ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

আন্দোলনের অনেক ইস্যু পেয়েও বিএনপি কিছুই করতে পারেনি, পারছেনা। বেশি অতীতে যাওয়ার দরকার নেই, সম্প্রতি সম্পন্ন হওয়া তিনটি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সরকারের বলপ্রয়োগ ও ভোট জালিয়াতি এবং তাতে নির্বাচন কমিশনের নিস্ক্রিয়তাকে আন্দোলনের ইস্যু করা যেত। বিএনপি কেবল সাংবাদিক সম্মেলনে ভোট কারচুপির বিস্তারিত তুলে ধরে নির্বাচন বর্জন করে। এ পর্যন্তই। তবে তিন সিটিতে বিজয়ী হলেও পরোক্ষভাবে আওয়ামীলীগের পরাজয় হয়েছে – এমনটিও বলেছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। আওয়ামীলীগ বলছে, আগের পরিকল্পনা মাফিক নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে বিএনপি নির্বাচন শুরুর কয়েক ঘন্টার মধ্যেই বয়কট করেছে।   মানলাম, বিএনপি’র নির্বাচন বয়কটের সিদ্ধান্ত পূর্ব পরিকল্পিত। সুষ্টু নির্বাচন হলে এবং ৩ সিটির ১টিতে বিজয়ী হলেও  আওয়ামী লীগের খুব একটা ক্ষতি হতো না। বিএনপি নতুন করে আবারো বলতে পারতো না- কোন দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন সুষ্টু হতে পারে না। তাহলে কি জনগণের ভোট  সমর্থনের উপর আওয়ামীলীগ ভরসা করতে পারছেনা? ধরে নিলাম, জনসমর্থনের উপর আওয়ামীলীগের ভরসাহীনতা বিএনপি’র জনপ্রিয়তা কিছুটা প্রমাণ করলো। কিন্তু সেই জনপ্রিয়তা, জনসমর্থন নিয়েও বিএনপি কেন আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে কিছুই করতে পারছে না? বরং অাওয়ামীলীগই সবসময় বিএনপিকে চেপে ধরে আছে।

ক্ষমতা প্রয়োগের মাধ্যমে মামলা-মোকদ্দমা দিয়ে দলটির নেতাকর্মীদের জর্জরিত করে ফেলেছে অাওয়ামীলীগ সরকার। বিএনপি’র অনেক কেন্দ্রীয় নেতা কারারুদ্ধ। মাথায় গ্রেফতারি পরোয়ানা নিয়ে অনেকেই পলাতক। দলের চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়াও বিপাকে। আন্দোলনের ডাক দিলে নেতা কর্মীদের অাশানুরূপ সাড়া পাচ্ছন না তিনি। ‘চেইন অব কমাণ্ড’ ভেঙ্গে পড়েছে। দলের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্তও ফাঁস হয়ে যাচ্ছে।মামলা-মোকদ্দমার ভয়ে অনেক কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতা নিস্ক্রিয় রয়েছেন। হামলা, মামলা ও গ্রেফতারের ভয়ে সদ্য সমাপ্ত সিটি কর্পোনেশন নির্বাচনে প্রতিটি কেন্দ্রে এজেন্ট দেয়ার মতো নেতা/সমর্থকও খুঁজে পায়নি দলটি। দলের সাংগঠনিক কাঠামো প্রায় ভেঙ্গে পড়েছে। এই সাংগাঠনিক শক্তি দিয়ে সরকার বিরোধী আন্দোলন করে যে হোঁচট খেতে হয়, তা প্রমাণিত হয়ে গেছে। প্রায় তিন মাস হরতাল, অবরোধ করে  কোন দাবিতো আদায় হলোনা। বরঞ্চ ‘হরতাল’ এর ইজ্জ্বতহানী হয়েছে বলেও রসিকতা শুনতে হয়েছে বিএনপিকে। পাশাপাশি পেট্রোল বোমায় পোড়া মানুষের আর্তনাদ, আর সাধারণ মানুষের হয়রানি, কষ্টের দায়ভার ফেলা হয়েছে দলটির উপর। বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া নিজেই নিজের  অফিসে অবরূদ্ধ থাকেন বা সরকার কর্তৃক তাকে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়- যাই বলা হোক না কেন, আন্দোলনতো চাঙ্গা হয়নি। সিটি নির্বাচনের প্রচারণায় সরকার দলীয় কর্মীদের দ্বারা খালেদা জিয়ার গাড়ির বহরে হামলা চালানো হয়, এমনকি খালেদা জিয়ার গাড়িটিও হামলায় ক্ষতিগ্রস্থ হয়। বিএনপি থেকে দাবি করা হয়, খালেদা জিয়াকে হত্যার চেষ্টায় তার গাড়িতে গুলি করা হয়েছে। তারপরও দেশব্যাপি বিএনপি নেতা কর্মীরা অনেকটা নিশ্চুপ ছিলেন। কারণ পরিস্কার- হামলা, মামলার ভয়। বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখলে অাবার গুম আতঙ্ক। দলের নেত্রী খালেদা জিয়ার উপরও যেভাবে মামলা কার্যকর; তাতে তিনিও গ্রেফতার হতে পারেন। বিএনপি’র যা অবস্থা, তাতে সরকার সে সাহস দেখাতেই পারে। আর তা যদি  হয়, তাহলে বিএনপি অনেকটা নেতৃত্বশূণ্য হয়ে যাবে।

