ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

 

রুপা জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে বলল, দেখ কত সুন্দর চাঁদ উঠেছে! আমি বললাম, আজ নাকি নীল চাঁদ উঠবে! দেখ তো চাঁদটা নীল কিনা? রুপা বলল, চাঁদ আবার নীল হয় নাকি? আমি বললাম, হয় বোধহয়, এই দেখ, অনলাইন নিউজ পেপারে খবর দিয়েছে, “আজ নীল চাঁদ দেখা যাবে, শীতলক্ষ্যা নদীতে মানুষের ঢল”।

রাত তখন প্রায় ১২ টা । আমি বিছানায় বসে জানালায় এপাশ-ওপাশ করে দুটো বালিশ ফেলে তাতে হেলান দিয়ে কোলের উপর ল্যাপটপ নিয়ে ব্লগে লিখছি। হিট থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য ল্যাপটপের নীচে সুতপার ছোট বালিশটা রেখেছি। রুপা আমার লেখাটা পড়ছে আর টুকটাক মন্তব্য করছে।

রুপা আমার লেখার প্রথম পাঠক ও সম্পাদক। তাও দুই শর্তে, প্রথমটা হল, যদি আমার লেখা ওর পছন্দ হয়, তাহলে রাত যতই হোক সে আমাকে চা বানিয়ে খাওয়াবে, আর দ্বিতীয়টি হল, যদি কোন বানান ভুল ধরতে পারে, তাহলে সে আমার কাছ থেকে সম্পাদনা ফি হিসেবে পাবে একশত টাকা।

সুতপা আমাদের একমাত্র মেয়ে ওর বয়স তিন বছর দেড় মাস, ও আমাদের পাশে বসে খেলছে, ল্যাপটপের দখল নেওয়ার চেষ্টা করছে, আর ইউ টিউবে ডরেমন ও গোপাল ভাই’য়ের (শ্রী কৃষ্ণের) কার্টুন দেখার বায়না করছে । পারছেনা বলে মাঝে মাঝে কি বোর্ডের অক্ষর গুলো চেপে দিচ্ছে, যাতে আমি ওর উপরে বিরক্ত হই। আমি জানি আমার সামান্য বিরক্ততিতে ও খুশি হবে এবং দ্বিগুণ উৎসাহে কি বোর্ডের উপর ঝাঁপিয়ে পড়বে। তাই আমি হাসি মুখে ওকে প্রতিবার কি বোর্ডের অক্ষর গুলোকে উলটাপালটা চেপে দেওয়ার জন্য থ্যাঙ্ক ইউ দিছি এবং ফল যা পাবো বলে আসা করছিলাম তাই পাচ্ছি “ও উৎসাহ হারাচ্ছে”।

অফিস থেকে বাসার আসার পর আমি সাধারণত টিভি ও টুকটাক বই-পত্রিকা পরে সময় কাটাতাম কিন্তু মেয়ের ডরেমন ও রুপার স্টার প্লাস এর জ্বালায় আমি টিভি রুম থেকে স্ব-নির্বাসিত। আর নির্বাসনই আমাকে ব্লগার বানিয়েছে। ডরেমন কার্টুন তাও বা দেখা যায় কিন্তু স্টারপ্লাস, একেবারেই অসহ্য। এই চ্যানেলের শব্দ শুনলেই আমার রাগ ওঠে, আর কি যে আজেবাজে সিরিয়াল দেখায় তা বলে বা লিখে শেষ করা যাবে না! “কাজের মেয়ের হাত থেকে খাবার জলের গ্লাস পরে গেছে” এই ছোট্ট একটা ঘটনা ঘটিয়ে এবং সেটিকে পুঁজি করে পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে যে পর্বের পর পর্ব চালানো যায় তা এই চ্যানেলের সিরিয়ালগুলো না দেখলে বিশ্বাস করা সত্যিই কঠিন। আর কাজের মেয়ে? তাকে চিনতে হলে হয়তোবা বছরের পর বছর সিরিয়ালগুলো দেখেতে হবে! সবচেয়ে বাজে দিক হল, টিভি দর্শকের বছর পার হয়ে যাবে, ছেলে-মেয়ে বড় হয়ে যাবে; কিন্তু সিরিয়াল একটুও আগাবে না!

