ক্যাটেগরিঃ ব্লগ

আমি বেসরকারি একটা প্রতিষ্ঠানের এক সামান্য বেতনভুক কর্মচারী। সারা মাসের কাজের বিনিময়ে মাস শেষে একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ বেতন পাই আর তাই দিয়ে ঢাকার বাসা ভাড়াসহ যাবতীয় সকল খরচ নির্বাহ করার পাশাপাশি পারিবারিক কিছু দায়িত্ব পালন পূর্বক ডি, পি, এস ও ইনস্যুরেন্সের প্রিমিয়াম দেওয়ার পর হাতে তেমন কিছুই থাকে না।

পূজা উপলক্ষে অফিস থেকে নির্দিষ্ট অংকের বোনাস পেয়েছি। হাতে টাকা পেলে সবাই খুশী হয় তাই আমিও হলাম, পরক্ষণেই এই বোনাস টাকার খরচের তালিকা মিলাতে যেয়ে আমার সেই খুশী খুশী ভাবটা বেশীক্ষণ স্থায়ী হল না। পূজোয় প্রতিবছর আমাদের পরিবারের সবাইকে আমি নতুন জামা কাপড় দিয়ে থাকি। প্রথম প্রথম এটা “উপহার” হিসেবে থাকলেও এখন এটা একটা বাধ্যতামূলক পারিবারিক দায়িত্ব। বিশেষ করে বিয়ের পরে! বিয়ের কথা এখানে উল্লেখ করলাম এই কারণে যে, আমার ধারণা বিয়ে করার আগের “পুরুষ” আর বিয়ে করার পরের “পুরুষ” -এর মধ্যে ব্যাপক পার্থক্য আছে। বিয়ের আগে “পুরুষ” তার নিজ পরিবারে “ছেলে” হয়ে থাকে, তখন তার সাত খুন মাপ আর বিয়ের পর সেই “ছেলে” পুরুষ হয়ে দুই পরিবারে ভাগ হয়ে যায়, তখন তার সেই সাত খুন তো দুরের কথা সামান্য একটা অনিচ্ছাকৃত ভুলও মহাপাপ হিসেবে চিহ্নিত হয়! এই প্রসঙ্গে আমার স্বর্গীয় তালই মশাই মানে আমার জেঠাত ছোট বোনের শ্বশুরের অনেক দিন আগের একটা উক্তি না বলে পারছি না-

আমি তখন কলেজে পড়ি, আমাদের তালই মশাই তার ইঞ্জিনিয়ার ছেলের সাথে দেখা করতে আমাদের বাড়িতে এসেছে, বাড়ীর সামনের উঠানে আমাকে একা পেয়ে দুঃখের সাথে বললেন, বাবাজী, দেখ! আমি আমার ছেলের সাথে দেখা করার জন্য সেই পাবনা থেকে তার শ্বশুরবাড়িতে এসেছি, কি লজ্জার ব্যাপার! বিয়ের পর সব ছেলেই পর হয়ে যায়! বলে সে দীর্ঘ নিশ্বাস ফেললেন! পরক্ষণেই বললেন, দেখ, আমার মেয়ে জামাইটা কত ভাল, সেও তো ইঞ্জিনিয়ার, তারপরেও প্রায় প্রতি সপ্তায় আমার বাড়ী আসে, গত মাসে সে আমাদের রঙিন টিভি কিনে দিয়েছে! শুনে আমি কিছু না বলে, মাথা ঘুড়িয়ে মুখ টিপে হেসেছিলাম! কিন্তু কথাটা আমার মনের মধ্যে এখনো গেঁথে আছে।

