ক্যাটেগরিঃ ভ্রমণ

ইয়াঙ্গুনের কাজ আপাতত শেষ, দাঙ্গার কারণে রাখাইন প্রদেশের রাজধানী সিট্যুতে যাওয়া হচ্ছে না। ওই এলাকায় বিদেশীদের প্রবেশ নিষেধ। তবে ইয়াঙ্গুনে দাঙ্গার তেমন কোন প্রভাব পড়েনি। শহরের মোঘল এলাকায় কয়েকটি সুন্দর মসজিদ দেখলাম এবং তাতে নামাজ পড়ারত মুসুল্লিদেরও দেখেছি। এই বিষয়ে আমি জিজ্ঞাসা করে জেনেছি যে দাঙ্গার তেমন কোন প্রভাব ইয়াঙ্গুনে পড়েনি, তবে একটা ভয় ভয় ভাব আছে। আমাদের দোভাষী সাইদা যদিও একজন মুসলিম মেয়ে কিন্তু ওকে এবিষয়ে জিজ্ঞাসা করে বিব্রত করতে চাইনি। তবে এটুকু জেনেছিলাম, ওদের পূর্ব পুরুষ ব্রিটিশ আমলে ভারতের সুরাট থেকে এদেশে এসেছিল এবং ওরা এদেশের “নাগরিক”।

আমাদের ব্যবসায়িক পরিকল্পনার মূলে রয়েছে এই সিট্যু কারণ বাংলাদেশ থেকে নদী ও স্থলপথে পণ্য পরিবহনের প্রধান রুটই হচ্ছে “টেকনাফ-মন্ডু–সিট্যু-ইয়াঙ্গুন”। অপর রুটটি হল “চট্টগ্রাম-সিঙ্গাপুর-ইয়াঙ্গুন” -এটা সমুদ্রপথের মূল রুট। কোন রুট ব্যবহার করলে পণ্য পরিবহনের খরচ কম হবে এবং সময় কম লাগবে, এখন আমদের সেটা বের করতে হবে। সমুদ্রপথের খরচ, মানে সব ধরনের কন্টেইনার ভাড়া ও তাদের ধারণ ক্ষমতা সম্পর্কে আমরা জানি, ফিডার বা লাইটার ও বাল্ক জাহাজের ভাড়াও আমাদের জানার মধ্যেই, যেহেতু এই জাহাজগুলো আমাদের কোম্পানির নিজেদেরই আছে এবং আমাদের বস এই লাইনের গুরু তাই এবিষয়ে আমি তেমন কোন আগ্রহ দেখাচ্ছি না।

আমরা এখানে আসার আগেই টেকনাফ-মন্ডু–সিট্যু পর্যন্ত খরচ সম্পর্কে কিছুটা ধারণা পেয়েছি কিন্তু এই রুটে সিট্যু থেকে ইয়াঙ্গুন পর্যন্ত পৌঁছাতে কি পরিমাণ খরচ হবে সে সম্পর্কে আমাদের সঠিক কোন ধারণা নাই। তাই আমাদের যে করেই হোক এটা বের করতে হবে, তা নাহলে আমাদের রিপোর্ট অপূর্ণাঙ্গ থাকবে।

টেকনাফ-মন্ডু রুটটি আসলে নাফ নদী নির্ভর একটা জলপথ যাতে মাঝারি আকারের নৌকায় পণ্য পরিবহন করতে হয়, স্থানীয় ভাষায় এই নৌকাগুলোকে ট্রলার বলে। এই রুটের সম্ভবতা যাচাই করার জন্য আমি ও আমার বস কিছুদিন আগে জরুরী ভিত্তিতে কক্সবাজার-টেকনাফ এসেছিলাম। সেটা মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে, রাখাইন ও রোহিঙ্গাদের মধ্যে দাঙ্গা লাগার কয়েকদিন আগের ঘটনা।

এই রুট পরিকল্পনায় আমাদের প্রধান সহায়ক ছিল আমাদের সবার প্রিয়, সব কাজের কাজী ও প্রধান তথ্য ভান্ডার চট্টগ্রামের শাহিন ভাই (ছদ্মনাম)। মিয়ানমারে এবং বাংলাদেশে “রোহিঙ্গা”দের নিয়ে যে একটা বড় ধরনের ঘটনা ঘটবে সে সম্পর্কে সে আমাদের আগাম ধারণা দিয়েছিল! তখন তার সেই কথা আমরা বিশ্বাস করেনি কিন্তু এখন তার সেই ধারণার কিছু অংশের সত্যতা দেখে আমরা ভীষণ অবাক হয়েছি! এই বিষয়ে পরে আসবো।

