ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

 

সেদিন ফেসবুকে একটা প্রোফাইলের ছবি’র লিংকে ক্লিক করে মনটা খারাপ হয়ে গেল নিজেকে প্রতারিতও মনে হলো। একটু পরেই আর একটা লিংকে বন্ধু রবু’র প্রোফাইলে ক্লিক করে মনটা ডবল ভাল হয়ে গেল, রবু’র হাসি মাখা মুখটা যেন স্বভাবমত বলছে, ” মামা ভাল আছ?” মনে মনে বললাম ভাল আছি। সাথে সাথে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠালাম এবং অনলাইন চ্যাটে আমন্ত্রন জানালাম, উত্তর এলো সাথে সাথে, টুক টাক ভার্চুয়াল কথাবার্তা’র পর মোবাইল নম্বর দিয়ে বললাম ” ফোন কর”, সাথে সাথে ফোন আসলো ওর প্রথম কথাই হলো ” মামা ভাল আছ?” । অনেক দিন পর ওর সাথে কথা হলো, প্রোফাইলে ওর সাহেবের মত ফুটফুটে ছেলের ছবি দেখে বললাম, এত সুন্দর ছেলে তুই কোথায় পেলি, তোর বউ তাহলে খুব সুন্দর ? শুরু হয়ে গেল আমাদের স্বভাবগত ফাজলামি !

রাশেদের মা মারা গেছেন , রাশেদের ফেসবুক প্রোফাইলে ওর মা’র মৃত্যু সংবাদ পেলাম । ওর মার কথা আমার মনে পড়ছে। রাশেদের সিরাজগন্জের খলিফা পট্টির বাসায় আমি দুই-তিনবার গিয়েছিলাম, সম্ভবত প্রথমবার, তখন আমরা ইউনির্ভাসিটিতে প্রথম বর্ষে পড়ি, খাবার টেবিলে গরুর মাংস থাকায় এবং আমার নাম জানার পর খালাম্মা রাশেদকে বকুনি দিয়ে বললেন, ” তুই আগে আমাকে বলবি না?” আমি হেসে বললাম, ” খালাম্মা, আরও অনেক খাবার আছে, আমি তা দিয়ে ভালই খেতে পারবো, তবুও তিনি তাড়াতড়ি করে ডিম মামলেট করে এনে আমার খাবার প্লেটে তুলে দিলেন । ওই সময় রাশেদের বড়ভাই বেলজিয়াম থেকে ভাবীসহ এসেছিল, তাই খাবার টেবিলে প্রচুর আয়োজন ছিল, তার পরেও খালাম্মা ডিম ভেজে আনলেন। এটা বললাম এই জন্য যে খুবই অল্প সময়ের পরিচয়ে আমার প্রতি তার যে সন্তানতুল্য স্নেহ ও আন্তরিকতার দেখা সেদিন আমি পেয়েছিলাম তা খুবই বিরল। কিছু কিছু ছোট জিনিস আছে যা কখনো ভোলা যায় না, স্মৃতিতে গেঁথে থাকে। সৃষ্টিকর্তা তাকে স্বর্গবাসী করুন!

কয়েকদিন আগে রাশেদ দেশে এসেছিল ওর মাকে দেখতে, ব্যস্ততা, ঢাকার ভয়াবহ ট্রাফিক জ্যাম উপেক্ষা করে মতিঝিলে ওর সাথে দেখা করতে গেলাম, মোবাইলে ওর অবস্থান জেনে নিয়ে, স্ট্যাডার্ড ব্যাংকের মতিঝিল কর্পোরেট শাখায় ওর পুরোনো কলিগের রুমে ওর সাথে আমার অনেক দিন পরে দেখা হলো। জানলাম ওর মা ভীষন অসুস্থ, ক্যানসার, মনটা খুবই খারাপ হয়ে গেল। ওখান থেকে বের হয়ে, ওকে নিয়ে স্টক এক্সচেঞ্জের একটেনশন বিল্ডিং-এর ৪র্থ তলায় এম সিকিরিটিসে আমার বিও একাউন্টে নতুন করে আবার কিছু টাকা জমা দিলাম, ওই প্রতিষ্ঠানের জেনারেল ম্যানেজার মাসুদ ভাই বললেন, দাদা এই ধসের সময় কি শেয়ার কিনবেন ? বললাম স্কয়ার ফার্মা, ২০ বছর পর মেয়ের বিয়ে দিব এটা বিক্রি করে ! সবাই মিলে হাসলাম।

