ক্যাটেগরিঃ ব্লগালোচনা

দিন দিন আমরা সবাই খুব বেশী সিরিয়াস হয়ে যাচ্ছি! কেউই আমরা কোন জিনিষকেই হালকা ভাবে নিচ্ছি না। নিজের কথা ছাড়া আর কারও কথা ভাল লাগছে না, শুনতেও ইচ্ছা করছে না! কেউ যদি ভুল করে কিছু বলে বা লিখেও ফেলে, তাহলেও তার নিস্তার নাই, ঐ বলা কথা বা লেখার মধ্য থেকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে খুত বের করে সমালোচনা তো নস্যি গালাগালি করেও এখন আর সুখ পাচ্ছি না! সব জায়গায় আজ দলাদলি, মারামারি, দাঙ্গা-ফ্যাসাদ! এভাবে চলতে থাকলে এক পর্যায়ে আমাদের নিজেদের ছায়ার সাথেও ফ্যাসাদ বাঁধবে! কথায় আছে, বেশী বেশী চড় মারার অভ্যাস একবার হয়ে গেলে এক পর্যায়ে চড় মারার মত গাল না পেয়ে নিজের গালেই চড় মেরে অভ্যাসটা বজায় রাখতে হয়, এইভাবে চলতে থাকলে আমাদের পরিণতিও মনে হয় তাই হবে!

আমি যতটুকু জানি বা বুঝি, “ব্লগ” হল একটা লেখা-লেখির বা মত প্রকাশ করার সর্বাধুনিক মুক্তমঞ্চ, এখানে শৌখিন ও পেশাজীবী লেখকরা স্বনামে-বেনামে লিখবে, সেই অনুযায়ী মতামত দিবে, পাঠকগণ আলোচনা-সমালোচনা করবে, পরবর্তীতে সেই অনুযায়ী লেখা এডিট করবে বা কোন একটা বিন্দুতে স্থিতাবস্থায় আসবে! এরপরেও কোন লেখক যদি তার লেখাটাতে এডিট না করে, তবুও তার প্রতি কোনরূপ অন্যায় আচরণ বা তাকে ভয় দেখানো যাবে না! আবার লেখকেরও উচিত হবে, তার লেখা দ্বারা যেন ব্যাপক সংখ্যক পাঠক খতিগ্রস্থ না হন বা তাদের বিশ্বাসে আঘাত বা মনে কষ্ট না পান বা দেশ ও দশের কোন ক্ষতি না হয়, সে দিকে খেয়াল রাখা!

কয়েকটি বাংলা ব্লগে ঘোরাফেরা করে অল্প কয়দিনের অভিজ্ঞতায় আমার একটা ধারণা জন্মেছে; আর সেই ধারনাটা হল, এখানেও আমাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী ব্যাপক না হলেও কিছু কিছু দলাদলি ও গ্রুপিং চলছে বা আছে! এছাড়াও উদ্দেশ্য সিদ্ধির নামে কিছু কিছু মানুষ এখানে স্বনামে-বেনামে লেখার সুযোগটাকে কাজে লাগিয়ে, কখনো একা, কখনো দলভুক্ত হয়ে বা একই ব্যক্তি ভিন্ন ভিন্ন নামে (যদিও এর দালিলিক কোন প্রমাণ আমার কাছে নেই) কোন একটা উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে লিখছে, মন্তব্য করছে, বিতর্ক করছে, লেখায় খুত না থাকলেও, সেখান থেকে মানস অংকের মত “ধরে করি” বা “মনে করি”র মত করে খুত বের করে সমালোচনা, গালি’র ডালা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ছে। কেউ কেউ তো আবার এক ডিগ্রি এগিয়ে হুমকি ধামকিও দিচ্ছে! আর একটা শ্রেণী আছে যারা পোস্টের পুড়ো লেখাটা না পড়েই বা শুধুমাত্র মন্তব্য পড়েই নিজে নামে-বেনামে মন্তব্য দিচ্ছে বা গালাগাল করছে! নাম, ধর্ম নিয়ে অযথা প্রশ্ন তুলছে!

