাপাশি পাকিস্তানী যুদ্ধাপরাধীদেরও বিচার হওয়া উচিত। কারণ তারা আমার বাবার মতো অনেক নিরীহ মানুষকে হত্যা করেছে। এই মেয়াদে না পারলেও আগামী মেয়াদে হলেও যেন এই বিচার করা হয় এজন্য তিনি সরকারের প্রতি আহবান জানান।

নাদিম কাদির বলেন, নিজামী, সাঈদীসহ যাদের গ্রেফতার করা হয়েছে এরা চিহ্নিত অপরাধী। পৃথিবীর যত ঘৃণ্য কাজ আছে তার একটিও বাকী নেই যা তারা ৭১ সালে করেনি।
তিনি বলেন, বিচার দ্রুত হবে না ধীরে হবে এটা একান্তই বিচারকের বিবেচ্য বিষয়। তবে ইতোমধ্যে যেসব চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের গ্রেফতার করা হয়েছে তাদের মধ্যে দু’এক জনের বিচার অন্তত এই সরকারের মেয়াদকালে সম্পন্ন হোক এটা প্রত্যাশা করি। তিনি বলেন, সরকারের উচিত সংসদের মাধ্যমে এমন একটি আইন করে যাওয়া যাতে পরবর্তীতে যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক তারা যেন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কাজ চালিয়ে যেতে বাধ্য থাকেন।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে একটি মহল অপপ্রচার ছড়াচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশের শতকরা ৯৯ শতাংশ মানুষ এই বিচারের পক্ষে, আর ১ শতাংশ এর বিপক্ষে। এই ১ শতাংশের অপপ্রচারের কাছে ৯৯ শতাংশ মানুষের পরাজয় হতে পারে না। এ ব্যাপারে তিনি নতুন প্রজন্মকে সচেতন করার উপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, ‘নতুন প্রজন্মকে জানাতে হবে কাদের বিচার হচ্ছে, কেন হচ্ছে এবং কি তাদের অপরাধ।

শহীদ বুদ্ধিজীবী ডা. আব্দুল আলীম চেীধুরীর সন্তান ডা. নুজহাত চৌধুরী বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার আমাদের কাছে একটি স্বপ্নের মতো বিষয় ছিল। একাত্তরে আমরা আমাদের বাবাকে হারিয়েছি, হত্যাকারীদের বিচার আমাদের অন্তরের অন্তস্থল থেকে উৎসারিত একটি দাবি।

তিনি বলেন, আমার মা শহীদ জায়া শ্যমলী নাসরিন চৌধুরী সারা জীবন যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য সংগ্রাম করেছেন। কাঙ্খিত এই বিচার শুরু হওয়ায় আমরা অত্যন্ত খুশী। ডা. নুজহাত চৌধুরী বলেন, আমাদেরই আশ্রিত তথাকথিত এক মাওলানা, মুক্তিযুদ্ধের সময় আমার বাবাকে যিনি পাক হানাদার বাহিনীর কাছে ধরিয়ে দেন। তিনি যখন এই স্বাধীন দেশে ধর্ম প্রতিমন্ত্রী হন, পরবর্তীতে তিনি একটি পত্রিকারও মালিক হন। তখন আমরা স্বপ্নেও ভাবি নাই যে এ দেশে আর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হবে।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে রাজনীতি না করতে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি অনুরোধ জানিয়ে তিনি বলেন, যারা যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিরোধীতা করছেন তাদের জন্য বিষয়টি রাজনৈতিক হতে পারে। কিন্ত আমাদের হৃদয়ে প্রতিনিয়ত রক্ত ক্ষরণ হয়। বিরোধীতার খাতিরে বিরোধীতা করতে গিয়ে তারা আমার পিতার খুনীদের পাশে দাঁড়াচ্ছেন। যা সম্পূর্ণ অমানবিক।