ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

অর্থনৈতিক মন্দা, বেকারত্ব, উচ্চ পর্যায়ে দুর্নীতি, প্রধান দু’টি রাজনৈতিক দলের উপর অনাস্থা প্রকাশ করে ২০১১ সালে স্পেনের বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছিল সাধারণ জনগণ, যাদের অধিকাংশরাই ছিলেন বয়সে তরুণ। ফেইসবুক আর টুইটারের মতো সামাজিক ওয়েবসাইটে স্ট্যাটাস বিনিময়ের মাধ্যমেই জড়ো হন তারা। সংবাদ সংগ্রহের জন্য স্পেনের বার্সেলোনায় প্লাসা কাতালোনিয়া চত্বরে আমিও গিয়েছিলাম। সেই আন্দোলন সাপ্তাহব্যাপী দীর্ঘ হয়েছিল। সমবেতরা তাবু টানিয়ে বিক্ষোভস্থলে রাত্রিযাপনও করেছে। হাজারো মানুষের বিক্ষোভ সামলাতে তখনকার সরকারী দল সোসালিস্ট পার্টিকে বেশ হিমশিম খেতে হয়েছে। পুলিশ দিয়ে বিক্ষোভস্থল খালি করার চেষ্টাও করেছিল দলটি। পরবর্তী নির্বাচনে এর প্রভাবও পড়েছিল। স্পেনের এই প্রসঙ্গ টেনে আনার কারণ অনলাইন জগতের কার্যকর ভূমিকা।

আমাদের বাংলাদেশে শাহবাগে যা হয়েছে, হচ্ছে তা ইতিহাস। ফেইসবুক, ব্লগ অর্থাৎ ইন্টারনেট ব্যবহার করে কোন রাজনৈতিক দলের ব্যানারে না গিয়ে তরুণরা যা করলো; তাতে আমরা দেশকে নিয়ে আশার আলো দেখা শুরু করতে পারি। প্রসঙ্গ রাজাকারদের ফাঁসি দাবী হলেও এই জাগরণ বাংলাদেশের প্রধান দু’টি দলের জন্য সতর্কবার্তাও বটে। আওয়ামীলীগ, বিএনপি বুঝি না। আমরা এসেছি আমাদের হয়ে। হৃদ্যতার টানে, বিবেকের তাড়নায়। বিচারের দাবীতে। লাখো মানুষের কণ্ঠে ধ্বনিতো হয় – রাজাকারের ফাঁসি চাই। রাজনীতির বাইরে থেকে সাধারণ জনগণের এ সম্মিলন। রাজাকারের ফাঁসি ছাড়া যেখানে কোন আপোস নেই। রাজনীতিবিদ, সাহিত্যিক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, শিক্ষাবিদ, তরুণ- তরুণী, কিশোর কিশোরী কারা যোগ দেয়নি এ হৃদয় সম্মিলনে! যোগ দেন বাংলাদেশের ক্রিকেটাররাও; যাদের ক্রীড়ানৈপূণ্যে এই জনগণইতো রাস্তায় নেমে আসে আনন্দ মিছিল নিয়ে। শাহবাগের এ গণজাগরণ কেবল শাহবাগেই স্থির থাকেনি। সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে।
এ গণজাগরণ দেশের প্রধান দু’টি দলকে চিন্তা করতে বাধ্য করেছে নতুন উপলব্ধিতে। আওয়ামীলীগ সরকারের অনেক মন্ত্রীও গণজাগরণে হেনস্থা হয়েছেন, বক্তব্য দেয়ার সুযোগও পাননি। আর বিএনপিতো প্রথমে এ আন্দোলনকে আওয়ামীলীগেরই সৃষ্ট সাজানো নাটক বলেছিল। গত ৮ ফেব্র“য়ারি জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় বিএনপি নেতা মওদুদ আহমেদ বলেন, মানবতাবিরোধী বিচার নিয়ে সরকার নিজেরাই নিজের ফাঁদে ধরা পড়েছে। আর আওয়ামীলীগও মনে করছে জামায়াতকে সঙ্গ নিয়ে রাজনীতি করায় ফাঁদে পড়েছে বিএনপি। যার উদাহরণ গত ৯ ফেব্র“য়ারি ঢাকায় ১৮ দলীয় জোটের ব্যানারে জামায়াতকে নিয়ে সমাবেশ করার কথা থাকলেও বিরূপ প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কায় বিএনপি হয়তো সমাবেশ করেনি। কাজেই শাহবাগের গণজাগরণ আওয়ামীলীগ- বিএনপি দু’দলকেই ফাঁদে আটকিয়েছে। এ গণজাগরণে উদ্ধুদ্ধ হয়ে চট্টগ্রামে যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচাতে জামায়াতের ডাকা ৯ ফেব্র“য়ারির হরতালেও সাড়া দেয়নি নগরবাসী।
তবে এ গণজাগরণ বিএনপিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারে অধিনে নির্বাচন আদায় করার চলমান আন্দোলনে বেশ প্রভাব ফেলেছে। বিএনপি চাইলেও পারছে না আন্দোলনের ডাক দিতে। বিশেষ করে জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে রাজনৈতিক কর্মসূচি দেয়া থেকে বিরত রয়েছে। তাহলে ১৮ দলীয় জোটে কি ভাঙ্গনের আভাস মিলছে? যদিও বিএনপি বলছে, জোট আছে। থাকবে। বার্সেলোনায় পরিচিত একজন সংবাদকর্মী আশঙ্কা করে আমাকে বলেছেন, জামায়াতের সাথে আওয়ামী লীগের আঁতাতে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছে কাদের মোল্লার। কারণ হিসেবে তিনি বললেন, আন্তর্জাতিক মহলে চাপ আছে। সরকারের মেয়াদও তেমন একটা নেই। ট্টাইবুনাল প্রশ্নবিদ্ধ। ফাঁসির রায় হলেও কার্যকর করণ দুরূহ। এই অবস্থায় আওয়ামী লীগ কি কোন সন্ধি করেনি জামায়াতের সাথে! রাজনীতির মারপ্যাঁচে জামায়াতকে সঙ্গী করে বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে রাজপথ গরম করে রেখেছিল আওয়ামীলীগ একসময়।