রুপার চাঁদ দেখার কথায় আমি সুযোগ পেলাম, আনন্দিত কণ্ঠে সুতপাকে বললাম, মা, দেখে আসো তো কত বড় চাঁদ উঠেছে? চাঁদ দেখার কথা শুনে সে তাড়াহুড়া করে বিছানা থেকে নেমে এক দৌড়ে বেলকনিতে গেল চাঁদ দেখতে।

চাঁদ দেখেই সে উত্তেজিত ভঙ্গিতে দৌড়ে এসে ওর আধো উচ্চারণে বলল, বাবা, আস, দেখ, চাঁদ হাঁটছে! ওর কথা শুনে আমি আর রুপা, দুইজনই একসাথে হেসে উঠলাম, কিন্তু আমার পুঁচকে মা’টা ভীষণ উত্তেজিত, বাবা আসো! আসো না বাবা! বলে আমাকে টানতে শুরু করল ওর সাথে চাঁদ দেখেতে যাওয়ার জন্য। বার বার টানাটানিতে অনিচ্ছা সত্ত্বেও আমাকে ওর কথা শুনতেই হল, ল্যাপটপ রেখে, আমি চললাম ওর সাথে “চাঁদের হাটা” দেখতে!

এবছর, শরতের আকাশে প্রথম পূর্ণিমার চাঁদ দেখলাম, নীল আকাশ আর তাতে প্রচুর সাদা মেঘ। দখিনা বাতাসের চাপে মেঘগুলো দক্ষিণ দিক থেকে উত্তর দিকে উড়ে যাচ্ছে দ্রুত। ঘন সাদা মেঘে চাঁদ মাঝে মাঝে ঢেকে যাচ্ছে, চলন্ত মেঘের কারণে মনে হচ্ছে চাঁদ চলছে কোন এক অজানার পথে।

আমাকে নিয়ে এসে সুতপা আরও উত্তেজিত ভঙ্গীতে বেলকনির গ্রিলের ফাঁক দিয়ে হাত বের করে বলতে শুরু করলো, বাবা, ঐ দেখো, চাঁদ হাঁটছে! আমি বললাম, না মা চাঁদ হাঁটছে না, মেঘ চলছে। না হাঁটছে, আমি দেখেছি, ঐ দেখো, বাবা! ও বলল।

আমি মজা পেয়ে বললাম, হ্যাঁ, মা, তোমার চাঁদ মামা হাঁটছে। আমার স্বীকারোক্তিতে ও আরও উৎসাহিত হয়ে উঠলো, জিজ্ঞাসা করল, চাঁদ কোথায় যাচ্ছে বাবা? বললাম, মামার বাড়ী যাচ্ছে।
কার মামার বাড়ী? আমি বললাম, তোমার মামার বাড়ী।

মাধবপুরে? বললাম, হ্যাঁ। কি জন্য যাচ্ছে? বললাম, তোমার দাদু ভাইয়ের সাথে দেখা করতে। কি করব? প্রশ্নটি ও ঠিক মতো করতে পারলো না কিন্তু আমি কথা ঘুড়িয়ে ওকে খাওয়ানোর দিকে আগ্রহী করার জন্য বললাম, চাঁদ মামার ক্ষুধা লাগছে তো, তাই খেতে যাচ্ছে। কি খাবে, বাবা? বললাম, দুধ খাবে, ভাত খাবে, মাছ খাবে, মাংস খাবে।
কি মাংস খাবে?

এবার আমি প্রমাদ গুনলাম, এই রাত দুপুরে যদি খাসির মাংসের কথা বলি, তাহলে বিপদের সম্ভবনা! হাই কোলেস্টরলের ভয়ে আমি বাসায় খাসির মাংস কিনি না, তাই ও যদি খাসির মাংস খাওয়ার বায়না ধরে তাহলে নিশ্চিত বিপদ। ওর মা, এতক্ষণ আমদের কথা শুনছিল, এবার ওকে ধমক দিয়ে বলল, চুপ কর!

