ক্যাটেগরিঃ জানা-অজানা

“আলো আমার আলো ওগো আলোয় ভুবন ভরা”

আমাদের এই দুনিয়াতে যাই দেখি না কেন তাই কোনো না কোনো রঙের(না রঙিন চশমা দিয়ে রঙিন দেখার কথা বলছি না, খালি চোখে দেখা সাভাবিক রঙিন দুনিয়ার কথা বলছি) । প্রকৃতির কত কিছুর সুন্দর্য আপনাকে মুহিত করে। ময়ুরের পেখমের সুন্দর্য, বিচিত্র রঙের প্রজাপতির সৌদর্য, ফুলের সৌদন্র্য, সমুদ্র সৈকতের সৌন্দর্য আরো কত কি! ঐসব সৌন্দর্যের মূল ভিত্তি হলো ওগুলোর রং। কিন্তু এই রং বলতে কিছুই থাকত না যদি না আলো ওই রংগুলো তৈরী করত। আমরা বিভিন্ন বস্তু বিভিন্ন রঙের দেখি তার কারণ বিভিন্ন বস্তু থেকে বিভিন্ন রঙের আলো প্রতিপলিত হয়ে আমাদের চোখে আসে। কোনো বস্তুকে আমরা লাল রঙের দেখি কারণ ওই বস্তু শুধু লাল রঙের এল প্রতিপলিত করে বাকি সব রঙের আলো গুলো শুষণ করে নেয়। যেই রঙের বস্তু দেখি না কেন তার মানে হলো বস্তুত ওই রঙের আলো শুষণ করে না, বাকি সব রঙের আলো শুষণ করে। যখন আমরা কোনো সাদা বস্তু দেখি তার মানে হলো ওই বস্তু কোনো রঙের আলো শুষণ করে না, সব রঙের আলো প্রতিফলিত করে দেয়। সব রঙের আলোর সমষ্টি হলো সাধা রং। আবার কালো রঙের বস্তু দেখি কারণ ওই বস্তু আলোর সব রং শুষণ করে নেয়। আলোহীন দুনিয়া মানে হবে একটা বর্ণহীন দুনিয়া। সেই দুনিয়া কেমন হতে পারত তা কল্পনা করাও কঠিন।

আলো photon নামক particle দিয়ে তৈরী। এই ফোটন বিভিন্নভাবে তৈরী হতে পারে। প্রতিটা পরমানু তে আছে electron, proton and neutron । proton ও neutron মিলে তৈরী করে পরমানুর nucleus । এই nucleus কে কেন্দ্র করে electron একটা কক্ষপথে ঘুরতে থাকে যেমন সূর্য কে কেন্দ্র করে সব গ্রহগুলো ঘুরে ঠিক তেমনি। তবে ইলেক্ট্রন এর ঘুরার কক্ষপথ সব সময় একই থাকে না। কোনো শক্তির পাইলে ইলেক্ট্রন তার কক্ষপথ থেকে উপরে উটে যায়। আবার পরে তার নিজ কক্ষপথে চলে যায়। যখন তার কক্ষপথ down হয় তখন কিছু এনার্জি ছেড়ে দেয় আর এই energy হলো photon কনা। তবে সূর্যে nuclear fusion এর মাধ্যমে ফোটন তৈরী হয়।