ওখান থেকে বের হয়ে রাশেদকে বললাম কি খাবি ? ও বললো কিছু না, বললাম চল তোকে একটা স্পেশাল চা খাওয়াই, এই বলে দুজনে শাপলা চত্বরের দিকে হাটতে শুরু করলাম, হকার, মানুষ, রিক্সা, প্রাইভেট কার, বাসের জট ঠেলে আমাদের প্রিয় ”ডিজিটাল চায়ের দোকানে” এলাম। চায়ের দোকানের এমন নাম শুনে ও খুব মজা পেল, বললাম এখন ডিজিটালের যুগ, সবকিছুতেই এখন এর ছোঁয়া চাই-ই, চা’তে পড়লে ক্ষতি কি? দেশটাই তো আজ ডিজিটাল ! দেখলি না শেয়ার মার্কেটে কি সুন্দর ডিজিটাল ডাকাতি হলো ! হুজুর সালমান, মিষ্টি হাসির ফালু ভাইরা রাজনৈতিক বিবাদ ভুলে দুই আপা-বেগমকে ব্যাকআপে রেখে লাখ লাখ শেয়ার ব্যবসায়ীকে ডিজিটালি ফালা ফালা করে দিলো আমি নিশ্চিত ডীজীটাল স্টিভ জবস্ও ওদের কাছে নস্সি । যাক, টাকা না থাক আমাদের গর্বের সি ডি বি এ’লে শেয়ারতো আছে পরবর্তিতে সময় সুযোগমত আবার ওদের প্রিয় হাতে সাইজ হওয়ার জন্য ! ১৯৯৬ হয়েছিলাম, ২০১১ তে হলাম এবং সম্ভবত আবার ২০২০ সালে ! সৃষ্টিকর্তা ওদের অমর করুন!

ডিসকভারী টিভি চ্যানেলে জাপানী মৌমাছির উপর একটি প্রামান্য চিত্র দেখেছিলাম, তাতে দেখানো হয়েছিল কিভাবে ভীমরুলের দল ক্ষুদ্র ও নিরীহ মৌমাছিদের হত্যা করে তাদের আহরিত মধু ও সন্তানদের ডাকাতি করে নিয়ে যায়, নিজে ও সন্তানদের খাওয়ানো এবং সংরক্ষণের জন্য।

ভীমরুলদের পদ্ধতিটি খুবই চমৎকার ! প্রথমে ভীমরুলরা দলবেধে কোন গাছের কোটরে বা মাটির গর্তে চাক করে বাসা বাধে আর লক্ষ্য রাধে কোথায় কোথায় মৌমাছিগুলো বাসা বাঁধছে, নিরীহ মৌমাছির কর্ষ্টাজিত মধুতে মৌচাকগুলো যখন পরিপূর্ন, বাচ্চাগুলো যখন প্রায় পূর্ণ মৌমাছি, তখন ওরা ডিম পাড়ে। প্রথমে একটা বা দুটা ভীমরুল একটা মৌচাককে টার্গেট করে নিরীহ ভাবে ঘুর ঘুর করে এবং মৌচাকের পাশে গিয়ে বসে, বোকা মৌমাছিগুলো অল্প বিপদদেখে দলবেধে চাক ছেড়ে বেড়িয়ে এসে ভীমরুলটিকে ভয় দেখিয়ে তাড়াতে যায়, এই সুযোগে ঝাঁকে ঝাঁকে ভীমরুল এসে কিছু ঝুঝে ওঠার আগেই মৌমাছির দলে আক্রমন করে। প্রথমে ধারলো দাঁত দিয়ে মৌচাক রক্ষকদের মাথা কেটে ফেলে, তারপর কর্মী ও বাচ্চা লালনপালনকারী মৌমাছিদের মাথা কাটে, সর্বশেষে রানী মৌমাছিকে হত্যা করে। না, তারা কিন্তু সব মৌমাছিদের হত্যা করে না, একটা রানী মৌমাছি যে এখনো মথ এবং তাকে লালন পালন করার জন্য কিছু কর্মী ও বাচ্চা লালনপালনকারী মৌমাছিদের ভবিষ্যতে আবার মাথা কাটার জন্য জীবিত রেখে সব মধু ও বাচ্চা নিয়ে চলে যায়।