আমার প্রশ্ন, এখানে নাম-বেনাম, হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ–খ্রিস্টান, ধনী-গরিব, ছাত্র-শিক্ষক, জ্ঞানী–মূর্খ এইসবের প্রশ্ন আসবে কেন? ব্লগের শর্ত অনুযায়ী এখানে সবাই লেখক আর পাঠক, এখানে থাকবে না কোন নিয়ম বা দেশের বাধা (কিছু ক্ষেত্রে শর্তারোপ হতে পারে), জাত-পাত, ধর্ম-বর্ণ বৈষম্য এমনকি গোষ্ঠিগত লুকায়িত স্বার্থোদ্ধারের কোনরূপ অভিসন্ধিও থাকা চলবে না এখানে! এইসব শর্ত মেনে নিয়েই না আমরা সবাই পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এই সাইবার জগতে জড়ো হয়েছি!

আর দলবেঁধে স্ব স্ব অবস্থান থেকে লিখছি, আলোচনা-সমালোচনা করছি, হয়ত কারও লেখার স্টাইল বা মান ভাল আবার কারও খারাপ! তাতে তো কারও “বাড়া ভাতে ছাই পড়ছে না”! ভাল লাগলে পড়বো, না লাগলে পড়বো না, ফিনিশ! যদি কোন কারণে একটা লেখা পড়ে ফেলার পর দেখলাম আমার ভাল লাগে নাই, একটা মন্তব্য দেওয়া দরকার, সেটা দিয়ে অন্য কাজে নিজের সময় ব্যয় করবো! কিন্তু তা না করে দিনের পর দিন একই জিনিষ নিয়ে ঘ্যানর ঘ্যানর করবো আর প্যাঁচাতে থাকবো, তা তো ঠিক না! লেবু বেশী কচলালে তিতা হয়, এটা মনে হয় আমাদের সবারই জেনে রাখা ভাল!

যিনি বা যারা অন্য জনের নাম এবং আইডি নিয়ে প্রশ্ন করছেন, তাদের কাছে আমার প্রশ্ন, আপনাদের নামটা (আইডি) ঠিক আছে তো ভাইসব? নাকি আপনারাও ঐ একই গোত্রের? আমার এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার দরকার নেই কারণ ব্লগের নিয়ম অনুযায়ী আপনি যেমন এর উত্তর দিতে বাধ্য নন, আমিও তেমনি এইসব প্রশ্ন করার যোগ্যতা রাখি না! শুধুমাত্র কথার পৃষ্ঠে কথা আসে বলে বললাম!

আবার কেউ কেউ দেখি ব্লগের সংকলক’কে বলছে, “অমুকের লেখা আমার মনপুতঃ হয়নি বা অমুক আমার বা আমাদের বিরুদ্ধে লিখেছে, তাই ওটা মুছে ফেলুন, না হলে আমি বা আমরা আপনাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব!” – এটা কি ধরণের কথা? এটা তো সরাসরি হুমকি, আপনি বা আপনারা কি মগ? এটা কি তাহলে আপনাদের মুল্লুক? মন মত না হলে যা ইচ্ছা তাই করবেন, বলবেন, ভয় দেখাবেন?

না ভাই! এই জায়গাটা আপনাদের জন্য না! এটা মুক্ত জগত, স্বাধীন মত প্রকাশের একটা সাইবার প্লাটফর্ম! আমি ব্যক্তিগত ভাবে মনে করি, “আমি ততক্ষণ পর্যন্ত যোগ্যতা রাখি না, ব্লগের সংকলক’কে বলতে, লেখাটি আমার মনপুতঃ হয়নি, তাই ওটা মুছে ফেলুন! যতক্ষণ পর্যন্ত সংকলক বা তার টিম তাদের বা ব্লগের নিয়মের মধ্যে আছেন!”

আর একটা পোষ্টে দেখলাম রীতা রায় মিঠু’র সন্তানের অপকর্মের দায় নেয় অভাগা পিতামাতা, কুনাগরিকের দায় নেয় অভাগা রাষ্ট্র! লেখায়, লেখিকা দোহা এয়ারপোর্টে কাস্টমস কর্মকর্তার সাথে কথোপকথনের উল্লেখ করতে যেয়ে “ চেহারাতে ভারতীয় ছাপ” বলায় কয়েকজন তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠেছেন! যারা জ্বলছেন, তারা কিন্তু নিশ্চিত ভাবেই জানেন বাইরের দেশে, মানে বিদেশের মাটিতে বিশেষ করে যে সকল দেশে আমাদের তথা বাংলাদেশের পরিচিতির ব্যাপক ঘাটতি আছে সেসব দেশের মানুষ সহজে আমাদের আইডেন্টিফাই করতে পারে না, বা পারলেও কেউ কেউ ইচ্ছাকৃত ভাবেও তা করে না!