আমি বললাম, মুরগীর মাংস, মা। উত্তরটা শুনে ও একটু চুপ করে গেল, মনে হল, কিছু একটা জিজ্ঞাসা করবে কিন্তু কি করবে তা খুঁজে পাচ্ছে না। আমি ভেবে নিলাম, ও এখন মুরগীর মাংস খেতে চাইবে। আমি রুপার দিকে চাইলাম, ওর চোখের ইশারায় বুজলাম ফ্রিজে রান্না করা মুরগীর মাংস আছে।

ওকে খাওয়ানোর জন্য যে আমাদের কত ধরনের টেকনিক এপ্লাই করতে হয়, তার কোন ইয়ত্তা নেই। কিন্তু আমাদের আশায় গুড়ে বালি, ও প্রশ্ন করলো, তুমি কিনেছ বাবা? আমি হেসে বললাম, না মা তোমার দাদু ভাই কিনেছে।

বাজার থেকে কিনেছে? বললাম হ্যাঁ।
আমি বাজারে যাবো, বলে বায়না ধরল।

মনে হল বিপদ আমাদের সামনে লাফ দিয়ে পড়লো! আমি ফাঁদে পড়লাম। বললাম, কাল সকালে তোমাকে বাজারে নিয়ে যাবো, মা। না, এখনি যাব! বলেই চিৎকার করে কান্না জুড়ে দিলো। আমি যতবারই বলি কাল নিয়ে যাব, ততই ওর কান্নার জোড় বারে। এতক্ষণ আমরা চেয়ারে বসে কথা বলছিলাম। এবার ওর মা’র পালা। রুপা, ওকে ধর বলে মায়ের কোলে তুলে দিলাম।
রুপা এতক্ষণ বেলকনির মেঝেতে বসে আমাদের কথা শুনছিল। কান্না থামানোর জন্য রুপা গুন গুন করে গান ধরল। আমি বললাম, চাঁদ নিয়ে একটা গান গাঁও। নীল চাঁদ নিয়ে কি কোন গান আছে? শুভ্র দেবের একটা গান আছে না? “নীল চাঁদোয়া” নামে? নীল চাঁদোয়া কি এই নীল চাঁদকে নিয়ে লেখা নাকি? রুপা বলল, জানি না। আমি বললাম, আমিও জানি না কিন্তু হলেও হতে পারে।

নীল চাঁদের কথা আমরা এতক্ষণ ভুলেই গিয়েছিলাম । বাইরে তাকালাম, দেখলাম পরিষ্কার জোছনা, মনে হল, অন্য পূর্ণিমা রাতের মত আজকের রাতের তেমন কোন পার্থক্য নেই। চাঁদের দিকে ভাল করে তাকালাম, একই মনে হল । রুপাও বলল, কোন পার্থক্য তো দেখিনা? আরও একটু ভাল করে দেখার পর মনে হল, জোছনাটা কেমন যেন নীলচে মনে হচ্ছে, রুপাকে বললাম, আবার এও বললাম, এটা আমাদের মনের ভুলও হতে পারে, যেহেতু আমরা জেনেছি আজকের চাঁদটা হবে নীল তাই আমাদের কাছে জোছনাটা নীল মনে হচ্ছে। সে বলল, তাও হতে পারে।

আমি চেয়ার ছেড়ে মেঝেতে বসে রুপাকে বললাম, তার চেয়ে একটা গান ধরো। বলল কি গান ধরবো? চাঁদ নিয়ে যে কোন একটা, আমি বললাম। ও গান ধরলঃ
চাঁদের হাসি বাঁধ ভেঙ্গেছে
উচ্ছলে পড়ে আলো
ও রজনী গন্ধ তোমার
গন্ধ সুধা ঢাল। ……

রুপা গলা ছেড়ে গান ধরলো, ভালই গাচ্ছিল, পরিবেশও ছিল চমৎকার, এই সুযোগে আমিও গুনগুন শুরু করেছি, দুই তিনটা লাইন যেই গেয়েছি, অমনি আমার মেয়ে এসে আমার মুখ চেপে ধরে বলল, বাবা তুমি গান বন্ধ কর, মা’র গান ভাল, তোমার গান পচা। ও আমার সবকিছুই পছন্দ করে কিন্তু গানের বেলায় নো কম্প্রমাইস। যখনি আমি আমর হেঁড়ে গলায় গান গাওয়ার চেষ্টা করি তখনি সে বিরক্ত হয়ে আমার মুখ চেপে ধরে। আমি ওর এই বিরক্ত হওয়াটাকেই সুযোগ হিসেবে কাজে লাগাই ওর সাথে খুনসুটি করার জন্য । হয়ত সে কোন কিছুর জন্য কাঁদছে বা বায়না করছে; আমি ওর দিকে তাকিয়ে গান গাওয়ার ভঙ্গী করলেই ও সব ভুলে এসে আমার গান গাওয়া বন্ধ করবে, প্রথমে ধমকের ভঙ্গী করবে, তাতে কাজ না হলে আমার মুখ চেপে ধরবে, আর বলতে থাকবে, থামো বাবা! তোমার গান পচা। ততক্ষণে সে তার সব বায়না ভুলে যায়।