বোনাসের টাকা পকেটে নিয়ে আমি মনে মনে হিসেব করতে বসলাম কাকে কাকে এবার নতুন কাপড় দিব আর কাকে কাকে দিব না। প্রতিবছরই আমি এইভাবে বাছাই করে থাকি আর তাতে করে একটা সমতা রাখা যায়। যেহেতু আমাদের যৌথ পরিবার এবং আমরা সবাই সুখে দুখে মিলে মিশে আছি তাই সবাই এটা মেনেও নিয়েছে কিন্তু এবার যেহেতু আমার প্রমোশন হয়েছে এবং ঘন ঘন বিদেশ বিভুয়ে যাচ্ছি তাই সবার মধ্যে একটা এক্সট্রা চাহিদা তৈরি হয়েছে; সেটা কিন্তু কেউ আমাকে বলেনি কিন্তু আমি বুঝতে পেরেছি। তাই খচরের খাতায় একটা অতিরিক্ত টাকার অংক যোগ করলাম যা আমি বিদেশে কাজ করতে যেয়ে অফিস থেকে এলাউন্স হিসাবে পেয়েছিলাম।

যা হোক, এবার আসছি আমার মুল প্রসঙ্গে, অর্থাৎ পূজোয় কেনাকাটা ও সকলকে সন্তুষ্টি করা প্রসঙ্গে-

কেনাকাটা করবো শুনেই প্রথমেই আমার বউ বায়না ধরল, “এবার আমি তোমার সাথে শপিং-এ যাব”! শুনে, আমার ভিতরে যাই হোক না কেন, দু-পাটি দাঁত বের করে হেসে বললাম অবশ্যই যাবে! তোমাকে না নিয়ে আমি শপিং করবো নাকি! আমার হাসিতে এবার সে পটলো না, বলল, চালাকি করোনা, প্রতিবারই নিবে বল কিন্তু কোনবারই নেওনা, উল্টো সবকিছু কিনে নিয়ে এসে বল, কাজের ফাঁকে হটাৎ করে একটু সময় পেয়ে গেলাম তাই পূজোর শপিংটা সেরে ফেললাম, আর ভাব দেখাও তুমি কত ব্যস্ত! তখন আমার পছন্দ হোক আর না হোক সবকিছুই গিলতে হয়, এবার আর তা হবে না! আমি মাথা চুলকাতে চুলকাতে বললাম, আচ্ছা!

এবার আর ওকে ঠকাতে পারলাম না! মা’র নাম নিয়ে ওকে নিয়েই শপিং-এ বের হলাম। বের হওয়ার আগে অবশ্য ও আমাকে দিয়ে প্রতিজ্ঞা করিয়ে নিয়েছে, এই মর্মে যে, সে যা যা চাইবে তাই তাই কিনে দিতে আমি বাধ্য থাকিব আর বাইরে একটা বকাও দেওয়া যাবে না! আমি একবার শুধু দুর্বল কণ্ঠে ওর লিস্টটা সম্পর্কে জানতে চেয়েছিলাম, জেনে বুজলাম, প্রথম দিনই আমার বাজেট ফেল করতে যাচ্ছে! আমি দ্রুত সিদ্ধান্ত নিলাম কোথা থেকে এই শপিং গুলো করতে হবে! বসুন্ধরা সিটিতে গেলে আমি মাঠে মারা যাব! তাই আমি একটু বুদ্ধি করে বললাম, তোমার সব জিনিষ এক জায়গায় পেতে হলে তো গাউসিয়া-চাঁদনীচকে যেতে হবে, মেয়েদের সব জিনিষ ওখানে ভাল পাওয়া যায়! তুমি তোমার বান্ধবী অ্যানি’কে জিজ্ঞাসা করে দেখো? ও বলল, হ্যাঁ অ্যানিও গতকাল ওখান থেকে শপিং করেছে। শুনে আমি যেন হাতে চাঁদ পেলাম, ঝড়ে বক মরেছে দেখে আমার আর আনন্দ ধরে না! বুকে ফেটে হাসি উঠছিল কিন্তু সেটার গলা টিপে ধরলাম যাতে বের হতে না পারে!