এই বিষয়ে আমার কিছু বাস্তব অভিজ্ঞতা আছে তা থেকে একটা “কথোপকথন” তুলে ধরছি লেখার সুবিধার্থে: (দুবাইতে এক জর্ডানিয়ান প্রস্পেক্টিভ বায়ারের সাথে প্রথম সাক্ষাতে আমাদের ইংরেজিতে কথা হচ্ছিল)

হাত মিলিয়ে আমার নাম বলার পরে, সে আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, “তুমি কি ইন্ডিয়ান”?
আমি বললাম, না। আমি বাংলাদেশী।
বাংলাদেশটা কোথায়?
আমি একটু ভেবে বললাম, এটা উত্তর-পূর্ব ইন্ডিয়া ও নেপাল-ভুটানের কাছাকাছি।
ওহ! আমি কখনো এই দেশের নাম শুনিনি! ঠিক আছে!

ঐ “আরব” ব্যক্তিটির সাথে কথা বলার সময় আমার মনে হচ্ছিল, সে হয়তবা মিথ্যা বলছে! মধ্যপ্রাচ্যে এত বাংলাদেশী থাকে আর ইনি বাংলাদেশের নাম জানে না এটা তো হতে পারে না! কিন্তু কি আর করা যাবে, ঐ সময় তার কথা আমার মনপুতঃ না হওয়া সত্ত্বেও তা মেনে নিয়েছিলাম! পরবর্তীতে ওর সাথে আর একটু ঘনিষ্ঠ হওয়ার পর আমার মনে হয়েছে, সে বোধ মিথ্যা বলেনি!

এক্ষেত্রে কি ওর সাথে আমার ঝগড়া করা উচিৎ ছিল? যেখানে আমার মুল উদ্দেশ্য ছিল ওর সাথে সম্পর্ক স্থাপন করে ব্যবসা করা, তাও আবার ওদের ভূমিতে দাঁড়িয়ে! হ্যাঁ, পরে ওর সাথে আমার আরও কথা হয়েছিল এবং আমার ডায়েরিতে থাকা বিশ্বের ম্যাপ দেখিয়ে ওকে “বাংলাদেশ” ভালভাবে চিনিয়েছিলাম!

আমার সুযোগ ও সময় ছিল বলে এটা সম্ভব হয়েছিল। সবার কাছে তো আর এই সময়টুকু থাকে না বা সুযোগ পায় না! তখন সহজ এক্সিটের জন্য অনিচ্ছাকৃত সত্ত্বেও অনেক কিছু মেনে নিতে হয়। যেমন ঢাকায় সিটিং বাসে অফিস টাইমে চলাচল করার সময় হটাৎ করেই রাস্তার মাঝখান থেকে যদি একজন প্যাসেঞ্জার চলন্ত বাসে উঠে পড়ে, তখন কি আমরা মেনে নেই না? নাকি নিজেরা বাস থেকে নেমে যাই বা ঐ প্যাসেঞ্জারকে নামিয়ে দেই?

না! এর কোনটাই আমরা করি না। বড়জোর বাসের হেলপারের সাথে দুই-একটা গরম গরম কথার বলার চেষ্টা করে উল্টো হেলপারেরই ঝাড়ি খেয়ে চুপসে যেয়ে চুপচাপ বাসে বসে থাকি! তাও আবার সেটা চেষ্টা করি নিজের দেশ বলে, বিদেশ হলে কি করতাম? না কি সেটা করা যুক্তিসঙ্গত হতো? এই উদাহরণটা আমি দিলাম এই কারণে যে, অপ্রিয় অনেক জিনিষ পারিপার্শ্বিক অবস্থার কারণে আমাদের মেনে নিতে হয়!