সূর্য থেকে অন্যভাবে photon কনা তৈরী হয়। সূর্য থেকে Nuclear Fusion এর মাধ্যমে photon কনা বা আলো তৈরী হয়। Nuclear Fusion সব ধরনের পরমানু দিয়ে হতে পারে। Hydrogen পরমানু খুব সরল পরমানু আর সূর্যে মূলত hydrogen পরমানু থেকে photon কনা তৈরী হয়। Hydrogen পরমানু তে একটা proton ও একটা electron থাকে। সূর্যের অভ্ভন্তরীণ প্রচন্ড চাপ (পৃথিবীর চাইতে ১০০ বিলিয়ন গুন) ও তাপে (15 মিলিয়ন ডিগ্রী Celsius) electron টি পরমানু থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, থাকে শুধু প্রোটন। একটা প্রোটনের শুধু positive charge আছে। দুইটা চুক্বকের postive এর সাথে positive ও negative এর সাথে negative যেমন বিকর্ষণ করে তেমনি দুই positive charge যুক্ত প্রোটন ও একে অন্যের সাথে বিকর্ষণ মূলক আচরণ করে। কিন্তু সূর্যের অভ্ভন্তরের প্রচন্ড শক্তির কারণে দুইটা প্রোটন জোড়া লাগতে বাধ্য হয় কিন্তু তখন তাদের মধ্যে একটি প্রোটন নিউট্রন এ পরিবর্তিত হয়ে যায়। এই পরিবর্তনে কিছু ভর শক্তিতে বা ফোটন কনায় রূপান্তর হয়ে যায়। এটা সূর্য থেকে ফোটন কনা তৈরী হবার প্রথম স্তর।

কিন্তু আসলে দুইটা প্রোটন যখন মিলে যায় তখন শুধু একটা প্রোটন নিউট্রন এ পরিবর্তনের মাধ্যমে তার সমাপ্তি ঘটে না। আরো অতিরিক্ত দুটি কনা তৈরী করে। একটা হলো positron ও আরেকটা হলো নিউট্রিনো কনা। এই নিউট্রিনো কনা হলো একটা ভুতুরে কনা কিন্তু সেদিকে আমরা যাব না। positron কনা হলো নিউট্রন এর আন্টি-ম্যাটার অর্থাধ এই positron এর ভর ও spin নিউট্রন কনার মত কিন্তু বিপরীত চার্জের। আগেই বলেছি যে সূর্যের অভ্ভন্তরের প্রচন্ড তাপ ও চাপে হাইড্রোজেন পরমানু থেকে নিউট্রন সিটকে পরে কিন্তু তা একটা স্তরে এসে জমা হয় যেটাকে বলে প্লাসমা স্তর। positron প্লাসমা স্তরে গিয়ে নিউট্রন কে ধংশ করে তৈরী করে আরো ফোটন।

দুইটা প্রোটন কনা মিলিত হবার পর যখন একটা প্রোটন কনা নিউট্রন হয়ে যায় তখন একটা নতুন nucleus তৈরী হয় যাকে বলে deuterium (d)। এই deuterium আবার হাইড্রোজেন প্রোটনের সাথে সংঘর্ষে জড়িয়ে পরে এবং জোড়া লেগে যায় আর তৈরী করে আরো নতুন কিছু ফোটন এবং তৈরী হয় helium-3 পরমানু। না এখানেই শেষ নয়। তারপর এই helium-3 এর সাথে helium-3 এর সংঘর্ষ হয় আর তাতে দুইটা প্রোটন মুক্ত হয়ে যায় এবং তৈরী করে হীলিয়াম্-৪। আর মুক্ত দুইটা প্রোটন আবার হাইড্রোজেন পরমানু তে চলে যায় এবং পরে আবার এই প্রক্রিয়ার পুনরাবৃত্তি ঘটে। এই প্রক্রিয়া কে বলা হয় “proton–proton chain reaction”। সূর্যে আলো তৈরী হবার সাথে সাথে আমরা তা পেয়ে যাই না। সূর্যের অভ্ভন্তরে সৃষ্ট আলো বিভিন্ন শক্তির কারণে বাহিরে আসতে প্রায় ১ কোটি বছরের মত সময় লাগে। আমরা এই মুহুর্তে যে আলো টা পাচ্ছি তা ১ কোটি বছর আগে তৈরী হয়েছে।


