ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটে যাওয়া বাংলা বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে যা ঘটেছে, তা পুনরায় বলার প্রয়োজন নেই। সবাই জানি কম বেশি।  ঘটনার পরে সরকারের ভূমিকাও আমরা দেখেছি। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী যখন বলেন, ১লা বৈশাখে কোন নারীকে বস্ত্রহরণের প্রমাণ মেলেনি। আমরা আশাহত হই। কী কী প্রমাণ চান তিনি? গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়া সিসি টিভি ক্যামেরার সূত্র ধরে আসা ছবি, রিপোর্ট যথেষ্ট নয়? এখনতো আবার কিছু হলেই বলা হয় ‘ফটোশপ’ কারসাজি! ১লা বৈশাখে নারীদের ওপর যৌন নিপীড়নের ঘটনাকে ‘তিন-চারটা ছেলের দুষ্টামি ও শ্লীলতাহানির চেষ্টা’ বলে মন্তব্য করতেও আমরা দেখেছি পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এ কে এম শহীদুল হককে। এমন মন্তব্যও আমাদের ভাবায়, ভাবতে বাধ্য করে। এমআর পাসপোর্ট কার্যক্রমের উদ্বোধন করতে  স্পেন সফর করছিলেন যখন  স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী, প্রবাসী বাংলাদেশীদের আস্বস্থ করে তিনি বলেছিলেন, আইন শৃঙ্খলা সরকারের নিয়ন্ত্রণে আছে, বাংলাদেশ অনেক ভালো আছে। কতটা সরকারের নিয়ন্ত্রণে?

একের পর এক ব্লগার, লেখককে নির্মমভাবে হত্যা করা হচ্ছে, অথচ এখন পর্যন্ত কাউকে শাস্তির আওতায় আনতে পারেিন সরকার। ১লা বৈশাখে নারীদের শ্লীলতাহানীর ঘটনায় জড়িতদের  অনেকের চেহারা সিসি টিভি’র ক্যামেরায় ধরা পড়েছে। অথচ গ্রেফতারে কোন অগ্রগতি নেই। আর গ্রেফতারইবা করবে কারা? পুলিশ? যাদের হাতে কি না ঐদিন কয়েকজনকে তুলে দেয়া হলেও ছেড়ে দেয়া হয়। তাহলে পুলিশ আগে থেকেই জানতো, কিংবা যাদেরকে গ্রেফতারের পরিবর্তে ছেড়ে দেয়া হয়েছিল, তাদেরকে ওরা চিনতো? ঐদিন সিসি টিভি ক্যামেরা পর্যবেক্ষণের দায়িত্ব যারা ছিলেন, তারা  ঐ নারী লাঞ্জনার ঘটনা দেখেও কেন তৎক্ষনাৎ ব্যবস্থা নিলেন না।  নারীর বস্ত্রহরণ করা হচ্ছে, এটা পুরোপুরি পরিস্কার বুঝা না গেলেও জটলা, হাঙ্গামা নিশ্চয়ই বুঝা যাচ্ছিল। তারপরও ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। তাহলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এতগুলো সিসি টিভি ক্যামেরা বসানোর দরকারইবা কী। ভবিষ্যতে সিসি টিভি ক্যামেরা বসিয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা লোকজনের হাসির উপলক্ষ তৈরী করবে।

সে তো গেলো বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের কথা। সেই বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে নারী লাঞ্জনার ঘটনার প্রতিবাদ জানাতে সেদিন পুলিশ কর্তৃকও নারী হামলার শিকার হোন। প্রতিবাদ জানাতে রাস্তায় নামলেই কি পুলিশ হামলা চালাবে? আমরা সংবাদ মাধ্যমে দেখেছি ছাত্র ছাত্রীদের উপর কীভাবে পুলিশ অাক্রমণ চালিয়েছে। তাও বস্তুনিষ্ঠ প্রসঙ্গ নিয়ে ছিলো