ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

Kazi Nazrul Islam

আজকাল রবীন্দ্র বাড়াবড়ি মাত্রার বাইরে চলে যাচ্ছে, সন্দেহও ঘনীভূত হচ্ছে। কয়েকদিন আগে এমনটাই ঘটল, ১৫০ তম জন্মবার্ষিকীতে ‍উচ্ছবাস উল্লাস কোনটাই বাদ থাকেনি। রবীন্দ্র পূজারিদের অনেকেই আবার দ্বিজাতিতত্ত্ব সাম্প্রদায়িকতা অসম্প্রদায়িকতা ইত্যাকার শব্দ নিয়েও উদ্বাহু নৃত্যে রত হল। চ্যানেলে চ্যানেলে ঢোল আর কাঁসার বাদ্য বাজলো, যার রেশ এখনো চলছে। ভারতের জাতীয় কবি, কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দেড়শতম (সার্ধশত) জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে বাংলাদেশে এমন দৃশ্য।

একদেশের জাতীয় কবি আর উল্লাস করে ভিনদেশীরা। রবীন্দ্রনাথ বড় কবি, বাংলাভাষার কবি আমরা অবশ্যই স্মরণ করব তাকে। তবে মাত্রার ভিতরে থেকেই। বাংলাদেশীরা তা করেও আসছে বহুকাল থেকেই। এবারই ব্যতিক্রম ঘটল। তাই নানান প্রশ্ন দেশময়। যুক্ততার প্রয়োজন ছিল কি? না এখানে কোন অপরাজনীতি হামাগুড়ি দিচ্ছে। রবীন্দ্রবন্দনা আর রবীন্দ্রনাথ চর্চা দুটি ভিন্ন বিষয়। একটি রাজনীতি অন্যটি কাজনীতি। বর্তমানে রবীন্দ্র চর্চার চেয়ে রবীন্দ্র কড়চাটাই যেন বেশি উচ্চৈঃস্বর। বিশেষ করে বাংলাদেশের একশ্রেণীর বুদ্ধিজীবী নামধারী ইবলিশ ব্যক্তির কাছে রবীন্দ্রবন্দনা যেন একটা ফ্যাশনে রূপ নিচ্ছে। প্রসঙ্গ-অপ্রসঙ্গের কেউ তোয়াক্কা করছে না। কতক গায়ক-শিল্পী জাতে ওঠার চেষ্টা করছেন অহেতুক রবীন্দ্রস্তুতিতে মগ্ন হয়ে। আধুনিক গানের শিল্পী আবার কোন কোন নজরুলসংগীত শিল্পী রবীন্দ্রসংগীতের একখানি ক্যাসেট বাজারে এনে নিজেদের ‘বাহাদুর’ ভাবছেন, তিনি যে কতটা রবীন্দ্র অনুগত এরকম বয়ান নিয়ে পত্রিকার পৃষ্ঠায় উপস্থিত হচ্ছেন। ইদানিং এমনটাই নজরে আসছে। ওপারের ‘কলকে’ পাবার প্রত্যাশাই নাকি এই শ্রেণীটি এমনটা করছে, কারো কারো ধারণা। রবীন্দ্রনাথকে যেমন বাদ দেয়া যাবে না তেমনি রবীন্দ্রসংগীতেও মুখর হবো। কিন্তু একজনকে উপেক্ষা করে অন্যজনকে গ্রহণের প্রবণতা দৃষ্টিকটুতো অবশ্যই।

রবীন্দ্রনাথকে অতিমাত্রায় গ্রহণের মধ্য দিয়ে নজরুলের উপেক্ষা এবং অবহেলাকেই চিহ্নিত করছে প্রকটভাবে। ভুললে চলবে না কবি কাজী নজরুল ইসলাম বাংলাদেশের জাতীয় কবি।