বসে থাকতে আর ভাল লাগছিল না। সুতপা’কে বললাম, একটা বালিশ নিয়ে আসো তো মা! ও বলল, বাবা, তুমি এখানে ঘুমাবে? আমি বললাম, হ্যাঁ মা। আমিও ঘুমাব; বলে এক দৌড়ে একটা বালিশ আনতে গেল এবং অনেক কষ্ট করে কিন্তু হাসি মুখে ওর প্রায় সমান সাইজের একটা বালিশ এনে আমাকে দিলো। বেলকনির ছোট্ট মেঝেতে আমি শুয়ে পড়লাম, সুতপা এসে আমার বুকের উপর উপুড় হয়ে শুয়ে পড়লো। শোয়ার জন্য এটা ওর সবচেয়ে প্রিয় জায়গা। রুপা আমার পায়ের কাছে বসে মৃদু স্বরে গান গাচ্ছিল। সবাই মিলে আমরা নীল জোছনা উপভোগ করছিলাম।

ইচ্ছে করেই আমি সুতপাকে দিয়ে খুবই ছোট ছোট কাজ করাতে চেষ্টা করি। আমি এমনভাবে ওকে কাজের কথা বলি, যেন কাজ করাটা খুবই মজার একটা খেলা, যা সে আনন্দের সাথেই করে, প্রতিবার কাজ শেষে বাবার আদর পাওয়া যাবে, এটা সে জানে এবং যথারীতি বুঝে নেয় । ইতিমধ্যে ট্যাঁপ ছেড়ে নিজের ছোট্ট খাবার বাটি- চামচ ধোয়া থেকে শুরু করে ল্যাপটপ, গুগল, ইউটিউব অপারেট করা শিকে গেছে, যা রুপাও পারে না। আমি আমার মেয়েকে ছোট থেকেই স্বাবলম্বী দেখতে চাই, প্রথম প্রথম এই কথা বললে ওর মা রাগ করত, কিন্তু এখন আর করে না।
রুপার চাপাচাপিতে, কয়েক দিন আগে সুতপার জন্য একসেট বাংলা-ইংরাজি বর্ণমালার বই কিনে এনেছি, আমাদের এখন প্রধান চেষ্টাই হচ্ছে, কিভাবে এবং কত তাড়াতাড়ি ওকে বিদ্বান বানানো যায়!

আজকাল ইংলিশ মিডিয়ামের স্কুলের হুজুগে শিশুদের ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা, পারলে বাবা-মা’রা হসপিটালের বেড থেকেই তাদের পড়াতে শুরু করেন! সুতপাকে এখনো স্কুলে দেই নাই কেন, এই কথা শুনতে শুনতে আমি বিরক্ত। প্রায়ই শুনতে হয় অমুকের ছেলে-মেয়ে আড়াই বছরে স্কুলে গেছে তোর মেয়ে এখনো যাচ্ছে না কেন? এসব শুনে রুপাও খুব বিচলিত হয়ে পড়ে আর আমার উপর চাপ বাড়ে। এত অল্প বয়সে শিশুদের পড়াশুনার জন্য চাপ দেওয়াকে আমি অন্যায় মনে করি। স্কুলগুলো এক্ষেত্রে এককাঠি সরেস, বাচ্চার বয়স তিন-সারে তিন এর বেশি হলে নাকি আর ভর্তিই নেই না? ব্যবসার ফন্দি আর কি! তাই আমাকেও ওদের দলে ভিড়ে জেতে হচ্ছে, কি আর করা যাবে, কথায় আছে না? দশে করে যে কর্ম না করলে হয় অধর্ম।