ছাত্র ছাত্রীদের আন্দোলন। পুলিশের সাজোয়া যানে ঢিল ছুড়া এবং পরবর্তীতে ছাত্র-ছাত্রীদের উপর পুলিশের লাঠি-বন্দুকের বাঁটের আঘাত, বুটের লাথি মারা দেখে আমরা আতঙ্কিত হই। সাঁজোয়া যানে ঢিল ছোঁড়ার জন্য কি এভাবে ছাত্রদের উপর হামলে পড়তে হবে? বাংলাদেশের আন্দোলন সংগ্রামে ছাত্র ছাত্রীদের অবদান আমরা জানি। যে কোন অান্দোলন সংগ্রামের শুরুটা কিন্তু ছাত্র ছাত্রীদের হাত ধরেই। যদিও পরে আন্দোলনের সফলতা ছিনিয়ে নেয়া হয়। গণজাগরণ মঞ্চের উৎপত্তিও কিন্তু ছাত্র ছাত্রীদের সম্মিলনে। অস্বীকারের জোঁ নেই যে এই গণ জাগরণ মঞ্চের জন্যই যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির আন্দোলন গতি পেয়েছিল। এই মঞ্চই সরকারকে যথেষ্ট সহযোগিতা করেছে। গণজাগরণ মঞ্চে প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনের কর্তৃত্ব যেমন চোখে পড়ার মতো, তেমনি বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে যারা লাঞ্জনার শিকার হওয়া নারীদের উদ্ধারে এগিয়ে এসেছিলেন এবংলাঞ্জনাকারীদের বিচারের দাবিতে সচেষ্ট ও প্রতিবাদ অব্যাহত রেখেছেন, তারাও কিন্তু প্রগতিশীল ছাত্রসংগঠনের সদস্য। ঐদিন লিটন নন্দীরা যদি লাঞ্জনার শিকার হওয়া নারীদের উদ্ধারে এগিয়ে না আসতেন, এ ব্যাপারে সংবাদ সম্মেলন আর প্রতিবাদ সভা করে বিষয়টি না জানাতেন, তাহলে ঘটনাটা চাঁপাই থাকতো। কারণ  লাঞ্জিত হওয়া আমাদের দেশের নারীরা লজ্জাবোধ নিয়ে পুলিশ স্টেশনে গিয়ে মামলা বা সংবাদ মাধ্যমে ঘটনার বর্ণনা দেয়ার মতো পরিবেশে এখনো আসতে পারেননি।
প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনগুলো  যে বিষয় নিয়ে প্রতিবাদ করছে, তা প্রাসঙ্গিক, যৌক্তিক।  কিন্তু নেতা-কর্মীরা তৃপ্তির ঢেকুর তুলতে পারছেন না। বর্তমান আ’লীগ সরকারকে তারা আপনও বোধহয় ভাবতে পারছেন না। পুলিশী বাঁধা ও হামলা সেটাইতো প্রমাণ করে। অন্যদিকে একের পর এক ব্লগার, গণজাগরণ কর্মীকে  যেভাবে হত্যা করা হচ্ছে, সেটা কেবল ভাবার বিষয়ই নয়; আতঙ্কজনক। পূর্ববর্তী হত্যা মামলার সুরাহা না হওয়ায় হত্যাকারীরা অনুপ্রাণিত হচ্ছে। গত ১২ মে নিহত হওয়া ব্লগার অনন্ত বিজয় দাশকে দেখার পর ড: জাফর ইকবাল বললেন, ‘দেশ এভাবে চলতে পারে না।’ হ্যাঁ, চলতে পারে না। কিন্তু দেশতো এভাবেই চলছে! আওয়ামীলীগ ভালো করেই জানে- ভোটের রাজনীতিতে ভোটের বাক্সে প্রগতিশীলদের যদি ভোট পড়ে (নির্বাচনী সবগুলো আসনে সাধারনত তাদের সংগঠনের প্রার্থী সঙ্কট থাকে), তবে নৌকাতেই পড়বে! কারণ বিএনপি- জামাতের সাথে তাদের নীতি, মতাদর্শ সাংঘর্ষিক। তাই প্রগতিশীলদের সম্পর্কে আ’লীগের ধারণা বোধ হয় এমনই,  ‘সাথে না থাকলে যাবা কই?’ প্রগতিশীল বলুন কিংবা বাম পন্থী বলুন- তারা আ’লীগকে বিভিন্ন সময়ে মৌন সমর্থন দিয়ে আসছে । তাদের সেই দুর্বলতাকে পুঁজি করে কি আ’লীগ এমনটি করছে? আ’লীগ যদি এ বন্ধুদের ভুলে যায়, তবে হিতে বিপরীতই হবে।