দুপুরের মধ্যেই কাজ শেষ করে হোটেলে ফিরে এলাম। সিট্যুতে যাওয়া হচ্ছে না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম নেপিডো যাব কিন্তু আগে থেকে বিমানের রিটার্ন ডেট কনফার্ম করা “টিকেটের ডেট” পিছাতে যেয়ে দেখলাম এক-দুই দিন পিছানোর কোন সুযোগ নেই। পিছাতে হলে তিন-চার দিন “ডেট” পিছাতে হবে। এদিকে অফিসে অনেক জরুরি কাজ ফেলে গেছি। অগত্যা সিদ্ধান্ত নিলাম দেশে ফেরার।

নেপিডো হল মিয়ানমারের নতুন রাজধানী। শুনেছি অসাধারণ এক নতুন শহর গড়ে তুলচ্ছে বর্মীরা। ইয়াঙ্গুন টু নেপিডো নতুন এক হাইওয়ের গল্প শোনালো মামুন ভাই। ওই রাস্তায় গাড়ী চালাতে নাকি কোন স্পীড লিমিট নেই। গাড়ীর স্পীড মিটারের কাটা মিটারের সর্বশেষ পয়েন্ট ছুলেও নাকি মনে হয় গাড়ী খুব আস্তে চলছে! এযাত্রায় আর নেপিডো দেখা হল না! আফসোস থেকে গেল!

দুপুর গড়িয়ে বিকাল হওয়ার আগেই বেড়িয়ে পড়লাম, সিদ্ধান্ত নিলাম এবার উদ্দেশ্য বিহীনভাবে হাঁটবো, এই কয়দিনে হোটেল থেকে ট্যাক্সিতে আসতে যেতে শহরটা সম্পর্কে মোটামুটি একটা ধারণা হয়েছে।

হোটেলের ডানদিকের রাস্তা ধরে একটু এগিয়েই, মূল রাস্তাটা ক্রস করে পূর্বমুখী আর একটা বড় রাস্তায় এসে; এর ডানপাশ ধরে হাঁটতে শুরু করলাম। রাস্তায় প্রচুর মানুষ হাঁটছে, নতুন জামা কাপড় পড়া ছোট ছোট ছেলে-মেয়ে নিয়ে মা-বাবা’রাও আছে এদের মধ্যে। সম্ভবত আজ কোন পূর্ণিমা, আর পূর্ণিমা মানেই বৌদ্ধদের কোন না কোন উৎসব। সকালে কাজের ফাঁকে শহরে ঘুরতে ঘুরতে প্যাগোডাগুলোতে প্রচুর মানুষের ভিড় ও অনেক মেয়ে ও গৃহবধূকে হাতে ফুল ও ফলের ডালা নিয়ে প্যাগোডাতে প্রবেশ করতে দেখেছি। মামুন ভাইয়ের কাছ থেকে আগেই জেনেছিলাম আজ সরকারী ছুটির দিন। আর এখন মানুষের এই একমুখী স্রোত দেখেই বুজলাম সবাই কোন প্যাগোডাতে যাচ্ছে, আমিও এই মানব স্রোতকে অনুসরণ করলাম।

রাস্তায় বিভিন্ন বয়সী বৌদ্ধ ভিক্ষুরাও আছে। গেরুয়া বসন ধারীরা সবাই বাম হাত দিয়ে পেটের সাথে সরা দিয়ে মুখ ঢাকা একটা করে মাটির হাড়ি চেপে ধরে রেখে ও ডানহাতে একটা করে রঙ-বেরঙের নক্সা করা হাতপাখা নিয়ে হাঁটছে। সম্ভবত তারা “ভিক্ষা”র মাধ্যমে সারাদিনের খাবার সংগ্রহ করে কোন মঠে ফিরছে। এদেশে ভিক্ষুরা খুবই সম্মানিত ও পূজনীয়। ভোর বেলায় সবেমাত্র খোলা দোকানে ভিক্ষুদের পাখা দিয়ে বাতাস করতে করতে দোকানিদের আশীর্বাদ করতে দেখেছি।

আমি সেই স্রোতের সাথে সাথে হেঁটে একটা বড় প্যাগোডাতে চলে এলাম, পরে জেনেছিলাম এটি পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন প্যাগোডাদের মধ্যে অন্যতম এবং ইয়াঙ্গুনের অন্যতম দর্শনীয় স্থান যার নামটা আমি এই মুহূর্তে ভুলে গেছি।