জাতীয় কবির প্রতি সমীহেরও একটা বিষয় আছে। জাতীয় কবির আসন সব সময়ই শীর্ষে। তাছাড়া এক সময় নজরুলকে বলা হতো আধুনিক বাংলার শ্রেষ্ঠ সুরকার। সংগীত রচনার সংখ্যার দিক দিয়েও তার অবস্থান সর্ব শীর্ষে। সুরবৈচিত্র্য গায়কি ঢঙের রকমফের এবং কাব্যময়তায় নজরুল একেবারেই অন্যধাঁচের। নজরুলের তুলনা নজরুল। বিশেষ করে সংগীতসাম্রাজ্যে। সংগীতের প্রতিটি এলাকায়ই প্রবেশ করেছেন নজরুল সদর্পে। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথও নজরুলকে মান্য করতেন এজন্যে। কিন্তু ইদানিং রবীন্দ্রভক্তরা নজরুলের প্রতি বৈরীভাব পোষণ করেন। অবহেলা অবজ্ঞার ভাব উচ্চকিত হয় তাদের আয়োজনে-কর্মে। প্রতি বছর পহেলা বৈশাখ উদযাপিত হয় এখানে সেখানে। পত্র-পত্রিকা এবং চ্যানেলগুলোও সরব হয়। তারা সবাই রবীন্দ্রনাথের গান ‘এসো হে বৈশাখ’ দিয়ে শুরু করে বাংলা বর্ষবরণ। বৈশাখ অর্থই যেন রবীন্দ্রনাথ এমন একটা আবহ সৃষ্টি করা হয় দেশে। ‘ঐ নূতনের কেতন ওড়ে কালবোশাখি ঝড়/ তোরা সব জয়ধ্বনি কর/ তোরা সব জয়ধ্বনি কর’ বৈশাখ নিয়ে একটি চমৎকার গান এটি। তাছাড়া বৈশাখের চরিত্র এবং স্বভাব এখানে পূর্ণমাত্রায় দীপ্যমান। সুরের কাঠামো এবং গায়কি মেজাজও বৈশাখী ঝড়ের মতোই উচ্চকণ্ঠ। বৈশাখকে উপস্থাপন করতে হলে অনিবার্যভাবেই নজরুলকে স্মরণে আনতে হয়। কিন্তু এখানে নজরুল দারুণভাবে উপেক্ষিত, অবহেলার শিকার। এখানে নজরুলসঙ্গীত শিল্পীদের শৈথিল্য এবং হীমন্যতাও কতকটা দায়ী। রমনার বটতলায় আসর জমে বৈশাখের। সব যেন রবীন্দ্রময়। নজরুলকেও স্থান দেয়া হয়, তবে তা তৃতীয় বা চতুর্থ সারিতে। এটি এক ধরনের ষড়যন্ত্র তো বটেই, অবমাননাকরও। বৈশাখে প্রয়োজন উচ্চকণ্ঠ যেখানে নজরুলই যোগ্য বলে বিবেচ্য, সেখানে সুর ও শব্দের শীতলতায় আচ্ছন্ন রবীন্দ্রসঙ্গীত মোটেও মানানসই বলে বিবেচনায় আসে না। এরপরও রমনার বটতলায় বৈশাখ আসে রবীন্দ্রনাথের হাত ধরে। যে জন্যে বৈশাখের উচ্ছলতা-উজ্জ্বলতা অনেকটাই ম্লান থাকে। শক্তির প্রকাশ ঘটে না। আসলে বৈশাখের বৈশিষ্ট্যকে তুলে আনতে গেলে চাই নজরুলের বলিষ্ঠ কণ্ঠ। সুরের ঝংকারতো অনিবার্যভাবেই প্রত্যাশিত। ইচ্ছাকৃত প্রয়োজন পরিবেশকে উপেক্ষা করা কোন অবস্থায় শোভন নয়, সমীচীনও