Picture: Photon Photon Chain Reaction from wiki

আলো তরঙ্গ ও কনা উভয় ধর্মী। তার মানে আলো কখনো তরঙ্গের ন্যায় চলে আবার কখনো কনার আকারে চলে। আলো কেমনে তরঙ্গ ও কনা উভয় ধর্মী হতে পারে তা বাজার জন্য সহজ একটা উদাহরণ দেই। একটা পানির বোতল এ পানি নিয়া বেশি পরিমান পানি ঢালতে থাকুন। এবার আসতে আসতে পানি ঢালার পরিমান কমিয়ে দেন। আসতে আসতে কমাতে থাকলে এক সময় দেখবেন পানি ফুটা ফুটা করে পড়ছে। আলো ও ঠিক এমনিভাবে তরঙ্গ থেকে কনা ধর্মী হয়ে যেতে পারে। আলোর রং মূলত আলোর বিভিন্ন তরঙ্গ দৈর্ঘের কারণে তৈরী হয়। দৃশ্যমান আলোকের তরঙ্গ দৈর্ঘ্য ১ সেন্টিমিটারের ৪০ মিলিয়ন ভাগ থেকে ৮০ মিলিয়ন ভাগের মাঝামাঝি। এর চাইতে ক্ষুদ্র তরঙ্গ দৈর্ঘ্য গুলোর নাম অতিবেগুনি রশ্মি, রঞ্জন রশ্মি এবং গামা রশ্মি। লাল রঙের আলোর তরঙ্গ দৈর্ঘ্য হলো ৭০০- ৬৩৫ নানোমিটার।

Picture: Wavelegth of different colors from wiki

আলোর গতি প্রতি সেকন্ডে ১৮৬০০০ মাইল যদি আলো কোনো মাধ্যম দিয়া না যায়। যদি মাধ্যম দিয়া যায় তাহলে সেই মাধ্যমের প্রতিসারাংক অনুপাতে বেগটি কমে যাবে। পানির প্রতিসারাংক ১.৩৩ আর তাই পানিতে আলোর বেগ হলো ১৮৬০০০/১.৩৩। আইনস্টাইন এর theory or relativity অনুযায়ী আলোর বেগ হলো মহা বিশ্বের সর্বুচ্চ বেগ।ভর বিশিষ্ট কোনো কিছুই আলোর বেগের চেয়ে বেশি বেগে যেতে পারবে না। ভর বিশিষ্ট কোনো কিছু যদি আলোর বেগ পেতে চায় তাহলে তার অসীম শক্তি দরকার। এই মহা বিশ্বে আলোর বেগ কে যে অতিক্রম করা যাবে না তা অনেক পরীক্ষা ধারা প্রমানিত হয়েছে।১৯৬৮ সালে Switzerland এর CERN labrotory তে নিউট্রাল পাযোনার নাম এক ধরনের কনা তৈরী করা হয়েছিল যার গতিবেগ হলো আলোর গতির ৯৯ ভাগ। এই কনা থেকে দুটি আলোর কনা বের হয় আলোর গতিতে। নিউট্রাল পাযোনার ৯৯ ভাগ আলোর গতির সাথে আলোর গতির নতুন কণাগুলো কিন্তু আলোর গতিবেগ অতিক্রম করতে পারে নাই। আপনি যদি আলোর গতির কাছাকাছি গতিতে কোনো ট্রেন এ ভ্রমন করেন আর ভ্রমন কালীন সময়ে কোনো বল যদি সামনে ছুড়ে মারেন তাহলেও ওই বলের গতি আলোর গতি কে অতিক্রম করবে না। একটা রকেট যদি আলোর গতির কাছাকাছি গতিতে চলা অবস্তায় ওই রকেট থেকে যদি আলো জালানো হয় তাহলেও ওই জালানো আলো ও আলোর গতিকে অতিক্রম করতে পারবে না। আরেকটা কথা আলোর গতি কিন্তু শূন্য শানে সব সময় এখই থাকে। আপনি যদি আলোর তরঙ্গের দিকে রকেট এ ঘন্টায় ৩০০০০ killometer বেগে যান তাহলে ও আপনার রকেট থেকে আলোর গতি হবে ১৮৬০০০ মাইল। এই গতি থাকবে যদি আপনি আলোর তরঙ্গের উল্টা দিকে ও যান।

