ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

অফিসের কাজ সেরে ভাবছি কি করব, এখন বাজে সারে চারটা, অফিসের উদ্দেশ্যে ফিরতে গেলে সঠিক সময়ে পোঁছানো যাবে না, আবার বাসার দিকেও ফেরা যায় না, অফিস টাইম এখনো আছে বলে। ভাবলাম তাপস ভাইয়ের ওখানে যাই, আড্ডাও হবে সাথে সাথে শেয়ার বাজার আজ কতটুকু পড়লো তাও জানা যাবে।

যেই ভাবা সেই কাজ, জনতা ব্যাংকের কর্পোরেট ব্রাঞ্চ থেকে বের হয়ে রাস্তা পেরিয়ে বাংলাদেশ বিমানের অফিসের পাস দিয়ে সোজা হাটা ধরলাম মধুমিতা সিনেমা হলের উল্টো দিকের আই,এফ,আই,সি ব্যাংকের ব্রোকারেজ হাউসের দিকে।

হাঁটছি, এই সময় আমার ডিপার্টমেন্টের জুনিয়র কলিগ ফোন দিলো। হ্যালো বলতেই, ও বলল, স্যার কি মতিঝিলে? আমি বললাম, হ্যাঁ, কেন? ও বলল, স্যার যদি “ঐ” দিকে যান তাহলে কয়েকটা “খতিগ্রস্থের ফর্ম” কিনে আনবেন, ঐ বিল্ডিঙের নিচেই হকাররা বিক্রি করে! আমি আচ্ছা বলেই লাইনটা কেটে দিলাম।

যদিও আমাদের অফিসের প্রায় সবাই শেয়ার ব্যবসার সাথে কম বেশী জড়িত, তবুও এই কাজটা হয় খুবই সঙ্গোপনে। অনেকটা “কাকের খাবার লুকনোর মতো করে!” শুনেছি কাক নাকি তার সংগৃহীত খাবার চোখ বন্ধ করে লুকায়! ওদের ধারণা, “আমি যখন দেখছি না তখন কেউ দেখছে না” ধরনের! আর চোখ বন্ধ করে লুকানোর কারণে যখন ওদের খিদে পায় এবং খাবারটি সত্যি সত্যি দরকার, তখন আর সেটা খুঁজে পায় না!” আমাদের শেয়ার ব্যবসাটা করাটাও অনেকটা সেই রকমই এবং আমরাও সবাই ওদের মত যথারীতি আমাদের এতদিনের জমানো টাকা খুঁজে পাচ্ছি না এবং ফতুর!

“ঢাকা স্টক একচেঞ্জ” বিল্ডিঙের নিচেই ফর্মগুলো পেয়ে গেলাম, হলুদ রঙের আইপিওর খতিগ্রস্থের ফর্মের দিকে বিক্রেতার দৃষ্টি আকর্ষণ করে দাম জিজ্ঞাসা করেতেই, বিক্রেতা বলল, ৫ টাকা, আমি আবার জিজ্ঞাসা করলাম, আর নর্মাল ফরমের দাম? ও বলল, ১ টাকা। আমি হাসতে হাসতে বললাম, এটা কোন কথা হল, ভাই? মড়াদের আপনারাও মারছেন! দোকানিও মজা পেয়ে বলল, স্যার, সবাই মারে আমরা আবার বাদ থাকবো ক্যান! তবে স্যার ৩ টাকা হলে নিতে পারেন! তোমার কাছ থেকে এটা আমি এটা কিনবো না, হাউসে গেলেই তো ফ্রি পাওয়া যায়! বলেই, আমি আমাদের ব্রোকারেজ হাউসে যাওয়ার গন্তব্য ঠিক করলাম।

দ্রুত সিঁড়ি ভেঙে উঠে দরজা ঠেলে হাউসে ঢুকতে ঢুকতে হাঁক দিলাম, “মাসুস ভাই আমাকে কয়েকটি মিসকিনের ফর্ম দেন!” মাসুদ ভাই সহ হাউসের সবাই এক যোগে হেসে উঠলো! মাসুদ ভাই, আমরা যে হাউসে ট্রেড করি, সেই হাউসের জি,এম বললেন, দাদা, অনেকেই অনেক নাম দিয়েছে এটার, তার মধ্যে আপনার দেওয়া নামটা সবচেয়ে আপ্রোপ্রিয়েট, আসলেই তো আমরা সবাই আজ মিসকিন, আর আমাদের সরকার অনেক করুণা করে, খতিগ্রস্থ বিনিয়োগকারীদের নামে মিসকিনদের আইপিওতে সুযোগ দেওয়ার জন্য ২০% কোটার সুবিধা দিয়েছে!