নয়। কিন্তু এমনটাই ঘটছে ফি বছর। বৃত্তের বাইরে যাচ্ছে না বাংলা বর্ষবরণ। এখানে সাম্প্রদায়িকতা মৌলবাদ আর দ্বিজাতি তত্ত্বের প্রশ্ন তোলা অবান্তর, ষড়যন্ত্রমূলক। কারণ রবীন্দ্রনাথ যেমন আমাদের প্রিয় কবি, নজরুলও আমাদের জাতীয় কবি, অন্তরের কবি। তাই এখানে দৃষ্টিভঙ্গির ভিন্নতা বিষয় নয়, আসল বিষয় হলো সুষ্ঠু এবং সঠিক পরিবেশনাটিকে উপস্থিত করা। গোলমালটা সেখানেই।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন প্রচন্ডভাবে আস্তিক মানুষ। তার সৃষ্টিসম্ভারে এই আস্তিক্যের চিহ্ন স্পষ্ট। রবীন্দ্র সঙ্গীতের বিপুল অংশ ঈশ্বরবন্দনা এবং ধর্ম বন্দনার জয়ধ্বনি। রবীন্দ্রনাথ মানবপ্রেমের মাঝখান দিয়েই ঈশ্বরপ্রেমে পৌঁছেছেন। রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পীরা তার পূজারগান ব্রাহ্মসঙ্গীত অন্যান্য ধর্মীয় সঙ্গীত যেকোন অনুষ্ঠানেই পরিবেশন করছেন নির্দ্বিধায় সাহসের সাথে। কিন্তু নজরুলের কোন ধর্মীয় সঙ্গীত কোন অনুষ্ঠানে পরিবেশিত হলেই চোখ চাওয়া-চাওয়ি শুরু হয়, গুঞ্জন ওঠে। খোঁজা হয় সাম্প্রদায়িকতার গন্ধ। নজরুলসঙ্গীত শিল্পীদের হীনমানসিকতা এবং বলিষ্ঠতার অভাব বিষয়টি আরো ঘোলাটে করে তুলে। দু’একজন ব্যতিক্রম ব্যতিত নজরুলসঙ্গীত শিল্পীরা নজরুলের ধর্মীয় সঙ্গীত পরিবেশনে বরাবরই থাকছেন দ্বীধাগ্রস্ত ইদানিং। এসব গান গাওয়া যেন অপরাধের শামিল এমন একটা ভাব। রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পীরা যদি পরিবেশ পরিস্থিতির তোয়াক্কা না করে ‘আনন্দলোকে মঙ্গললোকে বিরাজ সত্য সুন্দর’ অথবা ‘বহে নিরন্তর অনন্ত আধার।’ কিংবা ‘আজ বুঝি আইল প্রিয়তম।’ চরণে সকলি আকুলি ধাইল’ এইসব ব্রাহ্মসঙ্গীত পূজার সঙ্গীত উপস্থাপন করেন তখন যদি কেউ এগুলোতে সাম্প্রদায়িকতা মৌলবাদের অস্তিত্ব খুঁজে না পান, বিপরীতে নজরুলের ‘শোন শোন য়্যা এলাহী/ আমার মোনাজাত/ তোমার নাম জপে যেন/ হৃদয় দিবস রাত’ অথবা ‘দরিয়ায় ঘোর তোফান পার কর নাইয়া/ রজনী অাঁধার ঘোর মেঘ আসে ছাইয়া’ কিংবা’ বাজিছে দামামা বাঁধরে আমামা / শির উঁচু করি মুসলমান। /দাওয়াত এসেছে নয়া জামানার/ ভাঙ্গা কিল্লায় উড়ে নিশান।’ এই গানগুলোতে সাম্প্রদায়িকতার গন্ধ আসে কোন যুক্তিতে?