চাঁদনীচকে ঢুকেই প্রথমেই ছোটদের জামা কাপড় কিনতে শুরু করলাম, আমার ছোট বোনের একের ভিতর তিন সন্তান মানে রাম-কৃষ্ণ-বৈশাখী’র পোশাক ঝটপট কিনে ফেললাম। যেহেতু ওরা একই বয়সের, তাই ওদেরটা কিনতে সবচেয়ে সহজ। ওদের বাবা-মাকে এবারের তালিকা থেকে বাদ দিলাম। তারপর একে একে আমার মেয়ে সহ বাড়ী ও শ্বশুরবাড়ি মিলে দুই পক্ষে যে কয়টা পিচ্চি-পাচ্চা আছে সবগুলোর পোশাক বয়সের উপর আন্দাজ করে কিনে ফেললাম। “আন্দাজ” বললাম এই কারণ যে, কয়েকটিকে আমি অনেকদিন ধরে দেখিনা আর ওরা বাড়ছেও খুব দ্রুত! তারপর একে একে ছোট-মাঝারি গুলোরও জিনিসপত্র তাদের ফরমায়েশ অনুযায়ী কিনে ফেললাম। এখানেও আন্দাজটা’কে কাজে লাগাতে হল, যদিও ওদের জন্য প্রতিবারই কিনি তারপরেও বছরে একবার দুইবার দেখার কারণে সঠিক মাপে জিনিষ কেনা সত্যই কষ্টকর! এইসব কেনার ফাঁকে ফাঁকে আমার মূল ক্লায়েন্ট মানে আমার বউ কিন্তু থেমে নেই, সে তার কাঙ্ক্ষিত জিনিস খুঁজতে বড় বড় দোকান খুঁজছে, ওর ধারণা বড় দোকান, দাম বেশী মানেই ভাল পণ্য! আমি ওকে বুঝাতে চেষ্টা করলাম, দেখো! তোমার ধারণা কিছুটা সত্য, যেমন ওরা ভাল পণ্য বিক্রি করে; এটা ঠিক কিন্তু দামটাও ডবল নেয়! মনে হল ও আমার কথায় কিছুটা কনভিন্সড। কয়েকটি বড় দোকান ঘুরিয়ে ওর কাঙ্ক্ষিত শাড়ীটা ঠিকই অর্ধেক দামে একটি মাঝারি মানের দোকান থেকে কিনে দিয়ে আমি ক্রেডিট নিলাম! আসলে আজ আমার কপাল ভাল! ঝড়ে খালি বক মরছে! তারপর একই থিয়োরি প্রয়োগ করে ওর চাহিদামত অন্যান্য পণ্যগুলোও কিনে দিয়ে এযাত্রা মোটামুটি নিশ্চিন্ত হলাম!

বাবার বাড়ীর প্রতি মেয়েদের ঝোঁক খুব বেশী থাকার কারণে ওদের কেনাকাটায়ও এর প্রভাব পরে। বড়দের কাপড় চোপর কিনতে এসে এর প্রভাবটা আরও বেশী করে টের পেলাম। আমার মা ফোনে আমাকে আগেই বলে দিয়েছিল, তার আর বাবার জন্য আমি যেন কিছু না কিনি কারণ হিসেবে বলেছিল “তাদের অনেক আছে আর কিছু লাগবে না”! আমার মন মানলো না, আমি বাড়িতে ফোন দিয়ে মা’কে জিজ্ঞাসা করলাম তোমাদের জন্য কি কিনবো? আবারও আগের মতই উত্তর পেলাম। পরে ক্রয় তালিকার অর্ধেকের মত কেনাকাটা করে সেদিনের মত বাসায় ফিরে এলাম।

