ক্যাটেগরিঃ ব্লগ

 

রীতা রায় মিঠু’র “সন্তানের অপকর্মের দায় নেয় অভাগা পিতামাতা, কুনাগরিকের দায় নেয় অভাগা রাষ্ট্র”! লেখায়, “ভারতীয় চেহারা” ও “হিন্দি” বলা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা সমালোচনা হচ্ছে – এই প্রেক্ষিতে আমি দুটি ছোট ঘটনার কথা উল্লেখ করতে চাই –

কয়েক দিন আগে আমরা অফিসের কাজে দুবাই গিয়েছিলাম, এমিরেটস এয়ারলাইন্সের বিমানে ওঠা থেকে এয়ারপোর্টে নামার পর কাস্টমস ক্লিয়ার পর্যন্ত শ্বেতাঙ্গ (বিমানের কেবিন ক্রু) থেকে আরব (কাস্টমস অফিসার), পাকিস্তানী-ইন্ডিয়ান’রা (সিকিউরিটি অফিসার) গন আমাদের তথা বাঙ্গালিদের সাথে যে আচরণ করলো তাকে এককথায় বলা যায় “মিসকিন’’দের আচরণ! যাদের এই কথা বিশ্বাস হবে না তাদের আমি বলবো “ ভাই স্বচক্ষে দেখে আসুন” – যদি আপনারা ভিসা পান!

এবার ভাষা নিয়ে দুটো কথা বলি-

আমাদের ভাগ্য ভাল (!) আর চেহারা-পোশাকের কারণে আমরা দুই কলিগ ইকনোমি ক্লাসের টিকেট কেটেও বিজনেস ক্লাসে সীট পেয়েছিলাম অবিক্রীত সীট ছিল বলে।

যাক, এয়ার পোর্টে নেমেই দেখি আমার দেশী-ভাইদের যাদের চেহারা মলিন, পোশাকে গরিবি ছাপ, লাইন ধরে নিয়ে যাচ্ছ তাদের(!) জন্য চিহ্নিত ইমিগ্রেশন বুথে। আমরা পেলাম কার্পেট বিছানো বিজনেস ইমগ্রেশন বুথ।

আমরা লাইনে দাঁড়িয়ে আছি, দেখলাম ইমিগ্রেশন অফিসার (আরব) এক-একজনকে বাম হাতের আঙ্গুলগুলো নাড়িয়ে ইশারায় ডাকছে! দুটো বুথে আমাদেরও একই ভাবে ডাক পড়লো। আমি বুথের সামনে দাঁড়িয়ে ইংরেজিতে “শুভ সন্ধ্যা” জানালাম! কিন্তু কোন উত্তর পেলাম না! আরব অফিসারটি বারবার আমার “সবুজ পাসপোর্ট” আর আমার “চেহারার” দিকে বারবার তাকাচ্ছে! আমার ভিসা ও হোটেল বুকিং এর কাগজপত্র দেখে নিশ্চিত হয়ে ছবি তোলার ক্যামেরা দিকে তাকাতে তাচ্ছিল্য ভাবে ইশারা করলো, প্রথম ইশারাটা আমি বুঝতে পারিনি, দ্বিতীয় বার বিরক্ত হয়ে আবার করলো! এবার বুঝতে পেরে ক্যামেরার দিকে তাকালাম! ছবি তোলার সুবিধার্থে সে আমাকে সামনে-পিছনে, ডানে–বামে নড়াচড়া করার বাম হাত নেড়ে ইশারা করছিল আমিও তার সাথে কথা না বলে সাড়া দিচ্ছিলাম! সবদিক দিয়ে সে নিশ্চিত হয়ে আমার পাসপোর্টে এন্ট্রি সিল দিয়ে ফেরত দিতে দিতে পরের যাত্রীর জন্য হাতের ইশারা করল! আমিও কোন কথা না বলে জাপানীদের মত মাথা নুইয়ে ধন্যবাদ জানিয়ে বের হলাম। আমি আশ্চর্য হয়ে খেয়াল করলাম অফিসারটি আমার সাথে একটা কথাও বলেনি! ভদ্রতা দেখানো তো বহু দুরের কথা! এবং পুরো ব্যাপারটা হল “ইশারা” তে!

আমার আগেই, আমার কলিগ ইমিগ্রেশন কমপ্লিট করে অপেক্ষা করছিল, আমি কাছে আসতেই ও “বিস্ফোরিত” হল ওদের আচরণ সম্পর্কে, আমি চোখের ইশারায় ওকে চুপ করতে বলে বের হওয়ার পথ ধরলাম। কিছুটা এগোতেই শারীরিক দিক দিয়ে ছোট খাট গড়নের এক সিকিউরিটি অফিসার সম্ভবত “ইন্ডিয়ান” আমার চোখের দিকে সরসারি চেয়ে থেকে আমাকে ওর ডান দিকে যাওয়ার ইশারা করলো। আমি বাম দিকে যেতেই দেখলাম একটা স্ক্যানার ও কয়েকজন সিকিউরিটি অফিসার অপেক্ষা করছে, ওদের লম্বাচওড়া চেহারা দেখেই বুজলাম ওরা পাকিস্তানী! আমার ধারণা ভুল হয়নি, স্ক্যানার মেশিনে আমার লাগেজ স্ক্যান করতে করতে ওদের মধ্য থেকে একজন আমাকে “উর্দু”তে জিজ্ঞাসা করলো, আপনার লাগেজে কি আছে? আমি উর্দু’তেই উত্তর দিলাম, অফিস ডকুমেন্ট, কোম্পানি প্রোফাইল এবং আমার কাপড়–চোপড়। আর একজন জিজ্ঞাসা করলো কোথা থেকে এসেছেন? আমি বললাম, বাংলাদেশ থেকে। আমার উর্দু শুনে এবং আমাকে দেখে ওরা মনে করেছিল আমি পাকিস্তানী! এবার আমার মুখে “বাংলাদেশ” শুনে ওরা রীতিমত অবাক হল! তারপর আরও প্রশ্নের উত্তর দিতে যেয়ে আমার উর্দু’র স্টক শেষ হয়ে গেল এবং ইংরেজিতে উত্তর দিতে দিতে সেখান থেকে বের হয়ে এলাম।

আমি উপরের দুটো ঘটনার কথা উল্লেখ করলাম এই কারণে যে, সাধারণ একটা কমুনিকেশনে দিদি এয়ার পোর্টে “হিন্দি” বলায় তার জাতিয়াতাবোধ নিয়ে যারা প্রশ্ন করছেন তারা আমার “ইশারা” ও “উর্দু”তে কথা বলাকে কি বলবেন?

“ভাষা” কি মনের ভাব প্রকাশ করা আর একে অপরের সাথে সফলভাবে যোগাযোগের মাধ্যম নয়?