মূলত বিএনপি’র মেরুদণ্ড ভেঙে যায়  ফখরুদ্দীন-মঈনুদ্দীন সরকারের আমলে। এক-এগারোর ‘সংস্কার’ প্রসঙ্গ আওয়ামীলীগকে যত না কাবু করেছে, তার কয়েকগুণ বেশি করেছে বিএনপিকে। তখনকার  দ্বিধাবিভক্ত বিএনপি’র নেতারা এখনো এক হতে পারেননি। তখন থেকেই বিএনপি’র সাংগঠনিক শক্তি কমতে থাকে। আর জামায়াতের সাথে জোটবদ্ধ হওয়ায় যুদ্ধাপরাধীর বিচার প্রসঙ্গে অধিকাংশ নবপ্রজন্ম, তরুণদের আকৃষ্ট করতে পারছেনা দলটি।  যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে সমালোচনা করলেও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বিএনপি চায় – এমন মন্তব্য করেছেন  দলের প্রধান খালেদা জিয়া। কিন্তু যুদ্ধাপরাধীদের সংগঠন জামায়াতকে সঙ্গী করে কীভাবে তা সম্ভব-  এমনটিও মন্তব্য করেছেন অনেকে।

বিএনপিকে ঘুরে দাঁড়াতে হলে, নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন আদায় করতে হলে কী কী করণীয়, তা দলটির নীতি নির্ধারকেরা নিশ্চয়ই ভাবছেন। এ জন্য দলটির কেন্দ্র ছাড়াও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতৃত্বে আমূল পরিবর্তন আনা হচ্ছে- এমন আভাস পাওয়া যাচ্ছে। যোগ্য এবং তরুণদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। বিগত আন্দোলনের দিনগুলোতে শীর্ষ নেতাদের ভূমিকা নিয়েও চিন্তা করছেন দলীয় নেত্রী। হ্যাঁ, প্রবীন- অভিজ্ঞ নেতাদের সাথে তরুণদের সমন্বয় করে দলের কেন্দ্রীয় জাতীয় নির্বাহী কমিটিসহ, অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের কমিটি করলে বিএনপি’র সাংগঠনিক স্থবিরতা অনেকটা কমে আসবে সত্যি; কিন্তু সরকার পতনের আন্দোলন বা নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন আদায়ে সেই একই অবস্থা থেকে যাবে। নতুন পদপ্রাপ্ত নেতারা হয়তো স্বত:স্ফুর্তভাবেই আন্দোলোনের  মাঠে নামবেন, পুলিশী বাঁধার সম্মুখীন হবেন, মামলা হবে। কেউবা গ্রেফতার হবেন, কেউবা পালিয়ে বেড়াবেন, কেউবা হবেন নিখোঁজ, গুম! ফলাফলতো একই থেকে যাবে। গতি আনতে  প্রবীন-নবীন, যোগ্যদের সমন্বয়ে কমিটি হোক, ঠিকই আছে;  কিন্তু সবার আগে যা করতে হবে, তা হলো প্রভাবশালী দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক দৃঢ় করা। বিশেষ করে  প্রতিবেশী দেশ ভারতের সাথে। প্রধান বিরোধীদল বিহীন ২০১৪ এর ৫ জানুয়ারির নির্বাচন যে সুষ্টু, গ্রহণযোগ্য হয়নি, তা সমালোচিত হলেও ভারতের সমর্থনে পার পেয়ে যায় আওয়ামীলীগ। সম্প্রতি ভারতের  লোকসভা নির্বাচনে বিএনপি প্রত্যাশা করেছিল বিজেপির নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসুক। কিন্তু ক্ষমতায় এলেও আওয়ামী লীগের সাথে ভারতের সুসম্পর্কে ফাঁটল ধরাতে পারেনি বিএনপি। জামায়াতের সাথে বিএনপির সখ্যতা এর অন্যতম প্রধান কারণ । তাছাড়া বিএনপি’র সাথে জামায়াতের জোট ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং যুক্তরাষ্ট্রের কাছেও সমালোচিত। তাই বিএনপিকে জামায়াতের বলয় থেকে বের হয়ে আসতে হবে। কারণ এছাড়া বিএনপি’র অন্য উপায় নেই; যদি বিএনপিকে ঘুরে দাঁড়াতে হয়। এত বড় সিদ্ধান্ত কি বিএনপি নিতে পারবে?

