ক্যাটেগরিঃ ভ্রমণ

 

ব্যাংকক এয়ারওয়েজ থেকে ইয়াঙ্গুন নামার পর, কাস্টমস ক্লিয়ারেঞ্চের সময় কাঁচের ভিতর থেকেই দেখলাম বাইরে টিপটিপ বৃষ্টি হচ্ছে। লাগেজ গুছিয়ে নিয়ে বাইরে এসে দেখি মামুন ভাই ও তার অফিসের লোকজন গাড়ী নিয়ে অপেক্ষা করছে।

গাড়ী চলতেই বড় ধরনের খটকা লাগলো, এখানে সব গাড়ী চলে রাস্তার ডানপাশ দিয়ে যদিও গাড়ির স্টিয়ারিং ডান পাশে! সাধারনতঃ এই ট্র্যাফিক সিস্টেমে স্টিয়ারিংটা বাম পাশে হওয়ার কথা।
এয়ারপোর্ট থেকে হোটেলে যাওয়ার রাস্তাটা খুব সুন্দর কিন্তু দু পাশের রাস্তা বিভক্তকারী কনক্রিটের কোন রোড ডিভাইডার না থাকার কারণে বারবারই মনে হচ্ছিলো এই বোধ হয় সামনের গাড়ির সাথে ধাক্কা লাগলো! দুই একবার চমকেও উঠলাম এবং হার্টটা তার কয়েকটা বিট’ও মিস করলো!

আমরা সাধারণত ঢাকা শহরের বিভিন্ন জায়গাকে বিভিন্ন নামে চিনি যেমন মিরপুর, বারিধারা, গুলশান, মতিঝিল ওরা চেনে বিভিন্ন টাউন-শিপ নামে, পুরো শহরটাই টাউন-শিপ আদলে তৈরি। আমাদের হোটেলটা ছিল “বহন” (আমাদের উচ্চারণ) টাউন-শিপ -এ। ভাষাটা এখানে একটা ফ্যাক্টর, ইংলিশ প্রায় কেউই জানেনা ! আর ইংলিশ অক্ষর দিয়ে কোন জায়গা বা হোটেলের নাম পড়তে গেলে তা নিশ্চিত ভাবে ভুল হবে। যেমন মায়ানমার-এর মুদ্রার নাম “Kyat” কিন্তু উচ্চারণ হবে “চাট”। ১০০ ডলারে ৮৪,০০০ চাট পাওয়া যায় কার্ব মার্কেটে কিন্তু হোটেলে এক্সচেঞ্জ করলে ৭৪,০০০ থেকে ৭৬,০০০ চাট পাওয়া যাবে। মামুন ভাইয়ের কাছে জরুরি ভিত্তিতে ১০০ ডলার ভাঙ্গানোর পর ৮৪,০০০ চাট পেয়ে নিজেকে যথার্থই বড়লোক মনে হলো। কিন্তু যখনিই মামুন ভাইয়ের কাছে হোটেল ভাড়া জিজ্ঞাসা করলাম তখনি মাথাটা চক্কর দিলো হোটেলের রুম ভাড়া শুনে । প্রতি রাত্রি ৭৫,০০০ চাট প্রতি রুম। পরে আমরা অবশ্য অনেক কমে রুম পেয়েছিলাম। এখানে বিদেশিদের জন্য সব কিছুর দাম ডাবল । আমি যে রুমে আছি তার ভাড়া একজন মায়ানমার বাসীর জন্য অর্ধেক ।

এখানে আসার পর প্রথম প্রথম আমি যখনিই কোনকিছুর দাম জিজ্ঞাসা করেছি বা কোন পণ্য-এর Price Tag দেখেছি তখনি ভড়কে গেছি দাম শুনে বা জেনে। “হোটেল পার্ক রয়াল” –এর কাছে “৩৬৫ রেস্টুরেন্ট”–এ দুপুরের খাওয়ার পর যখন আমার বস ও আমার খাওয়া বাবদ ২৫,০০০ চাট বিল আসলো তখন আবার ভড়কে গেলাম! পরে মামুন ভাই একটা বুদ্ধি শিখেয়ে দিলো, বলল “ দাদা, দাম যাই আসুক না ক্যান তাকে ১০ দিয়ে ভাগ করবেন। অর্থাৎ কোন কিছুর দাম ১,০০০ চাট চাইলে আপনি মনে করবেন ১০০ টাকা, তাহলে আর কোন প্রবলেম হবে না, আমাদেরও প্রথম প্রথম খুব সমস্যা হয়েছে”। বুদ্ধিটা খুবই কাজে দিলো। পরে আর যে কয়দিন ছিলাম এটা নিয়ে আর কোন সমস্যা হয়নি।

