ক্যাটেগরিঃ প্রকৃতি-পরিবেশ

চন্দ্রিমা উদ্যান-  নাম পরিবর্তন হয়েছে অনেক ঢাক-ঢোল পিটিয়ে, তবে উন্নতির কিছুই হয়নি। বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা আর ঢাকা শহরের প্রাণকেন্দ্র হলো সংসদ ভবন, আর সংসদ ভবনের পাশেই হলো এই উদ্যানের অবস্থান। যারা ঢাকা শহরে বসবাস করে তারা এই উদ্যানে বেড়াতে আসেননি অথবা নাম জানে না- এমন কাউকে খুঁজে পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না। ঢাকার বাইরে যারা থাকেন তারাও বেশিরভাগ মানুষ এর অবস্থান জানেন। ভোরে হাঁটতে যাওয়ার জন্য বা বিকেলে হাঁটার জন্য এর চেয়ে উৎকৃষ্ট জায়গা আর খুঁজে পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ।

একদিকে আমাদের জাতীয় সংসদ ভবন আরেক দিকে হলো এই উদ্যান। আর মাঝ দিয়ে রয়েছে একটি সুন্দর লেক। ভোরবেলা এখানে আসলে মনের অবস্থা পরিবর্তন হয়ে যায়। স্নিগ্ধ হাওয়া আর নির্মল পরিবেশ এক অন্য রকম করে দিয়ে যায় মনকে। প্রতিদিন এখানে অসংখ্য দর্শনার্থী আসে এই উদ্যান দেখতে আর এর পরিবেশ উপভোগ করতে।

আমরা দেখেছি একসময় যখন এর সঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ ছিল, তখন বিকেলে এই উদ্যানে আসলে মনে হতো কোন উন্নত দেশ বলতে আমার যেমন বুঝি তেমন কোন দেশে চলে এসেছি। পরিষ্কার-পরিচ্ছন পরিবেশ আর মাঝের লেকে থাকতো পানির ফোয়ারা। আবার নানা রকম আলোয় করা হতো আলোকিত। লেকের মাঝ দিয়ে দেওয়া হয়েছে একটি ব্রিজ, যার উপরে দাঁড়ানোর জায়গা পাওয়া যেত না। বন্ধের দিনে মনে হতো ঢাকা শহরের সকল মানুষ এখানে চলে এসেছে ঘুরতে।


ভোরের মুক্ত হাওয়ায় সকলে ব্যায়াম করছে

ঢাকা শহরের মানুষ যখনই একটু সময় পায় তখনই চায় পরিবার নিয়ে একটু বাইরে থেকে ঘুরে আসতে। আর ছোট বাচ্চাদের নিয়ে ঘুরতে যাওয়ার জন্য এর চেয়ে ভালো জায়গা আর হতে পারে না। বর্তমান বাংলাদেশের জনসংখ্যা যদি ১৬ কোটি ধরা হয় তাহলে এদের মধ্যে যারা ভোটার, অথবা ভোটার ছাড়াও যারা দেশের ইতিহাস সম্পর্কে জানতে চায়, তারা প্রায় সকলেই এই উদ্যানকে জানে।

তাছাড়া যদি ভোরের দিকে এই উদ্যানে যান তাহলে মনে হবে এটা যেন একটি ভাসমান বা অস্থায়ি ব্যায়ামাগার। শত শত লোক এখানে আসে, ভোর থেকে শুরু হয় আর শেষ হয় রাতে। ছোট ছোট দল হয়ে তারা ব্যায়াম করছে নিজেদের মতো করে। কোথাও কোথাও আবার এদের দেওয়া হচ্ছে প্রশিক্ষণও। পুরুষ-মহিলা এমনকি ছোট বাচ্চারাও এখানে আসে হাঁটতে বা ব্যায়াম করতে। কেউ করছে ব্যায়াম আবার কেউ নিচ্ছে ক্যারাতে প্রশিক্ষণ!  সকালে এলে মনে চাইবে একটু ব্যায়াম করি অথবা একটু দৌড় দেই। অনেক যুবক আসে এখানে খেলাধুলা করতে। নাম পরিবর্তন হয়েছে, তবে লোকজনের আসার কোন পরিবর্তন কিন্তু হয়নি। এর পাশেই রয়েছে আমাদের জাতীয় সংসদ ভবন, আর তার নিরাপত্তার জন্য সবসময় এখানে থাকে অনেক নিরাপত্তা কর্মী। এসব কারণে এই উদ্যানকে মানুষ এত নিরাপদ মনে করে।

