ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

 


“ও আমার দেশের মাটি, তোমার ‘পরে ঠেকাই মাথা।
তোমাতে বিশ্বময়ীর, তোমাতে বিশ্বমায়ের আঁচল পাতা ॥”

১৯৭১ সালের ৫ সেপ্টেম্বর। ৫ জন মুক্তিযোদ্ধার একটি টিম সুতীপুরের গোয়ালহাটিতে তার নেতৃত্বে টহল দিচ্ছিল। টহলের মূল উদ্দেশ্য ছিল, কাছেই যে পাকিস্তানিদের ক্যাম্প আছে, সেদিকে নজর রাখা। কিন্তু সেদিন ভাগ্য তাদের সহায় ছিল না। সকাল সাড়ে নয়টার দিকে পাক সেনারা তাদের কে দেখে ফেলে। তারপর তিন দিক দিয়ে তাদের কে ঘিরে গুলিবর্ষণ করতে থাকে।

ততক্ষণে মূল ক্যাম্প থেকে মুক্তিযোদ্ধারাও সাহায্যে এগিয়ে এসেছে। মুক্তিযোদ্ধারা এগিয়ে এলেও তাদের উদ্ধার করতে পারছিল না। তিনি তার টিম নিয়ে পাল্টা আক্রমণ করতে করতে পিছিয়ে আসছিলেন। তার টিমে একটিই মাত্র এলএমজি ছিল। সেটা ছিল নান্নু মিয়ার কাছে। আচমকা নান্নু মিয়াই গুলিতে আহত হলেন। এখন কী করা যায়? একে তো শত্রুরা তাদের তিন দিক থেকে ঘিরে ফেলেছে, পালানই কষ্টকর হয়ে উঠেছে। তার উপর আবার একজন আহত। আহত সঙ্গীকে নিয়ে পিছু হটা তো আরও কষ্টকর। বাঁচতে হলে, এরকম পরিস্থিতিতে আহত সঙ্গী ফেলে রেখে পিছু হটতে হয়। কিন্তু তা কি করা সম্ভব? একজন মুক্তিযোদ্ধা কি আরেকজন মুক্তিযোদ্ধাকে মৃত্যুর মুখে ফেলে রেখে যেতে পারে?

তিনি আহত নান্নু মিয়াকে কাঁধে তুলে নেন এবং হাতের এল.এম.জি দিয়ে এলোপাতাড়ি গুলি চালাতে শুরু করলে শত্রুপক্ষ পশ্চাৎপসরণ করতে বাধ্য হয়। আর দ্রুত জায়গা বদল করতে লাগলেন, যাতে শত্রুরা তাদের অবস্থান নিয়ে দ্বিধায় পড়ে যায়। কিন্তু শেষ রক্ষা বুঝি আর হল না। এবার একটা মর্টারের গোলা এসে লাগল তারই ডান কাঁধে।

না, হাল ছাড়লেন না তিনি । সবাইকে পালিয়ে যাওয়ার আদেশ দিলেন। জানালেন, তিনি সবাইকে কাভার করার জন্য থেকে যাবেন। অবিরাম গুলি করবেন, তাতে পাকবাহিনির আসতে দেরি হবে। ততোক্ষণে সবাই মুক্তিযোদ্ধাদের দলের কাছে, নিরাপদ জায়গায় চলে যেতে পারবে।

কিন্তু তাই কী আর হয়? কেউ-ই তো তাকে ফেলে যেতে রাজি হচ্ছিলেন না। আহত নান্নু মিয়াকে যদি বহন করে নেওয়া যায়, তাকে কেন নেয়া যাবে না? কিন্তু একজনকে তো কাভার দিতেই হবে। তিনি একরকম জোর করেই সবাইকে পাঠিয়ে দিলেন। নিজের কাছে কিন্তু এলএমজিটা রাখলেন না। আরেকজনকে এলএমজিটা দিয়ে তার কাছ থেকে একটা সাধারণ রাইফেল নিয়ে রাখলেন। কারণ তিনি তো ধরা পড়বেনই, মারা যাওয়াটাও একরকম নিশ্চিত। তখন তো তার কাছে যে অস্ত্রটা থাকবে, সেটাও পাকবাহিনীর হস্তগত হবে। মুক্তিবাহিনির কাছে তখনও এলএমজি খুবই গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র। মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও তিনি দেশের কথা ভাবলেন। সেভাবেই কাজ করলেন, যাতে মুক্তিবাহিনীর ক্ষতি খুবই কম হয়।