যখন ভর বিশিষ্ট কোনো কিছু পাশ দিয়া যায় তখন আলোর গতি কিছুটা হলেও ধীর হয়ে যায়। পৃথিবীর চারিদিকে ঘুর্নীয়মান জিপিএস ও satelitte গুলোর ঘড়ি পৃথিবীর ঘড়ির চাইতে কিছুটা দ্রুত থাকে।আবার ভর বিশিষ্ট কোনো কিছু আলোর পথ বাকিয়ে দিতে পারে। কোনো তারার আলো যখন সূর্যের পাশ দিয়ে পৃতিবীতে আসে তখন ওই আলোটা বেকে যায়। এই বেকে যাবার কারণেই আমরা সমুদ্র সৈকতে সূর্যাস্ত দেখতে পাই।

কি হবে যদি কোনো কিছু আলোর গতি অর্জন করতে পারে, যদিও আইনস্টাইন আর theory of relativity অনুসারে কোনো ভর বিশিষ্ট বস্তু কখনো আলোর গতি অর্জন করতে পারবে না। কিন্তু কোনো কিছু যত কাছাকাছি গতি অর্জন করতে পারে তার life time ও একটা অনুপাতে বেড়ে যায়। মহাকাশে শক্তিশালী কসমিক রে যখন বায়ুমন্ডলে আঘাত করে তখন সেখানে মিউওন নাম এক ধরনের কনা তৈরী হয় যার life time মাত্র ২.২ seconds। যার অর্থ পৃথিবীতে বসে আমাদের কখনো মিউওন দেখার কথা না। কিন্তু আশ্চর্যের বেপার হলো যে বিজ্ঞানীরা যখন কোনো পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে যায় তখন তারা এই মিউওন কনার যন্ত্রনায় অস্তির হয়ে যায়। কিন্তু মিউওন কণাগুলো তাহলে কেমনে পৃথিবীতে আসতে পারে?তার কারণ হলো মিউওন কণাগুলো তৈরী হয়েই আলোর কাচা কচি বেগে পৃথিবীতে আসতে শুরু করে আর তাই তার life time বেড়ে যায়। যখন কোনো কিছু গতিশীল হয় তখন তার কাছে সময় ধীর হয়ে যায়। ১৯৭৭ সালে কিছু বিজ্ঞানী প্লেনে পৃথিবীকে কয়েক পাক ঘুরে নেমে এসে দেখলেন যে তাদের ঘড়িতে অতিক্রান্ত সময় পৃথিবীর অতিক্রান্ত সময়ের চেয়ে কম।

আইনস্টাইন এর theory of relavity কে পাশ কাটাইয়া কি অন্য কোনো পদ্ধতিতে মানুষ সময়ের চেয়ে দ্রুত চলতে পারবে? তাত্তিকভাবে যে সব সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে তার মাঝে একটা হলো “worm hole” পদ্ধতি। আমাদের চারপাশে যেসব মসৃন জিনিস দেখতে পাই তা আপাত দৃষ্টিতে মসৃন মনে হলেও অনুবিক্ক্ষণিক যন্ত্র দিয়ে দেখলে তার মাঝে অনেক ছিদ্র দেখা যাবে। যেমন একটা আয়না কে মসৃন মনে হলেও আসলে মসৃন না। এমনকি পরমানুর ও বেশিরভাগ জায়গা ফাকা। তেমনি সময়ের মাঝে ও অরূপ ছিদ্র আছে। কোনো পদ্ধতি ধারা যদি এসব ছিদ্র বড় করা যায় তাহলে ওই ছিদ্র গুলো দিয়ে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় সময়ের গতিতে যাওয়া সম্ভব হবে। কিন্তু এটা শুধু তাত্তিকভাবে চিন্তা করা হচ্ছে। এটাকে কাজে পরিনত করতে হয়ত অনেক সময় লাগবে।