আজ উৎসবের দিন, সেই উপলক্ষে প্যাগোডার সামনের চত্বরে মেলা বসেছে। মেলার দোকানে সাজানো পণ্যের অধিকাংশই সস্তা ধরনের। বাচ্চাদের খেলনা থেকে শুরু করে খাবার দোকান পর্যন্ত সবই আছে এখানে। কয়েকটা খাবার দোকানে দেখলাম ছোট ছোট পাখি ছিলে মসলা দিয়ে মেখে ডালায় সাজিয়ে রেখে তা ক্রেতার পছন্দ মত গরম তেলে ভেঁজে দিচ্ছে, গায়ের চামড়া ছিলানো মৃত পাখিগুলির পায়ের নখ থেকে ঠোঁট পর্যন্ত সবকিছুই আছে, শুধু গায়ের পালক গুলিই নেই! মৃত পাখিগুলো এই করুণ অবস্থা দেখে আমার মনে হলো, পালক শুদ্ধ খাওয়ার অভ্যাস এখনো করে উঠতে পারিনি, হয়তো আর কিছুদিন পরে আমরা সেটাও পারবো! মৃত পাখি গুলোর গলায় কোন কাটা দাগ বা জবাই করার কোন চিহ্ন দেখেনি, সচরাচর আমরা যা দেখতে অভ্যস্ত! মনে প্রশ্ন জাগল, তবে কি পাখিগুলোকে দম বন্ধ করে হত্যা করা হয়েছে?

“জীব হত্যা মহা পাপ” ভগবান গৌতম বুদ্ধের এই অমর বানী অনুসরণকারীদের তা পালন করতে না দেখে কষ্ট পেলাম তাও আবার পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন ও বড় প্যাগোডার সামনের চত্বরে! আসলে আমরা সবাই ধর্ম পালন করার চাইতে তা নিজেদের মত করে ব্যবহার করতেই বেশী উৎসাহী। এতে যদি নিজ হাতে নিজ ধর্মের অবমাননা হয়, হউক, তাতে আমাদের কিছু যায় আসে না কিন্তু সামান্য ছুতায় অন্য ধর্মের দুর্বল মানুষ ও তাদের উপাসনালয়ের উপর দল বেঁধে ঝাঁপিয়ে পড়তে আমাদের একটুও বাধে না। আফটার অল, রাতে যাই করি দিনে আমরা সবাই “ধর্ম যোদ্ধা”!

খুন, ধর্ষণ, আগুণ লাগানো থেকে শুরু করে লুটপাট করা সহ সবধরনের অপরাধই করা যায় এটি ব্যবহার করে। আমার মাঝে মাঝে মনে হয় অস্ত্র হিসাবে “ধর্ম” “এটম বোমার” চেয়েও ভয়ংকর!

প্যাগোডার সামনে আর কিছুক্ষণ ঘুরে রাস্তা পেড়িয়ে পার্কের গেটে চলে এলাম। এটা ইয়াঙ্গুনের সবচেয়ে বড় পার্ক। গেট দিয়ে একটু সামনে এগিয়ে যেতেই একজন পুরুষ নিরাপত্তা রক্ষী আমাকে পার্কে ঢুকতে বাঁধা দিল, সাথে সাথে এক মধ্যবয়সী মেয়ে অফিসার এগিয়ে এসে দু-হাত জোড় করে মাথা নুইয়ে প্রণাম জানিয়ে আমাকে জিজ্ঞাসা করলো, স্যার কি পার্কের ভিতরে যাবেন? আমি বললাম, হ্যাঁ। তাহলে আপনাকে ২,০০০ চাট দিয়ে টিকেট কাটতে হবে বলেই অফিসারটি বিভিন্ন রঙের গোল গোল স্টিকার সম্বলিত একটা প্রিন্টেড পেপার আমার দিকে এগিয়ে দিলো। আমি দেরী না করে মানিব্যাগ থেকে ২,০০০ চাটের বদলে ভুল করে দুটি ৫,০০০ চাটের নোট বের করে তার হাতে দিলাম। অফিসারটি একটা হলুদ স্টিকার তুলে আমার শার্টের বুক পকেটের উপর লাগিয়ে দিয়ে ৮,০০০ চাট ফেরত দিয়ে হাঁসতে হাঁসতে বলল, স্যার, আপনি ভুল করেছেন! আমি লজ্জা পেলাম, আসলে আমি নোট চিনতে ভুল করেছিলাম। পড়ে জেনেছিলাম পার্কের এন্ট্রি ফি স্থানীয়দের জন্য ৫০০ চাট আর বিদেশীদের জন্য ২,০০০ চাট।

অসমাপ্ত

ইয়াঙ্গুনে কয়েকদিনঃ ৪র্থ পর্বঃ