বিএনপি’র দল হিসেবে টিকে থাকার সংগ্রামে জামায়াতের সঙ্গ ছাড়ার বিকল্প নেই। জামায়াতের সাথে জোট করে বিএনপি’র ক্ষতি বৈ লাভ হয়নি। ২০০১ এর নির্বাচনে জামায়াতকে কয়েকটি আসনে ছাড় দিতে হয়েছে; বিএনপি’র যোগ্য প্রার্থী থাকা সত্ত্বেও। ঐ আসনগুলোতে বিএনপি’র সাংগঠনিক স্থবিরতা দেখা দেয়। তাছাড়া বিজয়ী হবার পর জামায়াতকে মন্ত্রীত্বও দিতে হয়। যে পতাকা বাংলাদেশে উড়ুক, চায়নি জামায়াত; মন্ত্রীত্ব পেয়ে সেই জাতীয় পতাকা গাড়িতে লাগিয়ে দাপিয়ে বেড়িয়েছে তারা। স্মৃতিসৌধে পুস্পস্তবক অর্পন করেছে! মন্ত্রীত্ব পেয়ে প্রশাসনে নিজেদের অনেক লোকও ঢুকিয়েছে জামায়াত। এক কথায় বিএনপি’র মাথায় কাঁঠাল ভেঙ্গে খেয়েছে তারা। জামায়াতকে সুসঙ্গঠিত করতে এবং তাদের আস্ফালনে বিএনপি দায়ি।

প্রবাসে বাংলাদেশীদের অনেকেই যেমন আওয়ামী লীগ, বিএনপি নামে দেশের রাজনীতি চর্চ্চা করেন, জামায়াত সরাসরি নামে না হলেও বিভিন্ন নামে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যােচ্ছ। স্পেনের এক ঘটনা বলি। ইসলামিক ফোরাম ইউরোপ ইন বার্সেলোনা (জামায়াতের সমর্থনপুষ্ট)  এর উদ্যোগে আয়োজিত একটি অনুষ্টানে সংবাদ সংগ্রহের জন্য গিয়েছিলাম। ২০১৪ এর ২১ নভেম্বর ঐ অনুষ্টানে বক্তব্য রাখেন যুদ্ধাপরাধী হিসেবে ফাঁসি হওয়া গোলাম আযমের পুত্র ড: সালমান আল আযমী। তিনি তার বক্তব্যে বলেন, বিএনপি দল হিসেবে কখনো ভালো ছিল না। এটি ভ্যালুয়েবল কোন দল নয়৷ এরা ব্যর্থ। আন্দোলন করে এরা কিছু করতে পারবে না। বিএনপি বাংলাদেশের মানুষের এন্টি আওয়ামীলীগ হিসেবে ভোট পেত। বিএনপি এখন নিজেদেরকে আরো নীচু পর্যায়ে নিয়ে গেছে। যদিও এ অভিমত তার একান্ত নিজস্ব বলে ব্যক্ত করেন। যেমনটি গোলাম আযমের বড় ছেলে আব্দুল্লাহিল আমান আযমীও বাংলাদেশে করেছিলেন। বাবার ফাঁসির পর তিনি মন্তব্য করেছিলেন,  জোট শরীক বিএনপি’র নীরবতা ’অপ্রত্যাশিত ও অগ্রহণযোগ্য’। বিএনপি নেতাদের ’কৃতজ্ঞতাবোধ’ নিয়েও বিস্ময় প্রকাশ করেন তিনি। তারা দু’জনই তাদের বক্তব্যকে একান্ত নিজস্ব অভিমত বললেও আমি মনে করি, এটা জামায়াতের নেতা, কর্মী, সমর্থকদের মনের কথা। জোট রক্ষার স্বার্থে প্রকাশ্যে বলা হচ্ছে না।জামায়াত চাইবে যেকোন উপায়ে বিএনপি’র সাথে জোটবদ্ধ থাকতে। জামায়াতকে সঙ্গ করে বিএনপি’র কী ফায়দা হয়েছে? দলের অস্থিত্ব রক্ষার স্বার্থে, রাজনীতিতে ঘুরে দাঁড়াতে জামায়াতের সঙ্গ কি ছাড়বে না বিএনপি?

বিএনপি ঘুরে দাঁড়াক। গণতন্ত্রের স্বার্থেই। নতুবা সদ্য সমাপ্ত ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোনেশন নির্বাচনের মতো স্থানীয় এবং ২০১৪ এর ৫ জানুয়ারির মতো জাতীয় নির্বাচন হতে থাকবে । জনগণ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন না। গণতন্ত্র কেবল কাগজে কলমে, মুখেই থাকবে। একটি দল দীর্ঘদিন ক্ষমতায়  থাকবে। ক্ষমতার অপব্যবহার বৃদ্ধি পাবে। আর সেই ক্ষমতার অপব্যবহারে বিরোধী দলীয় নেতা কর্মী, সাংবাদ কর্মী, সাহিত্য-সংস্কৃতি কর্মী ছাড়াও সাধারণ জনগণ রেহাই পাবেন না।