এখন আসি এর বর্তমান অবস্থা নিয়ে। আসলে আমরা যদি এর দর্শনার্থী নিয়ে কথা বলি তাহলে বলবো, অবস্থা অনেক ভালো হয়েছে আগের থেকে। কিন্তু যেটা জরুরি প্রয়োজন সেটা হলো এর রক্ষণাবেক্ষণ। এত পরিমাণ ময়লা চারিদিকে যে মনেই হয় না কোন এক সময় এই উদ্যান এতটা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ছিল। পানি শুকিয়ে লেকটি একটি মৃত লেকে পরিণত হয়েছে এখন। এত সুন্দর একটি ব্রিজ, যেখানে দাঁড়ালে আগে মনে হতো আমি অন্য কোন এক সুন্দর দেশে গিয়েছি ঘুরতে, এখন সেই ব্রিজটিরও বেহাল অবস্থা। এখন সময় অপেক্ষার যে কবে এই ব্রিজটি ভেঙে পড়বে আর হতাহতের ঘটনাকে কেন্দ্র করে এখানে সাধারণ জনগণের প্রবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা হবে।

জিয়ার সমাধিস্থলে গেলে মনে হবে এটা কোনো বিলবোর্ডের জায়গা। সমাধির উপরে কিছু ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা ছিল, যা দিয়ে এই সমাধিসহ পুরো উদ্যানের নিরাপত্তা দেওয়া হতো। বর্তমানে সবগুলো ক্যামেরাই নষ্ট হয়ে উপর থেকে ঝুলছে, আর অপেক্ষা করছে কবে কার মাথার উপরে ভেঙে পড়বে।


জিয়ার সমাধি যেন একটি বিলবোর্ডের জায়গা

আমরা হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করে হাতিরঝিলের মতো সুন্দর এলাকা তৈরি করতে পারি, কিন্তু আমরা পারি না ভালো কিছুকে রক্ষণাবেক্ষণ করতে। আমরা চাই একটা সুন্দর পরিবেশ, যেখানে সবাই তাদের পরিবার নিয়ে একটু ঘুরতে যেতে পারে।

সময়ের সংকটের কারণে আমাদের হাতে পরিবার-পরিজন নিয়ে দূরে ঘুরতে যাওয়ার সময় থাকে না। আমরা চেষ্টা করি কাছাকাছি ঢাকার ভেতরে যেসব উদ্যান রয়েছে,  তাদের ভেতরে থেকে যেখানে নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভালো সেখানে যেতে। বর্তমান সরকার জনগণের নিরাপত্তার জন্য জিরো ট্লারেন্সে রয়েছে। এই দিক দিয়ে এখনো এই চন্দ্রিমা উদ্যান অনেক ভালো অবস্থানে রয়েছে।


লেকের বর্তমান অবস্থা

সাধারণ মানুষের কথা চিন্তা করে এই উদ্যানের সৌন্দর্য আবার ফিরিয়ে আনতে হবে। আর এর জন্য সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে এবং যারা এই উদ্যানের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে রয়েছেন তাদেরকে উদ্যানের সৌন্দর্য রক্ষায় কাজ করতে হবে, নগরের সৌন্দর্যপিপাসু নাগরিকদের জন্য।