বুকের উপর শুয়ে থাকা অবস্থায়ই, আমার মাথার পিছনে, প্লাস্টিকের জলের বোতলে লাগানো পাতা বাহারের লতা গাছটিকে দেখিয়ে, সুতপা আফসোসের সুরে বলল, বাবা দেখো, ঈশী না আমাদের গাছের সব পাতা ছিঁড়ে ফেলেছে! ঈশী পচা, তাই না বাবা। আমি বললাম হ্যাঁ মা। বাবা! তুমি ওকে বকা দিয়ো, আমি বললাম, দিবো মা! প্রথম যখন এই বিদেশী লতা গাছটি আমি আমাদের অফিসের পাশের এক পরিত্যাক্ত বাগান থেকে নিয়ে এসে লাগালাম তখন সুতপা সুযোগ পেলেই পাতা ছিঁড়ত, একদিন ওকে কোলে নিয়ে গাছটির কাছে যেয়ে একটা পাতা ওর হাতে, গালে ছুঁইয়ে দিয়ে বললাম, মা দেখো গাছটি কত সুন্দর, তোমাকে আদর দিচ্ছে, আর পাতা ছিঁড়ো না! পাতা ছিঁড়লে গাছ ব্যথা পায়, ব্যথা পেলে ও কান্না করে!

এই কথা শুনেই ও প্রশ্ন করলো, বাবা, কিভাবে কান্না করে? আমি বললাম তুমি যেভাবে কান্না করো সেইভাবে। উত্তর শুনে ও কি যেন ভাবতে শুরু করলো, মনে হচ্ছিলো কিছু একটা মেলাতে চেষ্টা করছে কিন্তু পারছে না।

আমি আবার শুরু করলাম, গাছ আমাদের অক্সিজেন দেয়, ছায়া দেয়, খাবার দেয়, গাছ ভালো! আর পাতা ছিঁড়ো না, তাহলে সবাই তোমাকে পচা বলবে! শুনে রুপা হাসতে হাসতে বলেছিল, মাস্টারও যেমন তার ছাত্রীটি তেমন! দেখনি একটু পড়েই আবার পাতা ছিঁড়তে আসবে! আমি বললাম একদিনে হয়ত হবে না কিন্তু হবে। ওর ব্রেনের পুরোটাই ফাঁকা, আমরা এখন ওকে যা শেখাবো ও তাই শিখবে, সব হয়তো ওর মনে থাকবে না কিন্তু ওর মেমোরিতে ঠিকই জমা থাকবে, সময়মত এই শিক্ষা ঠিকই বেড়িয়ে আসবে এবং এর বিপক্ষে যাইই দেখবে ওর ব্রেন তাইই ব্লক করবে। অনেকটা কম্পিউটারের মতো। রুপা বলল তাহলে কি মানুষের ব্রেন আর কম্পিউটার একই? আমি বললাম, না মানুষের ব্রেন আরও অনেক বড় ব্যাপার, বিজ্ঞানীরা কেবল এটা অনুসরণ করতে শুরু করেছে মাত্র, যদিও কম্পিউটার বিজ্ঞান অনেক এগিয়েছে, তারপরও এর হার্ডডিস্ক ও তা পরিচালনাকারী সফটওয়্যারের ক্ষমতাকে মানুষের ব্রেনের কাছাকাছি নিতে বিজ্ঞানীদের হয়ত শত বছর বা হাজার বছর অপেক্ষা করতে হতে পারে কিংবা কখনোও পারবে না! মানুষের ব্রেনটি প্রকৃতির বিলিয়ন বিলিয়ন বছরের রিসার্চের ফল, আমাদের বিজ্ঞানীরা কি এত সহজে তা ছুঁতে পাড়বে?

ঈশী আমার মেয়ের নতুন কিন্তু সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বান্ধবী, প্রায় একই বয়সী, হয়তো সুতপার চেয়ে পাঁচ-ছয় মাসের বড় হবে কিন্তু দেখতে একই রকম মনে হয়, খুবই মিষ্টি আর ভীষণ সুন্দর করে কথা বলে। গত মাসে ওরা আমাদের উপরের ফ্লাটে ভাড়াটে হিসেবে এসেছে। কিভাবে যেন দুইজনের বন্ধুত্ব হয়ে গেছে। খুবই গলায় গলায় মিল! আবার মাঝে মাঝে দেখি ওদের দুজনের ঝগড়াও হয়, কথা বন্ধ থাকার পাশাপাশি একে অপরের বাসায় আসা-যাওয়াও বন্ধ রাখছে! ওদের ভাবভঙ্গি, মান অভিমান দেখতে আমার ভীষণ মজা লাগে।

ঈশী পাতা ছিঁড়েছে বলে আজ সুতপার মন খারাপ, শুনে আমার ভাল লাগলো এই কারণে যে আমার মেয়ে আমার কথা বুজতে পারছে; ও ভাল মন্দ ধরতে পারছে।

যদিও ঈশী ওর ঘনিষ্ট বান্ধবী তারপরেও গাছের পাতা ছেঁড়ার কারণে সে আজ ওর চোখে অপরাধী, সুতপাও আমার মত গাছ ভালবাসতে শিখেছে যা আমি পেয়েছি আমার বাবা-মা’র কাছ থেকে। যাক বংশগতি তাহলে কাজ করছে। শুভ লক্ষ্মণ!