সবাই মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্পের উদ্দেশ্যে পিছু হটতে লাগল। আর নূর মোহাম্মদ শেখ একাই একটা মাত্র রাইফেল নিয়ে আধুনিক অস্ত্র-শস্ত্রে সজ্জিত বড়সড় একটা পাকবাহিনীর টিমের মোকাবিলা করতে লাগলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই মুক্তিবাহিনী পাল্টা আক্রমণ হানল। মুক্তিবাহিনীর পাল্টা আক্রমণে পাকসেনারা পিছু হটতে শুরু করে। পরে প্রতিরক্ষার সৈনিকরা এসে পাশের একটি ঝাড় থেকে তাঁর মৃতদেহ উদ্ধার করে। এই অসম অবিশ্বাস্য যুদ্ধে তিনি শত্রুপক্ষের এমন ক্ষতিসাধন করেন যে তারা এই মৃত্যুপথযাত্রী যোদ্ধাকে বেয়নেট দিয়ে বিকৃত করে চোখ দুটো উপড়ে ফেলে।

তিনি আমাদের বীর শ্রেষ্ট নূর মোহাম্মদ শেখ। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে যাদের জন্য আমরা সবাই গর্ব করি তিনি তাদেরই একজন।আচ্ছা, মুক্তিযুদ্ধারা যদি রাজাকার হয়ে জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ না করে আরাম আয়াসে থাকতেন তাহলে কি হত? অথবা তারা যদি যুদ্ধ না করে থাকতেন তাহলে কি হত? হয়ত তাদের অনেকে আজ মন্ত্রী হত, বিলাস বহুল জীবন যাপন করত। আমরা কখনো পেতাম না সাধীনতার সাধ। যাদের কাছে আমাদের সাধীনতা মূল্যহীন তাদের কাছে এটা হয়ত কিছু না।

দুনিয়ার প্রতিটা দেশে দেশের জন্ম ইতিহাস জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই কে এক সুতায় বেধে রাখে। সব দেশে হাজার টা বেপার নিয়া হাজার তা বিরুধ থাকতে পারে কিন্তু শুধু আমাদের দেশ ছাড়া কোনো দেশে নিজ দেশের জন্ম ইতিহাস নিয়া নিজ দেশের মধ্যে বিরুধিতা আছে বলে আমার জানা নেই। একজন সাভাবিক জ্ঞান বুদ্ধি সম্পন্ন মানুষ কি কখনো তার নিজ দেশের সাধীনতা নিয়া বিরুধিতা করতে পারে?

দুনিয়ার ইতিহাসের সব যুদ্ধের হতাহতের সংখা ও দুনিয়ার সব বড় বড় গণহত্যার সংখ্যার দিক দিয়ে ক্রমবিন্নাসে সাজালে আমার মনে হয় ৭১ এর গনহত্তা ২০ এর মধ্যে পড়বে। তারা কান্দে সিরিয়ার হত্যাকান্ডের জন্য, তারা কান্দে ফিলিস্তিন হত্যাকান্ডের জন্য। দুনিয়ার সব হত্যাকান্ড সব মানুষের জন্য কষ্টদায়ক। এটাই সাভাবিক। কিন্তু আমাদের নিজ দেশের ৭১ এর এত বড় গনহত্তা তাদের কে কাদায় না। বরং ৭১ এর কথা শোনলে তাদের গা জলে, যে দেশ ৭১ এর গনহত্তা করেছে সেই দেশ কে তারা সাপোর্ট করে। ৭১ এর গনহত্তা কারী ও গণ হত্যায় সহায়তাকারীর জন্য তারা কান্দে। একজন সামান্য বিবেক বুদ্ধি সম্পন্ন মানুষের কাছে কি তা আশা করা যায়?

৭১ এ তারা সাধীনতার বিরুধিতা করলো ভারত ও ইসলামের ভয় দেখিয়ে। বাংলাদেশ সাধীন হলে ইসলাম থাকবে না ও ভারত আমাদের নিয়ে নিবে। আজও তারা ভারত ও ইসলামের ভয় দেখাইয়া যুদ্ধপরাধী ও পাকিস্তান সাপোর্ট করে। একজন মানুষ ভিত হতে পারে। একজন মানুষ মঙ্গল গ্রহের কাল্পনিক প্রাণী নিয়েও ভিত হতে পারে। ইন্ডিয়া ও ইসলাম নিয়া যদি তারা ভিত হয় তাহলে সেটার জন্য তো তারা বিভিন্ন রক্ষামূলক পদক্ষেপ নিতে পারে। তাই বলে কি সাধীনতার বিরুধিতা করবে? তাই বলে কি যে দেশ আমাদের দেশের মাটিতে এত বড় একটা গনহত্তা করেছে তাকে সাপোর্ট দিবে?

