ক্যাটেগরিঃ প্রযুক্তি কথা

খৃষ্টীয় ক্যালেন্ডার বা ইংরেজী সালে ফেব্রুয়ারী মাস ২৮ দিনে। তবে এই সালে প্রতি চার বছর পর পর হয় লিপইয়ার বা অধিবর্ষ। অধিবর্ষে ফেব্রুয়ারী মাস গণনা করা হয় ২৯ দিনে এবং বছরের ব্যাপ্তি হয় ৩৬৫ দিনে বদলে একদিন বেশি অর্থাৎ ৩৬৬ দিনে। ইংরেজী সালের এই লিপইয়ার বা অধিবর্ষ সম্পর্কে আমরা প্রায় সকলেই পরিচিত। কিন্তু চান্দ্র সালের অধিবর্ষ আমাদের অনেকেরই অজানা।

চান্দ্র মাস বা বছর গণনা করা হয় চাঁদের হিসাবে যা চাঁদ দেখার উপর নির্ভরশীল। বিশুদ্ধ চান্দ্র সালের উদাহরণ হচ্ছে মুসলিম বিশ্বে বহুল ব্যবহৃত ইসলামিক ক্যালেন্ডার খ্যাত হিজরী সাল। এই সালে কোন অধিবর্ষ বা লিপইয়ার নেই। কিন্তু প্রাক ইসলামিক যুগে আরবদেশে চন্দ্রের হিসাবে মাস ও বছর গণনার পাশাপাশি সেই সালে লিপইয়ার বা অধিবর্ষ মেনে চলা হতো।

যে কোন বর্ষপঞ্জি বা ক্যালেন্ডার প্রনয়নের ভিত্তি হচ্ছে জ্যোতিবিজ্ঞান ভিত্তিক পর্যবেক্ষন লব্দ উপাত্ত থেকে বছর, মাস ও দিনে ‘কাল একক’ নির্ধারণ করা। আবর্তনশীল জ্যোতিষ্ক সমূহ হচ্ছে চন্দ্র ও সূর্য। যাদের নিজ অক্ষের উপর ঘূর্ণন ক্রমান্বয়ে দিন ও রাত্রি সৃষ্টি করে। আকাশে চন্দ্রের গতির কারণে প্রতিভাত হয় “চন্দ্রদশা” (Phase of the moon) যা থেকে আমরা মাসের ধারণা পাই। চন্দ্র মাস হচ্ছে চন্দ্র সূর্যেও দিকে অবস্থান (আমাবস্যার সময়) থেকে পৃথিবীকে প্রদক্ষিন করে একই অবস্থানে প্রত্যাবর্তন কাল। চন্দ্রের গড় প্রদক্ষিণ কাল বা চান্দ্র মাসের দৈর্ঘ্য হচ্ছে ২৯.৫৩ সৌর দিবস। এর ফলে চান্দ্র সালের কোন মাস ২৯ দিনে কোন মাস ৩০ দিনে হয়। ১২ চান্দ্র মাসে হয় ৩৫৪ দিন অর্থাৎ চান্দ্র সালে বছর গণনা করা হয় ৩৫৪ দিনে।

অন্যদিকে পৃথিবী সূর্যের চারদিকে প্রদক্ষিন করে আকাশ মন্ডলে আপাত বার্ষিক গতি ঋতুমন্ডলি সৃষ্টি করে এবং এতে আমরা পাই সৌর বছরের হিসাব। সৌর জগতে পৃথিবী নিজ অক্ষে প্রতিবার ঘূর্ণনকালকে এক সৌর দিবস ধরা হয় এবং পৃথিবী সূর্যের চারদিকে একবার ঘূরে আসার সময়কে এক সৌর বছর গণনা করা হয়। ২৪ ঘন্টায় এক সৌর দিবস এবং প্রায় ৩৬৫ দিন ৬ ঘন্টায় এক সৌর বছর যা এক চান্দ্র বছরের তুলনায় ১১ দিন বেশী।

এানব সভ্যতার প্রারম্ভ থেকেই পৃথিবীর প্রায় সর্বত্র চন্দ্রকলা ভিত্তিক মাস ও বছর গণনার প্রচলন শুরু হয়। কারণ আদ্যন্তবিহীন কালের সরল আদিম জনগোষ্ঠির জন্য ‌মাস’ বা ‘বছর’ নির্ণয়ের হিসাব চন্দ্রের তিথি দেখে মনে রাখা সহজ ছিল। চাঁদ দেখে মাস গণনা সহজ হলেও চন্দ্রের ১২ মাস পূর্ণ করে দেখা যেত বছরের সবগুলো ঋতু পার হয়নি। তাই চাঁদ দেখে মাস ও ১২ চান্দ্র মাসে বছর গণনা করে কৃষি ক্ষেত্র সহ প্রায় সকল প্রকার হিসাব নিকাশে সমস্যা দেখা দিত।

চান্দ্র সাল প্রতি বছরের ঋতু বৈচিত্র থেকে ১১ দিন কমে যাওয়ায় প্রতি তিন বছরে ঋতু বৈচিত্র থেকে প্রায় ৩২ দিন কমে যায়। ঋতু বৈচিত্রের সাথে চান্দ্র মাসের সমন্বয় করতে এবং কৃষি ক্ষেত্র সহ সকল হিসাবের ঝামেলা মিটাতে প্রতি তিন বছর অন্তর অধিবর্ষ ধরে তৃতীয় বছরটিতে একটি ত্রয়োদশ মাস গণনা করা হয়। প্রাক ইসলামের আরবরাও ‘বিস্তৃত বছর’ নামক বছরে নববর্ষ দিবসকে একমাস কাল স্থগিত রাখতো, ফলে পূর্ববর্তী বছর তেরো মাসের হতো। ইহুদিরা ‘Azar’ মাসকে দুইবার গণনা করে অধিবর্ষ বা লিপইয়ার গণনা করে। হিন্দু পঞ্জিকাকারগণ চান্দ্র বছরের অধিবর্ষে একটি মাসের পুণরাবৃত্তি ঘটায়। অধিবর্ষের বা প্রতি তৃতীয় বছরের অতিরিক্ত মাসটিকে বলা হয় ‘মলমাস’। মল অর্থ অসুচি বা নোংরা অর্থাৎ পরিত্যাজ্য। হিন্দু ধর্মমতে মাসটিকে হিসাবের বাইরে রেখে বছরের অন্য বারটি মাসকে সংরক্ষণ করা হে থাকে। এমাসে হিন্দুরা সবধরণের পূণ্যকর্ম বা অনুষ্ঠানাদি বা শুভকর্ম থেকে বিরত থাকে।

চন্দ্র সালের লিপইয়ার বা অধিবর্ষের অতিরিক্ত তেরোতম মাসটিকে জ্যোতিষীয় গ্রন্থাদিতে ‘অধিমাস’ নামে চিহ্নিত করা হয় এবং চন্দ্র সালে লিপইয়ারের রীতিকে ‘সাবনমিতি’ বলা হয়।