হুজুর, মিষ্টি হাসির ভীমরুল ভাইদের ডিজিটাল ডাকাতির সাথে মিলে যাচ্ছে না?

একটু পরে বকুল আসলো, সবাই মিলে সেনাকল্যান ভবনের বিপরীতে, ডেইলি সানের ব্র্যান্ডিং করা সংবাদপত্র বিক্রয় কেন্দ্রে ’র বামের গলিতে আমদের প্রিয়, আমার প্রিয় কলিগ রাশেদ ভাই ও তার শেয়ার ব্যবসায়ী বন্ধুদের আড্ডাস্থল ”ডিজিটাল চায়ের দোকানে” গরুর খাঁটি দুধের চা খেলাম । যদিও সাইনবোর্ড টি এখন আর নেই, তাতে কি নামকরন হয়ে গেছে এটার। বসুন্ধরা গ্র“পের সেন্ট্রাল ব্র্যান্ডিং ডিপার্টমেন্টের দায়িত্বে থাকার সময় ঢাকার সংবাদপত্র বিক্রয় কেন্দ্রেগুলোর ব্র্যান্ডিং করেছিলাম। এগুলোর কন্ট্রাক্ট গুলো এখনো বিদ্যমান থাকার মানে হলো আমার এই প্রজেক্টটি সফল এবং পণ্যের ধরন অনুযায়ী স্থান গুলো নির্বাচন সঠিক ছিল। সাধারনত আমাদের বর্তমান কর্পোরেট স্টাইলে নিজকে উপস্থাপন করার জন্য পুর্বোক্ত অফিসারের কাজকে অবমূল্যায়ন করা হয়। মনে হয় বর্তমানে যারা এই ডির্পামেন্টে কাজ করছে তারা এর চেয়ে ভাল কিছু ম্যানেজমেন্টের কাছে উপস্থাপন করতে পারেনি। যাহোক মাঝে মাঝে নিজের পুরোনো কাজগুলো এখনো টিকে আছে দেখে ভাল লাগে।

বকুল, রাশেদ ও আমি বহুদিন পড়ে একসাথে রিক্সায় উঠলাম যথারীতি আমি উপরে, টি এস সিতে ফারক অপেক্ষা করছে। অনেকক্ষন আড্ডা দিলাম। তারপর মা ও মেয়ে’র জন্য ব্যাকুল রাশেদকে বিদায় দিয়ে যার যার গন্তব্যে ফিরে গেলাম।

বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়ার পর আমরা বন্ধুরা সবাই যার যার কর্মের খোঁজে এদিক ওদিক চলে গিয়েছিলাম। প্র্রায় ১০ বছর পর আবার আমরা একত্রিত হতে শুরু করেছি। জানতে পারছি একে অপরের অবস্থান, কর্মস্থল, পজিশন, পরিবার সম্পর্কে। এরজন্য অবশ্যই মি: মার্ক জাকার বার্গ কে ধন্যবাদ দিতে হবে।

(বিভিন্ন সময়ে লেখা)