হোটেল পার্ক রয়াল হচ্ছে ইয়াঙ্গুন–এ সবচেয়ে বড় পাঁচ তারকা হোটেল, কিছু দিন আগেও এর রুম-রেন্ট ৫০-৮০ ইউ এস ডলার এর মধ্যে ছিল কিন্তু মায়ানমার সরকার অং সাং সুকি’কে মুক্তি দেওয়ার পাশাপাশি, তাকে ও তার দলকে গণতান্ত্রিক নির্বাচনে অংশ গ্রহণের সুযোগ দানের পর মায়ানমার –এ যেন পর্যটক-এর ঢল নেমেছে। এর সাথে যোগ দিয়েছে আমেরিকান ও ইউরোপিয়ান ব্যবসায়ী দল । এ যেন এক Gold Rush । এই সুযোগে হোটেলটির রুম রেন্ট ২০০ + ইউ এস ডলারে ঠেকেছে । আর “৩৬৫ রেস্টুরেন্ট” টির অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্যই হোল, এটা বছরের কখনই বন্ধ হয় না এবং সবধরনের খাবার সবসময় পাওয়া যায়! অবশ্যই বাঙ্গালী বা ইন্ডিয়ান ফুড না! অক্টোপাস থেকে স্যামন মাছের স্তেক, পরক(Pork) থেকে চিকেন আইটেম, ফ্রুটজুস থেকে শ্যাম্পেইন। এছাড়াও সবধরনের কেক, ডেসার্ট মিলবে এখানে। এর সাথে যে মানিয়ে নিতে পাড়বে তার কোন সমস্যা হবে না । যে পারবে না তাকে ভিন্ন চিন্তা করতে হবে কিন্তু মনে হয় কোন লাভ হবে না! ইয়াঙ্গুনের ছোট রেস্টুরেন্ট যেখানে শুধুই স্থানীয় মানুষ খাবার খায়, সেখানে আমরা খেতে পারবোনা। আমার কাছে সবচেয়ে ভাল লেগেছে আমি যে হোটেলে ছিলাম তার রেস্টুরেন্ট এর খাবার, আমি ফুড মেন্যু থেকে ২/৩ টা ভেজ মেন্যু বেছে নিয়ে তা নিজের মত করে মিশিয়ে খেয়েছি। আফটার অল এখনও অক্টোপাস বা সীস্নেক খাওয়ার মত অবস্থায় নিজেকে উত্তোলন করতে পারিনি!

চাকরীসূত্রে কিন্তু ব্যবসার কাজে এখানে এসে গত কয়েকদিন বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে, বিভিন্ন মানুষের সাথে মিশে, কথা বলে বুজলাম, এখানে ব্যবসা শুরু করা কষ্ট হবে কিন্তু একবার শুরু করতে পারলে এবং আমাদের কমিটমেন্ট ঠিক থাকলে ভবিষ্যৎ খুব ভাল। কারণ অফুরন্ত সম্পদে পরিপূর্ণ এই দেশের বাজারটি এখনও পুরোপুরি ফাকা। যদিও দেশটিতে চীনাদের এবং আংশিকভাবে থাইল্যান্ডের প্রভাব খুব বেশী কিন্তু গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পুরোদমে চালু হলে এই দেশের জনগণ নিশ্চিত ভাবেই আগের প্রভাব থেকে মুক্ত হতে চাইবে, হতে চাইবে স্বাবলম্বী, আর এখানেই আমাদের সম্ভাবনা। আত্মশক্তিতে বলিয়ান এই জাতি অবশ্যই অর্থনৈতিক ভাবেও পিছিয়ে থাকতে চাইবে না! এই কারনেই আমেরিকান ও ইউরোপিয়ান ব্যবসায়ীর দল ঝাঁপিয়ে পরেছে ব্যবসার খোঁজে, ফলও পাচ্ছে হাতে নাতে, রাস্তায় এখন ব্র্যান্ড নিউ BMW, Mercedes Benz, AUDI, TOYOTA-Lexus গাড়ির ছড়াছড়ি। শুনলাম ৫-৬ মাস আগেও অফিস টাইমে রাস্তা ফাঁকা থাকতো কিন্তু আমরা ভালই ট্র্যাফিক জ্যাম পেলাম। মনে মনে বললাম, এইতো মুক্ত অর্থনীতির বাই-প্রডাক, বুজবা কয়দিন পর, যখন আমাদের মত ডেইলি ৪-৫ ঘণ্টা জ্যামে বসে থাকবা! সবার কাছেই এক বাক্যে শুনলাম, এই দেশের মানুষ খুবই সৎ, চুরি ডাকাতির কথা নাকি শোনাই যায় না। মনে মনে আবার বললাম, মুক্ত অর্থনীতির বাই-প্রডাক্ট হিসাবে শুধু ট্র্যাফিক জ্যামই এই দেশে ঢুকবেনা? দুর্নীতিও ঢুকবে, এই জায়গাটাও ফাঁকা! অচিরেই দুর্নীতির লিস্টে আমাদের পাশে তোমাদের পাবো বন্ধু!