মিয়ানমার থেকে আসার পরে একদিন সুতপাকে এক জোড়া চপ্সষ্টিক বের করে দিলাম খেলা করার জন্য। আমি তিন জোড়া চপ্সষ্টিক ইয়াঙ্গুনের সবচেয়ে নাম করা রেস্টুরেন্ট “৩৬৫” থেকে নিয়ে এসেছিলাম ওকে দিব বলে। প্রতিবার খাবার সময় ওরা এক জোড়া করে চপ্সষ্টিক দিতো আমি সেগুলি ব্যবহার না করে রেস্টুরেন্ট গার্লদের বলে নিয়ে এসেছিলাম, যদিও আমি জানতাম এটা ছিল ওয়ান টাইম ব্যবহার করার জন্য, তারপরেও ওদের অনুমতি নিয়েছিলাম কারন বিদেশ বিভুঁইয়ের ব্যাপার, তাও আবার মিয়ানমারা, তা ছাড়ও ভদ্রতা বলেও একটা কথা আছে। যেহেতু আমি এটা দিয়ে খাবার খেতে পারি না, তাই লোক হাসানোর দরকার নেই বলে খুলেও দেখি নাই কখনো।

আমি যখন প্যাকেট খুলে বাঁশের তৈরি অসাধারণ সুন্দর চপ্সষ্টিক দুটো বের করে ওর হাতে দিচ্ছিলাম, প্রথমবার দেখেই ও জিজ্ঞাসা করলো, বাবা চপ্সষ্টিক? আমি থ বনে গেলাম, ও এটা চিনল কিভাবে? আর নামই বা জানলো কিভাবে? হাতে নিয়েই বলল, মা লুডস খাবো, ওর মা হাতে যেন চাঁদ পেল, এক দৌড়ে রুপা লুডস বানাতে গেল।

বাবা চপ্সষ্টিক তুমি এনেছ? বললাম হ্যাঁ মা। কোথা থেকে এনেছ? আমি বললাম ইয়াঙ্গুন থেকে, একটু চিন্তা করে ও একা একাই বলল ইয়াঙ্গুন থেকে! আমি বুঝলাম ও ইয়াঙ্গুন শব্দটা ধরতে পারছে না। ওর বোঝার সুবিধার জন্য আমি বললাম, মা আমি কয়েকদিন আগে মায়ানমার গেছিলাম না? ইয়াঙ্গুন হল মায়ানমারের রাজধানী, ওখান থেকে নিয়ে এসেছি। ও এবার বুঝল।
তুমি এটা আমাকে দিয়েছ ? আমি বললাম, হ্যাঁ মা।

আমি সবসময় ওকে সঠিক তথ্যটা ও সত্যটা বলি, যদিও জানি ও সব বুঝবে না, তারপরেও বলি কারন আমি জানি ওর ব্রেনের মেমোরি প্রায় পুরোটাই ফাঁকা, এখন আমরা যা বলবো বা ও যা দেখবে তাইই শিখবে। পরবর্তীতে এইসব তথ্য ওর বুদ্ধি গঠনে সহায়ক হবে। ভাল মন্দ সহজেই চিনতে পারবে।

আমার এইসব কথা বার্তা শুনে রুপা হাসে আর মাঝে মাঝে টিপ্পনী কাটে। কিন্তু আমি আমার কাজ চালিয়ে যাচ্ছি। কারণ আমি বিশ্বাস করি সৃষ্টি জগতের প্রতিটা প্রানীই বংশগতির মাধ্যমে তার বেসিক তথ্যটা পেয়ে থাকে, যা বাবা মায়ের জিনের মাধ্যমে প্রবাহিত হয়। এই তথ্যটাই হচ্ছে মূল জিনিস যা দিয়ে সে একটা প্রান বা শরীর হিসেবে তৈরি হয়, কিন্তু সেই প্রান বা শরীরটা পরিচালনার জন্য সকল প্রয়োজনীয় তথ্য সে তার পারিপার্শ্বিক অবস্থা থেকে সংগ্রহ করে। যেমন একটা বাই সাইকেল, সে কিন্তু নিজে নিজে চলতে পারে না যতক্ষণ না কেউ তাকে চালাচ্ছে। এই চালানোর ক্ষমতাটাই হচ্ছে জ্ঞান যা সে তথ্য হিসাবে সংগ্রহ করছে, বিজ্ঞানের ভাষায় ইনফর্মেশন। কম্পিউটার বিজ্ঞান যাকে বলে সফটওয়্যার।