ইদানিং নজরুলের ধর্মীয় এবং উদ্দীপনামূলক গানগুলোকে আড়ালে রাখার প্রাণান্ত প্রচেষ্টা চলছে। রেডিও এবং চ্যানেলে তো এসব এক প্রকার নিষিদ্ধের তালিকায় বলতে গেলে। ইসলামী কোন পর্বটর্বতে নজরুল তখন ভরসা। এ জন্য নজরুলসঙ্গীত শিল্পীরা তাদের দায়দায়িত্ব এড়াতে পারেন না কোনভাবেই। তাদের সৎসাহসের অভাব আত্মসচেতনতার অভাব বিষয়টিকে ষড়যন্ত্রের গভীরে নিক্ষেপ করেছে আরো। নজরুলকে এসব নানামুখী ষড়যন্ত্র থেকে উদ্ধারে একমাত্র উপায় নজরুলসঙ্গীত শিল্পীদের বলিষ্ঠ উদ্যোগ আর আত্মপরিচায়কে উচ্চকিত করে। নজরুল বিষয়ক প্রতিষ্ঠানগুলোর নীরবতাও এই ষড়যন্ত্রকে আরো প্রলম্বিত করছে।

নজরুলের বিরুদ্ধে ভিন্ন কৌশলের আর একটি ষড়যন্ত্র হলো তার গান লোপাট, তার সৃষ্টি অস্বীকার। এটি অবশ্য তার জীবনকাল থেকেই শুরু হয়েছে। এই চৌর্যবৃত্তির ব্যাপারটি সর্বজন স্বীকৃত। চিহ্নিতও হয়েছে বেটা সাধুবেশে চোর অতিসয়’রা। এই কালে বাংলাদেশের মোবাইল ফোনওয়ালারা পুকুর নয়, একেবারে সাগর চুরি করে ফেলেছে দিনে-দুপুরে। মোবাইল কোম্পানি গং তাদের রিংটোনে রবীন্দ্রনাথের আলখেল্লায় নজরুলকে ঢেকে দিয়েছে। নজরুলের গান এবার রবীন্দ্রনাথের নামে। এমনিতে রিংটোনের যেসব বিজ্ঞাপন ছাপা হয় সেখানে সব রকম সংগীতের প্রলোভন থাকলেও নজরুলসংগীত বলে যে একটা কিছু আছে সংগীত জগতে, তা ঠাহর করা যায় না। সম্ভবত এই রিং টোন তৈরির যারা কারিগর নজরুল তাদের কাছে একেবারেই অপরিচিত জন। রবীন্দ্রসংগীতের ঘরে যেসব গানের প্রথম কলি ছাপা হয়ে থাকে এর তৃতীয় গানটিই নজরুলের। গানের শুরুটা হলো এরকম-‘মোরে ভালোবাসায় ভুলিও না। পাওয়ার আশায় ভুলিও।’ এই গানটি প্রথমে রেকর্ড করেছিলেন শোভা বন্দোপাধ্যায় ঊনিশশ’ চল্লিশ সালে। কাছাকাছি সময় গানটি আবার গীত হয় সত্য চৌধুরীর কণ্ঠে সেনোলা রেকর্ড থেকে। এই কণ্ঠটিই মোবাইলের রিংটোনে ধ্বনিত হয়। রেকর্ডের অপর পৃষ্ঠার গানটি ছিল নন্দন বনহুতে ‘কে গো ডাকো মোরে/আধো নিশিথে’ আশ্চর্যের ব্যাপার বছরের পর বছর এমন একটি বিভ্রান্তি চলছে এর কোন সংশোধনীও নেই, প্রতিবাদ করারও কেউ নেই। নজরুলসংগীত শিল্পীদের এ বিষয়ে কি বক্তব্য? রবীন্দ্রসংগীত শিল্পীদেরও উচিত ছিল এই বিভ্রান্তি ঘোচানো। তাছাড়া নজরুল পরিচর্চায় যেসব ‘বরকন্দাজ’ প্রতিষ্ঠান অর্থাৎ নজরুল ইনস্টিটিউট নজরুল একাডেমিসহ আরো প্রতিষ্ঠান আছে তাদের নীরবতা প্রতিষ্ঠানসমূহের অযোগ্যতাকেই চিহ্নিত করে। নজরুলসাহিত্য, নজরুলসংগীত এবং ব্যক্তি নজরুল, নজরুল নামধেয় প্রতিষ্ঠানগুলোর হাতে নিরাপদ নয় এই সত্যটিই যেন নতুনভাবে জানিয়ে দিল।