ইয়াঙ্গুনে এখন বর্ষা নেমেছে । আসার পর থেকেই দেখছি কখনো মুষলধারে, কখনো টিপ টিপ বৃষ্টি হচ্ছে। শহরটা যেন একেবারে সবুজে ঢেকে আছে ।ঘাস, লতা, গাছ গুলো যেন বলছে দেখো আমরা কত সুন্দর হতে পারি। মনে হয় এই শহরের ৫০ ভাগ এলাকা জুড়ে আছে শুধু গাছ আর গাছ। একটা শহরের সৌন্দর্যও যে সবুজ গাছপালা হতে পারে তা এখানে না আসলে বুজতাম না। আমরা আমাদের সবুজ বাংলাদেশ নিয়ে গর্ব করি কিন্তু আজ ঢাকা শহরের কতটুকুতে সবুজ বেঁচে আছে? খুব হলে ৫ ভাগ! অথচ আমরা গর্ব করি সবুজ বাংলা নিয়ে ! অর্থনৈতিক উন্নতির নামে আমরা শুধু ঢাকা শহরকেই বৃক্ষ শূন্য করিনি, বাংলাদেশকেও বৃক্ষ শূন্য করেছি। ছোট বেলায় আমাদের গ্রামে অসংখ্য প্রজাতির ঘাস, উদ্ভিদ, গাছ পালা দেখতাম কিন্তু এখন তা আর দেখিনা। আমাদের লোভে পড়ে গ্রাম্য বনগুলোও আজ উজাড় হয়ে গেছে । গাছ রেখেও যে শহর গড়া যায় তা ইয়াঙ্গুন বাসি করে দেখিয়েছে। এখানে অবশ্য বৌদ্ধধর্ম-এর একটা বিশাল অবদান আছে। এই ধর্মমতের সাথে প্রকৃতি অঙ্গাঙ্গী ভাবে জড়িয়ে আছে।

ইয়াঙ্গুনে আজ কয়েকদিন ধরে আমাদের কাজের প্রয়োজনে প্রচুর ঘুরতে হচ্ছে, কাজের ফাঁকে ফাঁকে যতটুকু দেখেছি তাতে মনে হয়েছে যা বা যাদের আমি বহুদিন ধরে দেখেনি তা আবার দেখছি, কলমি-লতা থেকে সজনে, নয়নতারা থেকে কাঞ্চন, ভ্যান্না থেকে সেগুন।

আমি তাদের কথাই শুধু লিখতে পারছি যাদের নাম আমি জানি কিন্তু যাদের আমি শুধুই চিনি সেইরকম শতশত প্রজাতির ঘাস, উদ্ভিদ এর কথা লিখতে পারলাম না বলে দুঃখিত। এমনকি একটা বাড়ির উঠানে অনেক বড় একটা ধঞ্চে গাছ দেখলাম যা শুধু আমদের কৃষি জমিতে আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে লাগানো হয় জ্বালানি বা জমিতে সার তৈরি হওয়ার জন্য।

বাংলাদেশ ও মিয়ানমার এর মধ্যে প্রকৃতিগত ভাবে ভীষণ মিল। পীত প্রজাতির মানুষ গুলোকে বাদ দিয়ে এই দেশকে দেখলে যে কেউ বাংলাদেশ বলে করে ভুল করবে! একটা ব্যাপারে আমার খটকা লেগেছে, চরুই পাখি ব্যতীত আর তেমন কোন পাখি দেখিনি? ভেবে নিজেই সিদ্ধান্ত নিলাম “হয় অন্য পাখিগুলো বৃষ্টির কারণে চলাফেরা বন্ধ করে রেখেছে, না হয় দেশজুড়ে অনেক গাছ পালা থাকার কারণে তাদের খাদ্যের সন্ধানে লোকালয়ে আসতে হয় না”। এত গাছ আছে অথচ পাখি নাই এটা-তো হতে পারে না?
অসমাপ্ত