আবারো ক্ষমতায় যাবার সিঁড়ি হিসেবে যদি আওয়ামীলীগ জামায়াতের সাথে আঁতাত করে, তাহলে চরম মূল্য দিতে হবে। যদি হয় সেরকম কোন আঁতাত; তবে সেই আঁতাত হওয়ার আগে আওয়ামীলীগ কি কখনো ভেবেছিল এমন গণজাগরণ হবে দেশব্যাপী?

এই গণজাগরণ যত দীর্ঘ হবে, কিছুটা হলেও আওয়ামীলীগ সরকারের ফায়দা বেশি। শেষ সময়ের আন্দোলনে বিএনপি সুবিধা করতে পারবে না। তাই বিএনপিও চাইছে বিভিন্ন কথা বলে আন্দোলনকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে। লাভ যে হচ্ছে না, হবেও না; বরঞ্চ এতে যে জনগণের ক্ষোভের উপলক্ষ হচ্ছে; সেটা কি বিএনপি’র নীতি নির্ধারকরা বুঝতে পারছেন? এই সময়ে যদি বিএনপি জামায়াতকে ত্যাগ করে যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবীতে আন্দোলনরত তরুণদের সমর্থন জানাতো- তাহলে নিশ্চিত বিএনপি রাজনৈতিকভাবে লাভবান হতো। আন্দোলনের রেশ ধরে জনগণের কাছে আরো সমাদৃত হতো। এই উপলক্ষ আসন্ন নির্বাচনে জয়লাভ করার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা রাখতো। কিন্তু বিএনপি তা করছে না। করবে বলেও মনে হচ্ছে না। জামায়াতের সঙ্গী হওয়া বিএনপি এখন না পারছে কঠোর আন্দোলনে যেতে; না পারছে লাখো জনতার কণ্ঠে কণ্ঠ মেলাতে।