আমি হাসতে হাসতে বললাম, মাসুদ ভাই, আমার একাউন্ট স্ট্যাটাসটা আর কয়েকটি খতিগ্রস্থের ফর্ম দেন!

দাদা! ফর্ম নেওয়ার আগে চেক করে দেখুন, মিসকিন লিস্টে আপনার নাম আছে কিনা? মাসুদ ভাই আমাকে এই কথা বলেই, কম্পিউটার অপারেটরকে নির্দেশ দিলেন আমার নামটা ওই লিস্টে আছে কি তা চেক করে দেখতে। আমি কনফিডেন্টলি হাউস কোডটা দিতে দিতে বললাম, আমার নাম অবশ্যই থাকবে, খতিগ্রস্থ বিনিয়োগকারীদের আইপিওতে সুযোগ দেওয়ার সরকার ঘোষিত যে কাঠামোটা পত্র-পত্রিকায় দেওয়া হয়েছিল তা আমি পড়েছি এবং যতদূর বুঝেছি তাতে আমি আছি। আর আমার ক্ষতির পরিমানটাও তো নেহাত কম না, তাছাড়া আমিতো কোন মার্জিন লোণেরও সুযোগ নেইনি, তাই আমি মিসকিন লিস্টে আছিই!

কম্পিটার অপারেটর একটু ঘাঁটাঘাঁটি করে বলল, দাদা, আপনার নাম নেই! শুনে তো আমি থ বলে গেলাম! মাসুদ ভাই আমাকে খোঁচাতে শুরু করলেন এবং বললেন, দাদা, আপনি হলেন বড়লোক! আপনি থাকবেন বড় লোকের তালিকায়, মিসকিনের তালিকায় আপনি থাকবেন কেন?

ভাই! বড় লোক তো ছিলামই ২০১০ সালের আগে! ডিজিটালের মারপ্যাঁচে পরে এখন দেখছি মিসকিন লিস্টেও নাম নাই! ঘটনা কি, মাসুদ ভাই? সত্যি করে বলেন তো কি হয়েছে, আমার কিন্তু বিশ্বাস হচ্ছে না? আমার নাম কিন্তু এই তালিকায় থাকার কথা!

দাদা, শুধু আপনার নাম না আরও অনেকের ক্ষেত্রেই এটা হয়েছে, যাদের নাম এই লিস্টে থাকার কথা ছিল তাদের নাম নাই আবার যাদের থাকার কথাই না তাদের আছে!

হাসতে হাসতে বললাম, তবে কি এখানেও ডিজিটালের খেলা হয়েছে? দেখুন তো দরবেশ, মিষ্টি হাসির ভাইদের নাম আছে কিনা এই তালিকায়? আমার এই কথা শুনে আর এক “মুরুব্বী মিসকিন” হাসতে হাসতে আমাদের সাথে যোগ দিয়ে বললেন, ভাই আপনি ঠিকই বলেছেন, এই লিস্টে ওদের নাম পাওয়া যাবেই!

এতক্ষণ মাসুদ ভাই আমার একাউন্ট স্ট্যাটাস চেক করছিল, এবার সে বেশ চিন্তিত মুখে আমাকে বললেন, আপনার নাম না থাকার কোন কারণ তো দেখছি না! আপনার কোডটা আবার বলুন। আমি বললাম, সে তার ল্যাপটপে থাকা সিডিবিএলের ৪টি তালিকাই চেক করে বললেন, দাদা! মিসকিন লিস্টে আপনার নাম নাই!

আমি বললাম, যাক বাঁচা গেল, তাহলে মিসকিন লিস্টেও আমার নাম নাই!