চপ্সষ্টিক দুটো হাতে নিয়ে ও খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিল, একটু পড়েই আমাকে প্রশ্ন করলো, কিনে এনেছ, বাবা? আমি বললাম, না মা রেস্টুরেন্ট থেকে চেয়ে এনেছি। আমার জন্য এনেছ? হ্যাঁ মা তোমার জন্যই তো এনেছি! তুমি ছাড়া আর কে আছে আমার! শুনে ও খুব খুশি হল। এরই মধ্যে রূপা লূডস বানিয়ে মেলামাইনের বাটিতে এনে ওর সামনে রাখল কিন্তু কোন আনন্দদায়ক অনুভূতি প্রকাশ করল না, কারণ তাহলে ও বুঝে যাবে আমরা ওকে খাওয়াচ্ছি আর এটা বুঝতে পারলেই ও খাওয়া বন্ধ করে দিবে। ওকে আমরা যতবার ভুলিয়ে ভালিয়ে খাওয়াই ততবারই আমরা এই আশঙ্কায় থাকি।

সুতপা লূডসের বাটিটি কাছে টেনে নিলো আর আমরা অবাক হয়ে দেখলাম আমাদের মেয়েটা দিব্যি চপ্সষ্টিক দুটো দিয়ে লূডস খাচ্ছে! ওর ছোট ছোট আঙ্গুল দিয়ে অনায়াসে এগুলো অপারেট করছে। আমি চপ্সষ্টিক দিয়ে খাবার খাওয়ার অনেক চেষ্টা করেছি কিন্তু কখনো সফল হইনি। এগুলো দিয়ে খাবার ধরা যে কত কষ্টকর তা যে একবার চেষ্টা করেছে সে বুজতে পারবে। কিন্তু আমার পুচকি মেয়েটা পাড়ছে কিভাবে? এবার আমি ওকে প্রশ্ন করলাম, মা তুমি এটা দিয়ে খাওয়া শিখলে কিভাবে? ও খাবার মুখে নিয়েই বলল, নোবিতা যে খায়। ওর উত্তর শুনে আবার আমরা থ বনে গেলাম। নোবিতা হলে ডরেমন কার্টুনের দ্বিতীয় প্রধান চরিত্র, এক জাপানী বালক।

রুপা এখন গাচ্ছে মনপুরা ছবির গানটি-
ণিথুয়া পাথারে নেমেছি বন্ধুরে
ধরো বন্ধু আমার কেহ নাই …

চুপচাপ শুয়ে সুতপা মায়ের গান শুনছিল। আমি গলা মিলাতেই আবারও সে আমার মুখ চেপে গান বন্ধ করলো। গানটি শেষ হতেই বললাম, চল অনেক রাত হয়েছে শুয়ে পড়ি। কাল জরুরী কাজ আছে ।

বিছানায় শুয়ে পরার পরে সুতপা বলল, তোমার পিঠে হাটি, বাবা? আমি বললাম হাঁটো মা, রুপা ধমক দিয়ে বলল, না এখন ঘুমাবে কিন্তু কে শোনে কার কথা। আমি উপুর হয়ে শুয়ে পরলাম আর ও জানালার গ্রিল ধরে আমার পিঠে হাঁটতে শুরু করল। আমি একটু কৃত্রিম ব্যথা পাওয়ার শব্দ করছি আর ও দ্বিগুণ উৎসাহে হাঁটছে আর হাসছে।

বাইরে নীল জোসনা ঝরে পড়ছে, আকাশের চাঁদ, মেঘের পিঠে হাঁটছে আর হাসছে আর আমাদের চাঁদ বাবার পিঠে হাঁটছে আর হাসছে।
বাইরে ঘরে দুইজনই নীল আলো ছড়াছে!