ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

চেহারায় বিষণ্নতা। এলোমেলো চুল। দু’চোখে শত স্বপ্ন। সামনে পাহাড়সমেত বাঁধা। হাতে চায়ের ফ্লাক্স, সাথে সিগারেটের প্যাকেট, মাথায় ঝাকাভর্তি বাদাম। ‘লাগবে চা, সিগারেট, বাদাম’ বলছে অহরহ। কখনওবা আবার ওরাই এগিয়ে দিচ্ছে খাবারের প্লেট। জিজ্ঞেস করছে, ‘রুটি নাকি পরোটা?’। হাতে তুলে দিচ্ছে সিঙ্গারা, ছমসা কিংবা বাদাম। নয় বছরের আকাশ, আট বছরের ইবারাহীম খলিল, তের বছরের রফিক, দশ বছরের ইমন অথবা এগার বছরের রবিউলের জীবনের গল্প এমনই। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলের ক্যান্টিন, বটতলার খাবারের দোকান, চা স্টল, পিঠা চত্ত্বর, প্রান্তিক, অমর একুশে দেখা মেলে ওদের। পারিবারিক দ্বন্দ্ব-অসচ্ছলতা আর দারিদ্রের কাছে পরাজিত হয়ে ওদের পরিচয় আজ শ্রমিক। শিশু শ্রমিক। ওরা মৌলিক মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত। অজস্র স্বপ্নের বিপরীতে ওদের বাস্তবতা।

স্বায়ত্বশাসিত বিদ্যাপিঠ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। জাতিকে জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করার মহৎ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন যে বিদ্যাপীঠের অজস্র শিক্ষক-শিক্ষার্থী। অথচ তাদের খাবারের প্লেট এগিয়ে দিচ্ছে এই শিশুরা। শিক্ষার্থীরা সেই খাবার শেষে এক্সাম, আস্যাইনমেন্ট, টিউটোরিয়াল, ক্লাস, প্রেজেনটেশনে ব্যস্ত হয়ে পড়ছে। শিক্ষকরা সেমিনার, আলোচনাসভা কিংবা গবেষণায় সময় দিয়ে জাতিকে জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করতে চেষ্টা করছে সর্বাত্মক। এই হতদরিদ্র শিশুদের পাশে দাড়ানোর ফুসরত তাদের নেই। এ দৃশ্যপট ঠিক যেন প্রদীপের নিচে অন্ধকারের কথাই মনে করিয়ে দেয় খুব সহজে।

বিশ্ববিদ্যালয়টিতে দু’ধরনের পেশায় প্রায় শতাধিক শিশু শ্রমিক নিয়োজিত রয়েছে। প্রথম শ্রেণীর শিশুরা পরিবারের সাথে থেকেই দৈনন্দিন অর্থ উপার্জনে অংশগ্রহণ করছে। এরা সাধারণত ক্যাম্পাসে চা, বাদাম, ঝালমুড়ি, সিগারেট, পিঠা, সিঙ্গারা প্রভূতি খাবার বিক্রিতে সঙ্গে কাজ করছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলোতে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তারা বাস করে। দ্বিতীয় শ্রেণীর শিশুরা বিভিন্ন দোকান মালিকের অধীনে কাজ করছে। এক্ষেত্রে নির্দিষ্ট বেতনের বিনিময়ে এবং তিনবেলা খাবারের বিনিময়ে দুই ধরণের শিশু রয়েছে। যারা  আবাসিক হলের ক্যান্টিন, বটতলার খাবারের দোকানে কাজ করছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের একটি চা-স্টলে কাজ করে আকাশ। তিন বেলা খাবারের বিনিময়ে সকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি কাজ করতে হয় তাকে। কখনওবা রাত। মীর মশাররফ হোসেন হলের ক্যান্টিনে কাজ করে আট বছর খলিল। পরিবারের অসচ্ছলতার দরুন আজ সে শিশু শ্রমিক। সমবয়সীদের পড়ালেখা করতে দেখলে খারাপ লাগে। ‘গরিবের কপালে কি পড়ালেখা আছে’ বলে নিজেকেই সান্তনা দেয় নিজে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্শ্ববর্তী আমবাগানের ছেলে মেহেদী। বাবা অসুস্থ। মা গার্মেন্টসে কাজ করে। মায়ের আয়ে সংসার চলে। মেহেদীর পড়াশুনার সেই আয়ে অসম্ভব। তাই পড়ালেখা বন্ধ করে মেহেদী শিশু শ্রমিক খেতাব নিয়ে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের অমর একুশের পাদদেশে ফুচকা বিক্রি। সুবিধাবঞ্চিত রফিক, খলিল, রবিউল, মেহেদী, নয়ন, হৃদয়, আকাশের মত শতাধিক শিশু পারিবারিক অসচ্ছলতার কারণে বাধ্য হয়ে আজ শিশুশ্রমের সঙ্গে যুক্ত।

এ  প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাদাম বিক্রেতা পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র মমিন জানায়, তাদের সংসারে পাঁচ ভাই-বোন রয়েছে। বাবা রিক্সা চালিয়ে যা উপার্জন করে তা দিয়ে সংসার চলে না। তাই সে এ ব্যবসায় নেমেছে। শত শত শিশু অকালে ঝরে যাচ্ছে। যদিও বিভিন্ন আর্দশবাদীদের হরেক দাবি-দাওয়া ও অধিকার আদায়ের দাবি ওঠে ক্যাম্পাসে। কিন্তু শিক্ষা, চিকিৎসার মতো মৌলিক মানিবাধিকার বঞ্চিত এ শিশু শ্রমিকদের নিয়ে মাথাব্যথা নেই কারো। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনও এ বিষয়ে নির্বিকার।

শিশুশ্রম কার্যত শিশুদের ভবিষ্যতকে ধ্বংস হচ্ছে৷ শিশুরা লেখাপড়ার সুযোগ হারাচ্ছে, মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছে৷ বাংলাদেশে ১৪ বছরের কম বয়সীদের কাজে নিয়োগ দেয়া আইনত নিষিদ্ধ৷ তবে সেই নিষেধাজ্ঞা বাস্তবে প্রয়োগ হচ্ছে না৷ যদিও বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে শিশুশ্রম সরাসরি বন্ধ করে দেয়া সম্ভব নয়। তাই  প্রথমে শিশু কেনো শ্রমের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে এ সমস্যার সমাধানে উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে হবে। পরবর্তীতে সরকারকে আইনের প্রয়োগ করতে হবে কঠোরভাবে। এক্ষেত্রে ক্যাম্পাসের প্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে সরকারের ভূমিকা পালন করতে হবে। শিশুর লেখাপড়ার সুযোগ সৃষ্টি করে, লেখাপড়ায় উৎসাহিত করার জন্য উদ্যোগ নিতে হবে আমার – আপনার – আমাদের। মনে রাখতে হবে, আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যত।