তার ঐ লেখার মন্তব্য করতে যেয়ে কয়েকজনকে দেখলাম উদ্দেশ্যমূলক ভাবে তাকে কিভাবে হেনেস্থা করার যায়, দিনের পর দিন তার চেষ্টা করে যাচ্ছে! পাশাপাশি ভারত-আমেরিকাকে উদ্ধার করছে! যারা এগুলো করছেন তাদের কাছে আমার কয়েকটি প্রশ্ন আছে-

“চেহারায় ভারতীয় ছাপ” বলায় যারা গোস্বা করেছেন, তাদের কাছে আমার প্রশ্নঃ

১। আপনারা কি জানেন না যে আমাদের এই অঞ্চলকে বিদেশীরা প্রাথমিকভাবে “ভারত উপ-মহাদেশ” হিসেবে চিহ্নিত করার পাশাপাশি এই অঞ্চলের মানুষকে “ভারতীয়” হিসেবে চিহ্নিত করে? আরও বড় ভাবে গেলে “এশিয়ান” বলে? আপনারা কি ভূগোল পড়েননি? নাকি কখনো দেশের গণ্ডির বাইরে যাননি? নিকট অতীতের আমেরিকার নির্বাচনে কি দেখেননি ভোটারদের কিভাবে এশিয়ান-আমেরিকান, আফ্রিকান-আমেরিকান, হিস্পানিক-আমেরিকান হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে? তখন তো কারও গলা দিয়ে “টু” শব্দটুকুও বের হতে দেখালাম না? আমেরিকার দু মেয়াদের নির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে যে “আফ্রিকান-আমেরিকান” বলা হয় তাতে তো তাকে কখনো মনঃক্ষুণ্ণ হতে দেখলাম না? যত দোষ “ভারতীয়” নামে, এই নাম শুনলেই কেন আপনারা লাফ দিয়ে ওঠেন?
২। বিদেশে এই রকম একটা পরিস্থিতিতে আপনি বা আপনারা পড়লে কি করতেন? ঝগড়া করতেন, নাকি দেশে ফিরে আসতেন?
৩। যান না আরব-ভূমিতে, নিজ চোখে দেখে আসুন “ওরা” আমাদের মানে বাংলাদেশীদের কি চোখে দেখে? আর বাংলাদেশিরাও ওখানে একটু “জাতে” ওঠার জন্য (ঐ দেশের প্রেক্ষিতে) কি ভাষায় কথা বলে দেখে আসুন?

আর যারা ভারত-আমেরিকারকে উদ্ধার করছেন তাদের কাছে প্রশ্নঃ

১। আপনারা কি ভারতীয় চাল, ডাল, পেঁয়াজ–রসূন, গরু প্রভৃতি গোগ্রাসে খান না?
২। বেড়ানোর জন্য, চিকিৎসার জন্য, শিক্ষার জন্য কি আপনারা বা আপনাদের নিকটজনরা কি ভারতে যান না?
৩। যারা দিন রাত আমেরিকার ধ্বংস কামনা করছেন, আপনাদের ঐ দেশের উপর এত রাগ কি ডিভি লটারি লাগেনি বলে? সত্যি করে বলেন তো আপনি বা আপনারা কতবার করে ডিভি লটারিতে আবেদন করে বিফল হয়েছেন?
৪। কাল যদি আমেরিকা বাংলাদেশীদের জন্য ভিসা “ফ্রি” ঘোষণা করে আপনি বা আপনারা কি “আমার” সাথে লাইনে দাঁড়ানোর জন্য লাঠালাঠি করবেন না? সত্যি করে বলেন তো?

থাক, আমার এই লেখার উদ্দেশ্য কোনরূপ বিভেদ সৃষ্টি করা নয়! আমি বলতে চাচ্ছি অযথা বিতর্ক তৈরী না করে, আসুন আমরা সবাই মিলে সহনশীলতার মাধ্যমে বিডি ব্লগে একটা সুন্দর লেখা-পড়ার পরিবেশ গড়ে তুলি!

ধন্যবাদ!

সুত্রঃ
১। ধর্ম ব্যবসায়ীরা কক্সবাজার কে ‘রোহিঙ্গা রাজ্য’ বানানোর জন্য উঠে পড়ে লেগেছে !!- এর মন্তব্য গুলো। – সুলতান মির্জা।
২। সন্তানের অপকর্মের দায় নেয় অভাগা পিতামাতা, কুনাগরিকের দায় নেয় অভাগা রাষ্ট্র!” – এর লেখা ও মন্তব্য গুলো। – রীতা রায় মিঠু।