বাবা-মা, শ্বশুর-শাশুড়ি, দাদা-বৌদি, জামাই বাবু-দিদি, ছোট বোন জামাই-বোন, ভাইরা ভাই-বোন, ভাগ্নি-ভাগ্নি জামাই, কাকা-কাকিমা, শ্যালক, ভাগ্নে-ভাগ্নি, ভাস্তে-ভাতিজি, আমার চিরকুমার কাকা, কাকাতো ভাই-বোন সহ সবাইকে খুশি করতে গেলে আমার প্রাপ্য বোনাসের তিন গুণ অর্থেও তা সম্ভব না, এদের মধ্যে আবার যাদের সামাজিক স্ট্যাটাস অনেক উপরে তাদের খুশি করাই সবচেয়ে কঠিন কাজ, তেলের মাথায় তেল দেওয়ার একটা রেওয়াজ আমাদের সমাজে খুবই প্রচলিত, আমিও এর বাইরে না। তবুও আমি চেষ্টা করি আমার পরিবারের যারা আর্থিকভাবে কিছুটা অসচ্ছল তাদের সবাইকে কিছু না কিছু দিতে! যখন দেখি পারছিনা তখন আমি উচ্চ স্ট্যাটাস-ধারীদের আমার ক্রয় তালিকা থেকে চোখের পলকে বাদ দিয়ে ফেলি কারণ ওদের একজনের উপহারের মূল্য দিয়ে প্রায় তিন জনের উপহার কেনা যায়। আমি কোয়ালিটিতে না কোয়ানটিটিতে বিশ্বাসী। পরবর্তী আরও দুই-তিন দিনে আমার পূজোর কেনাকাটা প্রায় শেষ করলাম।

কেনার পর আমার ঝামেলা কিন্তু কমলো না, উল্টো তা বাড়ল কারণ যাদের জন্য কিনেছি তারা একেকজন দেশের একেক প্রান্তে বসবাস করে, তাই আমি প্রতিবারের মত এবারও কুরিয়ার সার্ভিসের উপর নির্ভর করলাম। আগে বাড়ী বাড়ী যেয়ে উপহার পৌঁছে দেওয়ার রেওয়াজ ছিল আমাদের সমাজে, এখন সবাই সবার প্রবলেম বুজতে শিখেছে বলে রক্ষা! আবার কুরিয়ার পাঠানোর পরও শান্তি নেই, প্রায়ই দেখা যায় সঠিক সময়ে তা গন্তব্যে পোঁছাচ্ছে না বা যেখানে আমি পার্সেল পাঠিয়েছি সেখানে ঐ কুরিয়ার সার্ভিসের কোন শাখা নেই।

সব বাঁধা পেড়িয়ে আমার উপহারগুলো তাদের স্ব স্ব গন্তব্যে পৌঁছানোর পর শুরু হল আসল সমস্যা। ফোন আসতে শুরু করলো, “তোর পাঠানো জিনিষ অমুকের ছোট হয়েছে, অমুকের বড় হয়েছে”, “মামা, তোমার জিনিষ ওর (ডাক্তার বাবু) পছন্দ হয়নি”, আমার গাল ফুলানো বউ বলল, তুমি এবার আমার মান সম্মান ডুবিয়েছ! আমি বললাম কেন? ও বলল, তোমার পাঠানো কাপড় চোপড় সব ছোট হয়েছে! আমি বললাম কেনার সময় তুমি তো আমার সাথে ছিলে! সবচেয়ে বেশি মুখ কালো করা কথা শুনলাম উচ্চ স্ট্যাটাস-ধারীদের কাছ থেকে, আর খুশি খুশি ভাব দেখলাম তাদের মধ্যে যারা আর্থিক ভাবে কিছুটা বা একেবারেই অসচ্ছল!

বাড়ী আসার পর, সব দেখে শুনে মা বলল, আমি তোকে আগেই বলেছিলাম না, সবাইকে নগদ টাকা দিয়ে দিতে! তাহলে যে যার মত কিনে নিত! আমি হেসে বললাম “তোমার জন্য এখনো কিছু কিনিনি মা”!

মা বলল, আমার কিছু লাগবেনা, তুমি বাড়িতে এসেছো তাতেই আমি খুশি!