তারা ভারতের ভয় দেখানোর জন্য সিকিম ও হায়দ্রাবাদ এর উদাহরণ টানে। কিন্তু সিকিম ও হায়দ্রাবাদ যেসব কারণে ভারত নিতে পারছে সেসব কারণ কি বাংলাদেশের কেতরে প্রযুজ্য। একটা দেশ কে যদি এত সহজে ভারত নিতে পারত তাহলে তো নেপালের মত ক্ষুদ্র দেশের পক্ষে এতদিন থাকার কথা ছিল না। সিকিম ও হায়দ্রাবাদ ভারত নিতে পারছে কারণ সেগুলোর ভৌগলিক অবস্তান ভারতের অভ্ভন্তরে, সেগুলো খুব ক্ষুদ্র বাংলাদেশের তুলনায়, সেগুলোর বেশিরভাগ মানুষ ভারত কে সাপোর্ট করত, তাদের দুর্বল শাসন বেবস্তা , তত্কালীন বিশ্ব পরিস্তিতি ইত্যাদি। যদি ওই দেশগুলোর মানুষ ভারতের অন্তর্ভুক্তি না চিত তাহলে ওই দেশগুলোর মানুষ আন্দোলন করত। হয়ত মনে হতে পারে যে ভারতের মত বড় দেশের বিরুদ্ধে অন্দোল করার সমর্থ তাদের নেই – ইটা ঠিক না। কারণ ভারতের অঙ্গরাজ্য আসামের কিছু মানুষ তাদের সাধীনতার জন্য আন্দলন করেছে। কিন্তু বাংলাদেশের মত এত বড় জনসংখ্যার দেশ কি ভারতের পক্ষে নেয়া কোনদিন সম্ভব? তাছাড়া বিশ্ব পরিস্তিতি এখন অনেক জটিল। আর ভারতের কি সামান্যতম জ্ঞান নেই যে বাংলাদেশে হত্তক্ষেপ করতে চাইলে সারা বিশ্ব পরিস্তিতি উত্তাল হয়ে যাবে তা বুজবে না?

যুদ্ধপরাধীদের কে বাচানোর জন্য তারা বিচার বেবস্তা নিয়া প্রশ্ন তুলে। ১/২ জন সাক্ষীর সাক্ষের ভুল ধরে তারা বলে বিচার সঠিক না (যদিও তাদের দেয়া তত্ত্ব কতটুকু সঠিক তা আমার জানা নাই)। কিন্তু প্রতিটা বিচার হচ্ছে অনেকগুলো সাক্ষীর সাক্ষ্য ও অনেক প্রমান সাপেক্ষে। টেলিভশন এ আমরা সব সময় অনেক অনেক সাক্ষী ও অনেক অনেক ঘটনা দেখি। সেখানে যদি ১/২ সাক্ষের মধ্যে সমসসা থাকে সেটাতে কোনো সমসসা হবার কথা নয়। যে সাকা চৌধুরী সব সময় বললেন যে তিনি যুদ্ধের সময় পাকিস্তানে লেখাপড়া করেছেন আর তার পাকিস্তান থাকার যে প্রমান দিলেন তা যে ভুল তা তো সবার চোখের সামনে। অথচ এটাই সাকা চৌধুরীর প্রধান প্রমান ছিল।

ওরা দেখতে চায়না, ওরা জানতে চায়না, ওরা শুনতে চায়না। ওরা তাদের জানার, শুনার, বোজার সব দরজা ও জানালা বন্ধ করে রেখে দিছে। শুধু একটা দিকে খুলা রাখছে যে দিক দিয়া শুধু একটা দিক দেখা যায়। ওরা বিজ্ঞান পড়বে না, ওরা দর্শন পড়বে না, ওরা ভুলেও প্লাতো, সক্রেটিসে, অ্যারিস্টট্ল, মেকিয়াভেলি ওসব পড়বে না। তারপর ও তারা মনে করে তারা সব বুজে, সব জানে। অতচ একজন মানুষ দিন রাত পড়াশুনা করেও তার পক্ষে অনেক কিছু বোঝা কঠিন হয়।